
বেদ আর তন্ত্রের বিভেদ, গোবলয় আর বাঙালির বিভেদ। ওদিকে মুসলমান আর কাফেরের বিভেদ। সব ভেদাভেদ মুছে দিতে যে গেরুয়া ও সবুজ pious idiot গণ সক্রিয়, তারা জানেন, ইতিহাসের কত কত কত অধ্যায় মুছতে হবে আপনাদের?
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, ত্রিশ জুন দুহাজার চব্বিশ

বেদ আর তন্ত্রের বিভেদ, গোবলয় আর বাঙালির বিভেদ। ওদিকে মুসলমান আর কাফেরের বিভেদ। সব ভেদাভেদ মুছে দিতে যে গেরুয়া ও সবুজ pious idiot গণ সক্রিয়, তারা জানেন, ইতিহাসের কত কত কত অধ্যায় মুছতে হবে আপনাদের?
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, ত্রিশ জুন দুহাজার চব্বিশ

তন্ত্রে নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়েছে, শুধুমাত্র কথার কথা নয়।
★ ডাকিনী। নারীরা গুরু হতে পারেন তন্ত্রে, তাঁদের ডাকিনী বলা হত আগে। পালযুগে চুরাশি সিদ্ধের অনেকেরই গুরু ছিলেন নারী, যেমন একজন বিখ্যাত গুরু ছিলেন শুঁড়িনী লোকডাকিনী। এছাড়া সিদ্ধাচার্যদের মধ্যেও নারী ছিলেন, যেমন বিখ্যাত নিগু ডাকিনী। এখনকার যুগে ডাকিনীর কদর্থ হয়েছে বটে সনাতন ব্রাহ্মণ্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক আগ্রাসনের ফলে, কিন্তু সেযুগে ডাকিনী সম্মানের উপাধি ছিল, এখনকার পিএইচডির মত। ডাকিনীরা মূর্তিমতী প্রজ্ঞা। ডাকিনীরা ছিলেন সাধনমার্গের গুরু।
★ যোগিনী। নারীরা শক্তিস্বরূপা হতে পারেন, স্বয়ং কুণ্ডলিনী তত্ত্ব হতে পারেন। এই রূপে তাঁদের সাক্ষাৎ পাওয়া যে কোনও মানুষের জন্য আশীর্বাদ। এঁরা শুধু সাধক, জ্ঞানডাকিনী বা গুরু নন, এই শ্রেণীর শক্তিস্বরূপা নারী হলেন যোগিনী এবং এঁদের দেখা পাওয়া ভাগ্যের কথা, চৌষট্টি যোগিনীর বা দশমহাবিদ্যার দেখা পাওয়ার মত। কোন্ নারীর মধ্যে তিনি আছেন কেউ বাইরে থেকে সহজে বলতে পারে না, এজন্য নারীর প্রতি অসম্মানবাচক আচরণ বা কথা বললে তন্ত্রসাধনার সমস্ত সুফল লুপ্ত হয়।
★ দূতী। নারীরা, বলা বাহুল্য, পুরুষ সাধকদের সাধনসঙ্গিনী হতে পারেন। এঁদের দূতী বলা হয়েছে ব্রহ্মযামলতন্ত্রে।
যে ব্যক্তি নারীদের অসম্মান করে, সে তন্ত্রেরই অসম্মান করে। যে ব্যক্তি প্রকৃত কালীসাধক তার পক্ষে কখনও জনসমক্ষে নারীবিদ্বেষের শিক্ষা (যেমন নারী নরকের দ্বার, কামিনী আর কাঞ্চন, নারীরা ত্রিভুবন খেয়ে ফেলল) দেয়া সম্ভব নয়।
