মা কালীর সপ্ত আদ্যা রূপ: শাস্ত্রীয় ও পুরাতাত্ত্বিক – তমাল দাশগুপ্ত

মা কালীর সপ্ত আদ্যা রূপ: শাস্ত্রীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক।

★ ঋগ্বেদে কৃষ্ণী। এছাড়া রাত্রি সূক্ত। কালীই আদি দেবী, জগদকারণ, সৃষ্টির উৎস অন্ধকার থেকে, পরে তিনিই ঊষা হয়ে আলো করেন। সুকুমার সেনও এই মত অবলম্বন করেন: সৃষ্টির আদিতে কৃষ্ণী, তিনিই পরে ঊষা।

হরপ্পা সভ্যতায় ভয়াভয় মাতৃকার মূর্তি পাওয়া গেছে। তিনিই জন্ম ও মৃত্যুর অধিষ্ঠাত্রী বলে কিছু গবেষক মনে করেছেন

★ বলাকাকালী। হরপ্পা (৪৫০০ বছর আগে), পাণ্ডু রাজার ঢিবি (৩০০০-৪০০০ বছর) চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গাল সভ্যতা (২০০০ বছর) বলাকা মাতৃকা পূজিত হতেন। ঐতরেয় আরণ্যক-এর বয়াংসি শ্লোক ইঙ্গিত করে বাঙালির পূর্বসূরী বলাকা উপাসক ছিলেন, অতুল সুর বলছেন।

কালীর ষোড়শ নিত্যার মধ্যে একজন বলাকা। বলাকা থেকেই অপভ্রংশ হয়ে মহাবিদ্যা বগলা। কালীকে বলাকিনী বলা হয় কালিদাসের কাব্যে।

★ চামুণ্ডা কালী। ইনি শ্রী শ্রী চণ্ডীতে অসুর বধ করেন
আজও দুর্গাপুজোর কেন্দ্রীয় অংশ সন্ধিপুজোয় বলি গ্রহণ করেন চামুণ্ডা কালী স্বয়ং। পালযুগে চর্চিকা পূজিত হতেন, ইনিও কালীর আরেক রূপ।

★ পার্বতী কালী। গুপ্তযুগে রচিত বেশিরভাগ পুরাণেই বলা হয় আদিদেবী হিমালয়দুহিতা আগে কালী ছিলেন, পরে তিনিই গৌরী। এটি হরপ্পা সভ্যতা এবং ঋগ্বেদে কৃষ্ণীর রূপভেদ হিসেবে ঊষার আগমনীর দ্যোতনা বহন করে, পৌরাণিক যুগ সেই আদ্যা তত্ত্ব নিজের মত পুনর্নির্মাণ করেছিল।

★ কৌশিকী কালী। শিব পুরাণে দেখা যায় দেবী কালীর কৃষ্ণবর্ণ ত্বক থেকে কৌশিকী কালী আসছেন। ইনি অষ্টভুজা এবং সিংহবাহিনী, এবং ইনি শুম্ভ নিশুম্ভ বধ করেন। এই কৌশিকী কালীর প্রভাব সিংহবাহিনী মহাকালী এবং মহিষাসুরমর্দিনী ভদ্রকালীর মধ্যে দেখা যায়। কৌশিকী কালী আদি মাতৃকা, বর্তমানে বিস্মৃত হলেও কৌশিকী অমাবস্যায় এঁরই উপাসনা হত।

★ কাল সংকর্ষণী কালী। ইনি কাশ্মীরি শৈবধর্মে সর্বোচ্চ উপাস্য মাতৃকা। ইনি কালের নিয়ন্ত্রণ করেন। নথিবদ্ধ আকারে দশম শতক থেকে তন্ত্রে মা কালীর সর্বেশ্বরী একেশ্বরী প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। মহাকাল সংহিতা কালীকে সর্বোচ্চ বলে ঘোষণা করে। কালীই চিরকাল জগদকারণ কিন্তু হরপ্পা থেকে পাণ্ডু রাজার ঢিবি থেকে চন্দ্রকেতুগড় অবধি প্রাচীন তন্ত্রভিত্তিক সভ্যতাগুলির পতন ঘটায় সেই সত্য আড়ালে চলে গিয়ে কালী কিছুটা প্রান্তিক হয়ে যান। মুণ্ডক উপনিষদ, মহাভারত বা চণ্ডীতে কালীকে দেখে প্রান্তিক দেবতা মনে হয়। কিন্তু তন্ত্রে চিরকাল কালীই জগদকারণ, শশাঙ্ক থেকে পালযুগে গৌড়ের উত্থানের ফলে গৌড়ে প্রকাশিতা বিদ্যা তন্ত্রশাস্ত্রে সেই অনাদি সত্যের পুনঃপ্রকাশ ঘটে। পালযুগে কালীর বর্তমান মুণ্ডমালিনী শবারূঢ়া রূপের চূড়ান্ত নির্মাণ ঘটতে থাকে।

★ দক্ষিণা কালী। মধ্যযুগের শুরুতেই বৃহদ্ধর্ম পুরাণে মা কালীর মূর্তিরূপ পাই, এখনকার মতোই, মুণ্ডমালিনী, শববাহিনী। বাংলা জুড়ে কালী ভাগবত ধর্মের বিপুল উত্থান ঘটে। বারো ভুঁইয়ার বেশিরভাগ শাক্ত এবং কালীই তাঁদের ইষ্ট। আগমবাগীশ তন্ত্রসারে দক্ষিণা কালীমূর্তির তত্ত্ব প্রকাশ করেন। যাঁর ভয়ে দক্ষিণদিকের অধিপতি যম পালিয়ে যান তিনিই দক্ষিণা কালী।

