সমগ্র বিহারেই মাতৃকা উপাসনার প্রাচীন নিদর্শন চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মোটেও আশ্চর্যের কিছু নয়। আজকের বিহারের পুরোটাই একসময় ছিল বৃহৎবঙ্গের অংশ। তাহলে শুধু রোহতাস কেন? এর উত্তরে বলতে হয় বিহারের প্রতিটি জেলার মাতৃপীঠ বা মন্দিরের বিবরণ দিতে গেলে প্রবন্ধ নয়, একটা আস্ত বই লিখতে হবে। রোহতাস কে অগ্রাধিকার দেওয়া হলো তার কারন বঙ্গাধীপতি শশাঙ্কের প্রথম জীবনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের সঙ্গে।
বেশীর ভাগ সাধারণ বাঙালি শশাঙ্ক কে চেনে প্রথম বাঙালি সম্রাট রূপে, যদিও তা ঠিক নয়। তাঁর আগেও বাংলার গৌরবময় একটা ইতিহাস ছিল। প্রথম জীবনে শশাঙ্ক নিজেই খুব সম্ভবত গৌড় সম্রাট জয়নাগের মহাসামন্ত ছিলেন এবং তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল গৌড় সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তের এই রোহতাস অঞ্চল। এখানকার রোহতাস গড় দুর্গ তাঁর স্মৃতি বিজড়িত। রোহতাসেই পাওয়া যায় মহাসামন্ত শশাঙ্কের নাম চিহ্নিত সীল, যা এই অঞ্চলে প্রাপ্ত সর্বপ্রাচীন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন।
রোহতাসের প্রাচীন নাম রোহিতাশ্ব সম্ভবত শশাঙ্কের রোহিত বর্ণের ঘোড়া থেকে এসে থাকতে পারে ; এমন একটা অনুমান করেছেন ডঃ তমাল দাশগুপ্ত,যদিও নামের উৎস পৌরানিক রাজা হরিশ্চন্দ্রের ছেলে রোহিতাশ্ব,এই ধারণাই জনপ্রিয়।
পুরানো রোহতাস অঞ্চল ছিল প্রাচীন শাহবাদ বিভাগের অংশ। সেই ভূখণ্ড ভেঙ্গে তৈরী হয়েছে তিনটি জেলা – রোহতাস, কৈমূর ও ভোজপুর।
রোহতাস এবং কৈমূরে আছে তিনটি অতি প্রাচীন মাতৃ উপাসনাস্থল, যার মধ্যে দুটি সতীপীঠ।
সতীপীঠ মা তারাচন্ডী মন্দির এবং তুতলা ভবানী মন্দির রোহতাস জেলায় অবস্থিত। মা মুন্ডেশ্বরী দর্শনের জন্য আমাদের যেতে হবে রোহতাসের পাশের জেলা কৈমূরে।
আমরা আমাদের এই ছোট্ট তীর্থ ভ্রমণ শুরু করবো একান্ন পীঠের অন্যতম মা তারাচন্ডী কে দর্শন করে। এই শক্তিপীঠের অবস্থান সাসারাম শহরের প্রান্তদেশে।
মা তারাচন্ডী।
রোহতাস জেলার মুখ্যালয় সাসারাম। এখানে আছে বড়ো একটি রেলওয়ে স্টেশন। হাওড়া থেকে সকাল সকাল সাসারাম পৌছায় এমন অনেক ট্রেন পেয়ে যাবেন । পুরো দিনটা মোটামুটি তাহলে পাবেন ঘোরার জন্য।
রোহতাস জেলার উত্তর এবং উত্তর পূর্ব দিকে সাসারামের সমতল অঞ্চল। দক্ষিণ অঞ্চলটি মালভূমি যা বিন্ধ্য পর্বতমালার অংশ বিশেষ। এখানে এটি কৈমূর পাহাড় নামে পরিচিত ।
সাসারাম শহরের প্রান্তে এক পাহাড়ের ওপর মা তারাচন্ডীর মন্দির। পাহাড়টিকে তারাচন্ডী হিল্স নামে ডাকে সবাই। শাস্ত্র মতে এই স্থানে সতী পার্বতীর দক্ষিণ নেত্র পতিত হয়েছিল।
সাসারাম থেকে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে ২ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে পাহাড়ের গুহায় মা তারাচন্ডী মন্দিরের অবস্থান। মন্দিরটি তিনটি তলে বিভক্ত।
পাহাড়, ঝর্ণা ও অন্যান্য জলস্রোতে ঘেরা এই স্থানটি পর্যটনের জন্যও উপযুক্ত। দক্ষিণ – পশ্চিম দিকে একই দূরত্বে আছে ধূঁয়াকুন্ড যা পর্যটকদের জন্য এক আকর্ষণের জায়গা।
বলা হয় মহর্ষি বিশ্বামিত্র এই পীঠে মা তারার উপাসনা করতেন। এখানেই পরশুরাম সহস্রবাহুকে পরাজিত করে মা তারার উপাসনা করেন।
মা এই স্থানেই চন্ড নামক দৈত্যকে সংহার করে চণ্ডী নামে অভিহিত হন।
জনশ্রুতি গৌতম বুদ্ধ সাধনায় সিদ্ধি লাভের পর এই স্থানে এলে মা তারাচন্ডী এক বালিকা রূপে তাঁকে দর্শন দেন।
দেবীর নির্দেশানুসারে এরপর তিনি সারনাথের দিকে যাত্রা করেন ও সেখানে তাঁর প্রথম উপদেশ দান করেন।
এই সতীপীঠ অতি প্রাচীন। পাথুরে প্রমাণ থেকে জানা যাচ্ছে ১১ শতকে এই স্থানটি বিখ্যাত শক্তিস্থল রূপে পরিচিত ছিল। মন্দিরের গর্ভগৃহের কাছে খরবার বংশীয় রাজা ধবলদেবের ব্রাহ্মি লিপিতে লেখা শিলালেখ বর্তমান যা সম্বত ১২২৯ এ উৎকীর্ণ করা হয়েছিল।
চারফিট উচ্চতা বিশিষ্ট গুহার পাথুরে গায়ে কোঁদা আছে মায়ের মুর্তি প্রত্যালীঢ় মুদ্রায়। দেবী লম্বোদরী ও নীল বর্ণা। কটি তে ব্যাঘ্র চর্ম। চতুর্ভুজ দেবীর দক্ষিণ হস্তে খড়্গ এবং কর্তৃ। বাম হস্তে মুন্ড ও পদ্ম।
মা তারাচন্ডীর মন্দির এক বিখ্যাত সতীপীঠ হওয়ার কারনে দূর দূরান্ত থেকে আগত ভক্তদের উপস্থিতিতে ভরা থাকে সারা বছর। এখানে আসা প্রত্যেক ভক্তের মনস্কামনা পূর্ণ করেন মা তারাচন্ডী ,তাই তাঁর আর এক নাম মনস্কামনা সিদ্ধি দেবী।
এই ধামে প্রতি বছর তিনটি মেলা বসে। হাজার হাজার শ্রদ্ধালু মায়ের দর্শন ও পূজা সেরে মানত করে। মনোকামনা পূর্ণ হলে মন্দিরে দীপ জ্বালায় ভক্তরা।
শ্রাবণ মাসে একমাস ব্যাপী এক মেলা বসে এখানে। শ্রাবণী পূর্ণিমার দিন স্থানীয় মানুষরা দেবী কে শহরের কূলদেবী রূপে মান্য করে চূনরী ও প্রসাদ উৎসর্গ করে। হাতি ঘোড়া ও ব্যান্ড পার্টি নিয়ে এক শোভাযাত্রা বের হয় এই উপলক্ষে।
শারদীয় নবরাত্রে মা’র অষ্টম রূপের পুজো করা হয়।সেই সময় প্রায় দুই লাখ শ্রদ্ধালু এখানে এসে মা’র দর্শন করে যান। পরম্পরা অনুযায়ী শারদীয়া ও চৈত্র নবরাত্রে অখন্ড দীপ জ্বালানোর প্রথা আছে।
মা তুতলা ভবানী।
আমাদের পরের গন্তব্য মা তুতলা ভবানী মন্দির।সাসারাম থেকে তুতলা ভবানী মন্দির ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে। রোহতাস জেলার তিলৌথু প্রখন্ডের অন্তর্গত কৈমূর পাহাড়ের কোলে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে মা তুতলা ভবানীর মন্দির। জায়গাটা কৈমূর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের অন্তর্গত।
উত্তর -পশ্চিম এবং দক্ষিন – পূর্ব দিকে দুটি বড় পাহাড় অর্ধচন্দ্রাকারে দাঁড়িয়ে আছে এখানে। দুটি পাহাড়ের মাঝে এক মাইল বিস্তৃত উপত্যকায় বয়ে চলেছে পাহাড়ী নদী কাছুয়ার। তারই জল দুটি পাহাড়ের সন্ধিস্থল থেকে ঝড়ে পড়ে সৃষ্টি করেছে এক জল প্রপাত। যেখানে জলপ্রপাত ঠিক তার নীচেই মায়ের মন্দির।
এই মন্দিরটিতেও খরবার রাজাদের অবদান আছে। এখানে দুটি শিলালেখ দেখতে পাওয়া যায়। প্রথমটি অষ্টম শতাব্দীর, শারদা লিপিতে লেখা যা আজও অপঠিত।
দ্বিতীয় শিলালেখ দ্বাদশ শতাব্দীর যা রাজা বীরপ্রতাপ ধবলদেব এখানে মূর্তি প্রতিষ্ঠার সময় লাগিয়ে ছিলেন। এই শিলালেখ থেকে পরিষ্কার জানা যাচ্ছে রাজা ধবলদেব সপরিবারে এখানে এসে ১১৫৮ খৃষ্টাব্দের ১৯ এপ্রিল (সম্বৎ-১২৫৪) শনিবার দিন দেবী মূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন।
অষ্টম শতাব্দীতে স্থাপিত আরো প্রাচীন এক মূর্তি এই মন্দিরে উপস্থিত যা ভগ্ন অবস্থায় বর্তমান। এই মূর্তির সঠিক ইতিহাস কিছু জানা যায় না।
১৪ সেপ্টেম্বর ১৮১২ খৃষ্টাব্দে প্রসিদ্ধ উদ্ভিদ ও প্রাণীতত্ত্ববীদ ফ্রান্সিস বুকানন এখানে জরিপের কাজে আসেন যা ওনার যাত্রা বিবরণে উল্লেখিত।
এই শক্তিস্থলের বর্ণনা মার্কেন্ডেয় পুরাণে পাওয়া যায় যেখানে মা শোনাক্ষী দেবী রূপে উল্লেখিত। এই স্থানটি এক সতীপীঠ। বলা হয় সতীর দক্ষিণ নিতম্ব এখানে পতিত হয়েছিল।
জলের ছিটায় ভেজা মন্দিরের অনেক গুলি সিঁড়ি ভেঙে এই মন্দিরে পৌঁছাতে হয়। পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট মন্দির। গর্ভগৃহে স্থাপিত সিঁদুর চর্চিত মায়ের শীলামূর্তি বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া যায়। দেবী মূর্তি অষ্টভুজ মহিষাসুর মর্দিনী।
মন্দিরের সামনের চত্বর রেলিং দিয়ে ঘেরা। তাতে বাঁধা অসংখ্য লাল কাপড়, যাকে এখানে চূনরী বলা হয়। অনেক নীচে এক কুন্ডে মন্দিরের ঠিক পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া জলপ্রপাতের জল সগর্জনে ঝরে পড়ছে।
এই ধামে শ্রাবণ মাসের আদ্রা নক্ষত্রে এবং নবরাত্রে প্রচুর ভীড় হয় ভক্তদের । ভক্তরা তাদের মনস্কামনা পূর্ণ হলে মায়ের চরণে বলির পাঁঠা উৎসর্গ করে।
মন্দিরের সাথে জড়িয়ে আছে দুটি জনশ্রুতি।
এই মন্দিরে কেউ অসৎ ও নোংরা চিন্তা ভাবনা নিয়ে এলে মা তাকে দন্ডিত করেন। মায়ের অনুচর এখানকার ভ্রমরদের বিষাক্ত কামড় সহ্য করতে হয় তাদের।
আর এক জনশ্রুতি অনুযায়ী মায়ের মন্দিরের ঠিক ওপরে পাহাড়ের ধার থেকে নীচে অমৃত বিন্দু ঝড়ে পড়ে! ভাগ্যবান ও ভাগ্যবতী ভক্তরাই তার আস্বাদন করতে পারে।
আমাদের পরের ও শেষ গন্তব্য মা মুন্ডেশ্বরী দেবীর মন্দির।
মা মুন্ডেশ্বরী।
মা মুন্ডেশ্বরী দর্শনের জন্য আমাদের যেতে হবে রোহতাসের ঠিক পাশের জেলা কৈমূরে যা একসময় রোহতাস জেলার অংশ ছিলো। সোন নদীর ধারে কৈমূর জেলার ভবুয়া মুখ্যালয় থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে ভগবানপুর ব্লক স্থিত রামপুর পঞ্চায়েতের পওড়া পাহাড়ের ওপর এই মন্দিরের অবস্থান। বলা হয় মা এখানে মুন্ড নামক দানবকে বধ করেছিলেন।
৬০৮ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত এই মন্দিরে পৌঁছানোর দুটি রাস্তা আছে। একটি সিঁড়ি যুক্ত অপরটি পাকদণ্ডী ,যাতে গাড়ি বা বাইকে মন্দিরের কাছাকাছি যাওয়া যায়। কিছু অংশ সবাইকেই সিঁড়ি দিয়ে যেতে হয়।
এই স্থানটি আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া দ্বারা ১৯১৫ খৃষ্টাব্দ থেকে সংরক্ষিত। তাদের দ্বারা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মন্দিরটি ১০৮ খৃষ্টাব্দে নির্মিত। এটি ভারতের প্রাচীনতম মন্দিরগুলির মধ্যে একটি। এই মন্দিরে পুজার্চনা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চালু আছে সেই প্রাচীন কাল থেকেই। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে।
এই মন্দিরের সবচেয়ে প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায় চীনা পরিব্রাজক হুয়েন সাং এর লেখায়। ৬৩৬ – ৩৮ খৃষ্টাব্দে পাহাড়ের ওপর এক মন্দিরের আলো দেখার কথা বলেছিলেন।
১৭৯০ সাল নাগাদ চিত্রকর ড্যানিয়েল ভাইদের তুলিতে এই মন্দির প্রথমবার চিত্রিত হয়।
বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি শিলালেখ ও শ্রীলঙ্কার রাজা দত্তাগামানির ব্রাহ্মি লিপিতে লেখা একটি সীল পাওয়া যায় মন্দির পরিসরে।
মন্দিরটি পাথরে তৈরী ও অষ্টাকোনাকৃতি। নাগাড়া বাস্তশিল্পের এটি একটি আদিমতম নিদর্শন। মন্দিরের চারদিকে দরজা কিম্বা জানালা আছে এবং বাকি চারটি দেওয়ালে মূর্তি স্থাপনের জন্য খোপ করা আছে। ভেতরের দেওয়ালেও ঐ ধরনের খোপ ও লতাপাতা যুক্ত পঙ্খের কাজ করা আছে।
মন্দিরের শিখরটি বিধ্বস্ত, সম্ভবত মোগল আমলের হামলার ফল। আধুনিক কালে সংস্কারের সময় সেই জায়গায় ছাদ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মন্দিরের গর্ভগৃহে আছে মা মুন্ডেশ্বরীর সাড়ে তিন ফিটের দশভুজা মূর্তি। মন্দিরের মাঝখানে প্রহরারত ভৈরব শিবের পঞ্চমুখী লিঙ্গ স্থাপিত। লোকে বলে এই লিঙ্গ দিনের নানান সময় রঙ বদলায়।
এছাড়াও মন্দিরের আছে আরো অনেক দেবদেবীর মূর্তি।
এই মন্দিরে বলি প্রথা চালু আছে । তবে এই বলির বিশেষত্ব হলো এটি রক্তপাত হীন। উৎসর্গীকৃত পাঁঠা কে মায়ের সামনে শুইয়ে পুরোহিত মন্ত্রপূত চাল ছিটিয়ে দিলেই পাঁঠাটি অচেতন হয়ে পড়ে এবং ক্রিয়া শেষে আবার মন্ত্রপূত চাল ছুড়ে মারলেই সেটি উঠে দাঁড়ায়। এই ভাবেই বলি সম্পন্ন হয়।
মা মুন্ডেশ্বরী মন্দিরের কাছাকাছি রেল স্টেশন হলো মোহনীয়া – ভাবুয়া রোড স্টেশন। মন্দির থেকে স্টেশনের দূরত্ব সড়ক পথে ২২ কিলোমিটার।
সাসারাম থেকে ট্রেনে আধ ঘন্টায় ভাবুয়া এসে সেখান থেকে গাড়ি বুক করে মন্দিরে আসতে পারেন। সরাসরি সাসারাম থেকেও গাড়ি বুক করতে পারেন। সাসারাম থেকে মন্দিরের দূরত্ব ষাট কিলোমিটারের মধ্যে। সোয়া ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে।
রোহতাস অঞ্চলে এই তিনটি শক্তিপীঠ ছাড়াও দর্শনীয় স্থান আছে প্রচুর। সেগুলি ঘুরে দেখতে ভুলবেন না। প্রকৃতি মায়ের অকৃপণ প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ এই স্থান যেন জগন্মাতার আর এক রূপ। মায়ের রূপ ধরে প্রকৃতি মাতাই যে আমাদের পুজো নেন।
তথ্য কৃতজ্ঞতা – তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ ও ইন্টারনেট।
তন্ত্রধর্মের সুদীর্ঘ ইতিহাসে আদিকাল থেকে প্রবহমান এক স্বতন্ত্র ধারা হলেন দেবী চামুণ্ডা। সরাসরি মেহেরগড় সংস্কৃতি থেকে হরপ্পা যুগ হয়ে আজ পর্যন্ত উপমহাদেশব্যাপী আমরা তাঁর বিপুল উপস্থিতি দেখতে পাই। আর হরপ্পা সভ্যতার ধর্ম-সংস্কৃতি তথা তন্ত্রের প্রধান উত্তরাধিকারী বাঙালি জাতির ধর্মে তো তিনি বস্তুত মধ্যমণি। অবাক হচ্ছেন? আসুন জেনে নিই কীভাবে।
পুরাণমতে অসুরবধকালে মা দুর্গার দেহকোষসম্ভূতা দেবী কৌশিকীর ক্রুদ্ধ ভ্রুকুটি থেকে উৎপন্ন হন দেবী চামুণ্ডা। তিনি চণ্ড-মুণ্ড অসুরদ্বয়কে বধ করেন। এরপর রক্তবীজবধের সময় দেবী চামুণ্ডা তার রক্ত পান করায় অবশেষে রক্তবীজের বিনাশ হয়। এভাবে পরমাপ্রকৃতিস্বরূপা দেবী নিজদেহ থেকেই যুদ্ধকালে নিজেরই বিভিন্ন রূপ তথা অষ্টমাতৃকাগণকে সৃষ্টি করেন অসুরনিধনে অবতীর্ণ হতে; চামুণ্ডা সেই অষ্টমাতৃকারই একজন।
