আনন্দময়ী কালী; কালীপূজা আনন্দের সাধনা

মা কালীর পূজা আর কৃচ্ছ্রসাধনকে অনেকেই এক করে ফেলেন। কালীপূজা মানেই সমস্ত দিন উপবাস, কঠোর বিধিনিয়ম, সংযমের আতিশয্য, শরীর পাতনের সংকল্প। এমনটাই ধারণা আমাদের সমাজের সিংহভাগ মানুষের। কিন্তু …. মায়ের পূজার তন্ত্রোক্ত বিধি কি আদৌ তাইই বলে?

বাঙালির তন্ত্রের কেন্দ্রে আছেন মা কালী। কলৌ কালী কলৌ কালী কলৌ কালী ন সংশয়:। আর কালীকেন্দ্রিক এই তন্ত্রধর্মের নামকরণের অগণিত ব্যাখ্যার একটি হল : ” তনুকে ত্রাণ করা।” যদিও এটি অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন ব্যাখ্যা। তন্ত্রের আদি অর্থ তন্তু বা weaving এর সাথে সংযুক্ত। প্রকৃতির সমস্ত শৃঙ্খলা, মানবদেহ ও চেতনার সমস্ত নিয়মের নির্যাসই এই তন্ত্রধর্মের প্রাণ। তাই যে ব্যাখ্যাই ধরি না কেন; তন্ত্রে সব অর্থেই দেহকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তন্ত্র মতে:
“ব্রহ্মাণ্ডে যে গুণা সন্তি তে তিষ্ঠন্তি কলেবরে”
বাঙালি সাধকের ভাষায়:
যাহা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তাহাই আছে দেহভাণ্ডে
এই দেহ মায়ের অধিষ্ঠান। কালীকিঙ্কর কবিরঞ্জন রামপ্রসাদের পদে আমরা তার সোচ্চার ঘোষণা শুনি:
“আনন্দে রামপ্রসাদ রটে মা বিরাজে সর্বঘটে
ঘটে ঘটে যত রূপ মা আমার সে রূপ ধরে”

উপমহাদেশে যত সুপ্রাচীন শক্তিপীঠ আছে; তন্ত্র তাদের প্রতিটির দ্যোতনা খুঁজে পেয়েছে মানবদেহে। এই তত্ত্বটি কৌলাচারে তোড়লতন্ত্রে এভাবে প্রকাশিত হয়েছে:

মূলাধারে কামরূপ, হৃদয়ে জলন্ধরপীঠ, তার ঊর্ধ্বে পূর্ণগিরি ও উড্ডিয়ান। ভ্রূমধ্যে বারাণসী। নেত্রে জ্বালামুখী। মুখে মায়াবতী।

এ হেন তন্ত্রমার্গে মা কালীর উপাসনা কখনোই শরীরকে ক্লেশ দিয়ে সম্ভব নয়।

রামপ্রসাদের পদে আমরা দেখি:

চব্য চোষ্য লেহ্য পেয় যত রস এ সংসারে
আহার করো মনে করো আহুতি দেই শ্যামা মা’রে

এটাই হল তন্ত্রের মানসপূজার তত্ত্ব। তোমার দেহে মায়ের অধিষ্ঠান। যা কিছু তোমার প্রিয়; তোমার শরীরের পুষ্টির জন্য আবশ্যক; তার আস্বাদনের মাধ্যমেই জগতজননীকে তৃপ্ত করো। অনাবশ্যক উপবাস, অতি অল্পাহারের ক্লেশ এই পথে একান্তই নিরর্থক। বরং এই জগতে আনন্দের যে অপূর্ব ধারা বয়ে যাচ্ছে; তার বারংবার আস্বাদন এবং তার গভীরে যে অপূর্ব প্রজ্ঞা নিহিত আছে; বারংবার তার উপলব্ধির পথেই তন্ত্রে কৈবল্যের বিধান আছে। কৌলমার্গের সেই সুবিখ্যাত শ্লোক এই প্রসঙ্গে স্মরণ করি:
পিত্বা পিত্বা পুনঃ পিত্বা পপাত ধরণীতলে
উত্থিত্বা চ পুনঃ পিত্বা পুনর্জন্মং ন বিদ্যতে