তন্ত্রের কেন্দ্রে আছেন আদ্যা নিত্যা অব্যক্ত প্রকৃতি। তিনি বাক্য ও মনের অগোচর। ধ্যানের সুবিধার জন্য আমরা শাক্তরা মা বলে ডাকি, এবং তাঁকে বিশ্বযোনি মনে করি। তিনি এই জগতের উৎস, তিনিই এই জগতের বিলয়। স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্ব চরাচর তাঁর থেকে সৃষ্টি হয়ে তাতেই বিলীন হয়।
এই জগন্মাতাকে যারা জগন্মায়া অর্থাৎ মোহ আর মায়াজাল বলে কল্পনা করে তারা শাক্তভেকধারী বৈষ্ণব মাত্র, এরা বিষ্ণুমায়া তত্ত্বে বিশ্বাসী, এরা প্রকৃত শাক্ত নয়।
নারীরা মোহমায়া নন, তাঁরা অসীম শক্তি। তাঁদের সম্মান না করে, তাঁদের আশ্রয় ছাড়া কোনও পুরুষের পক্ষে তন্ত্রসাধনা করা অসম্ভব। নারীর রজঃ অসীম শক্তির আধার, ব্রহ্মযামলতন্ত্রে বলা হয়েছে, কাজেই নারী কোনও অবস্থাতেই অশুচি নন। দেবী স্বয়ং কুমারী থেকে ধূমাবতী, শিশু থেকে বৃদ্ধা সমস্ত রূপ ধারণ করেন। কথিত আছে যশোর সম্রাট প্রতাপাদিত্য এক বৃদ্ধা ভিখারিণীর ওপর বিরক্ত হয়ে তাঁর স্তন কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই ভিখারিণী স্বয়ং ভগবতী ছিলেন, ফলে চূড়ান্ত শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী থাকা সত্ত্বেও প্রতাপের পতন ঘটেছিল।
জয় মা কালী।
© কালীক্ষেত্র আন্দোলন
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, ঊনত্রিশ জুন দুহাজার চব্বিশ

আমরা যাকে ফলহারিণী অমাবস্যা বলি, আসলে তো ফলদায়িনী অমাবস্যা বললেই বুঝতে সুবিধা হত। সাধকের কর্মফল হরণ করেন বললে সাধারণ মানুষ তো কিছুই বুঝতে পারে না। উপরন্তু এ সময়টা প্রকৃতি মা প্রচুর ফল প্রদান করেন, যা আমরা মনের আনন্দে ভক্ষণ করি। মা এই সময় আদৌ “ফল” হরণ করেন না। এই সময়টা ফলের, ফলনের। এই সময় উর্বরতার।
সেজন্যই সম্ভবত বাংলার বাইরে ফলহারিণী বলে না। এই তিথিকে উত্তর ভারতে বাঢ় অমাবস বলে, অর্থাৎ বট অমাবস্যা। একে বট সাবিত্রী ব্রতও বলা হয়। এই সময় বটবৃক্ষদেবতার পুজো হয়, ফলের কামনা করে।
প্রাচীন ভারতে বৃক্ষ উপাসনা হত, এছাড়া যক্ষ প্রভৃতি উপদেবতারা বৃক্ষবাসী হতেন। বৃক্ষবাসিনী একজন মায়ের উপাসনা হত হরপ্পা সভ্যতায়। মা কালী আদিতে ছিলেন বলাকা মাতৃকা। এখনও বটগাছ আমাদের কাছে পবিত্র। প্রায়ই মা কালীর সঙ্গে বটগাছের যোগ। বৃক্ষ পূজা এখনও হয়। নবদ্বীপ অধিষ্ঠাত্রী পোড়ামা আসলে বৃক্ষমাতৃকা। বাংলা জুড়ে অসংখ্য বটতলায় আজও মাতৃকা উপাসনা হয়।
দিল্লির বুরারি অঞ্চলে ২০১৮ সালের জুন মাসের শেষ দিনে একটি পরিবারের এগারো জন বাঢ় তপস্যা বা বট তপস্যা করতে গিয়ে মারা গিয়েছিল। এরকম তপস্যার কথা আমি কোনও তন্ত্র গ্রন্থে আজ পর্যন্ত পাইনি। বটবৃক্ষের শাখা হতে চেয়েছিলেন ওরা!