নদীয়ার কৃষ্ণচন্দ্র কালীভক্ত ছিলেন। এই সময় মায়ের মাতৃরূপ প্রকাশিত হয় শাক্ত ভক্তি আন্দোলনে, নেতৃত্ব দেন রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত। রাণী রাসমণির দক্ষিণেশ্বর মন্দির নির্মাণের ফলে মা দক্ষিণাকালীকে আশ্রয় করে শাক্ত ধর্মের নতুন অভ্যুদয়ের এক বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়। অবশ্যই বামাকালীও এই সময় বাংলা জুড়ে সমান উদ্যোগে ও আগ্রহে পূজিত হয়েছেন।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

তিনি আদিতে ছিলেন, এজন্য আদ্যা। তিনি চিরকাল আছেন এজন্য নিত্যা। তিনি উৎস, এজন্য জগদকারণ। অন্তিমে তিনিই জগদবিলয়। তিনি অব্যক্ত, তাঁকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ধ্যানের সুবিধার জন্য তাঁকে মা কালী বলে ডাকি, এবং তাঁর মুণ্ডমালিনী বলিপ্রিয়া শবারূঢ়া খড়্গিনী এলোকেশী রূপের পুজো করি।

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

মায়ের ছবিটি ইন্টারনেট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, বাইশ নভেম্বর দুহাজার বাইশ

মায়ের বাহন সিংহ আসলে বিষ্ণু স্বয়ং: শাক্ত বৈষ্ণব আপাত দ্বন্দ্ব নিরসনে শাস্ত্রীয় প্রমাণ – তমাল দাশগুপ্ত

মায়ের বাহন সিংহ আসলে বিষ্ণু স্বয়ং: শাক্ত বৈষ্ণব আপাত দ্বন্দ্ব নিরসনে শাস্ত্রীয় প্রমাণ।

সিংহবাহিনী মাতৃশক্তির উপাসনা নব্য প্রস্তর যুগ থেকে হচ্ছে এশিয়া জুড়ে, গত আট হাজার বছর ধরে। ভারতে কুষাণ যুগ থেকেই সিংহবাহিনী মূর্তির প্রচুর প্রত্ন প্রমাণ আছে, গুপ্তযুগ থেকে তো নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে। সিংহ বাহিনীর ইতিহাস নিয়ে আগে লিখেছি। আমাদের মা দুর্গা সিংহবাহিনী, এছাড়া কালীরও সিংহবাহিনী রূপ আছে, লক্ষ্মী এবং সরস্বতীরও সিংহবাহিনী রূপ হয়, জগদ্ধাত্রী তো অবশ্যই সিংহ বাহিনী। আজ আমরা জানব যে মায়ের বাহন এই সিংহ আসলে বিষ্ণুর রূপভেদ, বিষ্ণু স্বয়ং মায়ের বাহন। হ্যাঁ, এর স্বপক্ষে শাস্ত্রীয় প্রমাণ আছে।

বিষ্ণুর নরসিংহ অবতার সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি। বিষ্ণুর সিংহরূপ কাজেই আছে। কিন্তু মা দুর্গার বাহন সিংহও আসলে সিংহরূপী বিষ্ণু।

কালীবিলাসতন্ত্রে বলা হয়েছে মায়ের সিংহ বাহন আসলে হরি যিনি স্বয়ং বিষ্ণু।

কালিকাপুরাণে বলা হয়, মায়ের তিন বাহন হলেন ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর। প্রথমজন রক্তপদ্ম, শেষের জন শবরূপ ধারণ করে মায়ের বাহন হয়েছেন, আর বিষ্ণু স্বয়ং সিংহরূপে মায়ের বাহন।

দেবী পুরাণ অনুসারে বিষ্ণু স্বয়ং দেবী দুর্গার বাহন সিংহকে নির্মাণ করেছিলেন সর্বদেবের নির্যাস দিয়ে: এই সিংহের কেশরমূলে কেশব স্বয়ং ছিলেন, গ্রীবায় ছিলেন বিষ্ণু ও সিংহের দেহে সর্বদেবতার অধিষ্ঠান হয়েছিল।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

জয় মা সিংহবাহিনী। জয় জয় মা।

পালযুগে নবম শতকে পালরাষ্ট্রের অন্তর্গত অধুনা উত্তর প্রদেশে উৎকীর্ণ চতুর্ভুজ সিংহবাহিনী, এই মাতৃমূর্তির বর্তমান অবস্থান মেট মিউজিয়াম।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, একুশ নভেম্বর দুহাজার বাইশ

বাংলা উচ্চারণ তন্ত্রাশ্রয়ী, ব্রাত্য আর্য ভাষা আমাদের গর্বের উত্তরাধিকার – তমাল দাশগুপ্ত

বাংলার স্কুলে স্কুলে ধ্রুপদী ভাষা হিসেবে পালি শেখানো উচিত। আমাদের পূর্ব ভারতীয় ব্রাত্য আর্যভাষার শেকড় বুঝতে গেলে পালি ভিন্ন গতি নেই: তারকা পোসেনজিৎ হোক বা নদী পদ্দা, দেবী কাত্তায়নী হোন বা দেবী লোক্খী, দেহাতীত আত্তা হোক বা দেহভাণ্ডের চক্রো, আমরা যে মায়ের ভাষায় কথা বলি তা সুপ্রাচীন, অ-সংস্কৃত, অবৈদিক, এবং পূর্ব ভারতীয় আউটার এরিয়ান ভাষা, যা পালির সমতুল্য সংলগ্ন আত্মীয় একটি সুপ্রাচীন রাঢ়বঙ্গীয় ভাষার উত্তরাধিকার বহন করে। যাকে ভুল উচ্চারণ ভেবে, গ্রামীণ বা দেশজ উচ্চারণ ভেবে সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতরা সঙ্কুচিত থাকেন, তা আসলে আপনার শেকড়ের গর্বের উত্তরাধিকার।