কৌলমার্গে তো এমন নির্দেশও আছে যে উপবাসক্লিষ্ট অশক্ত দেহে যে কালীপূজা করে সে কখনোই অভিষ্ট লাভ করে না।

সহজযানের সিদ্ধাচার্যরাও একই কথা বলেছেন। সরহবজ্র জটিল ধর্মাচরণের অনর্থক পরিশ্রমকে তিরস্কার করে বলেছেন:

এস জপ হোমে মণ্ডল কম্মে
অনুদিন আচ্ছসি বাহিউ ধম্মে
তো বিন তরুণী নিরন্তর নেহে
বোহি কি লবভই প্রণ বি দেহে

এই হোম, মণ্ডল রচনার কঠিন বিধি তোমাকে ধর্মের বহিরঙ্গেই আটকে রাখে। এই দেহে বোধিলাভ তখনই সম্ভব; যখন সেই তরুণী স্নেহধারা বর্ষণ করেন। এই তরুণীই অদ্বৈতা আদিমাতৃকা; বাঙালির মা কালী।

আমাদের তন্ত্রধর্ম; আমাদের মা কালীর সাধনা আমাদের নিঃশ্বাসের মতোই জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। জগতবিচ্ছিন্ন হয়ে; প্রকৃতির স্বাভাবিক গতির বিরুদ্ধাচরণ করে মর্কট বৈরাগ্যকে তন্ত্র সযত্নে পরিহার করেছে। এই পথ এতটাই জীবনসম্পৃক্ত যে অনায়াসেই বস্তুবাদী ধারণা আর গূঢ় তত্ত্বকে আমরা একাকার করতে পারি। ঐহিক চেতনায় যা সুখদায়ক বলে পরিচিত; সেই মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুনকেই আমরা পঞ্চ ম কারের তত্ত্বে মাতৃসাধনার সোপানে পরিণত করি। আমাদের চর্যাপদের কবি পদ্মার খালে বজ্রনৌকা চালনা করে আত্মোপলব্ধির সর্বোচ্চ পর্যায়কে বঙ্গালী নাম দেন।

পুণ্যের জন্য সুদূর তীর্থে পাড়ি দেওয়াকেও তন্ত্রে অপ্রয়োজনীয় বলা হয়েছে।
তীর্থভ্রমণ দুঃখসাধন মন উচাটন হয়ো না রে
তুমি আনন্দত্রিবেণীর মূলে শীতল হও না মূলাধারে

সাধক কবি রামপ্রসাদ গেয়েছিলেন।

আবার সাধক কমলাকান্তের মৃত্যুকালে যখন বর্ধমানের রাজা তেজশ্চন্দ্র তাঁকে গঙ্গাতীরে নিয়ে যেতে চান; তখন সাধক কমলাকান্ত বলেছিলেন:

আমি কেন কি কারণে গঙ্গাতীরে যাব?
কেলে মায়ের ছেলে হয়ে বিমাতার কি শরণ লব?

অর্থাত সহজ পথে স্থির থাকো। কালীতত্ত্বে অটল থাকো। আর কিছুই দরকার নেই। এই পথে চলেই রাণী রাসমণি কাশীযাত্রা না করে বাংলার বুকে তন্ত্রপীঠ দক্ষিণেশ্বরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে শারীরিক ক্লেশ, জটিল আচার, ক্লান্তিকর যাত্রা কোনো কিছুই তন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গ নয়। মায়ের এই সাধনমার্গ বড়ো সরল; বড়ো ঋজু। অহেতুক জটিলতার দুর্গম পথে তাঁকে পাওয়া যায় না। কালী ধরা দেন প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিতে; একান্ত সহজ পথেই।

উজুরে উজু ছাড়ি মা জাহু রে বঙ্ক
নিঅড়ি বোহি মা জাহু রে লঙ্ক

© কালীক্ষেত্র আন্দোলন

তন্ত্রসারে মা তারার চারটি নাম – তমাল দাশগুপ্ত

তন্ত্রসারে মা তারার চারটি নাম।

মা তারার অষ্টোত্তর শতনাম প্ৰচলিত ছিল পালযুগে, যখন তিনি বাঙালির প্রধান উপাস্য মাতৃকা ছিলেন, কিন্তু অনেকগুলি নামই কালগ্রাসে বিলুপ্ত। মধ্যযুগে আগমবাগীশ কর্তৃক সংকলিত তন্ত্রসারে বর্ণিত মা তারার চারটি গুরুত্বপূর্ণ নাম জানব আজ।