কৌতূহল হচ্ছে? আরও জানতে চান? কুলমন্ত্র সাইটে আমার লেখা পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ পড়ুন। দ্য বুরারি ডেথস অ্যান্ড সেক্রেড হররস।
লিঙ্ক কমেন্টে।

পশ্চিমবঙ্গে এসেছি কদিনের জন্য, দিল্লিতে কলেজে সামার ভেকেশন চলছে। আমার এখানকার টিভি চ্যানেল দেখার সুযোগ হয় না এমনিতে, তো একটা বাংলা নিউজ চ্যানেলের বিজ্ঞাপনগুলো দেখছিলাম। ন্যাশনাল মিডিয়ার সঙ্গে চোখে পড়ার মত ফারাক।
বাঙালির টিভিতে একটা পাঁচ মিনিটের স্লটের বিজ্ঞাপনে আছে স্যাভলন, বিস্কুট, সোনার গয়না, লটারি, সিমেন্ট, বাইকের টায়ার। নিতান্ত random একটা নমুনা, কিন্তু এ থেকে যা বুঝলাম…
যা বুঝলাম, তা হল এই। বাঙালি সকালে উঠে বিস্কুট খেতে খেতে লটারি কিনতে যায়, রাস্তায় পড়ে গিয়ে ছড়ে গেলে স্যাভলন লাগায়। বড় মাপের “ইনভেস্টমেন্ট” করতে গেলে বাড়ি করে অথবা সোনার গয়না কেনে! রাস্তার অবস্থা খারাপ বর্ষাকালে, গণ পরিবহনের সুযোগ কম, দুচাকার টায়ার ঘন ঘন বদলাতে হয়…
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, সাতাশ জুন দুহাজার চব্বিশ

পৃথিবী রজস্বলা হলেন। অম্বুবাচীর সূচনা হল। অম্বুবাচীর আক্ষরিক অর্থ জলের উচ্চারণ! সবথেকে প্রাচীন জলদেবী, একদা অতি জনপ্রিয় কিন্তু আজকে বিস্মৃত মা নীলার স্মৃতিই বহমান বঙ্গে মা নীল সরস্বতী, আসামে মা কামাখ্যার মধ্যে
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, একুশ জুন দুহাজার চব্বিশ

মা কালীর সঙ্গে ভূতপ্রেতের সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা।
১. মা শ্মশানকালী শ্মশানভূমির অধিষ্ঠাত্রী। ভূতপ্রেত তাঁর গণ বা অনুচর। পালযুগে চামুণ্ডা মূর্তিমণ্ডলে কঙ্কালরূপী ভূতপ্রেতের উপস্থিতি দেখা যায়। মা কালীর দুদিকে ডাকিনী যোগিনী থাকেন যাঁদের জনপ্রিয় মূর্তিরূপ ভূতপ্রেতের মতোই দেখতে।
২. কালিদাসের কাব্যে এক জায়গায় মা কালীকে দেখা যায় ভূতপ্রেত (প্রমথগণ) অনুষঙ্গে নৃত্যরতা অবস্থায়। তিনি নরকপাল অলঙ্কার পরিধান করে নৃত্য করছেন। কাজেই মা কালীর সঙ্গে ভূতপ্রেতের সম্পর্ক প্রাচীন কাল থেকেই কবিকল্পনার অংশ।
৩. হরপ্পা সভ্যতায় একরকম মাতৃমূর্তি দেখা যায় সেখানে মাতৃমূর্তির মুখমণ্ডল নরকপাল/করোটির মত। এর থেকে কিছু গবেষক অনুমান করেন যে এটি সম্ভবত চামুণ্ডা (যাঁর মুখও প্রায়ই করোটির মত) বা কালীর আদি রূপ।
৪. মা কালীর পদতলে যে শবশিব থাকে তাকে প্রেতশিব বলার প্রথা। মা কালী প্রেতদের নিয়ন্ত্রক। তিনি কালের কলন করেন। এজন্য তিনি প্রেতদেরও অধিষ্ঠাত্রী। কারণ ভূতপ্রেত হল কালগ্রাসের প্রতীক।
৫. মা কালীর বাৎসরিক পূজার মহাতিথি দীপান্বিতা কার্তিকী অমাবস্যা। তার ঠিক আগের দিন ভূত চতুর্দশী পালিত হয়। যেমনভাবে রাজা আসার আগে রাজার অনুচররা আসেন, সেভাবে মা কালীর আগমনের আগে চোদ্দ ভূত আসেন লোকায়ত বিশ্বাসে। মা কালী যেমন মোক্ষদায়িনী, তেমনই যারা মুক্তি পান নি অথবা নিজে থেকেই মুক্তি/মোক্ষ চান নি কোনও গূঢ় কারণে, জীবন্মুক্ত নন, এমন সমস্ত যাঁরা ভূতপ্রেতদশায় অবস্থান করেন, তাঁদেরও নিয়ন্ত্রক।
