ডাঃ রক্তিম মুখার্জি
মাৎস্যন্যায় পুজোসংখ্যা ১৪৩১
আদিভূতা সনাতনী শূন্যরূপা শশিভালী
ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন মুণ্ডমালা কোথায় পেলি
যিনি অব্যক্ত জগতকারণ প্রকৃতি, বাক্য মনের অগোচর পরম তত্ত্ব; তাঁকে চেতনার উন্মেষের ঊষাকাল থেকে আমরা মা বলে ডেকেছি। মাতৃসাধনার ইতিহাস এক অর্থে মানব সভ্যতার ইতিহাসের থেকেও বেশি প্রাচীন। কারণ Venus of Berkhat Ram এর মাতৃমূর্তির পূজা homo sapiens এর পূর্বসূরি অধুনালুপ্ত একটি hominid প্রজাতির মধ্যে প্রচলিত ছিল। আজ প্রাচীন পৃথিবীর দুই অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার পীঠভূমি ভারত ও সুমেরের মাতৃসাধনার কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করব।
এই দুই ভূখণ্ড মিলিয়ে যদি মাতৃসাধনার আদিতম নিদর্শনের অনুসন্ধান করি তাহলে প্রশ্নাতীতভাবে উঠে আসবে বাঘোর কালীর প্রসঙ্গ। কারণ বাঘোর কালী এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত পৃথিবীর প্রাচীনতম মাতৃসাধনার স্থল বলে পুরাতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বাঘোর, মধ্যপ্রদেশের সিধি জেলার মেধাউলি গ্রাম থেকে ৪ কিলোমিটার দুরের একটি প্রত্ন ক্ষেত্র। সোন নদী উপত্যকায় প্রস্তরযুগের প্রত্নক্ষেত্রগুলোতে কাজ করার অংশ হিসাবে ১৯৮২ সালে এলাহাবাদ বিশ্যবিদ্যলয়ের জে.এন.পাল, আর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জে.এম.কেনয়ের এই পীঠস্থান আবিষ্কার করেন।

বালি পাথরের টুকরো দিয়ে বানানো একটি গোলাকার বেদী। তার কেন্দ্রস্থলে বসানো আছে একটা ত্রিকোণাকার রঙীন পাথরের টুকরো। প্রাকৃতিক লৌহমিশ্রিত বেলে পাথরটির রঙ হলদেটে-লাল, আর লালচে-বাদামীর মিশেল। রঙের স্তর কিন্তু এলোমেলো না। পাথরের খাঁজের সাথে সাথে মিলিয়ে রঙ বদল হয়েছে। আর এই খাঁজগুলো আছে এককেন্দ্রীয় কয়েকটি ত্রিভুজের নক্সায়। একটি ত্রিভুজের রং হালকা তো পরের ত্রিভুজে রঙ গাঢ়। ১৫০ মিমি উঁচু, ৬৫মিমি চওড়া আর ৬৫মিমি পুরো ত্রিভুজাকৃতির পাথর। এই শিলাটিই বাঘোরের মা কালীর নিরবয়ব প্রতিমা। আজ থেকে এগারো হাজার বছর আগে উপমহাদেশের দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর মাতৃপূজক সংস্কৃতির পূর্বসূরিরা এখানে মায়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ত্রিকোণাকার শিলা মাতৃযোনীর রূপক। যেহেতু মাতৃযোনী থেকেই নতুন প্রাণের আবির্ভাব ঘটে তাই এই ত্রিকোণাকার শিলাই ছিল সেযুগে মাতৃকার বিগ্রহ। চাঞ্চল্যকর বিষয় হল