আজকের বাংলা ভাষার ওপরে সংস্কৃত তৎসমের পোশাকি বানানবিধির আবরণ সরিয়ে দিলেই পাণ্ডু রাজার ঢিবি থেকে চন্দ্রকেতুগড়ের সভ্যতার আসল ভাষা বেরিয়ে আসবে, বাঙালির অতীতগৌরবের ধ্রুপদী ভাষা বেরিয়ে আসবে।

বাংলা বর্ণমালা তন্ত্রাশ্রয়ী। প্রথম বর্ণ ক এসেছে কালী থেকে। এবং ব্রাহ্মী থেকে আজকের বাংলায় ক অক্ষরে প্রাচীন বলাকা মাতৃকার আদল আছে, যেখান থেকে কালী, যেখান থেকে মহাবিদ্যা বগলামুখী এসেছেন।

বাংলা শব্দমালা অবৈদিক ও ব্রাত্য। বাংলা উচ্চারণ নিয়ে সংকুচিত হবেন না। আমরা বিদ্দা বলি, ভিদিয়া নয়। ওটা আড়াই হাজার বছর ধরেই বিদ্দা, ওতে আপনার জাতীয় গর্ব আছে। আমরা শুজ্জো বলি, সুরিয়া নয়। আমরা ওগ্নি বলি, আগুন বলি। প্রাচীন স্লাভ ভাষাতেও আগোন বলে, ওগ্নি (Ogni) লেখে।

বাংলা একটি সুপ্রাচীন ইন্ডো ইউরোপীয় ভাষা। ধ্রুপদী মর্যাদা পায়নি কারণ চতুর্দিকে দালাল, কারণ আবাপ ধরনের দালাল মিডিয়া আর যাদবপুর ধরনের দালাল একাডেমিয়া দিয়ে বাঙালিকে শেকড়বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে সেজন্য আমার কথাগুলো বাঙালির কাছে পৌঁছে দিতে ওরা বাধা দেয়। চাড্ডি ছাগু বিশ্বমানব এই একজায়গায় এসে জোট বেঁধেছে, বাঙালিকে ভুল বোঝাবে বলে।

এরা কেউ বেদের ছেলে বাপন, সবই বেদে আছে, হরপ্পাও বৈদিক। আর সেই হরপ্পার অনেক আগে থেকে রাম আর হনুমান আছে বলাই বাহুল্য। আবার কেউ ভুলনিবাসী ভোম্বল, তার সবই অস্ট্রিক (অথচ বৈদিক আর্যেরও পরে ভারতে অস্ট্রোএশিয়াটিক এসেছে)। কেউ বিশ্বমানব, তার কাছে শক হুন দল পাঠান মোগল সবই এক, বাঙালির স্বতন্ত্র কোনও অস্তিত্ব নেই। কেউ ভাষাবাদী কাংলাপক্ষ, বাংলাদেশ থেকে ধার করে এনেছে জয় বাংলা, সে মোল্লার লুঙ্গিতে বাঙালির জাতীয় পুঙ্গির প্রকাশ খুঁজে পায়।

বাঙালি, ভাবছেন এর সমাধান কোথায়? জয় মা কালী বলুন সবাই একমনে একসঙ্গে বলুন, মায়ের সামনে অনেক বলি দেওয়ার আছে। এত জোরে জয় মা কালী বলতে হবে, শত্রু যেন ভয়ে কেঁপে ওঠে।

এবং সেই বেদও তো কোনওভাবে মা কালীকে ছাড়া নয়, বাংলার মুসলমানও মা কালীকে অস্বীকার করলে ভয়াবহ মাশুল দেবে। আসুন, আমাদের মায়ের মন্দিরে সবার সমান আমন্ত্রণ। আসুন, কারণ মা ছাড়া আর কেউ নেই।

কারণ, কালিকা বঙ্গদেশে চ। বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী কালী। কারণ, কলৌ কালী কলৌ কালী নান্যদেবো কলৌ যুগে। কলিযুগে কালী ছাড়া আর কেউ নেই। কারণ, একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা। মা বলেছেন, তিনি একাই আছেন, তিনি ভিন্ন আর দ্বিতীয় কেউ নেই।

তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, আঠেরো নভেম্বর দুহাজার বাইশ

কার্তিক দেবতা ও মাসের নাম এসেছে আদি মাতৃকা কৃত্তিকা থেকে – তমাল দাশগুপ্ত

কার্তিক দেবতা ও মাসের নাম এসেছে কৃত্তিকা থেকে।

কৃত্তিকা কারা? এঁরা আদি সপ্তমাতৃকা। হরপ্পা সভ্যতায় সপ্তমাতৃকা বলি গ্রহণ করতে উপস্থিত থাকতেন, এই মর্মে প্রত্ন ফলক পাওয়া গেছে।