৬. মৃত্যু এক রহস্যময় জৈবিক সত্য। মৃত্যুকে প্রাচীন কাল থেকে মানুষ ভয় পায়, আবার এই মৃত্যু এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধি। মৃতরা সমস্ত প্রাচীন সভ্যতায় একই সঙ্গে ভীতিপ্রদ কিন্তু এক শক্তিশালী স্মৃতি যা অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। মৃত ব্যক্তির স্মৃতিতে একরকম অকাল্ট শক্তি নিহিত, যা কর্মফল অনুযায়ী ও মনস্তত্ব অনুযায়ী জীবিতদের ভালো মন্দ দুইই করতে পারে। মা কালীর মণ্ডলে ভূতপ্রেত সেই শক্তির দ্যোতনা। প্রেতের মধ্যে অতীতের স্মৃতি ও শক্তি আছে, এবং মা কালী যেহেতু স্বয়ং শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, তাই ভূতপ্রেতের অবস্থান মা কালীর মূর্তিমণ্ডলে অবিসংবাদী।
৭. মা কালী হলেন তন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তন্ত্রে শবসাধনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রেতসংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনা তন্ত্রের খুব গূঢ় অংশ। পালযুগের তন্ত্রযানে ভূতপ্রেত নিয়ে সারস্বত ডিসকোর্স পাওয়া যায়।
ভূত মানে আসলে তো অতীত, অতীতের ছায়া, অতীতের স্মৃতি। মা কালীর তন্ত্র আমাদের শেকড়। আমাদের শেকড়ে আছেন অতীতের ভূতপ্রেত। তন্ত্রভূমি বাংলার তেপান্তরে অক্ষয় বটগাছের ডালপালায় যে ভূতেরা বাস করেন, তাঁরা আমাদেরই অতীতের লোক, আমাদের পূর্বসূরী, তাঁরা আমাদেরই পূর্বস্মৃতি। তাঁরা এই কালবেলায় পিশাচরূপ ধারণ করে তন্ত্রধর্মের সমস্ত ঘরশত্রুদের ভক্ষণ করুন, আর মা কালীর সন্তানদের জীবনযুদ্ধে পাশে থেকে আমাদের জয়যুক্ত করুন।
জয় মা কালী। জয় মা কালী শ্মশানেশ্বরী প্রমথেশ্বরী।
© কালীক্ষেত্র আন্দোলন
মা কালীর ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া।
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, পনেরো জুন দুহাজার চব্বিশ

অদ্ভুত আঁধার নেমেছে বাংলার বুকে
যারা অন্ধ তারা সবচেয়ে বেশি দ্যাখে।
জীবনানন্দের কবিতার পংক্তি একটু বদলে নিয়ে আমরা আজকে বলতে চাই, বাঙালির জীবনে এক আশ্চর্য অন্ধকার নেমেছে এই বিশ্বমানব শেকড়বিচ্ছিন্ন আত্মবিস্মৃত দিনকালে। বাঙালির প্রাণের মা কালীর তত্ত্ব, ইতিহাস, ধ্যান, উদযাপন, দর্শন, সর্বোপরি মা কালীর সর্বময়ী সামগ্রিকতা – না আজকের কালীভক্তরা জানেন (তারা হয় প্রণাম ঠুকেই সারা, নয়ত নানা অদ্ভুত গুরুর পাল্লায় পড়ে বিকট দুর্বোধ্য সব আচারের বেড়াজালে জীবন কাটান), আর না জানেন সমাজের বাকি অংশ, বিশেষ করে সেই এলিট অংশ যারা আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস বানান।
যে অন্ধ সে চারপাশের কিছুই দেখতে পায় না। বাঙালির মনের মধ্যে যে অন্ধত্ব নেমে এসেছে, তার ফলে সে মা কালীর সর্বব্যাপী সর্বময়ী মাহাত্ম্য, বাঙালির মাতৃধর্মী সংজ্ঞায়ন সম্পর্কে কিছুই বুঝতে পারে না।
বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ যে তান্ত্রিক, সহজযানের তন্ত্র, তা আপনাকে স্কুলে শেখানো হয় না। চর্যাপদে সন্ধ্যাভাষায় একাধিক স্থানে divine feminine বা পরমা প্রকৃতির আবাহন হয়েছে, কিন্তু আপনাকে জানতে দেওয়া হবে না। অথচ চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যরা প্রায় সবাই তন্ত্রকে আশ্রয় করে মাতৃকা উপাসনা করেছেন। বিখ্যাত সিদ্ধ নারোপা ছিলেন বজ্রযোগিনীর উপাসক, এবং তাঁর স্বপ্নে যে নারোডাকিনী এসেছেন, তিনি আজকে আমাদের মহাবিদ্যা ছিন্নমস্তার অন্যতম আদি রূপ, এবং মা কালীর মূর্তিরূপের মধ্যেও তাঁর প্রভাব। সিদ্ধেশ্বরী কালীর উপাসনার মধ্যেও চুরাশি সিদ্ধদের স্মৃতি।
কিন্তু অন্ধকার, অন্ধকার। ওরা আপনাকে অন্ধকারে রাখতে চায়।
আপনি বারো ভুঁইয়ার কথা জানেন, কিন্তু তাঁদের বেশিরভাগ মাতৃকা উপাসক। যশোররাজ প্রতাপের পূজিত মা কালী তো আজও বিরাজমান। চাঁদ ও কেদার রায়ের শিলাময়ী মায়ের মূর্তি মানসিংহ নিয়ে যান অম্বর দুর্গে।
বহু আগে, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে গৌড়ে রাজত্ব করেছেন শশাঙ্ক। ইতিহাস বইতে তাঁর উল্লেখ তো থাকে। কিন্তু তিনিও তন্ত্রধর্মী ছিলেন, সেটা বলা হয় না। তাঁর মুদ্রায় তন্ত্রধর্মী মাতৃকা উপাসনার স্পষ্ট ছাপ। ওই শশাঙ্ক যুগে শিব ও নিলাবতীর বিবাহ উৎসবের মাধ্যমে তন্ত্রধর্মী বাংলা নববর্ষের (বৈশাখী নববর্ষ) সূচনা।
চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গারিডাই সভ্যতা (গঙ্গাল) নিয়ে “গঙ্গাহৃদি” “গঙ্গাঋদ্ধি” শীর্ষক প্রভৃতি প্রচুর লেখালেখি দেখবেন, কিন্তু আমাদের এই বিখ্যাত পূর্বসূরী গঙ্গাল জাতি যে মাতৃকা উপাসক ছিলেন, তার উল্লেখ চেপে যাওয়া হয়। তারও দুহাজার বছর আগে অর্থাৎ আজ থেকে চার হাজার বছর আগে বাংলার বুকে যে সর্বপ্রাচীন উন্নত তাম্রাশ্ম সভ্যতা গড়ে ওঠে সেই পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে বলাকা মাতৃকা পূজিত হতেন। পরেশচন্দ্র দাশগুপ্তর খনন প্রতিবেদন দ্রষ্টব্য। অর্থাৎ একটানা চার হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি এই মাতৃকা উপাসনায় সংজ্ঞায়িত। এবং এই বলাকা মাতৃকার সম্পর্কে নানা গবেষণার মাধ্যমে আমরা দেখিয়েছি যে ইনিই পরবর্তীকালে মা কালীর মধ্যে প্রকাশিত, এছাড়া মহাবিদ্যা বগলামুখী আসলে বলাকামুখী ছিলেন। কিন্তু আপনাকে জানতে দেওয়া হয় না।
চৈতন্য মহাপ্রভুর স্বহস্তে কপি করা একটি শ্রী শ্রী চণ্ডী গ্রন্থ ছিল। নিত্যানন্দ প্রভু ছিলেন শাক্ত অবধূত। তিনি সর্বদা ত্রিপুরাসুন্দরী যন্ত্র ধারণ করতেন। বাংলার গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মটি সম্পূর্ণ তান্ত্রিক। কিন্তু আপনাকে জানতে দেওয়া হয় না। জানতে না দিয়ে আমাদের ইতিহাস, শেকড়, বাঙালি আত্মপরিচয়কে অন্ধের হস্তীদর্শন করতে শেখাচ্ছে ওরা।