পৌরাণিক ভাষ্য এরপর বলছে ইনি প্রকৃতপক্ষে মা কালী; চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করে চামুণ্ডা আখ্যা পান। মা কালীর সঙ্গে এঁর একীভবন অবশ্যই যুক্তিযুক্ত ইতিহাস, মূর্তিতত্ত্ব ও তন্ত্রধর্মের স্বাভাবিক গতির নিরিখে, সে আলোচনায় পরে আসছি। কিন্তু চামুণ্ডা শব্দের এই ব্যুৎপত্তি খুবই সন্দেহজনক। সুকুমার সেন স্পষ্টই বলছেন, সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মে এই ব্যুৎপত্তি আদৌ সিদ্ধ হয় না। এ একরকম গোঁজামিল দিয়ে নামটির সংস্কৃতায়নের প্রয়াস। রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকরের মতেও চামুণ্ডা নামটি দ্রাবিড় উৎসসঞ্জাত। তিনি অনুমান করেছেন, সম্ভবত মধ্য-দক্ষিণ ভারতের কোনো অরণ্যচারী জাতি থেকে চামুণ্ডা উপাসনার বর্তমান রূপটি এসে থাকবে। পরবর্তীতে মূলধারার সংস্কৃতায়িত পৌরাণিক ধর্মে appropriation এর সময়ে নামটির এরকম ব্যাখ্যা দিয়ে পুরাণের কাহিনীতে দেবীকে সংযোজনের চেষ্টা হয়। দ্রাবিড়ভাষী জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরীদের মধ্যে অবশ্য চামুণ্ডার স্মৃতি প্রবলভাবে বর্তমান; বাঙালির দ্রাবিড় উত্তরাধিকার বাদ দিলেও দক্ষিণ ভারতে চামুণ্ডা উপাসনা প্রবল জনপ্রিয়। দাক্ষিণাত্যের বিভিন্ন স্থানে গ্রামদেবী রূপে চামুণ্ডা পূজিত হন। চামুণ্ডা বস্তুত মহীশূরের অধিষ্ঠাত্রী প্রধান মাতৃকা তথা মহীশূর রাজবংশের কুলদেবী রূপে পূজিত হন, অসুরদলনী চামুণ্ডেশ্বরীর মন্দির মহীশূরের প্রধান মাতৃকাপীঠ।
চামুণ্ডার মূর্তিতত্ত্বের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি হল, সর্বত্রই তিনি অতি ভয়াল রূপে চিত্রিত। পালযুগের একেবারে প্রথমদিকের কয়েকটি চামুণ্ডা মূর্তি ও দক্ষিণ ভারত থেকে প্রাপ্ত কিছু মূর্তি বাদে মূলত তাঁর মূর্তিতে কঙ্কালসার শীর্ণ দেহ, কোটরাগত বিস্ফারিত চক্ষু, কৃশ উদর, ঊর্ধ্বকেশ বা জটামুকুট মুখ্য লক্ষণ। দেবী স্বয়ং মৃত্যুরূপা, কালগ্রাসের প্রতীক; প্রলয়কালে সমগ্র বিশ্বকে তিনি গ্রাস করেন, অন্যথায় তিনি অতৃপ্ত ক্ষুধায় কাতর, তাই অস্থিচর্মসার দেহ। ক্ষুধার জ্বালা বোঝাতে মূর্তির উদরে একটি বৃশ্চিকও দেখানো হয় কোনো কোনো মূর্তিতে। প্রায়শই তিনি করালদংষ্ট্রা প্রকাশ করে অস্থিমাংস চর্বণরতা। তাঁর দন্তুরা রূপের মূর্তিতে দীর্ঘ শ্বদন্ত দৃশ্যমান থাকে; বর্ধমানের কেতুগ্রামের নিকটবর্তী দক্ষিণডিহি গ্রামের দন্তুরা বা অট্টহাস পীঠ থেকে পালসেনযুগে নির্মিত অনুরূপ দন্তুরা মূর্তি উদ্ধার হয়েছিল, যা বর্তমানে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে সংরক্ষিত। চামুণ্ডা মূর্তি সাধারণত শবারূঢ়া; উক্ত দন্তুরা মূর্তিতে দেবী হাঁটু ভাঁজ করে উবু হয়ে অর্থাৎ উৎকটাসনে শবের উপর উপবিষ্টা। কোথাও আবার তিনি পদ্মের উপরিস্থিত শবদেহের উপর এক পা ভাঁজ করে, অন্য পা ঝুলিয়ে অর্থাৎ ললিতাসনে বসে; কোথাও শবের উপর নৃত্যরতা। বৃহৎ বঙ্গের ক্ষেত্রে ওড়িশার কোনো কোনো মন্দিরগাত্রে (যেমন পরশুরামেশ্বর মন্দির) খোদিত চামুণ্ডামূর্তিতে অবশ্য পেচকবাহিনী রূপও দেখা যায়। মূর্তিমণ্ডলে প্রায়শই দেবীর অনুচররূপে প্রেতপিশাচগণ ও শৃগাল উপস্থিত। অনুচরগণ নৃত্যরত ও শৃগাল দেবীর আদেশে দেবীর পদতলের শবকে ভক্ষণ করছে, এমন মূর্তিকল্পনা পাওয়া যাচ্ছে। দেবী স্পষ্টতই শ্মশানবাসিনী। ক্ষেত্রবিশেষে দেবীর অঙ্গে সর্পালঙ্কার, হাতে সর্পায়ুধ বা মূর্তিমণ্ডলে পদতলে সর্পও থাকে।
চামুণ্ডার চার, ছয়, আট, দশ বা বারো হাতের বিগ্রহ পাওয়া যায়। দেবীর হাতে নরকপাল, পানপাত্র (রক্ত বা আসবপূর্ণ), শব, খট্বাঙ্গ, কর্তৃ বা খড়্গ, শূল, অসি, ডমরু, পাশ, অঙ্কুশ, ঘণ্টা, খেটক, ঢাল ইত্যাদি নানা আয়ুধের সমাহার দেখা যায়। অভয় বা বরদমুদ্রাও থাকে ক্ষেত্রবিশেষে। মাতৃকা সর্বদাই শত্রুর ভয়, দ্বেষ ও অস্বস্তির কারণ; ভক্তের কল্যাণ ও আশ্রয়স্বরূপ।
পালসেনযুগের দেবীমূর্তিসমূহের একটি বহুল প্রচলিত আঙ্গিক হল নৃমুণ্ডমালা বা অস্থির অলঙ্কার। সেযুগের চামুণ্ডামূর্তিতেও এই লক্ষণ ব্যাপকভাবে উপস্থিত। কিছু ক্ষেত্রে এমনকি নৃমুণ্ডনির্মিত যজ্ঞোপবীতও দেখা যায় মায়ের গলায়। পদতলেও ছিন্ন নৃমুণ্ড থাকে কিছু কিছু চামুণ্ডা মূর্তিতে। অধ্যাপক তমাল দাশগুপ্তের মতে এই নৃমুণ্ডের সজ্জা উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্য উপজাতিসমূহের Head Hunting সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা। আজও সেখানকার বেশ কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধে শত্রুর ছিন্নমুণ্ড সংগ্রহ করে উপাস্য দেবতাকে উৎসর্গ করা বা বীরত্বের প্রতীক হিসেবে সংরক্ষণ করার প্রথা আছে। পালযুগে ঐ অঞ্চলের পার্বত্য খস নামক জাতির সঙ্গে পালরাষ্ট্রের বিশেষ সুসম্পর্ক ছিল, এমনকি খস জাতির যোদ্ধারা পালসম্রাটের সেনাবাহিনীতেও যোগ দিতেন বলে জানা যায়। এই যোগাযোগ সেযুগের মূর্তিচিন্তায় প্রভাব ফেলে থাকবে। বিশেষত, অধ্যাপক দাশগুপ্তের সিদ্ধান্ত, গঙ্গারিডাই যুগের মূলত ঐশ্বর্যরূপিণী, শান্তশ্রীমণ্ডিত মাতৃকামূর্তিসমূহের বিপরীতে পালযুগে ভীষণা, ভয়াভয়রূপিণী যোদ্ধৃবেশী মূর্তিকল্পের আধিক্যের এক অন্যতম কারণ মধ্যবর্তী যুগের ইতিহাসের অস্থিরতা। গঙ্গারিডাই সভ্যতা বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময়; তার প্রাচুর্য, তার শক্তি, তার সুস্থিতি সারা পৃথিবীর ঈর্ষার কারণ ছিল। তার পতনের পর বাঙালির জাতীয় জীবনে সেই সুদিন আর আসেনি; মাঝে দীর্ঘ সময় গৌড়জন নিতান্ত অসহায়, অরাজক, প্রান্তিক। মাঝে মাঝে স্বল্প সময়ের জন্য নিতান্ত আঞ্চলিকভাবে কোনো কোনো রাজার উত্থান হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সম্রাট শশাঙ্কের গৌড়তন্ত্র সাময়িকভাবে বাঙালির স্বর্ণযুগের স্মৃতি ফিরিয়ে আনলেও তারপরই আসে মাৎস্যন্যায় যুগ। উপরন্তু ঘরশত্রু ও বহিঃশত্রুর শতমুখী আক্রমণে বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় সমস্ত ক্ষেত্র এসময় সম্পূর্ণ দিশাহীন। পালসাম্রাজ্যের পূর্ববর্তী এই দীর্ঘ দুঃসময় বাঙালির প্রাণের মাতৃকাদের নতুনভাবে সংশ্লেষ করছিল; জাতির অস্তিত্বসংগ্রামের দিনে মাতৃকারাও একের পর এক ধারণ করছিলেন রুদ্র যুদ্ধসাজ। পালযুগে এসে বাঙালি আবার মাথা তুলে দাঁড়ালে দেখা যাবে, তন্ত্রধর্ম এই যুদ্ধমাতৃকাদের মধ্য দিয়ে সগৌরবে নতুন করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে; শত্রুবিনাশে সতত উদ্যত, শত্রুরক্তে রঞ্জিত, সাক্ষাৎ মৃত্যুস্বরূপ মূর্তিকল্পের জনপ্রিয়তা এই যুগের ধ্রুব বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে দার্শনিক ব্যাখ্যায় এই রূপ আয়ুধাঘাতে মোহজাল ছিন্ন করে, অজ্ঞতা ও ষড়রিপুরূপী অসুরগণকে দমন করে সাধককে জ্ঞান ও সিদ্ধিদান করার প্রতীক। একাধারে যুদ্ধনায়িকা ও রক্ষয়িত্রী রূপে; সংহারকারিণী ও বরদাত্রী রূপে; সৃষ্টি ও মৃত্যুর প্রতীক রূপে; শ্মশানচারিণী ও জনপদ-অভিভাবিকা রূপে এই মাতৃকাগণ এরপর পূজিত হবেন।
চামুণ্ডা ও কালীর একীভবনের প্রসঙ্গে আসা যাক। উপমহাদেশে আদিযুগের সভ্যতার নিদর্শনের মধ্যেই বালুচিস্তানের ঝোব উপত্যকার বিখ্যাত ‘Grim Goddess’ বা ভয়াল মাতৃকার মূর্তি উপমহাদেশে মাতৃধর্মের প্রাচীনত্বের সূচক। এই শ্রেণীর মূর্তির বিস্ফারিত চক্ষু ও মুখের ভঙ্গিমা দেখে গবেষকরা একে কালীমূর্তির আদিরূপ বলে অনুমান করেছেন। এই লক্ষণ স্পষ্টতই প্রচলিত চামুণ্ডা মূর্তির সঙ্গে মেলে। পরবর্তীতে মহাভারতে দুর্গাস্তবে চামুণ্ডার উল্লেখ না থাকলেও শল্যপর্বে তৎকালীন ভারতে পূজিত জনপ্রিয় মাতৃকাদের একটি তালিকা পাওয়া যায়। সেখানে মা কালীকে শ্মশানবাসিনী ও নিমাংসাগাত্রী বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই মূর্তিরূপ চামুণ্ডার অনুরূপ। পুরাণে মা কালীকেই চামুণ্ডা আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আবার চামুণ্ডা চৌষট্টি যোগিনীগণের মধ্যেও অন্যতম; যোগিনীরা মা কালীর অংশসম্ভূতা ও সহচরী রূপে গণ্য হন। হরপ্পা থেকে প্রাপ্ত সপ্তমাতৃকা সীলের বৃক্ষতলে বলিপূজায় উপস্থিত সপ্তদেবীই আজকের হিন্দুধর্মের সপ্তমাতৃকা তত্ত্বের উৎস বলে মনে করা হয়; সেক্ষেত্রে পৌরাণিক সপ্তমাতৃকার মধ্যে গণ্য চামুণ্ডার শিকড় হরপ্পাতেও ছিল, তা স্পষ্ট। এবার সেই সপ্তমাতৃকার সঙ্গে তুলনীয়, মুণ্ডক উপনিষদের অগ্নির সপ্তজিহ্বার অন্যতম বলা হয়েছে মা কালীকে; এই সপ্তজিহ্বা যজ্ঞে বলি গ্রহণ করেন। আবার আজকের বাঙালির দুর্গাপূজায় প্রধান চার অঙ্গ বলতে গেলে বোধন, নবপত্রিকা স্নান, বলিসহ সন্ধিপূজা ও নিরঞ্জন। সন্ধিপূজায় বলির মন্ত্রে মা চামুণ্ডাকে আবির্ভূত হয়ে বলি গ্রহণ করতে আহ্বান করা হয়; এই অর্থেই বলা চলে, বাঙালির প্রধান উৎসব শারদোৎসবের কেন্দ্রস্থলে রয়েছেন দেবী চামুণ্ডা। অন্যদিকে দুর্গা স্বয়ং ভদ্রকালী; সেই হিসেবে চামুণ্ডা তাঁরই উগ্ররূপ। মা চামুণ্ডা বলিপ্রিয়া রূপেই বারংবার বর্ণিত, অষ্টম শতকে ভবভূতির মালতীমাধব নাটকে নরবলি দ্বারা দেবীর চামুণ্ডার পূজার উল্লেখ আছে।
আরও লক্ষণীয়, সেনযুগে দশমহাবিদ্যার তালিকায় কালীর থেকে পৃথকভাবে চামুণ্ডা উল্লেখিত নন; কিন্তু সেনরাজসভায় সঙ্কলিত সদুক্তিকর্ণামৃত নামক শ্লোকসঙ্কলনে কালীস্তব বলে অন্তর্ভুক্ত বেশ কয়েকটি শ্লোকের বিবরণ প্রকৃতপক্ষে দেবী চামুণ্ডার সঙ্গেই মেলে। এই সঙ্কলনে উমাপতিধর, শতানন্দ ও জনৈক অজ্ঞাতনামা কবির লেখা কালীস্তব অনুরূপ লক্ষণযুক্ত। উমাপতিধরের স্তবে বলা হয়েছে, দেবীর সর্বাঙ্গ অসুররক্তে চর্চিত, তাই তাঁর এক নাম চর্চিকা। দ্রষ্টব্য, চর্চিকা চামুণ্ডা পালযুগে অত্যন্ত জনপ্রিয় মাতৃকা। বজ্রযানের অক্ষোভ্যকুলে বজ্রচর্চিকার অন্তর্ভুক্তিও দেখা যায় এই যুগে। অক্ষোভ্যকুলের দেবী হিসেবে চর্চিকা সিদ্ধি, কৈবল্য ও জ্ঞান দান করেন। নয়পালের রাজত্বকালের বাণগড় প্রশস্তির সূচনাতেই চর্চিকার বন্দনা করা হয়েছে; সম্ভবত চর্চিকা নয়পালের ইষ্টদেবী ছিলেন। এই প্রবন্ধের শিরোনাম, ‘নমশ্চর্চিকায়ৈ’ সেযুগের একটির লেখ থেকেই গৃহীত। স্পষ্টতই, চামুণ্ডা-কালী অভিন্নতা তন্ত্রধর্মের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। আজও বাংলার শ্মশানকালীর মধ্যে চামুণ্ডার ছায়া স্পষ্ট। শ্মশানকালীর ধ্যানমন্ত্রগুলি প্রবলভাবে চামুণ্ডাতত্ত্বের লক্ষণসমৃদ্ধ। সপ্তম শতকে হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট গৌড়বঙ্গের গৃহে গৃহে চামুণ্ডামণ্ডপের উল্লেখ করেছেন; যেমন আধুনিককালের গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপ। তার চিহ্ন বাঙালির ধর্মে আজও বহমান। চামুণ্ডাতত্ত্বের আরও কয়েকটি আঙ্গিক উল্লেখ না করলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আজকের সপ্তমাতৃকা তত্ত্বের পূর্বসূরী বৃক্ষতলে উপস্থিত সপ্তদেবীর কথা ইতিপূর্বে বলেছি। রাজশাহী থেকে চামুণ্ডার একটি মূর্তি পাওয়া গেছে, যেখানে দেবী বৃক্ষতলে অবস্থান করছেন; যেন বৃক্ষবাসিনী মাতৃকা। আমরা জানি দুর্গাপূজায় বোধন অনুষ্ঠিত হয় বিল্ববৃক্ষমূলে। এছাড়া নবপত্রিকায় স্বয়ং প্রকৃতিমাতৃকার অধিষ্ঠান কল্পনা করা হয়। হরপ্পা যুগের একটি সীলে বৃক্ষপ্রসবিনী মাতৃকার (শাকম্ভরী?) ছবি উৎকীর্ণ দেখা যায়। বৃক্ষের সঙ্গে দেবীর সংযোগের স্মৃতি অবিচ্ছিন্নভাবে বাঙালির চেতনায় বাহিত।
রাজশাহী থেকে গর্দভবাহিনী চামুণ্ডা মূর্তিও পাওয়া গেছে। গর্দভ সাধারণত মা শীতলার বাহনরূপেই পরিচিত। সেক্ষেত্রে এই মূর্তিকল্পনা দেবী চামুণ্ডার রোগহারিণী রক্ষাকর্ত্রী রূপেরই ইঙ্গিতবাহী। দেখা যায়, চৌষট্টি যোগিনীগণ আর্যাবর্ত টেক্সটে প্রায়ই শিশুঘাতিনী, মৃত্যুদায়িনী, রোগ-শোক-অমঙ্গলসূচক রূপে বর্ণিত। সেই সূত্রে যোগিনীদের অন্যতমা চামুণ্ডা সম্পর্কেও অনুরূপ ধারণা দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে এই মূর্তি মায়ের মঙ্গলদায়িনী রূপের প্রতীক।