এই সাতজনের সঙ্গে সপ্তর্ষির বিবাহ সম্পর্ক কল্পিত হয় বৈদিক-পৌরাণিকদের দ্বারা, কিন্তু বলা হয় সে বিবাহ টেঁকে না, এবং সপ্তমাতৃকারা সবাই সপ্তর্ষিকে ত্যাগ করে স্বাধীনভাবে পৃথক নক্ষত্রমণ্ডলী প্রস্তুত করেন (বলা হয় একমাত্র অরুন্ধতী থেকে গেছিলেন সপ্তর্ষিদের সঙ্গে)। এই কৃত্তিকা নক্ষত্রমণ্ডলীকে পশ্চিমে Pleiades বলে, সেভেন সিস্টারস বলেও ডাকা হয়, রাতের অন্ধকারে এই নক্ষত্রমণ্ডলী স্পষ্টভাবে দেখা যায়, কারণ কৃত্তিকা হল পৃথিবীর সবথেকে কাছের নক্ষত্রমণ্ডলী।

প্রসঙ্গত এখনও সপ্তমাতৃকা বা অষ্টমাতৃকার মধ্যে আছেন চামুণ্ডা, যাঁকে কোনও পুরুষ দেবতার শক্তি বলে চালিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি আজও।

অরুন্ধতী বাদে সপ্তমাতৃকার বিবর্তনে এই ছয় কৃত্তিকা হলেন আদি মাতা, যাঁরা ভয়াল। এঁরা বৈদিক পৌরাণিক পুরুষতন্ত্রের যম। যখন গঙ্গার তীরে শরবনে আবির্ভাব ঘটে শিশু স্কন্দের এঁরা স্কন্দধাত্রী হন, এবং এঁদের নাম কৃত্তিকা থেকেই কার্তিকেয় নাম পায় শিশুটি। ছয় কৃত্তিকা তাঁর ধাত্রী, সেই থেকে কার্তিক ষড়ানন।

এঁরা যোদ্ধামাতৃকা বলেই শিশুটি যুদ্ধদেবতা হয়। মাতৃকার কোলে শিশু হরপ্পা সভ্যতার সবথেকে জনপ্রিয় মাতৃমূর্তি ছিল।

মহিষমেধ হত হরপ্পা সভ্যতায় মাতৃকার উপাসনায়। দুর্গা মহিষমর্দিনী মহাভারতে পূজিত। কিন্তু এক জায়গায় স্কন্দকে মহিষঘাতী বলা হয়েছে যা গুরুত্বপূর্ণ বিস্মৃত ইঙ্গিত: স্কন্দ শাক্ত ধর্মের থেকেই উঠে এসেছেন। তিনি মায়ের গণদের অধিপতি গণেশের মতোই মায়ের দ্বারপাল অনুচর, সেজন্য মায়ের পাশে পূজিত হন দুর্গাপুজোর সময়।

কৃত্তিকাদের স্মরণ করে আবহমান মাতৃকাদের জয়ধ্বনি হোক, মায়ের সন্তানদের জয়জয়কার হোক। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের দুই পাশে গণেশ কার্তিক। পালযুগে একাদশ শতকের দুর্গামূর্তি। বর্তমান অবস্থান সান ফ্রান্সিস্কো মিউজিয়াম অভ এশিয়ান আর্ট।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, সতেরো নভেম্বর দুহাজার বাইশ

মা মনসার নামকীর্তন করব আমরা – তমাল দাশগুপ্ত

আজ মা মনসার নামকীর্তন করব আমরা, তিনি বিষহরি নামে খ্যাত। মা মনসা অত্যন্ত প্রাচীন।

হরপ্পা সভ্যতায় একজন সর্পমাতৃকা পূজিত হতেন, প্রত্ন ফলক পাওয়া গেছে। সাড়ে চার হাজার বছর আগে। মনসা অবৈদিক দেবী, তিনি আমাদের তন্ত্রাশ্রয়ী সভ্যতার অধিষ্ঠাত্রী। তন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ কুণ্ডলিনী তত্ত্ব, এই কুণ্ডলিনী কল্পনায় হরপ্পা সভ্যতার সর্পমাতৃকার প্রভাব আছে বলে সিদ্ধান্ত করা যায়।

মোটামুটি আড়াই হাজার থেকে বাইশশো বছর আগে রচিত বৌদ্ধ যুগের একটি গ্রন্থ থেকে জনপ্রিয় নাগ উপাসনার কথা জানা যাচ্ছে।

চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গারিডাই সভ্যতায় সর্পমাতৃকার মূর্তি পাওয়া গেছে।

পালযুগে প্রাপ্ত সমস্ত মাতৃমূর্তির মধ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ মনসা মূর্তি। এই পালযুগেই কানা হরিদত্ত প্রথম মনসামঙ্গল লেখেন। মনসামঙ্গলের কাহিনী আরও প্রাচীন হওয়ার সম্ভাবনা, বাঙালি বণিকের ওই বৈদেশিক বাণিজ্য গঙ্গারিডাই যুগের, বা তারও আগে পাণ্ডু রাজার ঢিবির সময়কালের। শশাঙ্ক থেকে পালযুগে বাঙালির সেই বাণিজ্য সমৃদ্ধি আর দেখা যায় না।

মা তারার জনপ্রিয় রূপভেদ জাঙ্গুলী তারা পূজিত হতেন পালযুগে, তিনি মনসার মতোই সর্পমাতৃকা।

সেনবংশের প্রথম গৌড়েশ্বর বিজয়সেনের নামাঙ্কিত মনসা মূর্তি পাওয়া গেছে।

মা মনসা মধ্যযুগীয় মাতৃকাদের মধ্যেও অসম্ভব জনপ্রিয়।

এভাবে যুগে যুগে সুপ্রাচীন মা মনসা আমাদের মধ্যে পূজিত হয়েছেন।

মনসার একটি বৈশিষ্ট্য হল তিনি আদিদেবী।

মা মনসা কালী পূজিত হন চব্বিশ পরগণার উচিলদহ গ্রামে, জানা যাচ্ছে। জরাসন্ধের উপাস্য মাতৃকা বলে খ্যাত আকালিপুরের গুহ্যকালী সর্পবাহনা। মা মনসার সঙ্গে কালীর সংযোগ আছে।