১. তারা তারিণী। সন্তানকে ও সাধককে পরিত্রাণ করে মোক্ষ প্রদান করেন, সেজন্য এমন নাম।
২. নীল সরস্বতী। সাধককে বাকশক্তি প্রদান করেন, সেজন্য নীল সরস্বতী বা মহানীলসরস্বতী বলা হয়।
৩. উগ্রতারা। উগ্র আপৎ থেকে রক্ষা করেন।
৪. একজটা। মাতৃকা মাথায় জটা ধারণ করেন।

তারামন্ত্রে এঁদের প্রত্যেকের পুজো হয়।

ঐঁ হ্রীঁ স্ত্রীঁ হূঁ ফট্ মন্ত্রে তারিণীর উপাসনা হয়। এতে বাকসিদ্ধি পাওয়া যায়।

হ্রীঁ স্ত্রীঁ হূঁ ফট্ মন্ত্রে একজটার আরাধনা হয়। এই মন্ত্র মুক্তিপ্রদ। এই মন্ত্রে প্রথমে প্রণব নেই।

হ্রীঁ স্ত্রীঁ হূঁ মন্ত্রে উগ্রতারা এবং মহানীলসরস্বতী পূজিত হন। এই মন্ত্রে প্রথমে প্রণব এবং শেষে অস্ত্র (ফট্) নেই।

ওঁ হ্রীঁ স্ত্রীঁ হূঁ ফট্ – এটি নীলসরস্বতীমন্ত্র।

জয় মা তারা। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, নয় জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

তন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের সূচনা করুন একশো টাকা পাঠিয়ে – তমাল দাশগুপ্ত

7699750212 নম্বরে একশো টাকা পাঠিয়ে তন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের সূচনা করুন।

নমস্কার। আমি তমাল দাশগুপ্ত, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কলেজে অধ্যাপনা করি, এবং বাঙালির তন্ত্রাশ্রয়ী মাতৃকা উপাসক শেকড় সম্পর্কে গবেষণা করি। আমি এই পেজে আগে কখনও এমন কোনও পোস্ট দিই নি। কিন্তু পরীক্ষামূলকভাবে আজ দিয়ে দেখছি, কতজন সত্যিই আগ্রহী, বাঙালির শেকড়ে ফেরার জন্য, মাতৃধর্ম এবং তন্ত্রবিদ্যার স্পষ্ট, স্বচ্ছ, ঋজু চর্চার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার জন্য।

তন্ত্র নিয়ে এবং জগন্মাতার মাতৃধর্ম নিয়ে বিশ্ব জোড়া আগ্রহ আছে। বিদেশে অনেকগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ে তন্ত্র চর্চা বিভাগ আছে। পিয়ার রিভিউড সারস্বত জার্নাল প্রকাশিত হয়। তন্ত্রবিদ্যার সার্টিফিকেট কোর্স দেওয়া হয়। আমরা ভারতে সেরকম প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি এতদিন কারণ বিশ্বমানবিক গড্ডালিকা প্রবাহ। কিন্তু বাঙালির শেকড় সম্পর্কে সারস্বত জার্নাল প্রকাশের অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, সেমিনার করার অভিজ্ঞতা আমাদের আছে।