বাঘোর কালী হলেন কতকগুলি সমকেন্দ্রিক ত্রিকোণের আকারে সজ্জিত মাতৃশিলা। আজও আমাদের তন্ত্রে কালীযন্ত্রের এটাই আকৃতি। পাঁচটি সমকেন্দ্রিক ত্রিকোণের কেন্দ্রেই আজও মা কালীর অধিষ্ঠান কল্পিত হয়। এই বাঘোর কালীর থেকে অল্প দূরেই আছে সমতুল্য আরো একটি প্রস্তর যুগের মাতৃপীঠ। কেরাই কী দেবী”-র দেবস্থান। কেরাইকি দেবী বা কেরাই-এর দেবী। এখানেও আছে বালি পাথর আর চুনা পাথরের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে বানানো গোলাকার বেদী। তার উপরে রাখা ঐ রকম এককেন্দ্রীয় ত্রিভুজাকৃতি পাথর। অবশ্য একটি নয় ছয়টি। তাদের আকার, রঙ, সবই ঐ বাঘোরের বেদীর উপর পাওয়া পাথর খন্ডের মতই। আর রাখা আছে মস্তকহীন এক মুর্তি। যাকে বলা হয় অঙ্গারা দেবী। অঙ্গারা বা অঙ্গার, অগ্নিময়ী দেবী। আশ্চর্যের কথা হল এই দুটি পীঠই স্থানীয়দের কাছে দেবী কালিকা মাঈ-এর আরাধনা স্থল বলে পরিগণিত। কালীর আদি তত্ত্ব ভয়ঙ্করী ভয়হারিণী কালরূপা মাতৃকার। তিনিই রাতের অন্ধকারে বন্য প্রকৃতির মধ্যে মানবজাতিকে সন্তানের মতো রক্ষা করেন। আবার তিনিই ঊষার মাধ্যমে সূর্যোদয়ের বার্তা দেন। তিনিই জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো উগ্র। আবার তিনিই নিজের গর্ভ থেকে জগত প্রসব করেন। সম্ভবত এইভাবেই আদি মাতৃপূজক সংস্কৃতির চেতনায় কালীর তত্ত্ব এসেছিল। সেই কারণেই এই বাঘোরের উপাসনাস্থল কালীর নামাঙ্কিত ক্ষেত্র। বেদের রাত্রিসূক্তেও কালীর এই তত্ত্বটিই প্রকাশ পেয়েছে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই জায়গাটা বিন্ধ্য পর্বতমালার অংশ। এই প্রাচীনতম পীঠের স্মৃতিতেই কি আমাদের মাতৃকাকে বিন্ধ্যবাসিনী বলা হয়? যে উপাধিটা পরে একানংশা, চণ্ডী, কালী প্রমুখ মাতৃকার সাথে সংযুক্ত হয়েছে?
সিন্ধু ও সুমের সভ্যতার অন্যতম প্রধান দুই মাতৃকার কথা এবার আলোচনা করব। তিনি হরপ্পার মহিষমর্দিনী; আজকের দুর্গা।
উপমহাদেশে মহিষমর্দিনী দুর্গার প্রথম প্রকাশ আমরা খুঁজে পাই সিন্ধু সরস্বতীর বদ্বীপে। হরপ্পার টেরাকোটার মূর্তিতে মহিষমেধের একাধিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। একটি সিলে দেখা যায় একজন যোদ্ধৃ একটি মহিষের উপর পা তুলে শূলাঘাতে তাকে বধ করছেন। পাশেই একজন উপাসক ধ্যানরত। তাঁর মাথায় মহিষের শিঙের শিরস্ত্রাণ। আসকো পারপোলা ও শিরিন রত্নাগর এই মহিষমেধকে দুর্গার মহিষমর্দনের আদি রূপ বলেছেন।
The buffalo sacrifice to the Goddess is the cultic counterpart of the Mahiṣāsuramardinī myth, and really central to the Durgā cult.