মনসা যেহেতু জগদকারণ প্রকৃতির জগন্মাতা রূপের বহিঃপ্রকাশ, এজন্য সন্তান কোলে মনসা মূর্তি দেখা যায়। নাগ হল পৃথিবীর কোলে লুকোনো সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক, এজন্য মহাবিদ্যা কমলা, দেবী পদ্মা, সর্বোপরি শ্রী/লক্ষ্মীর বৈশিষ্ট্য ধারণ করেন মনসা। বিষহরি মনসার সঙ্গে সরস্বতীও সম্পর্কিত কারণ মনসা বিদ্যাদায়িনী।

মনসা পুজোয় পাঁঠা বলি দেন যে ভক্ত, তিনি ধনবান কীর্তিবান হন এবং সন্তানলাভ করেন, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অনুযায়ী। বাংলা জুড়েই মনসা পুজোয় মহা ধুমধামের সঙ্গে পাঁঠা বলি হয়।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

জয় মা মনসা। জয় জয় মা।

বাংলাদেশের রংপুর মিউজিয়ামে মা মনসার এই মূর্তি আছে।

সংযোজন

পালযুগের মা মনসা https://www.facebook.com/2343427979014091/posts/3284906298199583/

মনসাবিস্তার https://www.facebook.com/2343427979014091/posts/3156967607660120/

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, ষোলো নভেম্বর দুহাজার বাইশ

মা কালী এবং ঋগ্বেদের রাত্রি সূক্ত – তমাল দাশগুপ্ত

মা কালী এবং ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্ত।

ঋগ্বেদে দশম মণ্ডলে রাত্রিসূক্ত আছে, যা অনেকেই বৈদিক সাহিত্যে মা কালীর প্রাচীনতম ইঙ্গিত বলে মনে করেন। শ্রী শ্রী চণ্ডী পাঠের সময় রাত্রিসূক্ত পাঠের প্রথা আছে কারণ ঋগ্বেদের রাত্রির সঙ্গে চণ্ডী অভিন্ন ধরা হয়। চণ্ডী তো দুর্গা, তবে কি দুর্গা ও কালী অভিন্ন? হ্যাঁ, দুর্গাপুজো আসলে মা কালীর উপাসনা। দুর্গাপুজো আসলে ভদ্রকালীর উপাসনা, এবং সন্ধিপুজোর বলি গ্রহণ করেন চামুণ্ডা কালী। তার থেকেও বড় কথা হল, আদিদেবী কালীই পরে গৌরী, এই মর্মে অনেকগুলো পুরাণে একটা কাহিনী আছে যা আদি ঋগ্বেদে রাত্রি বা কৃষ্ণী থেকে ঊষার উদ্ভবের কাহিনীর রূপান্তর। রাত্রি ও তাঁর রূপভেদ ঊষা হরপ্পা সভ্যতায় পূজিত ছিলেন, সেখান থেকেই আমাদের দুর্গা কালী।

কিন্তু মা কালীর সঙ্গে রাত্রিসূক্ত কিভাবে সম্পর্কিত?

কালীর সরাসরি উল্লেখ বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে প্রথম আছে মুণ্ডক উপনিষদে, অগ্নির সপ্ত জিহ্বার মধ্যে কালী আছেন। কিন্তু সেটা অনেক পরে। ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্ত প্রাচীন, এমনকি ঋগ্বেদের দেবীসূক্তের থেকেও ঋগ্বেদের এই রাত্রিসূক্ত আরও প্রাচীন বলে ইতিহাসবিদ মহলে ঐক্যমত্য আছে। রাত্রিসূক্ত কত প্রাচীন? চার হাজার বছর পুরোনো, অন্তত।

রাত্রিসূক্তে সরাসরি কালীর নাম নেই। তবে কেন রাত্রিসূক্ত আমাদের আদ্যা নিত্যা অব্যক্ত জগদকারণ প্রকৃতির জগন্মাতা কালীরূপ-এর সঙ্গে জড়িত? এর প্রধান কারণ দার্শনিক এবং ঐতিহাসিক। ঋগ্বেদে “নকৎ কৃষ্ণী” বা রাত্রির কৃষ্ণবর্ণা দেবী সৃষ্টির উৎস, যেন মধ্যরাতে জগৎ সৃষ্টি হয়। এবং তিনিই এরপরে সৃষ্টির সূর্যোদয়ের ঊষা: রাত্রি সূক্ত পাঠ করলে দেখা যায় ঊষা ও রাত্রি অভিন্ন।

এই রাত্রি/কৃষ্ণী/কালীই আদিদেবী মহাদেবী। এঁর উপাসনা হত অবৈদিক হরপ্পা সভ্যতায়, এবং বৈদিকরাও কিছুটা ভয়ে কিছুটা ভক্তিতে ঋগ্বেদে রাত্রি সূক্তে রাত্রি দেবীর উদ্দেশ্যে স্তব করেছেন এভাবে:

রাত্রি অতিবিস্তার করেন যখন, যারা নীচে আছে কি যারা ঊর্ধ্বে আছে, সবাইকেই তিনি আচ্ছন্ন করেন। তিনিই আলো হয়ে, ঊষা হয়ে অন্ধকার দূর করেন। রাতের অন্ধকারে মহাবৃক্ষ যেমন পাখিদের আশ্রয়, তেমনভাবে রাত্রি আমাদের পক্ষে শুভঙ্করী হন। তিনি স্পষ্ট কৃষ্ণবর্ণ অন্ধকার, তিনি সর্বব্যাপী, তিনি আমাদের সর্বনিকটে, তিনি আমাদের ঋণ নষ্ট করুন, তাঁকে এই সমস্ত স্তব অর্পণ করলাম।

★★★

সব রঙ এসে কালো রঙে মেশে তাই দেবী কালী। এই রাত্রি জন্ম দেন, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনিই দেন পরম আশ্রয়। এবং অন্তিমে তিনিই গ্রাস করেন। শ্রী শ্রী চণ্ডী অনুযায়ী কালরাত্রি মহাদেবীর আরেকটি নাম।

সৃষ্টি – স্থিতি – বিনাশানং শক্তি ভূতে সনাতনী…

মা কালী হলেন কালো রাতের আলো। জগৎ সৃষ্টির শুরুতে অন্ধকার তাই তিনি কালো। সমস্ত জাগতিক জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে রাত্রির কোলেই আশ্রয় নিই আমরা, সেই আদিকাল থেকেই। চোখ বুজলে এই রাত্রিই নিদ্রা…

কালো রাত থেকে ঊষার জন্ম। তিনি অন্ধকার, কিন্তু তিনিই অন্ধকার বিনাশ করেন, তিনিই আমাদের আলো দেন, শেষে তিনিই মোক্ষ দেন, তাই দীপান্বিতা উৎসবে তাঁর উপাসনার রীতি।

“কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন…”

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, পনেরো নভেম্বর দুহাজার বাইশ

মা কালীর ধ্যানমন্ত্র/মূর্তিরূপ – তমাল দাশগুপ্ত

মা কালীর ধ্যানমন্ত্র/মূর্তিরূপ।

আমরা জানি আমাদের জগদকারণ জগন্মাতা সম্পর্কে বলিপ্রিয়া শব্দটি সুপ্রাচীন, এটি মহাভারতে পাওয়া যায়, যুধিষ্ঠিরের দুর্গাস্তবে বলিপ্রিয়া আছে, কিন্তু মা কালীর মূর্তিরূপ ও ধ্যানমন্ত্র দেখলে বোঝা যাবে মা কেন রুধিরপ্রিয়া বলেও আখ্যা পেয়েছেন। আজ মা কালীর কয়েকটি ধ্যানমন্ত্র মূর্তিরূপ সম্পর্কে জানব আমরা।

তন্ত্রসারে এই ধ্যানমন্ত্রগুলি উদ্ধৃত হয়েছে।

কালীতন্ত্রের ধ্যানমন্ত্র অনুযায়ী মা চতুর্ভুজা করালবদনা মুক্তকেশী মুণ্ডমালিনী ঘনমেঘশ্যামবর্ণা দিগম্বরী। বাম হাতে সদ্য ছিন্ন মুণ্ড ও খড়্গ, ডান হাতে অভয় ও বরমুদ্রা। শবদেহের ছিন্ন হাত দিয়ে নির্মিত মেখলা তাঁর কটিদেশে, মুখে হাসি, তাঁর তিন চোখ সকালের সূর্যের মত আরক্ত, মুখের দুই কস দিয়ে রক্ত ঝরছে।

চামুণ্ডাতন্ত্রের ধ্যানমন্ত্রে দেখা যায়, খড়্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে নির্গত সুধাধারায় মা কালী সিক্ত হন। তিনি ত্রিনেত্রা, বামহস্তে ধৃত নরকপাল, তা থেকে নির্গত রক্তধারা পান করছেন, মুক্তকেশী দিগম্বরী, তাঁর প্রজ্বলিত জিহ্বা, তিনি আলীঢ়পদা এবং তিনি নীলপদ্মের বর্ণবিশিষ্টা।

বিশ্বসার তন্ত্র অনুযায়ী মা কালী চতুর্ভুজা, কৃষ্ণবর্ণা, মুণ্ডমালাভূষিতা। ডানহাতে খড়্গ ও নীলপদ্ম এবং বামহাতে কর্তরি ও খর্পর। মাথার জটা গগনস্পর্শী, মা মুণ্ডমালিনী। মা এক পা শিব এবং অন্য পা সিংহের ওপরে রেখে অট্টহাস্য করছেন। এই ধ্যানকল্প অনুযায়ী নির্মিত মূর্তি খুব বেশি দেখা যায় না, এই মূর্তিতে মা কেবল রুধিরপান নয়, একটি আস্ত শব লেহন করেন।

সিদ্ধেশ্বর তন্ত্র অনুযায়ী মা কালী মুহুর্মুহু রক্তপানরতা, শবারূঢ়া, বাম হাতে নরকপাল এবং কর্তৃকা, ডান দিকের হাতে বর ও অভয় মুদ্রা।

সিদ্ধেশ্বর তন্ত্রের এই শ্লোকটি দিয়ে আজ মায়ের ধ্যানমন্ত্র-মূর্তিরূপ আলোচনা শেষ করি।

শবারূঢ়াং মহীভীমাং ঘোরদংষ্ট্রাং বরপ্রদাম্।
হাস‍্যযুক্তাং ত্রিনেত্রাঞ্চ কপালকর্তৃকাকরাম্।।
মুক্তকেশীং ললজ্জিহ্বাং পিবন্তীং রুধিরং মুহুঃ।
চতুর্বাহুযুতাং দেবীং বরাভয়করাং স্মরেৎ।।

তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

মায়ের ছবিটি টুইটার থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, চোদ্দ নভেম্বর দুহাজার বাইশ

দ্বেষক ছাগকে বলি দেব সৎকার্যের হাঁড়িকাঠে, বঙ্কিম বলে গেছেন – তমাল দাশগুপ্ত

মায়ের সামনে “দ্বেষক ছাগ”কে বলি দিতে হয় “সৎকার্য হাঁড়িকাঠে”, বঙ্কিম বলে গেছেন। তাই বাঙালির তন্ত্রাশ্রয়ী শেকড়ে আবহমান মাতৃধর্মের সর্বোচ্চ প্রসারের জন্য কাজ। আর মা কালীর প্রতি যারা বিদ্বিষ্ট, শত্রু বা অন্তর্ঘাতক – তারাই পাঁঠা, তাদেরই বলি হবে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, এগারো নভেম্বর দুহাজার বাইশ

মা বলিপ্রিয়া: কিন্তু মা কি সন্তানের বলি চাইতে পারেন? উত্তরের প্রয়াস – তমাল দাশগুপ্ত

মা কি সন্তানের বলি চাইতে পারেন? পারেন। পৃথিবী জন্ম দেন, পৃথিবীই গ্রাস করেন। যে কালস্রোতে ভেসে উঠি, সে কালস্রোতেই ডুবে যাই। মা কালী জগদকারণ, জগদবিলয়: মা কালী সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়। জয় মা বলিপ্রিয়া রুধিরপ্রিয়া!

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, দশ নভেম্বর দুহাজার বাইশ

কালীকথা: মা বোল্লা কালী – তমাল দাশগুপ্ত

মা বোল্লা কালী।

মা বোল্লা কালীর পুজো আসন্ন। এই বোল্লা কালী পুজো পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাতৃধর্মীয় উৎসব, এবং পাঁঠাবলির জন্য বিখ্যাত।

প্রসঙ্গত বর্তমান পত্রিকায় দেওয়া একটি হিসেবে জানা যাচ্ছে কোরোনার আগে দুহাজার উনিশ সালে বোল্লা কালী পুজোয় ছয় হাজার পাঁঠাবলি হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরেই এই পুজোয় পাঁঠাবলির সংখ্যা বিপুল। উনিশ শো ছিয়াত্তর সালের একটি হিসেবে দেখা যাচ্ছে সেবছর তেইশশো পাঁঠা বলি হয়েছিল। জানা যাচ্ছে এখানে বলি প্রথা এরকম: আগে শুরুতে মহিষ এবং কুষ্মাণ্ড বলি দেওয়া হয়, এরপর পাঁঠা বলি শুরু হয়।

★★★

একজন কালী গবেষক বলেন দশম একাদশ শতক থেকেই এখানে বোল্লা গ্রামে মায়ের পুজো হচ্ছে, এবং তান্ত্রিক নির্মিত পঞ্চমুণ্ডি ছিল। বলা দরকার পালযুগে বরেন্দ্রভূমির অন্তর্গত ছিল এই ভূখণ্ড। এখানে তান্ত্রিক ধর্মের পুরোনো ঘাঁটি, এবং সেই সময়ে এখানে কোনও স্থানেশ্বরী অধিষ্ঠাত্রী মায়ের পুজো প্ৰচলিত ছিল এমন সিদ্ধান্ত কাজেই অস্বাভাবিক নয়। সেযুগে এখানে যে মায়ের পুজো প্ৰচলিত ছিল সেই মা বোল্লা কালী আজ রক্ষাকালী বলেই মূলত পরিচিত, এমনকি মড়কের সময় তিনি রক্ষা করেন এই বিশ্বাস আছে, প্রায় একশো বছর আগে ১৯২০ সালে মড়ক ঘটেছিল এই অঞ্চলে, এবং বোল্লা কালী মড়ক থেকে রক্ষা করেছিলেন বলে তাঁকে সেই সময় মড়কাকালী বলা হত।

মায়ের পুজোয় পঞ্চ দ্রব্যের ব্যাপক ব্যবহার (পঞ্চ গুঁড়ি, পঞ্চ শস্য, পঞ্চ রত্ন, পঞ্চ পল্লব প্রভৃতি) থেকে একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা যে পালযুগে হয়ত এখানে পঞ্চরক্ষিকা পুজো হত, ইনি পালযুগের রক্ষামাতৃকা ছিলেন। এছাড়া মারীভয় নিবারণ করেন, মহামারী থেকে রক্ষা করেন, এমন মাতৃকার উল্লেখও তন্ত্রগ্রন্থে আছে।

মা বোল্লা কালীর একাধিক কিংবদন্তী আছে, তার মধ্যে একটি কাহিনী হল অলৌকিক পাঁচ মাথা সম্পন্ন সর্প নিয়ে। ফলে পঞ্চরক্ষিকা ছাড়াও সর্পবাহিনী গুহ্যকালীর কথা মনে আসতে পারে। গুহ্যকালীও খুব প্রাচীন মাতৃকা।

★★★

তবে বোল্লা কালীর লিপিবদ্ধ নথিবদ্ধ ইতিহাস বেশি পুরোনো নয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় বর্ধমানের জমিদার হরিমোহন গাঙ্গুলী বোল্লা গ্রাম সহ এই তল্লাটের মালিকানা পান, সেই সময় মহা ধুমধামে কালীপুজো শুরু হয়। এই জমিদারের দুই নায়েব, ভ্রাতৃদ্বয় রামসিংহ এবং চিত্তগোবিন্দ চৌধুরী পরে জমিদার হন, এবং পুজোর দায়িত্ব নেন। সেই সময় জ্যৈষ্ঠমাসের ফলহারিণী অমাবস্যায় বার্ষিক কালীপুজো হত।