অগ্নিপুরাণমতে, মা চামুণ্ডার অষ্টরূপ। রুদ্রচর্চিকা, রুদ্রচামুণ্ডা, মহালক্ষ্মী, সিদ্ধচামুণ্ডা, সিদ্ধযোগেশ্বরী, রূপবিদ্যা, ক্ষমা এবং দন্তুরা। সিদ্ধযোগেশ্বরী, রূপবিদ্যা ও ক্ষমা বাদে বাকি পাঁচ প্রকার মূর্তি পালযুগের চর্চিকা মূর্তিরই নানা রূপভেদ। আর অবশিষ্ট এই তিন রূপের মূর্তি ভৈরবী মহাবিদ্যার সঙ্গে সংযুক্ত। মৎস্যপুরাণে প্রতিমালক্ষণ অংশে চামুণ্ডা বিগ্রহকে যোগেশ্বরী মূর্তিরই রূপভেদ বলে দেখানো হয়েছে। অনুমান করা যায়, সিদ্ধযোগেশ্বরী রূপ সম্পর্কেই এই সিদ্ধান্ত। দন্তুরা চামুণ্ডা সম্পর্কে ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি। বর্ধমানের কঙ্কালেশ্বরী পীঠে কালী নামে পূজিত দেবীবিগ্রহ প্রকৃতপক্ষে পালসেনযুগের রুদ্রচর্চিকা মূর্তি। পেচকবাহিনী চামুণ্ডা মূর্তির উল্লেখ আগে করেছি; এই মূর্তিলক্ষণ মহালক্ষ্মী নামের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে থাকতে পারে। সিদ্ধযোগেশ্বরী রূপে দেবীর ললাটে তৃতীয় নয়ন, নৃত্যরত ভঙ্গিমা স্পষ্ট। চামুণ্ডার নৃত্যরত রূপের জনপ্রিয়তা থেকে মনে হয়, মেদিনীপুরের সুবিখ্যাত মা নাচিন্দা এই নৃত্যচামুণ্ডার স্মৃতি বহন করেন সম্ভবত। নৃত্যরত চামুণ্ডা সম্পর্কে আরও একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হল, মা চামুণ্ডাকে নাটেশ্বরী অর্থাৎ নাট্য ও নৃত্যশালার অধিষ্ঠাত্রী বলা হয়েছে কোনো কোনো ধ্যানমন্ত্রে। নবম শতকে কাশ্মীরের গঙ্গারিড বংশোদ্ভূত কবি রত্নাকর তাঁর হরবিজয় কাব্যে বলেছেন, অসুরসংহারের পর অসুররক্তে রঞ্জিতা দেবী চামুণ্ডা এক দিব্য বীণা বাজিয়ে তাণ্ডবনৃত্যে মগ্ন হলেন; সেই বীণার দণ্ড মেরু পর্বত, তন্ত্রী শেষনাগ, তুম্বা আকাশের চাঁদ।
অতঃপর লক্ষণীয়, দশমহাবিদ্যার মধ্যে দেবী ধূমাবতী হলেন নৃত্য ও নাট্যকলার অধিষ্ঠাত্রী। পালযুগে নির্মিত অট্টহাস বিগ্রহের রূপ দন্তুরা চামুণ্ডার অনুরূপ; বৃদ্ধা, লোলচর্মা, অতি শীর্ণকায়া, হাস্যরতা, উৎকটাসনে উপবিষ্টা। তাঁর দন্তরাশি সুদীর্ঘ ও ভয়াবহ, তাই তাঁর নাম দন্তুরা। শৃগালদলপরিবৃত অবস্থায় একটি রথের উপর ষোড়শদলপদ্মে তিনি অধিষ্ঠান করেন। ধূমাবতী মূর্তির সঙ্গে এই বিবরণের আশ্চর্য সাদৃশ্য। দেবী ধূমাবতী বৃদ্ধা, শীর্ণকায়া, কাকধ্বজ রথে আরূঢ়া। সম্ভবত এজন্যই অট্টহাস দেবীর রূপকে তন্ত্রে কখনও চর্চিকা আবার কখনও ধূমাবতী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সমীভবনের আরেকটি বিখ্যাত উদাহরণ উল্লেখ করে এই প্রবন্ধ শেষ করব।
উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির কাছে পেটকাটি মায়ের মন্দির ধূমাবতী মন্দির বলেই পরিচিত, এখানে পুজোও হয় ধূমাবতী মন্ত্রে। কিন্তু মূর্তিলক্ষণ অনুযায়ী মন্দিরের বিগ্রহটি আসলে পালসেনযুগে দশম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে নির্মিত কষ্টিপাথরের চর্চিকা মূর্তি। প্রায় সাত ফুট উচ্চতার এই বিগ্রহ ত্রিনয়না, করালবদনী, শীর্ণকায়া অস্থিচর্মসার, মুণ্ডমালিনী; সর্পমুকুট পরিহিতা, সর্পালঙ্কারভূষিতা। দেবী পদ্মের উপর ললিতাসনে উপবিষ্টা; পদতলে এক নারীমূর্তি, শেয়াল ও প্যাঁচা। পেটের উপর একটি কাঁকড়াবিছে। ১৯৩৫-৪০ সাল নাগাদ এখানে একটি প্রাচীন পুকুর সংস্কার করতে গিয়ে পুকুরের তলদেশে প্রায় দশ-বারোফুট গভীর থেকে এই দেবীমূর্তি পাওয়া যায়, তারপর স্থানীয় মানুষের উদ্যোগেই মন্দির নির্মাণ করে বিগ্রহের পুজো শুরু হয়। সম্ভবত মধ্যযুগে মুসলমান আক্রমণ থেকে বাঁচাতেই বিগ্রহটিকে পুকুরে নিমজ্জিত করা হয়েছিল, বাংলা জুড়ে আরও অসংখ্য প্রাচীন বিগ্রহের মতই। পুকুরের তলদেশে মাটির এতটা গভীরে প্রোথিত থাকা এবং কয়েকটি হাত ও নাক ছাড়া প্রায় সমগ্র মূর্তিটিরই মোটের উপর অক্ষত অবস্থায় থাকা দেখে মনে হয়, সম্ভবত মুসলমান যুগের একেবারে প্রথম দিকেই এই ঘটনা ঘটে থাকবে। উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে, অর্থাৎ প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তদেশে সমস্ত মধ্যযুগ জুড়ে মুসলমানের উপদ্রব দক্ষিণবঙ্গের মত তত ব্যাপকভাবে ছিলও না; এই অঞ্চল কার্যক্ষেত্রে ঘুরেফিরে কোচ-ভুটিয়া-মেচ এরকম নানা দেশজ জনগোষ্ঠী দ্বারাই শাসিত হত। শুধুমাত্র বখতিয়ারের উত্তরবঙ্গ অভিযানকালে দেবীকোটে তুর্কিদের সামরিক রাজধানী স্থাপিত হলে কিছুদিন এখানে এইপ্রকার পরিস্থিতি দেখা যায়। সম্ভবত সেসময়েই এই বিগ্রহ জলাশয়ে নিমজ্জিত করে দেওয়া হয় নিরাপত্তার জন্য; সাত শতাব্দীর জন্য দেবীর উপাসনা বিস্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যায়।
বিগ্রহটি প্রকৃতপক্ষে দশভূজা; বাঁদিকের একটি ভাঙা হাত বাদে বাকি চারটি হাতে শূল, ঘণ্টা, ছিন্নমুণ্ড, নরদেহ। ডানদিকের দুটি হাত ভাঙা; বাকি তিন হাতে নরকঙ্কাল, ডমরু, ঘণ্টা। স্পষ্টতই এখন পর্যন্ত আলোচিত চামুণ্ডামূর্তির সব লক্ষণ এই বিগ্রহে উপস্থিত। কিন্তু স্থানীয় সাধারণ মানুষের চর্চিকা চামুণ্ডা মূর্তি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তাঁরা দেবীর শীর্ণ দেহ ও ভয়ঙ্করী রূপ অনুযায়ী মহাবিদ্যা ধূমাবতীর মূর্তি বলে সিদ্ধান্ত করে সেই অনুযায়ীই পুজো শুরু করেন। উপরন্তু চর্চিকামূর্তির বহুলপ্রচলিত লক্ষণ শীর্ণ কোটরাগত উদর দেখে স্থানীয় মানুষের মনে হয়, আদতে মূর্তির উদর এরকম ছিল না, পুকুর থেকে তোলার সময়ে কোদালের আঘাতে পেটের অংশ ভেঙে গেছে। এই ধারণা জনশ্রুতি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে নতুন মন্দিরটির নামই হয়ে যায় ‘পেটকাটি মায়ের মন্দির’। এককালে যে জাতির রাজকীয় লিপির শুরুতে ‘ওঁ নমশ্চর্চিকায়ৈ’ শব্দবন্ধ খোদিত থাকত তার নিজ ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে এই বিস্মৃতি পীড়াদায়ক; কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। মধ্যযুগে বাঙালি সর্বস্বান্ত হয়েছে; আধুনিক যুগে তার খুদকুঁড়ো যা বেঁচে ছিল তাও কেড়ে নিয়ে হাতে ভিক্ষাপাত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। “অন্নদাসুত ভিক্ষা চাই, কি কহিব এরে কপাল বই” বলে কাঁদা ছাড়া বাঙালির হয়তো বা আর বিশেষ গতি নেই। তবু আমাদের সেই অতীত গৌরবের প্রতীক, সেই সুসময়ের নিদর্শন পালযুগের মা চামুণ্ডা আবার পেটকাটি মা রূপে আমাদের মধ্যে ফিরে এসেছেন; যেমন করেই হোক, সাধারণ গ্রাম্য বাঙালির নিখাদ ভক্তির পূজা গ্রহণ করেছেন। অতএব আশ্বস্ত হয়েই বলতে পারি, মা আমাদের ত্যাগ করেননি। শুরুতে উদ্ধৃত শ্রীধররচিত স্তবে বলা হয়েছে, মা চর্চিকার চরণের ধূলিকণা স্বয়ং বিধাতা ধ্যান করেন; সেই চরণযুগল স্মরণ করে মা চর্চিকার জয়ধ্বনিতেই বাঙালির পথ সুগম হবে।
যিনি অব্যক্ত জগতকারণ প্রকৃতি, বাক্য মনের অগোচর পরম তত্ত্ব; তাঁকে চেতনার উন্মেষের ঊষাকাল থেকে আমরা মা বলে ডেকেছি। মাতৃসাধনার ইতিহাস এক অর্থে মানব সভ্যতার ইতিহাসের থেকেও বেশি প্রাচীন। কারণ Venus of Berkhat Ram এর মাতৃমূর্তির পূজা homo sapiens এর পূর্বসূরি অধুনালুপ্ত একটি hominid প্রজাতির মধ্যে প্রচলিত ছিল। আজ প্রাচীন পৃথিবীর দুই অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার পীঠভূমি ভারত ও সুমেরের মাতৃসাধনার কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করব।
এই দুই ভূখণ্ড মিলিয়ে যদি মাতৃসাধনার আদিতম নিদর্শনের অনুসন্ধান করি তাহলে প্রশ্নাতীতভাবে উঠে আসবে বাঘোর কালীর প্রসঙ্গ। কারণ বাঘোর কালী এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত পৃথিবীর প্রাচীনতম মাতৃসাধনার স্থল বলে পুরাতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বাঘোর, মধ্যপ্রদেশের সিধি জেলার মেধাউলি গ্রাম থেকে ৪ কিলোমিটার দুরের একটি প্রত্ন ক্ষেত্র। সোন নদী উপত্যকায় প্রস্তরযুগের প্রত্নক্ষেত্রগুলোতে কাজ করার অংশ হিসাবে ১৯৮২ সালে এলাহাবাদ বিশ্যবিদ্যলয়ের জে.এন.পাল, আর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জে.এম.কেনয়ের এই পীঠস্থান আবিষ্কার করেন।
বালি পাথরের টুকরো দিয়ে বানানো একটি গোলাকার বেদী। তার কেন্দ্রস্থলে বসানো আছে একটা ত্রিকোণাকার রঙীন পাথরের টুকরো। প্রাকৃতিক লৌহমিশ্রিত বেলে পাথরটির রঙ হলদেটে-লাল, আর লালচে-বাদামীর মিশেল। রঙের স্তর কিন্তু এলোমেলো না। পাথরের খাঁজের সাথে সাথে মিলিয়ে রঙ বদল হয়েছে। আর এই খাঁজগুলো আছে এককেন্দ্রীয় কয়েকটি ত্রিভুজের নক্সায়। একটি ত্রিভুজের রং হালকা তো পরের ত্রিভুজে রঙ গাঢ়। ১৫০ মিমি উঁচু, ৬৫মিমি চওড়া আর ৬৫মিমি পুরো ত্রিভুজাকৃতির পাথর। এই শিলাটিই বাঘোরের মা কালীর নিরবয়ব প্রতিমা। আজ থেকে এগারো হাজার বছর আগে উপমহাদেশের দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর মাতৃপূজক সংস্কৃতির পূর্বসূরিরা এখানে মায়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ত্রিকোণাকার শিলা মাতৃযোনীর রূপক। যেহেতু মাতৃযোনী থেকেই নতুন প্রাণের আবির্ভাব ঘটে তাই এই ত্রিকোণাকার শিলাই ছিল সেযুগে মাতৃকার বিগ্রহ। চাঞ্চল্যকর বিষয় হল
বাঘোর কালী হলেন কতকগুলি সমকেন্দ্রিক ত্রিকোণের আকারে সজ্জিত মাতৃশিলা। আজও আমাদের তন্ত্রে কালীযন্ত্রের এটাই আকৃতি। পাঁচটি সমকেন্দ্রিক ত্রিকোণের কেন্দ্রেই আজও মা কালীর অধিষ্ঠান কল্পিত হয়। এই বাঘোর কালীর থেকে অল্প দূরেই আছে সমতুল্য আরো একটি প্রস্তর যুগের মাতৃপীঠ। কেরাই কী দেবী”-র দেবস্থান। কেরাইকি দেবী বা কেরাই-এর দেবী। এখানেও আছে বালি পাথর আর চুনা পাথরের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে বানানো গোলাকার বেদী। তার উপরে রাখা ঐ রকম এককেন্দ্রীয় ত্রিভুজাকৃতি পাথর। অবশ্য একটি নয় ছয়টি। তাদের আকার, রঙ, সবই ঐ বাঘোরের বেদীর উপর পাওয়া পাথর খন্ডের মতই। আর রাখা আছে মস্তকহীন এক মুর্তি। যাকে বলা হয় অঙ্গারা দেবী। অঙ্গারা বা অঙ্গার, অগ্নিময়ী দেবী। আশ্চর্যের কথা হল এই দুটি পীঠই স্থানীয়দের কাছে দেবী কালিকা মাঈ-এর আরাধনা স্থল বলে পরিগণিত। কালীর আদি তত্ত্ব ভয়ঙ্করী ভয়হারিণী কালরূপা মাতৃকার। তিনিই রাতের অন্ধকারে বন্য প্রকৃতির মধ্যে মানবজাতিকে সন্তানের মতো রক্ষা করেন। আবার তিনিই ঊষার মাধ্যমে সূর্যোদয়ের বার্তা দেন। তিনিই জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো উগ্র। আবার তিনিই নিজের গর্ভ থেকে জগত প্রসব করেন। সম্ভবত এইভাবেই আদি মাতৃপূজক সংস্কৃতির চেতনায় কালীর তত্ত্ব এসেছিল। সেই কারণেই এই বাঘোরের উপাসনাস্থল কালীর নামাঙ্কিত ক্ষেত্র। বেদের রাত্রিসূক্তেও কালীর এই তত্ত্বটিই প্রকাশ পেয়েছে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই জায়গাটা বিন্ধ্য পর্বতমালার অংশ। এই প্রাচীনতম পীঠের স্মৃতিতেই কি আমাদের মাতৃকাকে বিন্ধ্যবাসিনী বলা হয়? যে উপাধিটা পরে একানংশা, চণ্ডী, কালী প্রমুখ মাতৃকার সাথে সংযুক্ত হয়েছে?
সিন্ধু ও সুমের সভ্যতার অন্যতম প্রধান দুই মাতৃকার কথা এবার আলোচনা করব। তিনি হরপ্পার মহিষমর্দিনী; আজকের দুর্গা।
উপমহাদেশে মহিষমর্দিনী দুর্গার প্রথম প্রকাশ আমরা খুঁজে পাই সিন্ধু সরস্বতীর বদ্বীপে। হরপ্পার টেরাকোটার মূর্তিতে মহিষমেধের একাধিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। একটি সিলে দেখা যায় একজন যোদ্ধৃ একটি মহিষের উপর পা তুলে শূলাঘাতে তাকে বধ করছেন। পাশেই একজন উপাসক ধ্যানরত। তাঁর মাথায় মহিষের শিঙের শিরস্ত্রাণ। আসকো পারপোলা ও শিরিন রত্নাগর এই মহিষমেধকে দুর্গার মহিষমর্দনের আদি রূপ বলেছেন।
The buffalo sacrifice to the Goddess is the cultic counterpart of the Mahiṣāsuramardinī myth, and really central to the Durgā cult.
তাঁরা লক্ষ্য করেছেন এই মহিষমেধের সমতুল্য বৃষমেধ বা ষাঁড়বলির রীতি সুমেরীয় এলামাইট সভ্যতায় প্রচলিত ছিল। হরপ্পার সিলে যে ভঙ্গিতে মহিষকে শূলবিদ্ধ করা হচ্ছে; ঠিক সেই ভাবেই ষাঁড় বধ করা হত সুমেরে। Harappan water buffalo, imported from the Indus Valley, is the counterpart of the West Asian urus bull in the Sargonid “contest” seals, and that the “victor’s pose,” one foot placed on the head of the buffalo, is replicated
in Mesopotamia and in the Indus Valley. সুতরাং মহিষমর্দিনীর এই আদিরূপ বাস্তবে তাম্রাশ্মযুগের প্রাচীন সভ্যতাগুলিতে পরিব্যাপ্ত মাতৃপূজক সংস্কৃতির সুবিশাল পরিমণ্ডলেরই অনবদ্য প্রকাশ।
অন্য একটি সিলে দেখি এই মাতৃকা একটি গাছে আবির্ভূত হয়েছেন। গাছটি সম্ভবত অশ্বত্থ।
তাঁর সামনে উপাসনায় রত পূজারীর মাথায় মহিষের শিঙ। বলির জন্য রাখা আছে একটি বড়ো ছাগল। মাতৃকার অধিষ্ঠান ঐ গাছটিকে ঘিরে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরই মতো সাতজন দেবী। এই সাতজনের কথা বিশদে আলোচনা করব প্রসঙ্গক্রমে। তবে এই সিলটি প্রমাণ করে বৃক্ষতলে ছাগবলি দিয়ে মাতৃসাধনা হরপ্পাতে প্রচলিত ছিল। এবং এই দেবী যে মহিষমেধের মাধ্যমে উপাসিতা মাতৃকাই; তার প্রমাণ উপাসকের মাথার ঐ মহিষের শিঙ। মূল মাতৃকা এবং এই সাতজন সহচরীর সকলেই মাথায় বিচিত্র বেণী ধারণ করে আছেন( মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্রের রম্যকপর্দ্দিনী বা সুন্দর বেণীধারিণী অভিধাটি এই প্রসঙ্গে স্মরণ করি)।
গবেষকগণ এঁকেই মহিষমর্দিনীর আদি রূপ বলেছেন। এঁরই একটি মূর্তি দেখা যায়; যেখানে দেবী একটি কাঁটাগাছের নিচে বাঘের পিঠে মাথায় ছাগলের শিঙের মুকুট ধারণ করে আছেন। সম্ভবত এখানেও বলিদত্ত পশুর আভরণ ধারণের বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছে। A tiger-riding goddess wearing the horns of a mountain goat under an acacia tree.