তাঁরা লক্ষ্য করেছেন এই মহিষমেধের সমতুল্য বৃষমেধ বা ষাঁড়বলির রীতি সুমেরীয় এলামাইট সভ্যতায় প্রচলিত ছিল। হরপ্পার সিলে যে ভঙ্গিতে মহিষকে শূলবিদ্ধ করা হচ্ছে; ঠিক সেই ভাবেই ষাঁড় বধ করা হত সুমেরে। Harappan water buffalo, imported from the Indus Valley, is the counterpart of the West Asian urus bull in the Sargonid “contest” seals, and that the “victor’s pose,” one foot placed on the head of the buffalo, is replicated
in Mesopotamia and in the Indus Valley. সুতরাং মহিষমর্দিনীর এই আদিরূপ বাস্তবে তাম্রাশ্মযুগের প্রাচীন সভ্যতাগুলিতে পরিব্যাপ্ত মাতৃপূজক সংস্কৃতির সুবিশাল পরিমণ্ডলেরই অনবদ্য প্রকাশ।

অন্য একটি সিলে দেখি এই মাতৃকা একটি গাছে আবির্ভূত হয়েছেন। গাছটি সম্ভবত অশ্বত্থ।
তাঁর সামনে উপাসনায় রত পূজারীর মাথায় মহিষের শিঙ। বলির জন্য রাখা আছে একটি বড়ো ছাগল। মাতৃকার অধিষ্ঠান ঐ গাছটিকে ঘিরে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরই মতো সাতজন দেবী। এই সাতজনের কথা বিশদে আলোচনা করব প্রসঙ্গক্রমে। তবে এই সিলটি প্রমাণ করে বৃক্ষতলে ছাগবলি দিয়ে মাতৃসাধনা হরপ্পাতে প্রচলিত ছিল। এবং এই দেবী যে মহিষমেধের মাধ্যমে উপাসিতা মাতৃকাই; তার প্রমাণ উপাসকের মাথার ঐ মহিষের শিঙ। মূল মাতৃকা এবং এই সাতজন সহচরীর সকলেই মাথায় বিচিত্র বেণী ধারণ করে আছেন( মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্রের রম্যকপর্দ্দিনী বা সুন্দর বেণীধারিণী অভিধাটি এই প্রসঙ্গে স্মরণ করি)।

গবেষকগণ এঁকেই মহিষমর্দিনীর আদি রূপ বলেছেন। এঁরই একটি মূর্তি দেখা যায়; যেখানে দেবী একটি কাঁটাগাছের নিচে বাঘের পিঠে মাথায় ছাগলের শিঙের মুকুট ধারণ করে আছেন। সম্ভবত এখানেও বলিদত্ত পশুর আভরণ ধারণের বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছে। A tiger-riding goddess wearing the horns of a mountain goat under an acacia tree.
এঁর মাথার বেণীর সাথে সুমেরের এলামাইট সভ্যতার সিংহবাহিনী মাতৃকার বেণীর আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়। এই বেণীটি হল a band forming a “double bun,” as worn by princes in West Asia around 2400 bce.
এলামাইট সভ্যতায় পৃথিবীর দেবী বা আদিমাতৃকা হলেন KI. তাঁর প্রতীক ছিল সিংহ। তাঁর সামনে ষাঁড় বলি দেওয়ার রীতি ছিল। এই রীতিটি সেখানে কালচক্রের ধারণার সাথেও যুক্ত ছিল। ষাঁড় ও সিংহ ছিল প্রকৃতির দুই বিপরীতমুখী শক্তির প্রতীক। কখনও দুই সিংহের উপর প্রভুত্ব করছে এক অতিকায় ষাঁড় এবং কখনও দুই ষাঁড়কে দমন করছে এক বিশাল সিংহ; এই দুই ছবি ছিল সূর্যের গতির সাথে বছরের দুই ভিন্ন সময়ের প্রতীক। ঠিক এই ভাবনারই প্রকাশ আমরা দেখি হরপ্পার