আজ যদি আমরা একটি সারস্বত প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির উদ্যোগ নিই, সর্বাগ্রে জেনে আসতে হবে পশ্চিমে ওঁরা কিভাবে তন্ত্র সংক্রান্ত কোর্সগুলো ডিজাইন করছেন এবং পড়াচ্ছেন। ওঁদের লেখা বইগুলো আমাদের অনেকের কাছেই আছে কিন্তু অনলাইন এবং অফলাইন তন্ত্রচর্চা কোর্স কিভাবে ডিজাইন করছেন ওঁরা পশ্চিমে সেটা জানা দরকার, তাতে করে আমরাও আন্তর্জাতিক মানের কোর্স তৈরি করতে পারব। যেভাবে একসময় মিথিলা থেকে নবদ্বীপে ন্যায়চর্চার জ্ঞানভাণ্ডার বয়ে এনেছিলেন বাঙালি স্কলার, দেখা যাক পশ্চিমের যতটুকু মেথড, যতটা শেখার, ততটা আমরা বাংলায় নিয়ে আসতে পারি কি না। এবং আমরা জগন্মাতার ঋজুপথ তৈরি করব, মাতৃকাদূষণ চিরতরে বন্ধ করব। আদ্যা নিত্যা অব্যক্ত প্রকৃতির ধর্মের ঋজুপথ চাই, কুটিল গুহ্য দুর্বোধ্য কদাচার পরিহার করে স্বচ্ছ স্পষ্ট ঋজুপথের নির্মাণ করতে হবে।

পশ্চিমের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তন্ত্র বিষয়ে কোর্স করানো হয়। অনলাইন কোর্সে জয়েন করতে খুব বেশি খরচ হয় না। তার ফিজ আমি নিজের পকেট থেকেই দিতে পারি। কিন্তু শুধু পশ্চিমীদের কোর্স করা নয়, আমাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের কোর্স চালু করা আমাদের লক্ষ্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একা স্থাপনা করার মত বড়লোক আমি নই। ভারতের নিয়মে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনা করতে গেলে অন্তত দশ একর জমি লাগে, এক লাখের ডিমান্ড ড্রাফট জমা দিতে হয়, কোর্স চালানোর ইনফ্রাস্ট্রাকচার অর্থাৎ বিল্ডিং এবং লাইব্রেরি তৎসহ পুঁজি থাকতে হয়।

না, সরকারের কাছে আবেদন করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক্ষা করে লাভ হবে না বলেই প্রতীতি জন্মেছে এতদিন ধরে পারিপার্শ্বিক দেখে। বাংলা ভাষার ধ্রুপদী মর্যাদা আন্দোলনের সময়েই দেখেছি। আর শুধু সরকার কেন, সাধারণ মানুষের মধ্যেই বোধ নেই। প্রতিষ্ঠান ছাড়া, শক্তিকেন্দ্র ছাড়া, আন্দোলন ছাড়া সে বোধ আসবে না।

সেজন্য দেখা দরকার, কতজন আগ্রহী বাঙালি আছেন, যাঁরা এই উদ্যোগে সামিল হবেন। যদি সাড়া পাওয়া যায়, এবং এই একশো টাকা অকুণ্ঠ চিত্তে আমার পেজের পাঠকরা পাঠাতে পারেন তাহলে আমরা বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় তন্ত্র গবেষণার সারস্বত প্রতিষ্ঠান, আগামীর তন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলব বাংলার বুকেই। এবং একটি অনলাইন কোর্সের সূচনা এই বছর বাংলা নববর্ষের দিনই করব। কিন্তু একশো টাকা দিতে অন্তত পাঁচশ জন আগ্রহী বাঙালি আছেন কি না দেখি। আমার পোস্টে তো লাইক অনেকেই দেন।

১০০ টাকা পাঠান ঋতুপর্ণার নম্বরে। 7699750212 নম্বরে ফোনপে গুগলপে পেটিএম করতে পারেন। যাঁরা পাঠাচ্ছেন, সবাই স্ক্রিনশট পাঠাবেন ওই নম্বরেই হোয়্যাটস্যাপে। এছাড়া যিনি ব্যাংক ট্রান্সফার করতে চান, তাঁর জন্য ডিটেলস রইল।

Rituparna Koley

Account Number 33054363900

IFSC
SBIN0001865

আজ যিনিই একশ টাকা দেবেন তাঁর সেই একশ টাকা ভবিষ্যতের তন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার জন্য একটি ভিত্তিপ্রস্তর রূপে গণ্য হবে। আজ রাজা ধর্মপাল নেই, ধর্মপালের যুগ আর নেই, তাই আজকের বিক্রমশীল আমাদের সবাইকে হতে হবে।