এরপর রাসপূর্ণিমার পরবর্তী শুক্রবার বার্ষিক পুজোর প্রথা শুরু হয়। শুক্রবার এখানে হাটবার ছিল বলে জানা যাচ্ছে এবং সম্ভবত রাসের মেলার সঙ্গে বোল্লা কালীর মেলাকে মিলিয়ে দেওয়ার একটা প্রয়াস ছিল। প্রসঙ্গত রাস একটি প্রাচীন শাক্ত উৎসব, বৈষ্ণব ধর্মের রাস শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকে জগন্মাতার রাসমণ্ডলের প্রত্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে।

রাসপূর্ণিমার পরের শুক্রবার রাত দশটায় বার্ষিক পুজো শুরু হয়। এবছর এগারোই নভেম্বর পড়েছে।

পুজো শেষ হয় সোমবার। এবছর চোদ্দ নভেম্বর।

বার্ষিক পুজো ছাড়াও প্রতি সপ্তাহেই শুক্রবার মায়ের অন্নভোগ হয়। এছাড়া রোজই মায়ের নিত্য পুজো হয়। একটি কালো শিলাখণ্ডে মায়ের নিত্য পুজো হয়।

বার্ষিক পুজোর আগে বিশাল মাতৃমূর্তি নির্মিত হয়।

★★★

এই পুজো ঘিরে বিরাট মেলা বসে। আশেপাশে বালুরঘাটে ও গঙ্গারামপুরের হোটেলগুলো ভর্তি হয়ে যায়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কালীভক্তরা আসেন। এখানে পাঁঠাবলির মানত করার পাশাপাশি মায়ের মূর্তি নির্মাণ করেও নিবেদন করা হয়। দুহাজার উনিশে দুহাজার কালীমূর্তি নির্মাণ করে মায়ের পুজোয় নিবেদন করেন ভক্তরা। এই কালী মূর্তিগুলি মা বোল্লা কালীর বার্ষিক পুজোয় পূজিত মূল মূর্তির মতোই।

মায়ের পুজোয় প্রসাদ হিসেবে কদমা বিখ্যাত, বৃহৎ আকৃতির দুই কিলোর কদমাও পাওয়া যায় এই সময়।

মাকে বেশ কয়েক কিলোগ্রাম সোনার গয়না পরানো হয় পুজোর সময়।

★★★

মা জাগ্রত বলে খ্যাত আছে। ১৯২৩ সালে মায়ের মূর্তি তৈরি করার সময় শিল্পী নকড়ি মহান্ত মায়ের নাকের সামনে কেরোসিনের লম্ফ ধরে কাজ করছিলেন, রাতের বেলায়, মা সেই ধোঁয়ায় বিরক্ত হওয়ায় জ্বলন্ত লম্ফটি উড়ে গিয়ে হাটখোলায় অগ্নি কাণ্ড ঘটায়, এরকম একটি কিংবদন্তী আছে।

এমন কিংবদন্তী বাংলা জুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে মা কালী সহ অন্যান্য পূজিত মাতৃকা সম্পর্কে প্ৰচলিত। অস্যার্থ, মৃন্ময়ী মাকে নিছক মাটির মূর্তি ভাবা ঠিক নয়, কারণ তাতে শক্তির সঞ্চার আছে।

★★★

বোল্লা নামের পেছনে কারণ হিসেবে বলা হয় চারশ বছর আগে বল্লভ চৌধুরী নামে একজন জমিদার এই কালীমূর্তি নির্মাণ করেন, ফলে বল্লভকালী, সেই থেকে বোল্লা কালী। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় যাঁরা নায়েব এবং পরে জমিদার হন, সেই চৌধুরী উপাধির বাবুদের সঙ্গে বল্লভ চৌধুরীর সম্পর্ক কিছু ছিল কি না, স্থির জানতে পারিনি, তবে অসম্ভব নয়। জমিদার থেকে অনেকেই নায়েবে পরিণত হতেন, এবং আবার নায়েব থেকেও জমিদার হওয়ার অনেক উদাহরণ আছে।

বোল্লা নামের সঙ্গে বল্লাল কোনওভাবে যুক্ত থাকতে পারে কি না জানা নেই, যদিও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে শাক্ত রাজা বল্লালের স্মৃতিবিজড়িত মাতৃকা উপাসনাপীঠ আছে।

★★★

এখানে মায়ের রঙ আকাশী নীল অর্থাৎ শ্যামা। মায়ের মূর্তি চোদ্দ হাত লম্বা বলে জানতে পারছি দুয়েকটি বই থেকে, তবে একটি স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী বর্তমানে সাড়ে সাত হাত দীর্ঘ প্রতিমা তৈরি হয়।

মা বোল্লা কালীর মন্দিরটির চূড়া বেশ দীর্ঘ: চুরাশি ফুট উঁচু।

বালুরঘাট স্টেশন থেকে বাস বা অটোয় যাওয়া যায় মা বোল্লা কালীর মন্দিরে। মল্লিকপুর স্টেশন থেকেও অটো বা রিকশায় যাওয়া যায় বোল্লা গ্রামে। বালুরঘাট শহর থেকে কুড়ি কিলোমিটার পূর্বে এই বোল্লা গ্রাম। কলকাতা থেকে বাস রাস্তায় সরাসরি সংযুক্ত।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবিটি ইন্টারনেট থেকে।

জয় মা বোল্লা কালী। জয় জয় মা।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, নয় নভেম্বর দুহাজার বাইশ