এঁর মাথার বেণীর সাথে সুমেরের এলামাইট সভ্যতার সিংহবাহিনী মাতৃকার বেণীর আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়। এই বেণীটি হল a band forming a “double bun,” as worn by princes in West Asia around 2400 bce.
এলামাইট সভ্যতায় পৃথিবীর দেবী বা আদিমাতৃকা হলেন KI. তাঁর প্রতীক ছিল সিংহ। তাঁর সামনে ষাঁড় বলি দেওয়ার রীতি ছিল। এই রীতিটি সেখানে কালচক্রের ধারণার সাথেও যুক্ত ছিল। ষাঁড় ও সিংহ ছিল প্রকৃতির দুই বিপরীতমুখী শক্তির প্রতীক। কখনও দুই সিংহের উপর প্রভুত্ব করছে এক অতিকায় ষাঁড় এবং কখনও দুই ষাঁড়কে দমন করছে এক বিশাল সিংহ; এই দুই ছবি ছিল সূর্যের গতির সাথে বছরের দুই ভিন্ন সময়ের প্রতীক। ঠিক এই ভাবনারই প্রকাশ আমরা দেখি হরপ্পার একটি সিলে যেখানে মাতৃকা দুই বাঘের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। দুই বাঘ পরস্পরের দিকে আক্রমণে উদ্যত এবং মাঝে মাতৃকা এই দুই শক্তিকে প্রতিহত করে সামঞ্জস্য রক্ষা করছেন। এর মধ্যে গবেষকগণ দেখেছেন সূর্যের ত্রিমুখী অয়নের সংকেত। আবার অন্যদিকে আমরা বলতে পারি এ হল দেহতত্ত্বের তিন নাড়ির প্রতীক। দুইপাশে ঈড়া ও পিঙ্গলা। মাঝে সুষুম্নার পথে কুলকুণ্ডলিনীর প্রকাশ। ভবিষ্যতে যে আমরা মাতৃকার মণ্ডল দেখি; সেখানে দুই বা চারজনের মাঝে এক মাতৃকার অধিষ্ঠান একটি ধ্রুব বৈশিষ্ট্য। ফ্রিজিয়ান আনাতোলিয়ার মধ্যপ্রস্তরসযুগের Cybeli বা আদি পৃথিবী মাতৃকাও দুই সিংহের মাঝে বসে আছেন। সম্ভবত এই দুই বিপরীত ধারার মাঝে মধ্যমণি হয়ে মাতৃকার অধিষ্ঠান তাম্রাশ্মযুগের মাতৃসাধনার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যা আজও বাঙালির মাতৃপূজক সংস্কৃতিতে বিদ্যমান। মাতৃকার এই চিত্র যেন প্রকৃতির শৃঙ্খলার প্রতীক। তিনি সমস্ত সম ও বিষম শক্তির অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করেন কর্ণধারের মতো। এখানেই তাঁর তত্ত্ব সাঙ্খ্যের প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে যায়। সাঙ্খ্যের প্রকৃতিই জগতের সঞ্চালিকা। তিনি অব্যক্ত জগদকারণ।
অন্যদিকে হরপ্পার মাতৃকার এই অবস্থানকে যদি কালচক্রের এবং সূর্যের অয়নের সাথে সংযুক্ত ভাবা যায় সেক্ষেত্রেও আমরা ভবিষ্যতের উপমহাদেশের মাতৃসাধনার একটি দিক খুঁজে পাই। সেটি হল ঊষার উপাসনা; যা আজকের দুর্গাপূজার মূল তত্ত্বের সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট।
হরপ্পার ঊষা মহিষমর্দিনীর সাথে যে মাতৃকার সংযোগ সবথেকে প্রকট তিনি হলেন সুমেরের ইনন্যা; যিনি আসিরীয় সভ্যতায় ইশতার নামেও পূজিত।
সুমেরীয় পুরাণে তিনি সর্বশক্তির অধিশ্বরী। ইনন্যা কথাটির অর্থ স্বর্গের কন্যা। লক্ষ্য করার বিষয় হল ঊষাকেও ঋগ্বেদে দ্যুলোকের কন্যা বলা হয়েছে। ইনন্যার বাবা চন্দ্রদেব; মা আনতুম; ভাই: সূর্যদেব শামাশ ও বোন: পাতালের রানী ইরিশকিগাল। তাঁর বাহন সিংহ, দেবী সিংহের পিঠে চড়ে যুদ্ধ করতেন, হাতে থাকে ধনুক ও তূণ ভর্তি তীর। প্রতীক অস্টকোণ তারকা। তাঁর মহাজাগতিক গতিকে শুক্রগ্রহের সঞ্চরণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। উরুক শহরের এয়ান্না মন্দির ছিল তাঁর প্রধান উপাসনাস্থল। সুমেরীয় পুরাণে অন্য সব দেবতার পৃথক পৃথক কাজ থাকলেও ইনন্যার কোনো একটি সুনির্দিষ্ট কাজের উল্লেখ নেই। বরং সমস্ত দেবতার ঐশ্বর্যলক্ষণ ও কার্যক্ষমতা তাঁর তত্ত্বে আরোপিত হয়েছে। এর থেকে ঐতিহাসিকরা মনে করেছেন ইনন্যার মধ্যে সমস্ত পৃথক দেবতাদের গুণাবলী একত্রিত করে বিশ্বজননীর অভিন্ন তত্ত্ব নির্মাণ করা হয়েছিল। আবার সুমেরীয় লিপিতে ইনন্যা নামটির অক্ষরগুলো দেখে কিছু গবেষক সিদ্ধান্ত করেছেন ইনি আদিতে সুমেরীয় সভ্যতার আগেকার ইউফ্রেটিস নদী অববাহিকার একটি প্রাচীন সভ্যতার মাতৃদেবী ছিলেন। পরে সুমেরীয় ধর্মভাবনায় তাঁর আগমন ঘটেছে এবং সমস্ত দেবশক্তির সম্মিলিত মহিমা তাঁর তত্ত্ব রচনা করেছে। আমাদের মহিষমর্দিনী দুর্গার পৌরাণিক তত্ত্ব নির্মাণের সময় শ্রী শ্রী চণ্ডীতে সমস্ত দেবশক্তির সম্মিলনে তাঁর রূপ পরিগ্রহের কাহিনীটি এই প্রসঙ্গে স্মরণ করি। আবার ইনন্যাকে যেভাবে সমস্ত দেবতাদের প্রধান বলে দেখানো হয়েছে তা দেখে কেনোপনিষদের আদিজননী উমা হৈমবতীর তত্ত্ব মনে পড়ে, যিনি সিংহবাহিনী মাতৃকার আদি ধারাটির সাথে সংযুক্ত।
ইনন্যার রূপভেদ ইশতারের সাথে পায়রার সংযোগ ছিল। তাঁর মন্দিরে একটি তালগাছ থেকে একটি দৈত্যাকার পায়রা রূপে দেবী বেরিয়ে আসছেন; এরকম নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। আজও আমরা মহিষমর্দিনী দুর্গার পূজার পর নীলকন্ঠ পাখি ওড়াই। আজও আমাদের মা কালীর নিত্যাদের মধ্যে বলাকা মাতৃকা আছেন। কুমারসম্ভবের কবি কালিদাস কালীকে বলাকিনী বলেছেন। আমাদের মেহেরগড় ও পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে বিপুল সংখ্যক পক্ষীমাতৃকার মূর্তি মিলেছে। ইশতারের এই পায়রা রূপটি উপমহাদেশের পক্ষীমাতৃকার সেই আদি ধারাটির সাথে তাম্রাশ্মযুগের সুমেরীয় সংস্কৃতির গভীর সংযোগের আরেকটি দৃষ্টান্ত।
প্রশ্ন জাগে সমকালীন সুমেরীয় ফ্রিজিয়ান সভ্যতার great mother goddess এর রাজকীয় বাহনটি অর্থাত সিংহ আমাদের সংস্কৃতিতে কবে থেকে আছে? এতদিন আমাদের ধারণা ছিল কুষাণদের সূত্রে মধ্য এশিয়ার সিংহবাহিনী মাতৃকা ভারতে এসেছেন এবং মহিষমর্দিনীর সাথে একীভূত হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সত্যিই কি তাই? প্রসঙ্গত এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানের সিংহবাহিনী আদিমাতৃকার উপাসনার আলোচনা করেছিলেন শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয়; ভারতের শক্তিসাধনা ও শাক্ত সাহিত্য গ্রন্থে।
“গ্রীক মাতৃদেবীও পার্বত্য দেবী। তাঁহার যে মূর্তি পাওয়া যায় সেখানে দেখি, তিনি সুশোভিত আঁচল পরিহিতা, হাতে তাঁহার রাজদণ্ড বা বর্শা; তিনিও পর্বতশিখরে দণ্ডায়মানা এবং সিংহকর্তৃক পরিরক্ষিতা। ক্লীটের মাতৃদেবীই এশিয়ার প্রসিদ্ধ মাতৃদেবী ‘সীবেলির সঙ্গে একীভূত হইয়া গিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। এশিয়ার এই সীবেলি দেবীকে অনেক স্থলে আসনারূঢ়া দেখা যায়, এবং তাঁহার পায়ের কাছে কতকগুলি সিংহকে নত হইয়া থাকিতে দেখা যায়। কখনও এই দেবীর সহিত
সিংহ, ভল্লুক, চিতাবাঘ এবং অন্যান্য নানাবিধ পশু সংশ্লিষ্ট দোখতে পাওয়া যায়। সীবেলি মীসিয়া লিডিয়া ফ্রিগিয়া প্রভৃতি স্থানের পর্বতে পৃজিতা হইতেন।”
কিন্তু তিনি আমাদের মাতৃপূজক সংস্কৃতির সিংহবাহিনীকে “মধ্য এশিয়া থেকে আগত” এমন মত পোষণ করেননি। বরং উপমহাদেশের প্রাচীন মাতৃকা উপাসনার ধারার সাথে তুলনামূলক বিচার করে সিদ্ধান্ত করেছেন:
পৃথিবীর অন্যত্র যে সিংহযুক্তা পর্বতবাসনীর উল্লেখ পাই, আমাদের সিংহবাহনা পর্বতবাসিনী উমা বা পার্বতী সেই দেবীরই ভারতীয় রূপ? একথা কি মনে করা যাইতে পারে যে, একটি সাধারণ দেবী- মূর্তির পরিকল্পনাই প্রাচীন কালে সব দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল ? এই প্রসঙ্গে আমরা আরও একটি প্রয়োজনীয় তথ্যের উল্লেখ করিতে পারি। আমরা পূর্বেই আলোচনা করিয়া দোখয়া আসিয়াছি যে, উমা কথাটি সম্ভবতঃ মূলে একটি সংস্কৃত শব্দ নহে; অন্ততঃ কথাটির যে-সকল ব্যুৎপত্তি দেওয়া হইয়াছে তাহার কোনোটিই সর্বজনগ্রাহ্য নহে । কিন্তু আমরা দেখিতে পাই, মাতৃ-শব্দের ব্যাবলনীয় প্রাতিশব্দ হইতেছে ‘উম্মন’ বা ‘উম্ম’; শব্দটির এক্কাডীয় (4,০০80190) প্রতিশব্দ, হইতেছে “উম্ম; দ্রাবিড়ী প্রতিশব্দ হইতেছে উম্ম; এই শব্দগুলিকে পরস্পরের সহিত মিলাইয়া লওয়া যাইতে পারে এবং সবগুলিই আবার ভারতীয় ‘উমা’ শব্দটির সহিত মিলিত করিয়া দেখা যাইতে পারে ।
যাই হোক। এতদিন ধারণা ছিল সিন্ধু-সভ্যতার মাতৃকার তুলনায় ভারতে সিংহবাহিনী মাতৃকার উপাসনা তুলনামূলকভাবে নবীন। কিন্তু সম্প্রতি এই ধারণায় কিছু বদল এসেছে উত্তর আফগানিস্তানের Dashley 3 BMAC temple forts প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পরে। এর সময়কাল ২৩০০ থেকে ২০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের এবং সিন্ধু সরস্বতীর বদ্বীপ থেকে মেহেরগড় পর্যন্ত সুবিশাল ক্ষেত্রে যে সভ্যতার পত্তন হয়েছিল; এটি তার থেকে বিচ্ছিন্ন একেবারেই নয়।
এই প্রত্নক্ষেত্রটি চতুষ্কোণ; চারটি বাহুতে চারটি দ্বার। কেন্দ্রে মূল উপাসনালয়। অবিকল তন্ত্রের যন্ত্রের আকৃতি। এই দুর্গমন্দিরে পূজিত হতেন যে সিংহবাহিনী দেবী; তিনি সুমেরের ইনন্যার রূপ। সিংহবাহিনী। অধিকাংশ মূর্তিতে তাঁর সিংহাসনের দুই পাশে দুই সিংহ আর দেহের দুই পাশে দুই ডানা। অর্থাত একাধারে পক্ষীমাতৃকা এবং সিংহবাহিনী। এঁর মধ্যে পরবর্তী সময়ের তন্ত্রের অজপা হংসের দ্যোতনা আছে। আবার ঈড়া পিঙ্গলা সুষুম্নার তত্ত্বও আছে। আবার দুর্গমন্দিরের সাথে এই মাতৃকার সংযোগ আছে। শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয়ের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত এই প্রসঙ্গে লক্ষণীয়। ভারতের শক্তিসাধনা ও শাক্ত সাহিত্য গ্রন্থে তিনি বলছেন: পুরাণে দেবীকে দুর্গপরাক্রমা বলা হয়েছে। এই ‘দুর্গপরাক্রমা’ কথাটির তাৎপর্য কিঃ এখানেও আমরা দেবীকে দুর্গের সহিত যুক্ত করিতে প্রলুব্ধ হইতেছি। দুর্গা কি প্রাথমিক রূপে নগরপালিকা দুর্গরক্ষিণী দেবী ছিলেন? দুর্গাধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপেই কি তিনি সর্বশক্তিময়ী দেবীরূপে পূজিতা হইলেন? শক্তিময়ীর মহাদেবীত্ব লাভ আতি সহজেই সম্ভব হইয়াছিল। “
এই Dashley 3 BMAC temple forts প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথমত এখানে সিংহবাহিনী ইনন্যার সমতুল্য উপমহাদেশের দ্বারপ্রান্তের এক সুপ্রাচীন সিংহবাহিনী মাতৃকার সংযোগ পাই আমরা। তিনি হলেন নানা। নানা কুষাণ মুদ্রায়( যেমন সম্রাট হুবিষ্কের মুদ্রা) ও খ্রীষ্টীয় প্রথম শতকের গান্ধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। আসকো পারপোলা মনে করিয়ে দিচ্ছেন বর্তমান বেলুচিস্তানের সতীপীঠ মরুতীর্থ হিংলাজে দেবী হিংলাজ আজও বিবি নানী নামে পূজিত হন। এই নানী এবং নানা দুটি নামই ইনন্যার প্রতিধ্বনি হওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়ত এই আবিষ্কারের ফলে যুগপৎ মহিষমর্দিনী ও সিংহবাহিনী রূপে আদিমাতৃকার উত্থানের চিত্রটি আমরা দেখতে পাই; যার সূচনা তাম্রাশ্মযুগের ভারতীয় উপমহাদেশে। আসকো পারপোলা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত করেছেন: …. a goddess related to Hindu Durgā was worshipped in Afghanistan from at least as early as 2000 bce, then by the Iranian-speaking Dāsas who arrived there around 1500 bce, and then again by the Iranian-speaking Kuṣāṇas who arrived more than a thousand years later.