ইতিহাস অনেক পড়েছেন আজ পর্যন্ত এই পেজে। আসুন সবাই, এবার মায়ের জয়ধ্বনি দিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার সময় এসেছে।

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, আট জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

সংযোজন

যিনি ব্যাংক ট্রান্সফার করতে চান তাঁর জন্য ডিটেলস রইল

Rituparna Koley
Account Number 33054363900

IFSC
SBIN0001865

ইউপিআই আইডি এবং কিউ আর কোড

আজ এখনও পর্যন্ত বাইশ জন টাকা পাঠিয়েছেন। এঁরা প্রত্যেকে বিক্রমশীল উপাধি পাবেন, কারণ অনাগত মহাবিহারের সূচনা আজ এঁদের হাত দিয়ে হল।

খসড়া সিলেবাস রইল। সবাই মতামত দিন। পয়লা বৈশাখে অনলাইন কোর্সের সূচনা হবে। তন্ত্র ইউনিভার্সিটি তৈরির মত পয়সা নেই আমাদের এখনও কিন্তু তন্ত্রবিদ্যা গবেষণার জন্য নিয়মিত অনলাইন এবং অফলাইন কোর্স আপাতত তৈরি করা সম্ভব।

তন্ত্র ইউনিভার্সিটি চাই নইলে বাঙালি মানুষ হবে না – তমাল দাশগুপ্ত

তন্ত্রভূমি বাংলায় তন্ত্রচর্চার কোনও বিশ্ববিদ্যালয় নেই। মাতৃকা উপাসক বাঙালির মাতৃধর্মের দর্শন, তত্ত্ব, ইতিহাস গবেষণার কোনও সারস্বত প্রতিষ্ঠান নেই। তন্ত্র ডিসকোর্স চাই, তন্ত্র ইউনিভার্সিটি চাই, নইলে বাঙালি মানুষ হবে না!

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, সাত জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

ডাকিনী যোগিনী – তমাল দাশগুপ্ত

ডাকিনী যোগিনী।

কালীপুজোয় প্রায়ই দেখি মা কালীর দুই পাশে আছেন ডাকিনী যোগিনী। মা কালীর কোনও ধ্যানমন্ত্রে এঁদের উল্লেখ নেই, তাহলে এঁরা কিভাবে এলেন? আসলে এঁরা বজ্রযোগিনী মণ্ডল থেকে এসেছেন। পালযুগে পূজিত বজ্রযোগিনীর দুইদিকে বজ্রবর্ণনী এবং বজ্রবৈরোচনী, আজকের ছিন্নমস্তার দুইদিকে বর্ণিনী এবং ডাকিনী থাকেন।

কালী মহাসমুদ্রে এসে পৃথিবীর সমস্ত মাতৃধর্মের দর্শন তত্ত্ব ও ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নির্যাস মিশেছে। ডাকিনী যোগিনী মায়ের দুইদিকে থেকে তন্ত্রের এক সুপ্রাচীন ডায়াগ্রাম নির্মিত করেন: ইড়া ও পিঙ্গলার মধ্যবর্তী সুষুম্না।

ডাকিনী অর্থে জ্ঞানী ও বিদুষী নারী। পালযুগে এটি সম্মানের উপাধি ছিল। ডাকিনী সম্পর্কে আগে লিখেছি। যোগিনী অর্থে মায়ের পুজোয় যিনি পৌরোহিত্য করেন, সর্বদা মায়ের সঙ্গে থাকেন (যিনি মায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, মায়ের পুজোর যোগান দেন তিনিই যোগিনী। প্রসঙ্গত যোগী শব্দের অর্থও তাই। যোগ এবং যোগী – এ দুটিই সেই আদিকালের হরপ্পা সভ্যতা থেকে পালযুগের মাতৃকা উপাসক সভ্যতা পর্যন্ত আবহমান তন্ত্রধর্মের কনসেপ্ট)।

সানুচর জগদকারণ জগন্মাতার মণ্ডলে ডাকিনী যোগিনীর জয় হোক।

জয় মা কালী। ডাকিনী যোগিনীর জয় হোক। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, ছয় জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