একটি সিলে যেখানে মাতৃকা দুই বাঘের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। দুই বাঘ পরস্পরের দিকে আক্রমণে উদ্যত এবং মাঝে মাতৃকা এই দুই শক্তিকে প্রতিহত করে সামঞ্জস্য রক্ষা করছেন। এর মধ্যে গবেষকগণ দেখেছেন সূর্যের ত্রিমুখী অয়নের সংকেত। আবার অন্যদিকে আমরা বলতে পারি এ হল দেহতত্ত্বের তিন নাড়ির প্রতীক। দুইপাশে ঈড়া ও পিঙ্গলা। মাঝে সুষুম্নার পথে কুলকুণ্ডলিনীর প্রকাশ। ভবিষ্যতে যে আমরা মাতৃকার মণ্ডল দেখি; সেখানে দুই বা চারজনের মাঝে এক মাতৃকার অধিষ্ঠান একটি ধ্রুব বৈশিষ্ট্য। ফ্রিজিয়ান আনাতোলিয়ার মধ্যপ্রস্তরসযুগের Cybeli বা আদি পৃথিবী মাতৃকাও দুই সিংহের মাঝে বসে আছেন। সম্ভবত এই দুই বিপরীত ধারার মাঝে মধ্যমণি হয়ে মাতৃকার অধিষ্ঠান তাম্রাশ্মযুগের মাতৃসাধনার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যা আজও বাঙালির মাতৃপূজক সংস্কৃতিতে বিদ্যমান। মাতৃকার এই চিত্র যেন প্রকৃতির শৃঙ্খলার প্রতীক। তিনি সমস্ত সম ও বিষম শক্তির অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করেন কর্ণধারের মতো। এখানেই তাঁর তত্ত্ব সাঙ্খ্যের প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে যায়। সাঙ্খ্যের প্রকৃতিই জগতের সঞ্চালিকা। তিনি অব্যক্ত জগদকারণ।
অন্যদিকে হরপ্পার মাতৃকার এই অবস্থানকে যদি কালচক্রের এবং সূর্যের অয়নের সাথে সংযুক্ত ভাবা যায় সেক্ষেত্রেও আমরা ভবিষ্যতের উপমহাদেশের মাতৃসাধনার একটি দিক খুঁজে পাই। সেটি হল ঊষার উপাসনা; যা আজকের দুর্গাপূজার মূল তত্ত্বের সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট।
হরপ্পার ঊষা মহিষমর্দিনীর সাথে যে মাতৃকার সংযোগ সবথেকে প্রকট তিনি হলেন সুমেরের ইনন্যা; যিনি আসিরীয় সভ্যতায় ইশতার নামেও পূজিত।
সুমেরীয় পুরাণে তিনি সর্বশক্তির অধিশ্বরী। ইনন্যা কথাটির অর্থ স্বর্গের কন্যা। লক্ষ্য করার বিষয় হল ঊষাকেও ঋগ্বেদে দ্যুলোকের কন্যা বলা হয়েছে। ইনন্যার বাবা চন্দ্রদেব; মা আনতুম; ভাই: সূর্যদেব শামাশ ও বোন: পাতালের রানী ইরিশকিগাল। তাঁর বাহন সিংহ, দেবী সিংহের পিঠে চড়ে যুদ্ধ করতেন, হাতে থাকে ধনুক ও তূণ ভর্তি তীর। প্রতীক অস্টকোণ তারকা। তাঁর মহাজাগতিক গতিকে শুক্রগ্রহের সঞ্চরণের সাথে তুলনা করা হয়েছে। উরুক শহরের এয়ান্না মন্দির ছিল তাঁর প্রধান উপাসনাস্থল। সুমেরীয় পুরাণে অন্য সব দেবতার পৃথক পৃথক কাজ থাকলেও ইনন্যার কোনো একটি সুনির্দিষ্ট কাজের উল্লেখ নেই। বরং সমস্ত দেবতার ঐশ্বর্যলক্ষণ ও কার্যক্ষমতা তাঁর তত্ত্বে আরোপিত হয়েছে। এর থেকে ঐতিহাসিকরা মনে করেছেন ইনন্যার মধ্যে সমস্ত পৃথক দেবতাদের গুণাবলী একত্রিত করে বিশ্বজননীর অভিন্ন তত্ত্ব নির্মাণ করা হয়েছিল। আবার সুমেরীয় লিপিতে ইনন্যা নামটির অক্ষরগুলো