অদ্ভুত আঁধার, অদ্ভুত আঁধার। প্রত্যেক বছর দুর্গাপুজো কালীপুজো এলেই আমাদের প্রাচীনতম ইতিহাসকে বিকৃত করে মূলধারার মিডিয়ায় হই হই করে একদল বুদ্ধিজীবী মিথ্যার বেসাতি করতে শুরু করে। দুর্গাপুজো নাকি হালফিলের পুজো, আগে ছিলই না, কালীপুজো নাকি মধ্যযুগের আগে ছিলই না। আমরা গবেষণা করে দেখিয়েছি, যে এই দুটিই হরপ্পা সভ্যতার উত্তরাধিকার, অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে চলে আসছে একটানা। ভারতে সবথেকে প্রাচীন কালীমন্দির তো প্রাচীন প্রস্তর যুগের, এগারো হাজার বছর আগেকার, যে বিষয়ে প্রত্নবিদ Kenoyer এর প্ৰবন্ধ আছে (Baghor Kali)। স্থানীয় কোল উপজাতি কর্তৃক মধ্য ভারতে বিন্ধ্য পর্বতমালার অরণ্যে এখানে যোনিশিলারূপে গত এগারো হাজার বছর ধরে মা কালী পূজিত হচ্ছেন।
হরপ্পা সভ্যতায় ঊষার বোধন হত। কিন্তু অদ্ভুত আঁধার, অদ্ভুত আঁধার। একদল আপনাকে অন্ধকারে রাখবে বলে মরিয়া।
তন্ত্রধর্মের এই আবহমান শেকড়ের সত্যিটা যাতে বাঙালি কোনোদিনই না জানতে পারে তার জন্য রামকৃষ্ণ মিশন এবং রাজ্য সরকারের একাংশ চক্রান্ত করে প্রফেসর তমাল দাশগুপ্তকে এবছর কলকাতার নরেন্দ্রপুর কলেজে যোগদান করতে দেয়নি। বাঙালির মধ্যে যে অদ্ভুত আঁধার নেমে এসেছে, সেই আঁধার পাছে সাক্ষাৎ মা কালীর খড়্গরূপী প্রফেসর তমাল দাশগুপ্ত খণ্ডবিখণ্ড করে দেন, সেজন্য দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কলেজে ষোল বছরের অধ্যাপনার অভিজ্ঞতাবিশিষ্ট, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হিন্দু স্টাডিজের তন্ত্র কোর্সে উচ্চ প্রশংসিত প্রফেসর তমাল দাশগুপ্তকে অসভ্যতা করে, জঘন্যভাবে, অন্যায়ভাবে কলেজ সার্ভিসের মেরিট প্যানেলে উচ্চ স্থান অধিকার করা সত্ত্বেও যোগদান করতে দেয়নি রামকৃষ্ণ মিশন এবং কলেজ সার্ভিস কমিশনের একাংশ।
তবে মা কালীর খড়্গ তো এত সহজে থামবে না। কালীক্ষেত্র আন্দোলন থামবে না। আমরা বাঙালিকে সত্যিটা জানিয়ে যাব।
এবং একদিন এই অদ্ভুত আঁধার কেটে চারদিক আলোয় ভরে যাবে। যারা চোখ থাকতেও অন্ধ, তাদের অন্ধকার রাজত্ব শেষ হবে একদিন। সেদিন কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচন দেখবে মাতৃকা উপাসক বাঙালি জাতি। আমরা কালীক্ষেত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সেদিনের অপেক্ষায় আছি। আমরা অনবরত যুদ্ধ চালিয়ে যাব মা কালীর নাম নিয়ে।
জয় মা কালী।
© কালীক্ষেত্র আন্দোলন
মা কালীর ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া।
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, আট জুন দুহাজার চব্বিশ

এই ফলহারিণী অমাবস্যা তিথিতে ভারতে কোথাও কোথাও শনিদেবের জয়ন্তী পালিত হয়। বিষয়টা চিত্তাকর্ষক। মা কালীর পার্শ্বচর গ্রহরাজ শনিদেব কর্মফল প্রদান করেন। এই প্রাচীন তান্ত্রিক তিথিতে কর্মফলবন্ধনমুক্তি ঘটে। জয় জয় মা
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, পাঁচ জুন দুহাজার চব্বিশ

বামজেহাদি ইতিহাসবিকৃতির কয়েকটা পরিচিত প্যাটার্ন আছে। প্রথমত দুর্গাপুজোকে অর্বাচীন বলবে, এই সেদিন নাকি সিরাজ পতনের আনন্দে শুরু। অথচ সিংহবাহিনী মাতৃকার উপাসনা নব্য প্রস্তর যুগের। মহিষমর্দিনীর উপাসনা হরপ্পা সভ্যতা থেকে চলছে। চার অনুচরসহ মায়ের উপাসনা চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গাল সভ্যতার অভিজ্ঞান। আর বর্তমান আকারে দশভুজা সিংহবাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী মায়ের মূর্তি পালযুগ থেকে একটানা পাওয়া যাচ্ছে।