পেজের পাঠকদের জন্য আজ লেখক পরিচয় – তমাল দাশগুপ্ত

নমস্কার, তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta পেজের সমস্ত পাঠকদের শুভেচ্ছা জানাই। নতুন পাঠকদের জন্য আজ লেখক পরিচয়। আমার নাম তমাল দাশগুপ্ত। আমি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কলেজে অধ্যাপনা করি আজ চোদ্দ বছর হল। আমার শিক্ষাগত পরিচয় হল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ। আমি বাঙালির শেকড়ে থাকা তন্ত্রধর্ম নিয়ে এবং মাতৃকা উপাসনা নিয়ে চর্চা করি।

কেউ জিজ্ঞেস করার আগেই বলে দিই, এই ছবিতে আমার হাতের বইটা হল টিবেটান বুক অভ লিভিং অ্যান্ড ডাইং। জীবন ও মরণের তিব্বতী গ্রন্থ। দিল্লির একটা বইয়ের দোকানে কদিন আগে ছবিটা তুলেছেন আমার স্ত্রী ঋতু।

তন্ত্র চর্চা এবং মাতৃ সাধনা করতে গেলে হিন্দু ও বৌদ্ধে ভেদ করবেন না, শাক্ত বৈষ্ণবের ভেদ করবেন না, বাঙালি অবাঙালি ভেদ করবেন না, ঘটি বাঙাল ভেদ করবেন না, উত্তরবঙ্গ দক্ষিণবঙ্গ ভেদ করবেন না, শহর ও গ্রাম ভেদ করবেন না, পুরুষ নারী ভেদ করবেন না, ব্রাহ্মণ শূদ্র ভেদ করবেন না, ভারতীয় অভারতীয় ভেদ করবেন না। মায়ের ধর্ম তো বিশ্বব্যাপী, কিন্তু তার ভরকেন্দ্র হল এই বাঙালি জাতি। আমাদের এই বাংলা ভূমি হল কালীক্ষেত্র।

মায়ের সন্তান বলে যারাই নিজের পরিচয় দিই, তাদের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই। সবাই সমান। আমাদের মা কে যে সর্বোচ্চ উপাস্য মানে, সেই আপন।

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, ছয় জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

মা কালী কি অনার্য? না, এত সহজ নয় – তমাল দাশগুপ্ত

মা কালী কি অনার্য, অবৈদিক? না, এত সহজ নয়। বেদে পূজিত হন নক্ৎ কৃষ্ণী (অর্থাৎ রাত্রি, কালো মেয়ে), এবং বেদে রাত্রিসূক্ত কালীর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। সৃষ্টির আদিতে কালো রাত, এবং উন্মেষে ঊষা: কালীই আদিমাতা অদিতি (সুকুমার সেনের লেখায় এর সমর্থন আছে), এবং কালরাত্রি থেকে জগৎ উৎপন্ন হওয়ার মেটাফর হিসেবে নিশা থেকে ঊষার উৎপত্তি: কালীই দুর্গা হিসেবে প্রকাশিত হন। প্রসঙ্গত ঊষা দশভুজারূপে বেদে সম্বোধিত। এদিকে কালী বলি গ্রহণ করতেন: মুণ্ডক উপনিষদে যজ্ঞের অগ্নির সপ্ত জিহ্বা সংক্রান্ত শ্লোক অবশ্যই দেবী হিসেবে, মাতৃকা হিসেবে কালীর আবাহন করে।

তবে কি কালী বৈদিক? না, এতটাও সহজ নয়। হরপ্পা সভ্যতায় কালী পূজিত ছিলেন, প্রমাণ করা যায়। কালীর মুখ্য স্থান আমাদের অবৈদিক ব্রাত্য তন্ত্রাশ্রয়ী ব্রতধর্ম। বেদ আমাদের জগন্মাতার ধর্মের পরিপূর্ণ প্রকাশ ও স্ফুরণ ধারণ করতে পারেনি।