এই নানা সিংহবাহিনী। ইনন্যার মতোই “Lady of ladies, goddess of goddesses, directress of mankind, mistress of the spirits of heaven, possessor of sovereign power; the light of heaven and earth,
daughter of the Moon God, ruler of weapons, arbitress of battles; goddess of love; the power over princes and over the sceptre of kings”। অভিধাগুলি ব্যাবিলনের Marduk এর ইনন্যা মন্দিরের লিপি থেকে প্রাপ্ত। এর মধ্যে অধিকাংশ অভিধাই তাঁর সার্বভৌম সত্ত্বার এবং রাষ্ট্রশক্তির সাথে তাঁর একীভবনের দ্যোতক। দেবীসূক্তের “অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসুনাং”( এই গতিময় জগতের রাষ্ট্রী বা রাষ্ট্রশক্তি আমিই) উক্তির কথা স্মরণ করি। স্মরণাতীত কাল থেকে বাঙালির জাতীয় চেতনাও মাতৃকার সাথে অভিন্ন। গঙ্গারিডির গজলক্ষ্মী ও দশায়ুধা ছিলেন রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির প্রতীভূ। ধর্মপালের পালরাষ্ট্রের রাজচিহ্নে আর্যতারার চিত্র আঁকা থাকত। আবার আধুনিক যুগেও ঋষি বঙ্কিমের বন্দেমাতরম মন্ত্রে স্বদেশচেতনা মাতৃকারই রূপ ধারণ করেছে। যাই হোক। আপাতত একটি বিশেষ অভিধার দিকে দৃষ্টিপাত করছি। সিংহবাহিনী এই দেবীকে বলা হতো “daughter of the moon god”. চন্দ্রের সাথে দেবীর এই সংযোগ আমাদের মহিষমর্দিনী দুর্গার তত্ত্বের দুটি দিকের সংকেত দেয়। চন্দ্র শীতলতার প্রতীক। সারাদিনের দাবদাহের পর তার স্নিগ্ধ কিরণে স্নাত ও শীতল হয় জগত। তাই চাঁদের নাম হিমকর হিমাংশু শীতাংশু ইত্যাদি। অন্যদিকে হিম বা শীতলার সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত; চাঁদের মতোই শ্বেতশুভ্র এক প্রাকৃতিক সত্ত্বা জড়িয়ে আছে ভারতের আধ্যাত্মিক ধারণার সাথে। সেটি হল উত্তরের বিখ্যাত পর্বতমালা হিমালয় বা হিমগিরি। চন্দ্রের দেবতার কন্যা সিংহবাহিনী ইনন্যার সাথে আমাদের হিমালয়কন্যা গিরিনন্দিনী সিংহবাহিনী দুর্গার এই সাদৃশ্য চমকপ্রদ। ঊষার সাথেও হিমগিরির সংযোগের কথা সুকুমার সেন লক্ষ্য করেছিলেন।
আবার পালযুগে বজ্রযানে আমরা এক মাতৃকার উপাসনার বিবরণ পাই যাঁর সাথে চন্দ্রের সংযোগ আছে। তিনি হলেন চুন্দা বা চুন্দী( প্রাকৃত নাম; সংস্কৃত চন্দ্রা বা চন্দ্রী থেকে আগত)। এঁর বিগ্রহ সাধকের হৃদয়ের চন্দ্রমণ্ডলে অধিষ্ঠিত। বর্ণ চন্দ্রের মতো শুভ্র। ললাটে অর্ধচন্দ্র। কন্ঠে চন্দ্রের মালা। এঁকে সমস্ত বুদ্ধগণের জননী বলে ধারণা করা হতো। ইনি পালসম্রাট গোপালের ইষ্টদেবী ছিলেন। সুকুমার সেন মহাশয়ের মতে এই চুন্দির সাথে চণ্ডীর সংযোগ আছে। চুন্দা বা চুন্দিও চণ্ডীর মতোই অবৈদিক পরিমণ্ডলের মাতৃকা এবং বিশ্বজননী। চুন্দা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সার্কিটে জনপ্রিয় ছিলেন। জাভা, মঙ্গোলিয়া, জাপান, চীন, সর্বত্র তিনি পূজিত হতেন। ইলোরার গুহাচিত্রে চুন্দা আছেন। অষ্টসহস্রিকাপ্রজ্ঞাপারমিতার একাদশ শতকের একটি পুঁথিতে পট্টিকেরা (এখনকার নোয়াখালি-কুমিল্লা-ত্রিপুরা) অঞ্চলে পূজিত চুন্দার চিত্র আছে, এছাড়া রাঢ়দেশে পূজিত চুন্দার ছবিও পাওয়া গেছে এই পুঁথিতে। জাপানে তাঁকে শিবের স্ত্রী অর্থাৎ শক্তি/দুর্গার সঙ্গে এক ভাবা হয়েছে। তাঁকে শরৎকালের চাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। পালযুগে তাঁর উপাসনা সম্ভবত শরত কালে হত।
চুন্দার হাতে মুদ্গর (গদা), কুন্ত (ভল্ল), বজ্র, পাত্র/কলস, পদ্ম, দণ্ড, অনেক সময় পুস্তক। চতুর্ভুজ থেকে শুরু করে দ্বাদশভুজ, অষ্টদশভুজ এমনকি ছাব্বিশহস্ত চুন্দার মূর্তিও পাওয়া গেছে।
চুন্দার সাথে চণ্ডীর এই সংযোগও ইনন্যার চন্দ্রদেবতার কন্যারূপের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে এই মহিষমেধের তাৎপর্য কী? একটি লৌকিক কারণ তো অবশ্যই প্রবল আরণ্যক পাশবিক শক্তিকে প্রতিহত করে মানবসভ্যতার পত্তন করা। কিন্তু এ ছাড়াও কী অন্য তাৎপর্য ছিল? এর উত্তর নিহিত আছে সুমেরের কালগণনার রীতিতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য অধিকাংশ প্রাচীন সভ্যতায় কালকে চক্রের আকারে ধারণা করা হতো। কালচক্রের ধারণা আমাদের তান্ত্রিক ধর্মভাবনার একদম কেন্দ্রীয় ধারণাগুলির একটি। যাই হোক; সুমেরের প্রাচীন বর্ষগণনার রীতিতে সূর্যের উত্তরায়ন ও দক্ষিণায়নের ভিত্তিতে বছরের দুই ভাগকে সিংহ ও বৃষের রূপকে প্রকাশ করা হতো। ষাঁড় ও সিংহ ছিল প্রকৃতির দুই বিপরীতমুখী শক্তির প্রতীক। কখনও দুই সিংহের উপর প্রভুত্ব করছে এক অতিকায় ষাঁড় এবং কখনও দুই ষাঁড়কে দমন করছে এক বিশাল সিংহ; এই দুই ছবি ছিল সূর্যের গতির সাথে বছরের দুই ভিন্ন সময়ের প্রতীক। যে সময় সিংহ বৃষকে দমন করছে; বছরের সেই সময়টিই ছিল বৃষমেধ করে সিংহবাহিনী মাতৃকার উপাসনার লগ্ন। একই বৈশিষ্ট্য দেখা যেত এলামাইট সভ্যতায়; সেখানে পৃথিবীর দেবী বা আদিমাতৃকা হলেন KI. তাঁর প্রতীক ছিল সিংহ। তাঁর সামনেও ষাঁড় বলি দেওয়ার রীতি ছিল। হরপ্পার মহিষমেধ এবং সুমেরের বৃষমেধ যেহেতু মহিষমর্দিনী সিংহবাহিনী মাতৃকার একই উপাসনারীতির দুই ভিন্ন স্থানীয় প্রকাশ; তাই বলা যায় উপমহাদেশে মহিষমর্দিনীর আদিরূপটি কালচক্রের ধারণার সাথে সংযুক্ত হয়েই বন্দিত হয়েছিল। উৎস থেকেই তাই মা মহিষমর্দিনীর মধ্যে কালরূপা মাতৃকার প্রকাশ বর্তমান।
আবার এই যে দুই ষাঁড়কে একটি সিংহ দমন করছে; অর্থাত দুইদিকের দুই প্রবল শক্তিকে মধ্যস্থলের একটি শক্তি নিয়ন্ত্রিত করছে; এর সমতুল্য দৃষ্টান্ত আছে হরপ্পার একটি সিলে যেখানে মাতৃকা দুই বাঘের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। দুই বাঘ পরস্পরের দিকে আক্রমণে উদ্যত এবং মাঝে মাতৃকা এই দুই শক্তিকে প্রতিহত করে সামঞ্জস্য রক্ষা করছেন। এর মধ্যে গবেষকগণ দেখেছেন সূর্যের ত্রিমুখী অয়নের সংকেত। এই মাতৃকার সিলে একটি চক্রের চিহ্নও আছে যা স্পষ্টতই কালচক্রের সাথে এঁকে সংযুক্ত করে। ইনি ভাগবতধর্মের প্রাচীন মাতৃকা একানংশার আদিরূপ হতে পারেন। সেক্ষেত্রে মহিষমর্দিনী মাতৃকার সাথে কালতত্ত্বের সংযোগের বিষয়টি আরো সুদৃঢ় হয়। কারণ একানংশা মাতৃকাই মহাভারতে মহিষাসৃকপ্রিয়া ( মহিষের রক্তে তৃপ্ত) ও বিন্ধ্যবাসিনী রূপে পূজিত হয়েছেন।
হরপ্পার মাতৃকার মহিষমেধকে যদি কালচক্রের এবং সূর্যের অয়নের সাথে সংযুক্ত ভাবা যায় সেক্ষেত্রেও আমরা ভবিষ্যতের উপমহাদেশের মাতৃসাধনার একটি দিক খুঁজে পাই। সেটি হল ঊষার উপাসনা; যা আজকের দুর্গাপূজার মূল তত্ত্বের সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট। কারণ ঊষা বাস্তবে প্রকৃতির এক বিশেষ ক্ষণ বা লগ্ন যা রাত্রির অবসান ও দিনের সূচনাকে নির্দেশ করে। সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বা কালকেই আমরা ঊষা বলি।
ঊষা কিম্ভূত অন্ধকারের দৈত্যকে প্রতিহত করেন।
বি তিষ্ঠতে বাধতে কৃষ্ণম্ অন্বম্
ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বন্য মহিষকে বধ করে রক্তধারার মধ্যে মহিষমর্দিনীর উপাসনা ঘোর অন্ধকার ভেদ করে রক্তবর্ণ ঊষার আগমনেরই দ্যোতক ছিল। কাজেই মহিষমর্দিনী দুর্গার আদিরূপের মধ্যে কালতত্ত্বের ধারণা অঙ্গাঙ্গীভাবে নিহিত ছিল।
আবার সুকুমার সেন লক্ষ্য করেছেন ঊষা ও নিশাকে একাধিক সূক্তে অভিন্ন বলা হয়েছে। নিশা হলেনকৃষ্ণী বা কালো মেয়ে যিনি রাত্রি এবং গৌরবর্ণা ঊষা যিনি দশদিকে কিরণ বিস্তার করেন বলে দশভুজা আখ্যা পেয়েছেন। নিশা ও ঊষার মধ্যে পরস্পর ভগ্নী সম্পর্ক কল্পিত হয়েছে ঋগ্বেদে। তমাল দাশগুপ্ত মহাশয় লক্ষ্য করেছেন এঁরা একজন সৃষ্টির সূচনাকালে এবং অন্যজন সৃষ্টির বিস্তার ও স্ফুরণকালে অধিষ্ঠান করেন। আজও দুর্গাপূজার সময় মহাসপ্তমীর পূজার সূচনা ঘটে চামুণ্ডার উদ্দেশ্যে মাষভক্ত দিয়ে। কালো মাষকলাইকে সিঁদুর দিয়ে রঞ্জিত করে এই মাষভক্ত বলি খুব সম্ভবত কৃষ্ণবর্ণ নিশা ও রক্তবর্ণ ঊষার অদ্বৈত তত্ত্বেরই প্রকাশ। অন্যদিকে চামুণ্ডা কালরূপা কালীর এক প্রাচীন রূপ। ইনিই আবার দুর্গাপূজার অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজার সময় অষ্টচণ্ডীর সাথে বলিগ্রহণ করেন। মহাপূজার বিশেষ ক্ষণ বা মুহূর্তে কালীর সাথে মহিষমর্দিনীর এই সরাসরি অভিন্নত্ব দুর্গাতত্ত্বের মধ্যে সংশ্লিষ্ট হরপ্পার কালরূপা মাতৃকার আদি ধারাটির নিরবচ্ছিন্নতাকেই প্রকাশ করে।
সমতুল্য দৃষ্টান্ত সুমেরীয় সভ্যতাতেও আছে। সেখানে ইনন্যার বোন পাতাললোকের দেবী এরেশকিগল। তিনি মৃত্যুর এবং পুনর্জীবনের দেবী। সুমেরীয় পুরাণে ইনন্যার এরেশকিগলের মৃত্যুপুরীতে যাওয়া ও ফিরে আসার আখ্যানটি সবথেকে জনপ্রিয় ছিল। এই আখ্যানকে ঋতুচক্রের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। ভোরের শুকতারা ও সন্ধ্যার সন্ধ্যাতারা রূপে একই শুক্র গ্রহের দ্বিমুখী গতির সাথে ইনন্যা ও এরেশকিগলের তত্ত্বকে সংযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাত কালরূপা মাতৃকা নিশা ও মহিষমর্দিনী ঊষার অভিন্নতার সমতুল্য একটি দার্শনিক বোধ সুমেরের মাতৃপূজক সংস্কৃতিতেও ছিল।
কালরূপা মাতৃকার একটি বৈশিষ্ট্য হল তিনি অভয়া; আবার তিনিই অতি ভীষণা। হরপ্পায় ভীষণা মাতৃকার এইরকম একটি সিল পাওয়া গিয়েছে যাকে দুর্গার বর্তমান কাল অবধি প্রচলিত একটি রূপের সাথে সংযুক্ত করা যায়। সেই সিলে মাতৃকা ব্যাঘ্রবাহিনী। দুই হাতে দুটি অস্ত্র নিয়ে acacia জাতীয় কাঁটাগাছের নিচে তাঁর অধিষ্ঠান। মুখমণ্ডল করাল। কাঁটাগাছের নিচে মাতৃকার এই অধিষ্ঠান বাঙালির যে লৌকিক দেবীর কথা মনে করিয়ে দেয়; তিনি হলেন বনদুর্গা বা কান্তারদুর্গা।
আমাদের মাতৃকা হয়ে উঠেছেন যুগপৎ ভয়ঙ্করী ও অভয়া। ভয় এবং অভয়ের এই আশ্চর্য সমন্বয় বা ভয়াভয়া রূপ উপমহাদেশের মাতৃকা উপাসনার এক ধ্রুব বৈশিষ্ট্য। আর এইটিই উপমহাদেশে মাতৃকার প্রাচীনতম মূর্তিকল্পের খোঁজে আমাদের সহায়কও বটে। আর এই সূত্রেই সর্বপ্রাচীন যে প্রত্নমূর্তিগুলি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেগুলি হল সিন্ধু সরস্বতী বদ্বীপের উত্তরে মেহরগড় ঝোব অঞ্চলের মাতৃমূর্তি। প্রশ্ন উঠতে পারে বাঙালির কালীসাধনার ইতিহাস খুঁজতে ভারতের অপর প্রান্তের প্রসঙ্গ আনার কারণ কী? কারণ এই অঞ্চলেই উপমহাদেশের প্রাচীনতম মাতৃপূজক নগরসভ্যতার পত্তন ঘটেছিল তাম্রাশ্মযুগে। সিন্ধু সভ্যতায় ভবিষ্যতের বাঙালির মাতৃসাধনার ধারার সমস্ত আদি লক্ষণ বিদ্যমান। অতুল সুর মহাশয় অনুমান করেছিলেন এই অঞ্চলের অধিবাসীরাই তাম্রাশ্মযুগের শেষদিকে বীরভূম বর্ধমানের সীমায় অজয় অববাহিকায় পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে বাঙালির প্রথম নগরসভ্যতার নির্মাণ করেছিলেন। দুই সভ্যতার সমতুল্য মৃৎপাত্র( লাল কালো), খাদ্যাভ্যাস( মাছ), নৌ পরিবহনের আধিক্য, মাতৃমূর্তির এবং সেগুলোর নির্মাণশৈলীর সাদৃশ্য এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। নৃতাত্ত্বিক প্রমাণও দিয়েছিলেন রমাপ্রসাদ চন্দ মহাশয়। কাজেই বাঙালির কালীসাধনার আদিতম বীজটিও এখানেই নিহিত ছিল। এই বালুচিস্তান ঝোব অঞ্চলে অনেকগুলি মাতৃমূর্তি পাওয়া গেছে যাঁরা প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে ভয়ঙ্করী ভয়হারিণী রূপের আদিতম দৃষ্টান্ত। বেলুচিস্তানের কুল্লি ঢিপিতে আবিষ্কৃত এ-জাতীয় মূর্তির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে স্টেন মন্তব্য করেছেন, this strikingly confirms the view previously advanced that these figures represent a divinity of fertility, the ‘mother-goddess’ of many eastern cults। বেলুচিস্তানের মেহি-ঢিপিতে আবিষ্কৃত মূর্তিকা-প্রসঙ্গেও তাঁর মন্তব্য প্রায় একই।
ঝোব্ উপত্যকার মূর্তিকাগুলির রূপ কিন্তু ভীষণা, কখনও বা করোটির মত। তবুও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এগুলির মূলেও আদিম উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসই অনুমান করেছেন। এ-জাতীয় মূর্তির বর্ণনায় পিগট্ যেমন বলেছেন, a grim embodiment of the mother-goddess who is also the guardian of the dead – an underworld deity connected like with the corpse and the seed-corn buried beneath the earth” (দেবীপ্রসাদ ভারতীয় দর্শন ৭২)।
অর্থাৎ যেভাবে মৃতদেহ ও বীজ উভয়েই মাটির নিচে চাপা থাকে, সেভাবে এই মাতৃকা উর্বরতাসূচক, এবং মৃতদের রক্ষক, তিনি পাতাললোকের ঈশ্বরী। ডান হাতে খড়্গ নিয়ে বাম হাতে শঙ্কাহরণ করা যে মাতৃকার অপূর্ব বৈশিষ্ট্য; এভাবেই তাঁর আদি রূপের উৎসরণ ঘটেছিল। প্রসঙ্গত মাতৃকাদেবী তন্ত্রে পৃথিবীর সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট। মার্কণ্ডেয় পুরাণে চণ্ডী হচ্ছেন মহীদেবী।
আধারভূতা যদস্তমেতাঃ মহীস্বরূপেন যতঃ স্থিতাসি
(সকলের আধার রূপে মহীরূপে তুমি নিত্য বিদ্যমান।)
আদিমাতৃকার বসুধারা রূপটি তার সার্থক দৃষ্টান্ত। প্রসঙ্গান্তরে এই নিয়ে আলোচনা করব।