এবং মজা দেখুন। বামজেহাদির থেকে ওই shitball লুফে নেবে দিলু মোষ। বলবে, ইয়ে দুর্গা কওন হ্যায়।
বামজেহাদি ইতিহাস বিকৃতির আরেক প্যাটার্ন। বাংলায় নাকি হিন্দু মুসলমান হাত ধরাধরি করে থাকত। দুষ্টু শ্যামা একাই নাকি বাংলা ভেঙে দিয়েছিলেন। এই মর্মে সুজন চক্রবর্তী নামক বামহাঁদাজেহাদির বক্তব্য এসেছিল।
এখানেও দেখবেন বামের shitball লাফ দিয়ে পরম যত্নে ধরে নেবে চাড্ডি। শ্যামা নাকি বাংলাভাষী হিন্দুর হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা। অথচ সেযুগে শ্যামা একেবারে প্রান্তিক। বাংলা ভাগের জন্য সবথেকে বেশি উদ্যোগ বাংলার কংগ্রেস নেয়। ১৯৩৭ থেকে মুসলমান সরকারের অধীনে অবিভক্ত বাংলার হিন্দুর প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে গেছিল। জ্যোতি বসু সহ তিনজন কমিউনিস্ট সদস্য বাংলাভাগের পক্ষে আইনসভায় ভোট দেন। বস্তুত শ্যামার দলের এম এল এ সংখ্যা কমিউনিস্টদের থেকেও কম ছিল। ওই যে তথাকথিত অবিভক্ত স্বাধীন বঙ্গের প্রস্তাব যেটা সুভাষ বসুর দাদা শরৎ বসু দিয়েছিলেন কলকাতার কশাই সুহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে, ওটা নিতান্ত এক গ্যাসবেলুন ছিল, ওই প্রস্তাব আদৌ আইনসভায় পেশই করা হয়নি।
বামজেহাদি ইতিহাসবিকৃতির আরেক প্যাটার্ন। বাঙালি একেবারে অর্বাচীন জাতি। বাঙালির কোনও ইতিহাস নেই, এই তো সেদিনের কথা। মুসলমান সুলতানদের আমলে বাঙালি জাতি তৈরি হয়েছে।
ওদিকে তথাগত রায়ের এই মর্মে টুইট আছে। বাঙালির তো কোনও ইতিহাসই নেই, দশম একাদশ শতকের আগে। তাও আসল ইতিহাস হল বেঙ্গল রেনেসাঁস। আর তাও আবার ইংরেজের দয়ায়। ইংরেজ যদি গঙ্গার বদলে মহানদীতে নৌকো ভিড়ত তবে বাংলার বদলে উড়িষ্যার রেনেসাঁস হত। এই গেরুয়াগবেট জানেন না, আসলে সত্যিই মহানদীতে ইংরেজের নৌকো ভিড়েছিল, বাংলায় আসার অর্ধ শতাব্দী আগেই ইংরেজের ব্যবসা শুরু হয়েছিল উড়িষ্যয়। তারও চল্লিশ বছর আগে গুজরাটে গেছিল ইংরেজ। আজ পর্যন্ত উড়ে আর গুজ্জুর রেনেসাঁসের অপেক্ষায় ভারতের ইতিহাস গালে হাত দিয়ে বসে আছে।
বামজেহাদি ইতিহাস বিকৃতির একটা পরিচিত প্যাটার্ন আছে। এরা বলে, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাঙালি। অথচ পৃথিবীর সর্বত্র জাতির সংজ্ঞায়ন হয় ধর্মে। নিছক বাংলায় কথা বললেই বাঙালি হওয়া গেলে ইংরেজিতে কথা বললেই ইংরেজ হওয়া যেত।
ঠিক পাশাপাশি চাড্ডি দেখুন। ওদের বাবারা বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাংলাদেশি দেগে দিচ্ছে। আমি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কলেজে প্রফেসর, দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকায় আমার স্ত্রীকে বাংলাদেশি বলে চলে গেছে অমিত শাহের পুলিশ।
এই পর্যন্ত পড়ে মনে হতেই পারে, তৃণমূলের সমালোচনা কেন করছি না। তৃণমূলের ইতিহাস বিকৃতির সমালোচনা কোথায়? তবে কি আমি তৃণমূলের হয়ে বলছি এখানে?