তবে কালী কে? আর্য না অনার্য? তিনি কার, সেনযুগের হিন্দুর না পালযুগের বৌদ্ধর? আসলে তিনি সকলের। তিনি পূর্বের এবং পশ্চিমের। তিনি নারী ও পুরুষ। তিনি তন্ত্রের কেন্দ্রে, কিন্তু আসলে তাঁর দর্শন নিয়েই বেদ উপনিষদ। তিনি সাংখ্য, তিনি বৌদ্ধ জৈন সহ সমস্ত নাস্তিক অবৈদিক ধর্ম। তিনি অব্যক্ত, আবার তিনিই মুণ্ডমালিনী রূপ ধারণ করেন। তিনি বলাকা, তিনি শিবারূপও ধারণ করেন। তিনি জড়জগৎ, তিনিই জীবজগৎ। তিনি বৈষ্ণবের রটন্তি কৃষ্ণকালী এবং তিনি শাক্তদের পরম আরাধ্যা। কালী ব্রাহ্মণ্য ধর্মেও পূজিত, আবার তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মেও পূজিত।

কালীর নামে পাণ্ডু রাজার ঢিবির সুপ্রাচীন সভ্যতা বাংলার বুকে পাঁচ হাজার বছর আগে উত্থিত হয়েছিল, মা সেখানে বলাকা মাতৃকা রূপে পূজিত হতেন। কালী ছিলেন চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গাল সভ্যতায়, সেখানেও বলাকা রূপে পূজিত হতেন। তিনি পালযুগে চামুণ্ডা চর্চিকা রূপে পূজিত, এবং সেনযুগে বৃহদ্ধর্ম পুরাণে তাঁর বর্তমান মূর্তিরূপ পাই, প্রথম মহাবিদ্যা রূপে কালী সেনযুগে পূজিত। ষোড়শ শতকে বারো ভূঁইয়ার বিদ্রোহ কালীকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল আবার উনিশ শতকের নবজাগরণে এবং বিংশ শতকের অগ্নিযুগে কালী আমাদের কেন্দ্রে ছিলেন।

কালীকুল বর্ণবাদ স্বীকার করে না। মা কালীর ধর্মে লিঙ্গভেদ নেই, পুরুষ প্রাধান্য নেই। কালীর উপাসনা সবার জন্য অবারিত। অনেকে সেজন্য কায়েমী স্বার্থ নিয়ে ভয় দেখায়, যাতে সবাই মায়ের পুজো না করতে পারে। বোধকরি সেও আমাদের মায়ের লীলা। মিথ্যা ভয় জয় করুন, মায়ের দর্শন পাবেন। কিন্তু জ্ঞান তো সামান্য সাঁকো, তা দিয়ে নয়, কারণ এই সমুদ্রের কোনও অন্ত নেই। ভক্তি নৌকো ছাড়া এই কালী সমুদ্র পার হওয়া যায় না।

কালী আসলে আর্য অনার্য, হিন্দু বৌদ্ধ, পুরুষ নারী, এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। কালী হলেন সারা পৃথিবীর মাতৃধর্মের অনেক সহস্র বছরের নির্যাস।

এবং কালী হলেন বাঙালি জাতির সবথেকে বড় গর্ব, সবথেকে বড় আশ্রয়, সবথেকে বড় ব্যাপ্তি। কালী আমাদের জাতির কেন্দ্রে আছেন। আমাদের ভূখণ্ড মা কালীর নামে শাসিত হয় এবং আমাদের জাতি মা কালীর নামে সংজ্ঞায়িত হয়।

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, পাঁচ জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

নতুন বছরের ইংরেজি বাংলা ক্যালেন্ডার – তমাল দাশগুপ্ত

নতুন বছরের ইংরেজি-বাংলা ক্যালেন্ডার। গুগল ড্রাইভ লিংক আছে, ঝকঝকে রেজলিউশনের পিডিএফ ডাউনলোড করে নিতে পারেন।

কালীক্ষেত্র আন্দোলন পেজ থেকে।

ইংরেজি নতুন বছর ২০২৩এর শুভেচ্ছা। এসে গেল নতুন বছরের ইংরেজি বাংলা ক্যালেন্ডার, কালীক্ষেত্র আন্দোলনের সমর্থকদের জন্য। উৎকৃষ্ট রেজলিউশনের জন্য পিডিএফ ডাউনলোড করুন এই লিঙ্কে https://drive.google.com/file/d/1G3WIJS9_QwejDf4mSQewpShFLMRBEe3u/view?usp=drivesdk