বালুচিস্তান মেহেরগড়ের এই মাতৃকা ছিলেন পক্ষীমাতৃকা। অর্থাত পাখির মতো তীক্ষ্ম চঞ্চু; জননীর মতো স্তন্যদায়িনী; আবার দেবীর মতো ঐশ্বর্যলক্ষণ তাঁর মূর্তিতে। তাম্রাশ্মযুগের মাতৃমূর্তির এ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বস্তুত আজও তন্ত্রে মাতৃকার সাথে পক্ষীর অপূর্ব সংযোগ আছে। কালীসাধনার বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে আলোচনার সময় এটি বারবার প্রতিভাত হবে। সুকুমার সেন মহাশয় জানিয়েছেন ঊষা এবং নিশা নামে যে দুই ভগিনী দেবীর কথা বেদে উল্লিখিত হয়েছে; তাঁরাই দুর্গা ও কালীর আদিতম প্রকাশ। এর মধ্যে ঊষাই আদি দশভুজা; তাঁর পূজা উপলক্ষ্যে শূলাঘাতে মহিষমেধের প্রত্ন প্রমাণ উপস্থাপিত করেছেন আস্কো পারপোলা ও শিরিন রত্নাগর। অশ্বত্থ বৃক্ষে ঊষার সাথে সাতজন মাতৃকার পূজা করছেন পুরোহিত; বলিদান করছেন একটি সুবৃহৎ ছাগ; এমন সিলও পাওয়া গেছে। প্রসঙ্গত চণ্ডী অনুযায়ী সপ্তমাতৃকার মধ্যে কালী/চামুণ্ডাও আছেন। আজও বাংলা তথা দাক্ষিণাত্যে এই সপ্তমাতৃকার উপাসনার সুপ্রাচীন নিদর্শনের অভাব নেই। কাজেই সিন্ধু সভ্যতায় যে কালীর আদিতম রূপ প্রকাশিত হয়েছিল সেটা বোঝা কঠিন নয়। এর সাথে সিন্ধু সভ্যতার প্রান্তে ঝোব ও বালুচিস্তানের ভয়ঙ্করী ভয়হারিণী ঐ মাতৃমূর্তিগুলির প্রমাণকে যোগ করলে আমরা কালীসাধনার একদম গোড়ার দিকের চিত্রটি অনেকটাই উপলব্ধি করতে পারি। সিন্ধু সভ্যতার অন্তিম পর্বেই বীরভূমের পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে অবিকল একই রকম পক্ষীমাতৃকার মূর্তি পাচ্ছি। সাথে পাচ্ছি একদম সমতুল্য লাল কালো মৃৎপাত্র। এই লাল আর কালোর সমাহার মাতৃকা উপাসনার শুরু থেকে আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সিন্ধু ও বালুচিস্তানের মাতৃমূর্তিতেও এই দুই রঙের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। ঘোর অমানিশার অন্ধকার ভেদ করে ঊষাকালীন সূর্যের মতো রক্তবর্ণ ধারণ করে মাতৃকা উদিত হচ্ছেন বরাভয়ের আশ্বাস দিতে; সম্ভবত এটাই ছিল প্রথম মাতৃসাধকদের অন্তরের অনুভব। সেটাকেই তাঁরা এই দুই রঙে ধরে রেখেছিলেন। ঘন কালো চুলের মাঝে সিন্দুরের তিলক এবং সমুদ্র সন্নিহিত সভ্যতার অলঙ্কার রূপে শঙ্খও সম্ভবত এভাবেই যুক্ত হয়েছিল মাতৃপূজার ধারায়। হরপ্পার মাতৃমূর্তিতে তাই সিন্দুর ব্যবহার এবং শঙ্খের অলঙ্কারের বাহুল্য অত্যন্ত প্রচলিত ছিল। পরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সেই আনন্দময় উপাসনার রীতিকে সংকুচিত করেছে; শাঁখা সিন্দুরকে বিবাহিত নারীর জন্য বাধ্যতামূলক করে তার মূল তাৎপর্য হরণ করা হয়েছে। তবু আজও মাতৃসাধনার সময় সিন্দুরের তিলকে; মাষভক্ত বলির সময় কালো রঙের মাষকলাইয়ে লাল সিন্দুর মাখানোর রীতিতে; বিজয়া দশমীর সিন্দুর খেলায় এবং সর্বোপরি মা কালীর মূর্তিতে লাল কালোর অপূর্ব সমন্বয় বড়ো অনায়াসেই তন্ত্রের আদিপর্বের মধুর এক অধ্যায়ের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তথ্যসূত্র:
গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়ের প্রবন্ধসমূহ
The roots of hinduism: the early Aryans and Indus valley civilization; Asko Parpola
ভারতীয় দর্শন; দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
ভারতের শক্তিসাধনা ও শাক্ত সাহিত্য; শশিভূষণ দাশগুপ্ত
Excavation at Pandu Rajar Dhibi ; Paresh Chandra Dasgupta
Electronic Corpus of Sumerian Literature ETCSL “Inanna and Enki”
ঋতু শরত, কাল সায়াহ্ন, স্থান নির্জন পরবাস। এ ভূখণ্ড বৃহৎ বঙ্গের বাইরে। তাই দুর্গাপুজোর সময়ও সন্ধে আলোকোজ্জ্বল নয়, রাত শব্দমুখর নয়। কিন্তু তাও রাতের স্তব্ধতা ভেদ করে অ-নে-ক দূরে কোথাও মাইকে গান বাজছে। দিগন্তে মৃদু গুনগুন একটা ধ্বনি, যার তাল, লয়, ছন্দ, সুর ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কি গান, চেনা না অচেনা, নতুন না পুরোনো, এ ভাষার, না ও ভাষার, না সে ভাষার, তাও ধরা যাচ্ছে না। কেবল এক আশ্চর্য মনখারাপ আচ্ছন্ন করছে আমাদের।
আশ্বিনের সন্ধেবেলা। দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেছে। আজ ষষ্ঠী, আজ সায়ংকালে বোধন হয়েছে। এই সময় তন্ত্রভূমি বঙ্গের আকাশে বাতাসে, দিনে রাতে, মৃত্তিকা ও মানসে, সমস্ত সন্ধিক্ষণে এক আশ্চর্য সমারোহ থাকে। কিন্তু বাংলা থেকে অনেক দূরে এখানে সেরকম কিছু নেই। হয়ত সেটাই ভালো। উৎসবে অভ্যস্ত হয়ে গেলে আমরাও ভুলে যাব, আমাদের তন্ত্রপ্রতিজ্ঞার কথা। তার থেকে পরবাস ভালো, যেখানে আশ্বিন মাস কোনও অভ্যেসে চলে না। এখানে চিন্তা ও চর্যার বোধন হতে পারে। এখানে একাকীত্ব তপস্যার মত, নির্বাসন অধ্যয়নের মত, শূন্যতা অনুসন্ধানের মত। এখানে, প্রত্যেক নিঃসঙ্গ লহমায় কল্প থেকে কল্পান্তর ঘটে গেছে আমাদের।
এখানে, জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, যুগ ও যুগান্তরের সন্ধিক্ষণে, আদি ও মধ্যের সন্ধিক্ষণে, ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের সন্ধিক্ষণে, উদ্ভাস ও নিরঞ্জনের সন্ধিক্ষণে, উল্লাস ও অশ্রুজলের সন্ধিক্ষণে, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের সন্ধিক্ষণে, আসা ও যাওয়ার সন্ধিক্ষণে যে মহাজাগতিক আলোড়ন দেখেছি আমরা, তাতে নিশ্চিত বলতে পারি, আমাদের শারদীয়া দুর্গাপুজোর মহাসন্ধিক্ষণে যে সন্ধিপুজো হয়, তা কেবল ধর্মীয়, শাস্ত্রীয়, অনুশাসনীয় প্রথা নয়। মায়ের ধর্মে অনেক লক্ষ বছরের জীবনচর্যার নির্যাস ধরা আছে। এ ষষ্ঠীর বোধন একেবারেই অকাল নয়, এ অনন্ত অনাদি। এ সপ্তমীর মহাস্নান নিছক স্মার্ত নয়, এ বহুপ্রাচীন স্মৃতি। এ মহাষ্টমীর অঞ্জলি নিছক পৌরাণিক নয়, এ পুরাতাত্ত্বিক প্রথা। এ মহানবমীর ভোগ নিছক প্রসাদ নয়, এ প্রাগৈতিহাসিক পন্থা। মাতৃধর্মের আঙ্গিক ও উদযাপনে অনেক লক্ষ লক্ষ বছরের প্রাচীন স্মৃতি আছে।
মাতৃধর্ম পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম। পৃথিবীর সবথেকে প্রাচীনতম মাতৃকামূর্তির সঙ্গে, মুছে যাওয়া অতীতের সঙ্গে পরিচয় হবে আজ। শারদীয়া দুর্গাপুজোর উৎসে, মাতৃভূমি বঙ্গের সমস্ত মাতৃকা উপাসনার উৎসে, মানুষের উৎসে, এমনকি পৃথিবীর উৎসে যে মা আছেন, পৃথিবীর প্রাচীনতম যে মাতৃকা, যাঁর উপাসনা যুগ থেকে যুগান্তরে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলেছে, তাঁর কথা আজ জানব।
পৃথিবীতে তখনও মানুষ আসে নি…
একঃ “ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন, মুণ্ডমালা কোথায় পেলি…”
পৃথিবীতে তখনও মানুষ অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্স আসে নি। প্রাচীন এক হোমিনিড প্রজাতি, হোমো ইরেক্টাস এঁর মূর্তি বানিয়েছিল। সময়কাল আনুমানিক পাঁচ লক্ষ বছর আগে। মরক্কোয়, ড্রাআ নদীর তীরে জার্মান প্রত্নবিদ লুৎজ ফিডলার আবিষ্কার করেন ১৯৯৯ সালে। ট্যান ট্যান শহরের কাছে একটা জায়গায় এঁর মূর্তি পাওয়া গেছিল। ভিনাস অভ ট্যান ট্যান বলা হয়।
ভিনাস নামটা কেন দেওয়া হচ্ছে?
আসলে ইউরোপে দেবী ভিনাস বা আফ্রোদিতির একরকম সলজ্জা নগ্নিকা মূর্তি হত, যেখানে তিনি ডান হাতে যোনি ঢেকে রাখতেন, এবং বাম বাম হাত বস্ত্র গ্রহণে উদ্যত, ফলে বক্ষ উন্মুক্ত। সলজ্জা ভিনাস বলা যায়। ল্যাটিন ভাষায়, Venus Pudica, বা লজ্জাবতী ভিনাস। পল হুরো (Paul Hurault), যাঁর রাজকীয় উপাধি ছিল মার্কুইস দ্য ভিব্রেই, ইনি ছিলেন ফ্রান্সের একজন শখের প্রত্নতাত্ত্বিক, ইনি দক্ষিণ পশ্চিম ফ্রান্সের ভিজিয়ের নদীর উপত্যকায় একটি প্রাগৈতিহাসিক নারীমূর্তি আবিষ্কার করেন, ম্যামথের দাঁতে নির্মিত, যার হাত, মুখ, পা কিছুই নেই কিন্তু স্পষ্টভাবে যোনি আছে। এই মূর্তিকে ইনি লজ্জাবতী ভেনাসের সঙ্গে তুলনা করে ও বৈপরীত্য দেখিয়ে Venus Impudica বা নির্লজ্জা ভিনাস আখ্যা দেন।
সময়টা ১৮৬৪ সাল। সেই শুরু।
এ নামটা, যেমন বললাম, একজন শখের প্রত্নবিদের দেওয়া। তিনিও এ নামে এই ধরণের প্রাগৈতিহাসিক মূর্তিকে ঠিক ভিনাস আখ্যা দেন নি, বরং মূল ভিনাস মূর্তি বা Venus Pudicaর সঙ্গে পার্থক্য দেখিয়ে ফরাসি ভাষায় La Vénus impudique বা Venus Impudica আখ্যা দেওয়ার প্রয়াস করেন। অর্থাৎ আদি নামকরণে মূল ভিনাস মূর্তির থেকে পার্থক্য স্বীকৃত। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ভিনাস নামের মধ্যে একাধিক সমস্যা আছে, সর্বাধিক সমস্যা হল কালানৌচিত্য দোষ বা anachronism, কারণ প্রাগৈতিহাসিক কালের মূর্তি। গ্রীস ও রোমের দেবীর নামে নামকরণ করা যায় না। যেমন হরপ্পা সভ্যতার উপবিষ্ট মূর্তিটিকে আদিশিব আখ্যা দিলে কালানৌচিত্য দোষ হয়। আমরা সেজন্য ভিনাস না বলে স্রেফ নারীমূর্তি বা উয়োম্যান ফিগারিন বলতে পারি, যদিও এই ভিনাস নামটা বাজারচলতি হয়ে গেছে। নগ্নতা প্রাগৈতিহাসিক যুগে আলাদাভাবে বিশেষ কোনও তাৎপর্য বহন করে না, অতএব নগ্ননারীমূর্তি বলারও সেরকম প্রয়োজন নেই, যেমন এই মূর্তিগুলির মাথায় টুপি বা পায়ে জুতো বা হাতে সেলফোন না থাকার জন্য আলাদাভাবে কিছু বলি না, না থাকাই স্বাভাবিক, সেভাবে যেভাবে গায়ে পোষাক না থাকাটাও আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে না, কারণ প্রাগৈতিহাসিক যুগ।
উপরে Venus of Tan Tan, পাঁচ লক্ষ বছর পুরোনো, রেপ্লিকা, বর্তমান অবস্থান Museo de la Evolución Humana, বুর্গোস, স্পেন। নিচে Venus Impudica, ষোল হাজার বছর পুরোনো, বর্তমান অবস্থান প্যারিসের Musée de l’Homme। এ দুটি মূর্তির পাশাপাশি অবস্থানেও কালানৌচিত্য আছে, কিন্তু ভিনাস মূর্তি কেন বলা হয় সেই আলোচনায় যেতে গিয়ে এঁদের দুজনকে পাশাপাশি দর্শন করলাম। ভিনাস অভ ট্যান ট্যান মানুষ (Homo sapiens) আসার আগেকার।
এই ধরণের মূর্তিকে যৌন উত্তেজক বা পর্নোগ্রাফিক আখ্যা দেওয়ার প্রয়াসকে প্রতিরোধ করেছেন বেশিরভাগ গবেষক। প্রাগৈতিহাসিক যুগের উন্মুক্ত দেহকে বর্তমান মাপকাঠি খাটিয়ে পর্নোগ্রাফিক গণ্য করার প্রয়াসে কালানৌচিত্য দোষ আছে।
ভিনাস অভ ট্যান ট্যানের সমসাময়িক অথবা তার থেকেও পুরোনো আরও একটি মাতৃমূর্তি হল ভিনাস অভ বেরেখাত রাম। এই মূর্তি বর্তমান ইজরায়েল অধিকৃত গোলান হাইটসে ১৯৮১ সালে প্রত্নবিদ নামা গোরেন-ইনবার কর্তৃক আবিষ্কৃত হয়। এটির সময়কাল সর্বাধিক আট লক্ষ থেকে সর্বনিম্ন পৌনে তিন লক্ষ বছর পুরোনো হতে পারে। এটিও মানবপূর্ব, অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্স আসার আগেকার। গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘ বাদানুবাদ হয়েছে এটির চরিত্র নিয়ে, কিন্তু প্রথমত, এতে হস্তশিল্পের প্রমাণ পাওয়া গেছে, অর্থাৎ খোদাই করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়ত এটির কোনও কেজো ব্যবহারের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ কেউ দিতে পারেন নি (একজন দাবি করেছিলেন যে রঙ তৈরির কাজে ব্যবহার হত, কিন্তু সে তত্ত্ব বাতিল হয়েছে), অথচ এটি হোমো ইরেক্টাস কর্তৃক ব্যবহার হত তাতে সন্দেহ নেই, অতএব এটির রূপক/মূর্তিতাত্ত্বিক ব্যবহার হত এরকম সিদ্ধান্ত করা যায়। Naama Goren-Inbar, Alexander Marshak, Francesco d-Errico – এই তিন গবেষক ভিন্ন ভিন্ন সময়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে এটিকে মূর্তি আখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ, functional বা কেজো নয়, representational বা মূর্ত রূপক হিসেবেই এই প্রস্তরখণ্ডের ব্যবহার ছিল। যারা জানেন না, তাদের জন্য বলি, এটিই প্রাগৈতিহাসিক প্রাগ্মানব দুই ভিনাস মূর্তি সম্পর্কে প্রধানতম গুরুত্বপূর্ণ দিকঃ নিছক কেজো (functional) ব্যবহার হলে, যেমন কিছু পিষে রঙ তৈরি করার কাজে ব্যবহার হলে, তখন মূর্তি নন। কিন্তু রূপক বা প্রতীক (symbolic/representational) ব্যবহার হলে, তখন মূর্তি।
Venus of Berekhat Ram, Israel Museum (উপরে ও নিচে)
এই স্ফীতোদর নারী সেযুগের মাতৃমূর্তি। আবিষ্কর্তা Naama Goren-Inbar তাই মনে করেন। আমরাও একমত।
আমরা সবেমাত্র মানবপূর্ব ভিনাস মূর্তির অস্তিত্বের প্রতি সচেতন হয়েছি, মাত্র চার দশক আগে প্রথমবারের জন্য এই আশ্চর্য সম্ভাবনা সামনে এসেছে যে হোমো স্যাপিয়েন্স পৃথিবীতে আসার আগেই হোমো ইরেক্টাস প্রজাতির আদিম হোমিনিড আজ থেকে আট লক্ষ বছর আগে মাতৃমূর্তি তৈরি করত। আরও অনেক নতুন আবিষ্কার নিঃসন্দেহে আগামী দিনে হবে। আমরা এতদিন জানতাম, প্রাগৈতিহাসিক যুগের সবথেকে আদি মাতৃমূর্তি ছিল প্রাচীন প্রস্তর যুগের ভিনাস অভ হোহ্লে-ফেল্স্। ম্যামথের দাঁতের তৈরি, চল্লিশ হাজার বছর পুরোনো। এখন আমরা জানি, এটি হল মানুষের তৈরি সবথেকে প্রাচীন মাতৃমূর্তি যা পাওয়া গেছে আজ পর্যন্ত। কিন্তু মানুষ, হোমো স্যাপিয়েন্স এই পৃথিবীতে আসার কয়েক লক্ষ বছর আগেই মাতৃমূর্তি নির্মাণ শুরু হয়ে যায়, সেই হিসেবে যখন মানুষ ছিল না, তখনও মাতৃকা ‘উপাসনা’ ছিল! তবে অবশ্যই আজকের মত নয়। কিংবা, কে জানে! হয়ত ততটা আলাদাও নয় যতটা মনে হয়। আসল কথা, পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন মাতৃমূর্তি মানবপুর্ব, এবং হোমো ইরেক্টাস কর্তৃক নির্মিত এই ভিনাস অভ বেরেখত রাম, এবং ভিনাস অভ ট্যান ট্যান। এগুলির বয়স পাঁচ লক্ষ থেকে আট লক্ষ বছর পুরোনো।
এই স্ফীতোদরী মাতৃমূর্তি সম্ভবত সেযুগে গর্ভিণীরা মাদুলির মত গলায় পরিধান করতেন, গর্ভযন্ত্রণা উপশম করতে, এরকম একটি চমকপ্রদ তত্ত্ব আছে। হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির তৈরি প্রথম মাতৃমূর্তি এটি। চল্লিশ হাজার বছর আগেকার, প্রাচীন প্রস্তর যুগের ভিনাস অভ হোহ্লে ফেল্স্। এই পৃথুলা, বিপুলস্তনী, স্ফীতোদরা মূর্তির আশ্চর্য বিষয় হল, মস্তক নেই, তার জায়গায় একটা আংটা আছে, এবং ফলে ওই তত্ত্ব। কিন্তু অন্যভাবেও ভাবা যায়। যিনি পরিধান করবেন, তাঁর দেহেই এই মাতৃকার অধিষ্ঠান হবে, কারণ মাদুলি পরিধানকারীর মাথাটাই এখন ‘দেবী’র দেহের উপর বিরাজমান।
Venus of Hohle Fels ২০০৮ সালে জার্মানির শেল্ক্লিঙ্গেন শহরে আবিষ্কৃত হয়। বর্তমান অবস্থান Urgeschichtliches Museum, Blaubeuren
এরকম মাতৃমূর্তির পেছনে কি মানুষের কাল্পনিক ও বৃহৎ সম্প্রদায় গঠনের গতিবিদ্যা নিহিত? কারণ, ইউভাল হারারির তত্ত্ব অনুযায়ী দেখলে, হয়ত এই ‘জগদকারণ’ ‘জগৎযোনি’ মাতৃকার উপাসনার কাহিনীতে পারস্পরিক বিশ্বাস থেকেই প্রস্তরযুগের মানুষদের সম্প্রদায়, সমবায়, পারস্পরিক সহায়তা এবং সম্মিলনী নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। অবশ্যই, ব্যক্তি মানুষের জন্য talisman বা জাদুবিদ্যামূলক ব্রতধর্মী মাদুলি হিসেবে এই মূর্তির ব্যবহারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। এই মাতৃমূর্তির বিপুলাকার স্তন, উদর ও যোনি অবশ্যই উর্বরতার প্রতীক। এই সময় থেকে আর কোনও দ্বিধা দ্বন্দ্ব নেই। এগুলো কেজো মূর্তি নয়, রূপক মূর্তি। রূপক মূর্তি হলে ধর্মীয় অথবা সাংস্কৃতিক হওয়া অবশ্যম্ভাবী। ধর্ম না সংস্কৃতি?