দেখে কিছু গবেষক সিদ্ধান্ত করেছেন ইনি আদিতে সুমেরীয় সভ্যতার আগেকার ইউফ্রেটিস নদী অববাহিকার একটি প্রাচীন সভ্যতার মাতৃদেবী ছিলেন। পরে সুমেরীয় ধর্মভাবনায় তাঁর আগমন ঘটেছে এবং সমস্ত দেবশক্তির সম্মিলিত মহিমা তাঁর তত্ত্ব রচনা করেছে। আমাদের মহিষমর্দিনী দুর্গার পৌরাণিক তত্ত্ব নির্মাণের সময় শ্রী শ্রী চণ্ডীতে সমস্ত দেবশক্তির সম্মিলনে তাঁর রূপ পরিগ্রহের কাহিনীটি এই প্রসঙ্গে স্মরণ করি। আবার ইনন্যাকে যেভাবে সমস্ত দেবতাদের প্রধান বলে দেখানো হয়েছে তা দেখে কেনোপনিষদের আদিজননী উমা হৈমবতীর তত্ত্ব মনে পড়ে, যিনি সিংহবাহিনী মাতৃকার আদি ধারাটির সাথে সংযুক্ত।

ইনন্যার রূপভেদ ইশতারের সাথে পায়রার সংযোগ ছিল। তাঁর মন্দিরে একটি তালগাছ থেকে একটি দৈত্যাকার পায়রা রূপে দেবী বেরিয়ে আসছেন; এরকম নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। আজও আমরা মহিষমর্দিনী দুর্গার পূজার পর নীলকন্ঠ পাখি ওড়াই। আজও আমাদের মা কালীর নিত্যাদের মধ্যে বলাকা মাতৃকা আছেন। কুমারসম্ভবের কবি কালিদাস কালীকে বলাকিনী বলেছেন। আমাদের মেহেরগড় ও পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে বিপুল সংখ্যক পক্ষীমাতৃকার মূর্তি মিলেছে। ইশতারের এই পায়রা রূপটি উপমহাদেশের পক্ষীমাতৃকার সেই আদি ধারাটির সাথে তাম্রাশ্মযুগের সুমেরীয় সংস্কৃতির গভীর সংযোগের আরেকটি দৃষ্টান্ত।
প্রশ্ন জাগে সমকালীন সুমেরীয় ফ্রিজিয়ান সভ্যতার great mother goddess এর রাজকীয় বাহনটি অর্থাত সিংহ আমাদের সংস্কৃতিতে কবে থেকে আছে? এতদিন আমাদের ধারণা ছিল কুষাণদের সূত্রে মধ্য এশিয়ার সিংহবাহিনী মাতৃকা ভারতে এসেছেন এবং মহিষমর্দিনীর সাথে একীভূত হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সত্যিই কি তাই? প্রসঙ্গত এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানের সিংহবাহিনী আদিমাতৃকার উপাসনার আলোচনা করেছিলেন শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয়; ভারতের শক্তিসাধনা ও শাক্ত সাহিত্য গ্রন্থে।
“গ্রীক মাতৃদেবীও পার্বত্য দেবী। তাঁহার যে মূর্তি পাওয়া যায় সেখানে দেখি, তিনি সুশোভিত আঁচল পরিহিতা, হাতে তাঁহার রাজদণ্ড বা বর্শা; তিনিও পর্বতশিখরে দণ্ডায়মানা এবং সিংহকর্তৃক পরিরক্ষিতা। ক্লীটের মাতৃদেবীই এশিয়ার প্রসিদ্ধ মাতৃদেবী ‘সীবেলির সঙ্গে একীভূত হইয়া গিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। এশিয়ার এই সীবেলি দেবীকে অনেক স্থলে আসনারূঢ়া দেখা যায়, এবং তাঁহার পায়ের কাছে কতকগুলি সিংহকে নত হইয়া থাকিতে দেখা যায়। কখনও এই দেবীর সহিত
সিংহ, ভল্লুক, চিতাবাঘ এবং অন্যান্য নানাবিধ পশু সংশ্লিষ্ট দোখতে পাওয়া যায়। সীবেলি মীসিয়া লিডিয়া ফ্রিগিয়া প্রভৃতি স্থানের পর্বতে পৃজিতা হইতেন।”