মহাকালভৈরব – তমাল দাশগুপ্ত

মহাকালভৈরব।

পালযুগের তন্ত্রাশ্রয়ী সভ্যতায় মহাকাল পূজিত হতেন মহাকালীর পুরুষ রূপ হিসেবে। এজন্যই অনেক পরে শাক্ত কবি গেয়েছেন, কালী কেবল মেয়ে নয়, মেঘের বরণ করিয়ে ধারণ কখনও কখনও পুরুষ হয়।

পূজিত মহাকাল মূর্তির অন্যতম একটি নাম ছিল ধর্মপাল, এবং পালসম্রাট ধর্মপালের দৈহিক আদলে এই মহাকাল মূর্তি নির্মিত হত। মহাকালকে জ্ঞাননাথ বলেও ডাকা হত, পালযুগের বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞাননাথ এবং মা তারা পূজিত হতেন।

আজও বিদেশের অনেক মিউজিয়ামে পালযুগের বাংলায় নির্মিত মহাকাল মূর্তি দেখা যায়। নবম-দশম শতকের মহাকালসংহিতা নামক গ্রন্থে আমরা তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে অবগত হই এবং সেই গ্রন্থে কালী/মহাকালীর সর্বোচ্চ উপাস্য রূপের কথাও বলা হয়েছে।

বস্তুত কালীর পুজোর আগে অষ্টভৈরবের পুজো এবং তৎসহ মহাকালভৈরবের পুজোর প্রথা আছে। সম্পূর্ণ পূজাবিধি আছে আগমবাগীশের তন্ত্রসারে যেখানে মহাকালভৈরব সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। ইনি দেবীর দক্ষিণভাগে বিদ্যমান। ইনি ধূম্রবর্ণ। দণ্ড এবং চিতাকাঠ ধারণ করেন। ইনি করালদ্রংষ্টা। কটিদেশে অর্থাৎ কোমরে ব্যাঘ্রচর্ম। এঁর উদর অতি স্থূল। এঁর গায়ে রক্তবস্ত্র। এঁর ত্রিনয়ন। কেশজটা ঊর্ধ্বে এবং চতুর্দিকে বিকীর্ণ। ইনি মুণ্ডমালা ধারণ করেন। কপালে অর্ধচন্দ্র। এঁর উগ্রমূর্তি এবং দেহ অগ্নিভ।

মহাকালং যজেদ্দেব্যা দক্ষিণে ধূম্রবর্ণকং।
বিভ্রতং দণ্ডখট্টাঙ্গৌ দ্রংষ্টাভীমমুখং শিশুং।
ব্যাঘ্রচর্ম্মাবৃতকটিং তুন্দিলং রক্তবাসসং।
ত্রিনেত্রমূর্দ্ধকেশঞ্চ মুণ্ডমালাবিভূষিতং।
জটাভারলসচ্চন্দ্রখণ্ডমুগ্রং জ্বলন্নিভং।

কুমারীকল্পে আমরা মহাকালের এই মন্ত্রটি পাই:

হুঁ ক্ষ্রোঁ যাং লাং বাং ক্রোং মহাকালভৈরব সর্ব্ববিঘ্নান্ নাশয় হ্রীঁ শ্রীঁ ফট্ স্বাহা।

প্রকৃতপক্ষেই মহাকাল ভক্তের সমস্ত বিঘ্ন নাশ করেন। তিনি জগন্মাতার শাক্ত ধর্মের অতন্দ্র ভৈরব-ক্ষেত্রপাল-প্রহরী। তাই আমরা মহাকালের জয়ধ্বনি করি।

জয় মহাকাল। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মহাকালের ছবিটি পিন্টারেস্ট থেকে।

মহাকাল সম্পর্কে আগেও লিখেছি। লিংক কমেন্টে রইল।

সংযোজন

মহাকাল সম্পর্কে আমার লেখালেখির লিঙ্কের সঙ্কলন https://matshonyay.home.blog/2022/07/25/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%97%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B2-%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%B0/

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, চার জানুয়ারি দুহাজার তেইশ