যৌন উত্তেজনার তত্ত্ব (পর্নোগ্রাফি), আগেই বলেছি, প্রায় সব গবেষক খারিজ করেছেন। প্রাগৈতিহাসিক যুগে নগ্নতা স্বাভাবিক, উপরন্তু সন্তানসম্ভবা, সন্তানের জন্মদাত্রীর নগ্নতা যেখানে বিষয়। এছাড়া গলার মাদুলিতে পর্নোগ্রাফি, এই উদ্ভট নতুন ব্যাখ্যার ঝোঁক নিতান্ত বেপরোয়া গবেষক না হলে দেখাবেন না। নারী শরীরকে শুধুমাত্র ভোগ্য না ভাবলে এই মূর্তিকে পর্নোগ্রাফি ভাবা অসম্ভব। বরং এই মূর্তির আনুপাতিক শৈলী বিশ্বস্রষ্টার বা নিদেনপক্ষে মানবস্রষ্টার বৃহৎ বৈভবের দ্যোতক, এরকম সিদ্ধান্ত ভুল হবে না। মাতৃধর্মের পক্ষেই সিদ্ধান্ত করা যায়।
ধর্মীয় সংস্কৃতির পক্ষে সিদ্ধান্তও যথেষ্ট যৌক্তিক হবে। যেমন, প্রসববেদনা উপশমের জন্য জাদু মাদুলি। অথবা, দলের কোনও নেতা/পুরোহিতের গলায় এই মাদুলি হতে পারে জগজ্জননীর শক্তির প্রতীক। শিকার করতে যাওয়ার সময় মায়ের সুরক্ষাকবচ! কিংবা, অন্য কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধের সময়, মায়ের আশীর্বাদ। দূরদূরান্তে যাওয়ার সময়, মাতৃভূমি ও নিজস্ব জনগোষ্ঠীর মূর্ত স্পর্শ। আবার, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় পরিধান করার জন্য পবিত্র ও মন্ত্রপূত মাদুলি। নরনারীর সম্পর্ক অথবা প্রজননের ক্ষেত্রে উর্বরতার প্রতীক হিসেবে পরিধান করলে হয়ত সুসন্তান আসবে, এই বিশ্বাস। কিংবা, দেখতে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য (সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে পৃথুলা মাতৃমূর্তি হয়ত আজকে খ্রিষ্টধর্মের ক্রুশবিদ্ধ যীশুর আইকনের মত, কিংবা চে গুয়েভারার টি শার্টের মত, অথবা বৌদ্ধ মন্ত্র লেখা কাগজের মত, যারা বিশ্বাসী নন তারাও হয়ত অনেকে সাংস্কৃতিকভাবে ব্যবহার করেন) সেজন্যই প্রাগৈতিহাসিক হোমো স্যাপিয়েন্স সাংস্কৃতিকভাবে ব্যবহার করতেন।
আর একটি চমকপ্রদ তত্ত্ব হল, প্রাগৈতিহাসিক যুগের সন্তানসম্ভবা নারী নিজেই নিজের মূর্তি তৈরি করতে চেয়েছেন। যেহেতু নিজেকে ওপর থেকে দেখছেন, নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না, তাই মূর্তি মুণ্ডহীন, কিন্তু বিপুলাকার স্তন ও দেহের নিম্নাংশ পরিলক্ষিত হচ্ছে, এই ভিনাস মূর্তি সেভাবেই নির্মিত।
এছাড়া এই পৃথুলা নারী বিপুলা পৃথিবী মাতৃকার প্রতীক ও দ্যোতনা হতে পারেন, এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনঃ “তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী”
অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অভ প্রিহিস্টোরিক ফিগারিন্সগ্রন্থের ভূমিকায় বেইলি, কচরেন, জাম্বেলির ২০১০ সালের প্রবন্ধকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এই সব প্রাগৈতিহাসিক মূর্তির সঙ্গে শক্তির সম্পর্ক ছিল, এগুলি ‘পাওয়ারফুল অবজেক্টস’। এই মূর্তিগুলি ‘পাওয়ার অবজেক্টস’ ছিল, এর সঙ্গে ক্ষমতার দ্রব্যগুণ সম্পৃক্ত ছিল। এই মূর্তিগুলি থেকে শক্তি নির্মিত, নিয়ন্ত্রিত, নিয়মাধিকৃত হত। এই সমস্ত প্রাগৈতিহাসিক মূর্তির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা রিচুয়ালের সম্পৃক্ততার কথা তো স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুকে।
লাল রঙ শক্তির রঙ। হতে পারে বলির রঙ, রক্তের রঙ, রজঃস্রাবের রঙ, রজোগুণের রঙ, কিংবা লেলিহান আগুনের রঙ, অথবা লাল ফুলের বসন্তের রঙ। লাল রঙের সঙ্গে আজকের শাক্ত ধর্মের অবিচ্ছেদ্য সংযোগের পেছনে কোনও আদিম কারণ থাকবে।
সমস্ত ভিনাস মূর্তির মধ্যে বোধকরি সবথেকে বিখ্যাত হল ভিলেনডর্ফের ভিনাস, যা অস্ট্রিয়ার ভিলেনডর্ফ থেকে ১৯০৮ সালে আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই মূর্তি রক্তবর্ণ চর্চিত, মূর্তির গায়ে ও মাথায় red ochre বা একরকমের লাল সিঁদুর লাগানো, যা অবশ্যই মাতৃকা উপাসনায় লাল রঙের প্রতীকী দ্যোতনার সর্বপ্রাচীন প্রমাণ। ভিলেনডর্ফের ভিনাস ২৯৫০০ বছর পুরোনো।
Venus of Willendorf, Naturhistorisches Museum, Vienna (উপরে ও নিচে)
লাইমস্টোনে নির্মিত এই পৃথুলা মাতৃমূর্তির অনেকগুলি আশ্চর্য বিষয় আছে। মস্তকটি আশ্চর্য, কেশসজ্জা অথবা মাথার আবরণ রহস্যময়, চোখ নাক মুখ নেই, সম্ভবত ইচ্ছা করেই স্পষ্টভাবে কোনও ব্যক্তি মানুষের মাথার সঙ্গে মিল তৈরি করা হয়নি, বিমূর্ত রাখা হয়েছে যাতে তা বিশ্বজনীন হতে পারে। মাথা ঈষৎ নমিত, যার বিভিন্ন তাৎপর্য হতে পারে, নিচের দিকে তাকাচ্ছেন, বা (গর্ভের?) সন্তানের দিকে তাকাচ্ছেন, অথবা ক্ষুধার্ত সন্তানকে স্তন্য পান করাতে যাওয়ার আগের মুহূর্ত। স্ফীতোদরী, বিপুলস্তনা, হয়ত গর্ভিণী। উর্বরতার প্রতীক, সমস্ত গবেষক একমত। এই মাতৃমূর্তি যে পাথরে নির্মিত তা অস্ট্রিয়ায় পাওয়া যায় না, তা সুইডেন বা হল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল। আবার হাত স্পষ্টভাবে তৈরি নয়, অনেকটা schematic ধরণের হাত, দুই স্তনের উপরিভাগে দুটি অতি ক্ষুদ্র হাত বিশ্রামরত যার বিভিন্ন তাৎপর্য হতে পারে। প্রথমত, মূর্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহারিক সুবিধার জন্য ক্ষুদ্র হাত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, হাত মূলত কর্ম ও কর্মফলের দ্যোতক। বৃহদাকার হাত না থাকা কর্মবিরতির সূচক। কর্মফলমুক্তি, অতি উচ্চ ধারণা, তবে প্রাচীন প্রস্তর যুগে সকলে অসভ্য বর্বর ছিল এমন সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত নয়। মূর্তির পাদদেশ অসম্পূর্ণ, তারও নানা তাৎপর্য সম্ভব। মূর্তি হয়ত দণ্ডায়মান থাকার জন্য নয়, শায়িত থাকার জন্য নির্মিত, অথবা বিশেষ অনুষ্ঠানে পাদদেশ নির্মাণ করে স্থাপনা করা হত, অথবা কোনও থলির মধ্যে রাখা হত।
চারঃ “কালী কেবল মেয়ে নয়, মেঘের বরণ করিয়ে ধারণ কখনও কখনও পুরুষ হয়’…”
প্রাগৈতিহাসিক যুগের সমস্ত ভিনাস মূর্তির বিস্তারিত আলোচনা করা এই প্রবন্ধের আওতার বাইরে। আমরা সময়সারণী মেনে পরপর কিছু প্রাগৈতিহাসিক ভিনাস মূর্তি দেখে নেব।
১) ভিনাস অভ গাল্গেনবার্গ। এই মূর্তি অত্যন্ত প্রাচীন, হোহ্লে ফেল্স্ -এর পরেই সবথেকে প্রাচীন মানবনির্মিত নারীমূর্তি, ৩৬০০০ বছর পুরোনো। ১৯৮৮ সালে পাওয়া গেছিল অস্ট্রিয়ার স্ট্রাটজিং থেকে, যা ভিনাস অভ উইলেন্ডর্ফ-এর প্রাপ্তিস্থানের কাছেই। দুটি মূর্তি একই মিউজিয়ামে আছে। স্থানীয় Amphibolite পাথরে নির্মিত এই মূর্তির বাম হাত উত্তোলিত, বাম স্তন অত্যুচ্চ, কিন্তু একদিকে হেলে আছে, অনেকটা যেন একদিক থেকে সাইড প্রোফাইল হিসেবে মূর্তিটি তৈরি, সেজন্যই সম্ভবত ডান স্তন সেভাবে দেখা যায় না। ডান হাত কোমরে রাখা আছে। মূর্তি স্ফীতোদরী বা পৃথুলা নয়, বাদবাকি প্রাগৈতিহাসিক ভিনাসের তুলনায় এই দিকে আলাদা। বাম হাত ওপরে তোলার ভঙ্গিটি নাচের বলে অনেকে মনে করেছেন। এই মূর্তির ডাকনাম ফ্যানি, ভিয়েনার বিখ্যাত ব্যালেরিনা ফ্যানি এলস্লার-এর নামে।
Venus of Galgenberg, Naturhistorisches Museum, Vienna (উপরে ও নিচে)
২) ভিনাস অভ ডলনি ভেস্তোনিৎসে। ৩১০০০ বছর পুরোনো এই পৃথুলা বিপুলস্তনী স্ফীতোদরা মাতৃমূর্তি পৃথিবীর প্রাচীনতম মানবনির্মিত সেরামিক শিল্পকীর্তি। এই সেরামিক অত্যুচ্চ তাপমাত্রায় মাটি এবং হাড় পুড়িয়ে তৈরি করা হয়েছিল। চেক রিপাবলিকের দক্ষিণ মোরাভিয়া অঞ্চলের ডলনি ভেস্তোনিৎসে অঞ্চলে পাওয়া গেছিল ১৯২৫ সালে। একটি চমকপ্রদ বিষয় হল, প্রত্নবিদরা মূর্তির মাথায় চারটি পালক গোঁজার ছিদ্র খুঁজে পেয়েছেন।
Venus of Dolní Věstonice, Moravské zemské muzeum, Brno, Czech Republic (উপরে ও নিচে)
৩) ভিনাস অভ মাওআর্ন। লাল রঙ করা লাইমস্টোন নির্মিত এই বিমূর্ত শৈলীর সৃষ্টি/উর্বরতা প্রতীককে Rote von Mauern, the red one of Mauern নামেও ডাকা হয়। ২৭০০০ বছর পুরোনো। জার্মানির মাওআর্ন থেকে ১৯৪৮ সালে পাওয়া গেছিল। এখানে খুব সম্ভবত নারীর পশ্চাদ্দেশকে উর্বরতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আবার ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অণ্ডকোষ-সহ পুরুষলিঙ্গও হতে পারে আশ্চর্যজনকভাবেঃ এই বিমূর্ত প্রতীকটি নারী ও পুরুষ দু-ই হতে পারে, গবেষকদের মতে। আমাদের শাক্তপদাবলী মনে পড়তে পারেঃ ‘কালী কেবল মেয়ে নয়, মেঘের বরণ করিয়ে ধারণ কখনও কখনও পুরুষ হয়’।
Venus of Mauern, Archäologische Staatssammlung, Munich
পাঁচঃ “সচকিত হয়ে তারা/শুনেছে কোথায় শিঙা বাজে,/সাজো সাজো, ডাকে কোন অলক্ষ্য আদেশ…”
এই নারীমূর্তিগুলিকে প্রথাগত অর্থে ভিনাস, অর্থাৎ সৌন্দর্য ও আকর্ষণীয় রূপলাবণ্যের দেবী আখ্যা দেওয়া যায় না। অ্যালান ডিক্সন ও ও বার্নাবি ডিক্সন আধুনিক যুগের হেটেরোসেক্সুয়াল পুরুষদের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে যৌন উত্তেজনামূলক চিন্তা আসে না এই মূর্তিগুলিকে দেখে। এই দুই গবেষকের সিদ্ধান্ত হল, এই নারীমূর্তিগুলির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উর্বরতার প্রতীক এবং গর্ভিণী পৃথুলা মাতৃমূর্তি হতে পারে। এছাড়া সেই সময় ইউরোপে যেহেতু তুষার যুগ চলছিল, গড় আয়ু ছিল কম, জীবনধারণ ছিল কঠিন, কাজেই এই পৃথুলা মাতৃমূর্তি ছিল দীর্ঘ আনন্দময় জীবনে প্রাচুর্য, পুষ্টি ও তুষ্টি সহকারে বেঁচে থাকার প্রতীক, অর্থাৎ এঁরা মূলত বৃদ্ধামাতা।
কিন্তু এমন একটি চিরাচরিত পৃথুলা বিপুলস্তনী স্ফীতোদরী মাতৃমূর্তি পাওয়া গেছে, যেখানে মূর্তির তাৎপর্য কেবলমাত্র উর্বরতা অথবা দীর্ঘায়ুর প্রতীক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে মাতৃধর্মের অপ্রমেয় বিমূর্ত ধর্মতত্ত্বের মূর্ত প্রকাশ ঘটেছে।
ভিনাস অভ লোসেল। ২৫০০০ বছর পুরোনো। ঠিক মূর্তি নয়, একে বলা হয় রিলিফ, অর্থাৎ কোনও নিরেট পদার্থের গায়ে খোদাই করে যে অবয়ব নির্মিত হয়। আঠেরো ইঞ্চি লম্বা লাইমস্টোনের এই ভিনাসমূর্তি আসলে লোসেল অঞ্চলে লাইমস্টোন নির্মিৎ পাথুরে আশ্রয় (abri de Laussel)-এর ভেতরে পাথরের দেওয়ালের গায়ে খোদাই করা ছিল, দেওয়াল থেকে এই অংশটি খসে পড়ে ১৯১১ সালে আবিষ্কারের সময়। স্থান, দক্ষিণ পশ্চিম ফ্রান্সের Dordogne। এখনও রিলিফের চারপাশে প্রস্তরখণ্ডটি এবড়ো খেবড়ো অবস্থায় দৃশ্যমান। এই পাথরটির নিম্নাংশ red ochre বা লাল সিঁদুরজাতীয় রঙ দ্বারা চর্চিত, ফলে কোনও ব্রতধর্ম জাতীয় আদিম অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হত, এই সম্ভাবনা আছে। এই রিলিফের হাতে একটা শিঙা আছে, বাইসনের শিং, যার গায়ে বেশ কয়েকটি লম্বা লম্বা খাঁজকাটা দাগ। এরকম শিঙা বা হর্ন বাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হত, আমাদের দেশেও হত, ইউরোপেও হত, আবার এরকম শিঙা পানপাত্র হিসেবেও ইউরোপে ব্যবহৃত হত। অর্থাৎ এটি আধার হতে পারে, প্রাচুর্যের প্রতীক হতে পারে, তৃষ্ণা মেটানোর জীবনীশক্তি হতে পারে। অন্যদিকে বাদ্যযন্ত্র হিসেবেও শিঙা দূরদূরান্তের আহ্বান হতে পারে, হয়ত এই আদিম মাতৃকার ডাকে একত্রিত হওয়া সন্তানদের সমবেত শক্তির প্রতীক হতে পারে। শিঙার গায়ে দাগগুলো রহস্যময়। মোট তেরোটি দাগ আছে। এগুলি কি উর্বরতা ও ঋতুচক্রের হিসেব? অথবা এক বছরে তেরোটি চান্দ্র মাসের প্রাচীন দিনগণনা বা ক্যালেণ্ডার? সেক্ষেত্রে, শিঙার আকৃতি যে বাঁকা চাঁদের মত, সেটাও তাৎপর্যপূর্ণ।
এই মূর্তির মস্তক শিঙার দিকে, অর্থাৎ ডানদিকে ফেরানো। অর্থাৎ মুখের একদিকই শুধু দেখা যাচ্ছে। মাথায় কেশরাশি অথা কেশসজ্জা। মুখ নাক চোখ প্রভৃতি নেই, মুখমণ্ডলবিহীন মস্তককে ভিলেনডর্ফের মতই বিমূর্ত বলা যায়।
এই শিঙার মধ্যে ধর্মীয়, কাব্যিক, দার্শনিক এবং আনুষ্ঠানিক আঙ্গিক আছে। এখানে একটা কাহিনী আছে, কোনও প্রাচীন স্তোত্র আছে। বিংশ শতকে রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষায় বললে, “মিলেছি আজ মায়ের ডাকে…” কিংবা, “জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছ দান…”
Venus of Laussel, Musée d’Aquitaine, Bordeaux, France
একাধিক প্রবন্ধে এই শিঙাটিকে গ্রীক কিংবদন্তীর cornucopia বা horn of plenty এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু এরকম অফুরন্ত শিঙা উর্বরতার প্রতীক, সেক্ষেত্রে মাতৃমূর্তি, যিনি নিজেই উর্বরতার প্রতীক, তাঁর হাতে শিঙা একরকমের অনন্তশিল্প বা meta-art বলে ভাবা যেতে পারে।
যে শিঙা গ্রীক কিংবদন্তীর অফুরন্ত পানীয়ের ভাণ্ড, তার সঙ্গে মাতৃস্তনের সম্পর্ক আছে। কর্নুকোপিয়া সম্পর্কে গ্রীক কিংবদন্তী পাঠ করলে দেখা যায়, এ শিঙাটি হল প্রতীকী স্তন, দেবরাজ জিউস সদ্যোজাত অবস্থায় এতে দুগ্ধ পান করেছিলেন অবিরাম ধারায়। এক্ষেত্রেও, অনন্তশিল্প বলা যায়, কারণ এ চিত্রে শিঙা ও মাতৃকার স্তন দুইই উপস্থিত। এবং শিঙাটিই মূর্ত স্তনের বিমূর্ত প্রতীকী রূপ।