এখানে দুটো ব্যাপার আছে। তৃণমূল সাধারণত চাল ত্রিপল চাকরি ইত্যাদি চুরিতে এত ব্যস্ত থাকে, যে ইতিহাসের মত অনর্থক ব্যাপারে মাথা গলায় না। মাথায় তো ষাঁড়ের গোবর তৃণমূলের, গোবর মাথা আর কি গলাবে, ওই নাক গলায় না আর কি। যেভাবে হারেরেরে করে বামজেহাদি এবং গেরুয়াচাড্ডি বাঙালির ইতিহাস নিয়ে খেপ খেলতে নেমেছে, কোনওদিন দেখেছেন তৃণমূল দলকে সেরকম করতে? যেখানে পুকুরচুরিতে পয়সা নেই, সেরকম কাজে তৃণমূলের উৎসাহ নেই। অতএব তৃণমূল সাধারণত আমাদের পথরোধ করে সেভাবে দাঁড়ায় না।
কিন্তু ব্যতিক্রম আছে। তৃণমূলের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু তার নাটকে গৌড় সম্রাট শশাঙ্ককে অতি কদর্যভাবে চিত্রায়ন করেছেন, যা কোনোমতে ক্রিয়েটিভ লাইসেন্সের দোহাই দিয়ে জাস্টিফাই হয় না। ব্রাত্য এর আগে বোমা নাটকেও বাংলার অগ্নিযুগকে ভিলিফাই করেছেন। অতএব তৃণমূলের আঁতেলদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্যই অসভ্যতা করেন, ইতিহাসবিকৃতি করেন। বর্তমানে রাজ্য সরকারের শিক্ষা দপ্তরের বিরুদ্ধে আমার মামলা চলছে, অতএব বেশি কিছু আর বলব না, কিন্তু ব্রাত্য বসুর অসভ্যতার প্রকাশ্য প্রতিবাদ আমার পেজে আমি আগেও করেছি।
বামজেহাদি ইতিহাস বিকৃতি। পাশাপাশি চাড্ডির অসভ্যতা। কিন্তু আমরা তো এসে গেছি আজকে। শেকড়বিচ্ছিন্ন, আত্মবিস্মৃত, আত্মঘাতী বাঙালির মধ্যে আজকে তো সপ্তডিঙা আন্দোলন, কালীক্ষেত্র আন্দোলন এসে গেছে মা কালীর মৃতসঞ্জীবনী নিয়ে।
শুনে রাখুন। বাঙালির ইতিহাসকে বিকৃত করলে কেউ ছাড় পাবেন না। প্রচণ্ড, ভয়ানক, তীব্রতম প্রত্যাঘাত হবে।
জয় মা কালী।
তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, দুই জুন দুহাজার চব্বিশ
চার হাজার বছরের বাঙালিকে আড়াই ফুটের জায়নামাজে বসানো যাবে না, মোল্লাপক্ষকে বলে দিও।
আমার এইসব চমৎকার ওয়ান লাইনারগুলো উপযুক্ত কদর পায় না। আসলে কালীভক্তিমূলক অডিয়েন্স তো আমার 🌺
তবে সবার শেষে, কেকে যাওয়ার পর দুবছর হয়ে গেল।
আমি প্রচুর হিন্দি ইংরেজি গান শুনি। বাংলা গানে ওই স্পিরিটটার খুব অভাব। ভ্যাদভ্যাদে ইনিয়ে বিনিয়ে ন্যাকা গান আমার একেবারে পোষায় না, আর বাংলাতে সেটাই ম্যানুফ্যাকচার হয়, দুঃখের কথা।
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, দুই জুন দুহাজার চব্বিশ