কোনও কোনও গবেষক শিঙাটিকে ফ্যালাস বা লিঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেছেনঃ মাতৃকা তাঁর হাতে উর্বরতার প্রতীক হিসেবে লিঙ্গ ধারণ করছেন। এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, মাতৃকার মণ্ডলের অংশ হিসেবে, তাঁর হাতেই ধরা আছে লিঙ্গ, যা তাঁর ঐশ্বরিক উর্বরতা শক্তির প্রকাশের আঙ্গিক। এই লিঙ্গের কোনও পৃথক অস্তিত্ব নেই, এটি মাতৃকার প্রজননশক্তির অঙ্গ।
শিঙার সঙ্গে মৃগয়ার সম্পর্ক আছে। এই শিঙাটি শিকার-সাফল্যের প্রতীক হতে পারে, বাইসনের সফল মৃগয়ার জন্য মাতৃকার আশিস হওয়া সম্ভব। অর্থাৎ ইনি শিকারের দেবী হতে পারেন। এরকমও একটা সম্ভাবনা বলা হয়েছে যে শিঙার গায়ের দাগগুলি হয়ত সফল মৃগয়ার দ্যোতনা বহন করে, আদিম শিকারী সফল হয়ে ফিরে এলে একটি করে দাগ দিতেন।
এই শিঙাটি কোনও জাদুবস্তু, বা ব্রতধর্মী অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত মন্ত্রপূত দণ্ডের চিত্রকল্প হতে পারে। হয়ত এর মাধ্যমে মাতৃকার রহস্যময় শক্তির আবাহন হত।
উপসংহার
ইউরেশিয়ার প্রাগৈতিহাসিক সমস্ত ভিনাস মূর্তি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক আলোচনা এই প্রবন্ধের আওতার বাইরে। এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ শেষ করার সময় আমরা দ্রুত আরও কয়েকটি বিখ্যাত প্রাগৈতিহাসিক ভিনাস মূর্তি দেখে নেব।
১) সব ভিনাস মূর্তি নগ্ন নয়, যদিও নগ্নতাই বিচার্য ছিল এই ভিনাস ইম্পুদিকা নামকরণের পেছনে। এই প্রসঙ্গে গজদন্তে নির্মিত আনুমানিক ২৪০০০/২৬০০০ বছর পুরোনো ভিনাস অভ লেস্পুগা দ্রষ্টব্য। এই পৃথুলা (steatopygous, একধরণের পৃথুলা দেহ যেখানে শরীরের নিম্নাংশ, যেমন পশ্চাদ্দেশ ও উরু বিশেষভাবে স্ফীত) মাতৃকার দেহে কোমর থেকে স্কার্টের শৈলী দেখা যাচ্ছে যা spun thread বা তন্তুবয়নের দ্যোতক, বলছেন টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ বার্বার। প্রসঙ্গত এই steatopygous শারীরিক গঠন মানব প্রজাতির নারীদের মধ্যে একাংশের এক অতীব প্রাচীন দৈহিক বৈশিষ্ট্য, যা পৃথুলা আদিমাতৃকামূর্তির গঠনশৈলীর পেছনে দায়ী হতে পারে।
Venus of Lespugue, Musée de l’Homme, Paris
২) সব ভিনাস মূর্তির মুখমণ্ডল বিমূর্ত নয়। ২৫০০০ বছর পুরোনো, গজদন্ত নির্মিত ভিনাস অভ ব্রাসেম্পুই দ্রষ্টব্য।
Venus of Brassempouy, Musée d’Archéologie Nationale in Saint-Germain-en-Laye, near Paris
৩) ২২৮০০ বছর পুরোনো, ম্যামথদন্তে নির্মিত ভিনাস অভ মোরাভানির (স্লোভাকিয়া) মুণ্ড নেই, হাত অস্পষ্ট, হাঁটুর নিচে থেকে পা নেই। এগুলি একাধিক উর্বরতামূলক ভিনাস মূর্তির বৈশিষ্ট্য। বিপুল স্তন, স্ফীত উদর, মাতৃযোনি-বিশিষ্টা মূর্তি।
Venus of Moravany, Slovak Academy of Sciences in Nitra
৪) সব প্রাগৈতিহাসিক ভিনাস মূর্তি পৃথুলা নন, সেটা অবশ্য ভিনাস ইম্পুদিকা’র ক্ষেত্রে দেখেছি। চেক রিপাবলিকের ভিনাস অভ পেত্রভিৎসে লৌহনির্মিত তন্বী মূর্তি। আনুমানিক ২৩০০০ বছর পুরোনো, মস্তক ও হস্তপদবিহীন।
Venus of Petřkovice, Archaeological Institute, Brno
৫) কস্তিওনকি ভিনাস-সমূহ। রাশিয়ার কস্তিওনকি প্রত্নক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত একাধিক গজদন্তের ভিনাস মূর্তি আছে। এগুলির সময়কাল ২০০০০ থেকে ২৫০০০ বছর।
Venus Figurines (No.1) of Kostyonki, Hermitage Museum, St Petersburg
৬) ভিনাস অভ সাভিনানো। ২০০০০ থেকে ২৫০০০ বছর পুরোনো, ইতালির মোদেনা থেকে পাওয়া গেছিল। সফট গ্রিনস্টোন (সার্পেনটাইন)-এ নির্মিত। মস্তকের জায়গায় বিমূর্ত শঙ্কু। বিপুলস্তনী, লম্বোদরী।
Venus of Savignano, Pigorini National Museum, Rome
৭) গাগারিনো ভিনাস সমষ্টি। রাশিয়ার গাগারিনো গ্রাম থেকে গজদন্তে নির্মিত একাধিক ভিনাস পাওয়া গেছে।
Venus Figurines (No.1) of Gagarino. Hermitage Museum, St. Petersburg
৮) ভিনাস অভ মন্রুজ। সুইজারল্যান্ডের নিউচ্যাটেল-এর মন্রুজ থেকে পাওয়া গেছিল। ৯০০০ থেকে ১১০০০ বছর পুরোনো। জেট মণিপাথরে (gemstone) নির্মিত। এটি পেন্ডেন্ট হিসেবে পরিধান করা হত। Steatopygous, লক্ষণীয়।
আলোচনার একদম শেষে নব্য প্রস্তর যুগের সিংহবাহিনী, সিটেড উয়োম্যান অভ চ্যাটালউইক। এঁকে অবশ্য কেউ ভিনাস আখ্যা দেয় না, কিন্তু আদিম আদিমাতৃকাদের মত ইনিও পৃথুলা। ৬০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে baked clay নির্মিত মাতৃকামূর্তি। এঁর মূর্তিতে মুণ্ডটি পরে রিকন্সট্রাকশন করা হয়েছে, মুণ্ডবিহীন অবস্থায় পাওয়া গেছিল।
Seated Woman of Çatalhöyük, Museuem of Anatolian Civilizations
ভিনাস অভ বেরেখত রাম থেকে ধরলে গত আট লক্ষ বছর ধরে এই পৃথুলা লম্বোদরী মাতৃকার ধর্ম পৃথিবীতে স্থায়ী হয়েছে। এর মধ্যে একাধিক হোমিনিড প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে, হোমো স্যাপিয়েন্সের আবির্ভাব ঘটেছে। আর কোনও মানবধর্ম এতদিন ধরে স্থায়ী হয়নি, আর কোনও মূর্তিশৈলী এত সহস্র বছর ধরে পূজিত হয়নি।
আদিমতম আদিমাতৃকাদের নিয়ে, তাঁদের আদিম ধর্মের স্বরূপ নিয়ে আমাদের আরও সারস্বত অনুসন্ধান করতে হবে।
একজন মাওবাদী বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের পিএইচডি পরীক্ষায় জেল থেকেই প্রথম হয়েছেন, কিন্তু অভিযোগ হল যে উপাচার্য তাকে জয়েন করতে দিচ্ছেন না। ঘোর অন্যায়, সন্দেহ নেই। আমি জেনেছিলাম বামজেহাদি রণজিৎ শূরের ফেবু পোস্টে। খবরটা ছড়িয়ে পড়ায় পুরো বাম-তৃণ-জেহাদি ইকোসিস্টেম গর্জে উঠেছে, আবাপ খবর করেছে, চোর্কুণাল হুঙ্কার দিয়েছে (ওঁরই জেলসঙ্গী ছিলেন মাওবাদী গবেষক), ছাত্রী মলেস্ট করে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত এক অধ্যাপক বাণী দিয়েছেন শিক্ষার অধিকার নিয়ে। ওদিকে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু নাকি জেলমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন যাতে বন্দীকে বর্ধমানের জেলে রেখে পিএইচডি করার সুযোগ দেওয়া হয়।
বাঙালির ইতিহাসকে যে ইকোসিস্টেমটি বিধ্বস্ত করে, শেকড়বিচ্ছিন্ন করে, নিয়মিতভাবে হিন্দু বাঙালিকে আত্মঘাতী হতে প্ররোচনা দেয়, এই সমবেত শঙ্খনাদে তাদের ঘরে যেন এক নতুন জন্মাষ্টমীর আবাহন হল। কারাগারে বুঝি বা আরেক মাওবাদী কৃষ্ণই (নতুন কিশেনজি!) নতুন করে ভূমিষ্ঠ হলেন, বাঙালির ইতিহাস মুছে ফেলার ও বিকৃত করার এক নতুন লীলাময় অধ্যায়ের আশায় আজকের বিশ্বমানবদের দিন গোনা শুরু হল! ইতিহাসবিভাগগুলোর এমনিতে তো পেশাদারি দায় দায়িত্বই হল বাঙালি যাতে তার অতীতকে জানতেই না পারে, এবং জানলেও যাতে ভুলভাল জানে।
কিন্তু আমাকে তৃণমূলের সক্রিয় মদতে রাকৃমি নরেন্দ্রপুর কলেজ জয়েন করতে দিল না, কলেজ সার্ভিসের সমস্ত আইন কানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, তখন কারও একটাও টুঁ শব্দ শোনা গেল না। স্বাভাবিক। আমি এই ইকোসিস্টেমের অংশ নই, বরং এদের সঙ্গে সাপে নেউলে সম্পর্ক। বাঙালি বিশ্বমানবরা বেছে বেছে প্রতিবাদ করেন!
দিল্লিতে অধ্যাপনা করলে আমার তো ব্যক্তিগত ক্ষতি কিছু নেই, বরং লাভ। তবে আমি বাংলায় ফিরলে এই মুমূর্ষু বাঙালি জাতির কিছু উপকার হতে পারত!
মামলা করা ছাড়া আপাতত আমি আর কিছুই করতে পারছি না, তবে আমার কিছু করার দরকারও নেই। যা করার সব মা কালীই করবেন!
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, বারো জুলাই দুহাজার চব্বিশ
বিপত্তারিণী চণ্ডীর ব্রতে তারিণী/তারা ও চণ্ডীর সাযুজ্য। নিষেধ অমান্য, নিষিদ্ধের প্রতি কৌতূহল, ফলে বিপদ, সেখান থেকে রক্ষার্থে বিপদ-তারিণী। আষাঢ় নবরাত্রির রথ ও উল্টো রথের মধ্যে মঙ্গল ও শনির এই ব্রতধর্মে জয়দুর্গা পূজিত হন।
বারাহী নবরাত্রি শুরু হয়েছে যা আষাঢ় নবরাত্রি, তান্ত্রিক নবরাত্রি এবং গুপ্ত নবরাত্রি নামেও পরিচিত। বছরে দুটি গুপ্ত তথা তান্ত্রিক নবরাত্রি হয়, আষাঢ় এবং মাঘ মাসে। বলা বাহুল্য শরৎকালে এবং বসন্তকালের দুটি নবরাত্রি হল প্রকাশ্য , যখন শারদীয়া ও বাসন্তী দুর্গাপুজো হয়। মাঘ নবরাত্রির সময় মাতঙ্গী (তন্ত্রের সরস্বতী) পূজিত হন, এজন্য মাঘ নবরাত্রিকে মাতঙ্গী নবরাত্রিও বলা হয়।
আষাঢ় নবরাত্রিতে মা বারাহী পূজিত হন। ইনি অত্যন্ত প্রাচীন তান্ত্রিক দেবী।
১. হরপ্পা সভ্যতা পতনের পরে ভারতে প্রথম যে তাম্রাশ্ম সভ্যতার উন্মেষ হয় (copper horde culture) সেখানে দেখা যায় বরাহ উপাসনা। আরও আশ্চর্য যে এখানে বরাহের মধ্যে হরপ্পা সভ্যতার ইউনিকর্ন রয়েছে। অর্থাৎ হরপ্পা সভ্যতার প্রাচীন তান্ত্রিক ধর্মের একটি ধারাবাহিক ঐতিহ্য এই বরাহ টোটেমের মধ্যে প্রবহমান।
২. চন্দ্রকেতুগড়ের গঙ্গাল সভ্যতায় পূজিত ছিলেন একজন দেবী যাঁর হাতে মাছ। পালযুগে যে বারাহী পূজিত হতেন, তাঁর হাতেও মাছ। মৎস্য প্রতীকে প্রাচীনকাল থেকে তন্ত্র ধর্মের গভীর দর্শন ও তত্ত্ব পরিস্ফুট।
৩. পালযুগের বজ্রযান ধর্মে দেবী বজ্রবারাহী পূজিত হতেন। ইনি খুব গুরুত্বপূর্ণ তন্ত্রের দেবী। ইনি মুণ্ডমালিনী ছিলেন। পালযুগের তন্ত্রে অন্যতম প্রাচীন মুণ্ডমালিনী দেবী ছিলেন বজ্রবারাহী (যদি না সবথেকে প্রাচীন হন), এবং এঁর মূর্তিমণ্ডলের প্রভাবে বাংলার তন্ত্রে এই মুণ্ডমালিনী মূর্তি নির্মাণ শুরুর প্রথা। অর্থাৎ আজকে মা কালীর এই যে মূর্তিরূপ, এ তো সেনযুগের বৃহদ্ধর্ম পুরাণে প্রথমবার লিপিবদ্ধ, কিন্তু এমনকি মধ্যযুগে আগমবাগীশের কালীমূর্তিরূপের পেছনেও পালযুগের সেই তন্ত্রের মূর্তিরূপ আছে যে ভাবাদর্শের সূচনা হয়েছিল মুণ্ডমালিনী বজ্রবারাহী থেকে। এছাড়া মধ্যরাত্রিকালে বামমার্গে বজ্রবারাহীর উপাসনার প্রথা, যা আজও তন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কার। পরশুরাম কল্পসূত্রে বারাহী উপাসনার সময় হিসেবে মধ্যরাতের কথা বলা হয়েছে। বারাহী যুদ্ধের দেবী হিসেবেও পূজিত হতেন এবং যুদ্ধযাত্রা করার আগে তাঁর আশীর্বাদ নিতেন সেযুগের রাজা, সেনাপতি ও সৈন্যগণ।
৪. পৌরাণিক হিন্দুধর্মে বারাহী আছেন সপ্তমাতৃকা বা অষ্টমাতৃকার মধ্যে। বামন পুরাণে দেবী চণ্ডীর পৃষ্ঠ থেকে বারাহী উত্থিত হয়েছিলেন। এছাড়া দেবী ভাগবত সহ আরও বিভিন্ন পুরাণে বারাহীর গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও পৌরাণিক হিন্দুধর্মে মাতৃকাদের গুরুত্ব প্রায়ই খর্ব হয়েছে, তাঁরা বিভিন্ন পুরুষ দেবতার শক্তি রূপে কল্পিত হয়েছেন, এবং সাধারণত বরাহ (বরাহ উপাসনা প্রাচীন। পরে বৈষ্ণব ধর্ম এটি আত্মসাৎ করে এবং বিষ্ণুর অবতার হিসেবে বরাহ গণ্য হয়। প্রসঙ্গত বারাহী নবরাত্রির মধ্যেই কিন্তু জগন্নাথের রথযাত্রা হয়) শক্তি হিসেবে বারাহী কল্পিত। কিন্তু দেবী ভাগবত পুরাণে দেখি বারাহী আখ্যা পেয়েছেন বরাহের মাতা রূপে।
৫. বারাহী আমাদের বর্ণমালার প-বর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। প্রসঙ্গত বাংলা বর্ণমালা তন্ত্রাশ্রয়ী। ভারতে বর্ণমালার সূচনা তন্ত্রধর্মের সাহায্যে হয়েছিল যার জন্য এখনও বর্ণ গুলি তন্ত্রের বীজ মন্ত্রের রূপ ধারণ করে। কালী স্বয়ং পঞ্চাশৎ বর্ণময়ী। প্রথম অক্ষর ক হলেন স্বয়ং কালী।
৬. বারাহীর সঙ্গে প্রাচীন বাক দেবীর সম্পর্ক আছে বলে মনে করেছেন গবেষক হরিপ্রিয়া রঙ্গরাজন, তাঁর ইমেজেস অভ বারাহী গ্রন্থে। বারাহীর সঙ্গে সরস্বতীর সম্পর্ক সত্যিই থাকতে পারে কারণ সরস্বতী পুজোয় জোড়া ইলিশের উপাসনা করা এখনও একটি লোকরীতি। মনে রাখা দরকার, আমরা প্রথমেই বলেছি, বারাহী হলেন মৎস্যধারিণী।
৭. সর্বোপরি বারাহী হলেন উর্বরতা ও কৃষির প্রতীক। আষাঢ় নবরাত্রির সময় তাঁর উপাসনা আমাদের ক্ষেত্রকে উর্বর করুক, আমাদের সম্পদশালী করুক, আমাদের কৃষকদের পরিশ্রম সফল করুক, এই সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা বঙ্গভূমি পূর্ণ হোক ধনধান্যে।
দেবীকে নৃত্যগীতবাদ্যে তুষ্ট করতে হয়, এটিই প্রাচীন প্রথা। তাই শাক্তগীতির বৈচিত্র্য প্রয়োজন, দ্রুতলয়ের গান, বিশেষ করে নাচার উপযোগী বাংলা কালীগান দরকার। নয়ত কালীপুজোয় হিন্দি গানই চলবে, আটকানো অসম্ভব। এখন আমার কানের পাশে টুট জাই রাজাজি চলছে ডিজে বক্সে। আষাঢ় অমাবস্যায় বার্ষিক কালীপুজো হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায়।
★ তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta
মায়ের ছবি ইন্টারনেট থেকে।
তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, পাঁচ জুলাই দুহাজার চব্বিশ