কিন্তু তিনি আমাদের মাতৃপূজক সংস্কৃতির সিংহবাহিনীকে “মধ্য এশিয়া থেকে আগত” এমন মত পোষণ করেননি। বরং উপমহাদেশের প্রাচীন মাতৃকা উপাসনার ধারার সাথে তুলনামূলক বিচার করে সিদ্ধান্ত করেছেন:
পৃথিবীর অন্যত্র যে সিংহযুক্তা পর্বতবাসনীর উল্লেখ পাই, আমাদের সিংহবাহনা পর্বতবাসিনী উমা বা পার্বতী সেই দেবীরই ভারতীয় রূপ? একথা কি মনে করা যাইতে পারে যে, একটি সাধারণ দেবী- মূর্তির পরিকল্পনাই প্রাচীন কালে সব দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল ? এই প্রসঙ্গে আমরা আরও একটি প্রয়োজনীয় তথ্যের উল্লেখ করিতে পারি। আমরা পূর্বেই আলোচনা করিয়া দোখয়া আসিয়াছি যে, উমা কথাটি সম্ভবতঃ মূলে একটি সংস্কৃত শব্দ নহে; অন্ততঃ কথাটির যে-সকল ব্যুৎপত্তি দেওয়া হইয়াছে তাহার কোনোটিই সর্বজনগ্রাহ্য নহে । কিন্তু আমরা দেখিতে পাই, মাতৃ-শব্দের ব্যাবলনীয় প্রাতিশব্দ হইতেছে ‘উম্মন’ বা ‘উম্ম’; শব্দটির এক্কাডীয় (4,০০80190) প্রতিশব্দ, হইতেছে “উম্ম; দ্রাবিড়ী প্রতিশব্দ হইতেছে উম্ম; এই শব্দগুলিকে পরস্পরের সহিত মিলাইয়া লওয়া যাইতে পারে এবং সবগুলিই আবার ভারতীয় ‘উমা’ শব্দটির সহিত মিলিত করিয়া দেখা যাইতে পারে ।
যাই হোক। এতদিন ধারণা ছিল সিন্ধু-সভ্যতার মাতৃকার তুলনায় ভারতে সিংহবাহিনী মাতৃকার উপাসনা তুলনামূলকভাবে নবীন। কিন্তু সম্প্রতি এই ধারণায় কিছু বদল এসেছে উত্তর আফগানিস্তানের Dashley 3 BMAC temple forts প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পরে। এর সময়কাল ২৩০০ থেকে ২০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের এবং সিন্ধু সরস্বতীর বদ্বীপ থেকে মেহেরগড় পর্যন্ত সুবিশাল ক্ষেত্রে যে সভ্যতার পত্তন হয়েছিল; এটি তার থেকে বিচ্ছিন্ন একেবারেই নয়।
এই প্রত্নক্ষেত্রটি চতুষ্কোণ; চারটি বাহুতে চারটি দ্বার। কেন্দ্রে মূল উপাসনালয়। অবিকল তন্ত্রের যন্ত্রের আকৃতি। এই দুর্গমন্দিরে পূজিত হতেন যে সিংহবাহিনী দেবী; তিনি সুমেরের ইনন্যার রূপ। সিংহবাহিনী। অধিকাংশ মূর্তিতে তাঁর সিংহাসনের দুই পাশে দুই সিংহ আর দেহের দুই পাশে দুই ডানা। অর্থাত একাধারে পক্ষীমাতৃকা এবং সিংহবাহিনী। এঁর মধ্যে পরবর্তী সময়ের তন্ত্রের অজপা হংসের দ্যোতনা আছে। আবার ঈড়া পিঙ্গলা সুষুম্নার তত্ত্বও আছে। আবার দুর্গমন্দিরের সাথে এই মাতৃকার সংযোগ আছে। শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয়ের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত এই প্রসঙ্গে লক্ষণীয়। ভারতের শক্তিসাধনা ও শাক্ত সাহিত্য গ্রন্থে তিনি বলছেন: পুরাণে দেবীকে দুর্গপরাক্রমা বলা হয়েছে। এই ‘দুর্গপরাক্রমা’ কথাটির তাৎপর্য কিঃ এখানেও আমরা দেবীকে দুর্গের সহিত যুক্ত করিতে প্রলুব্ধ হইতেছি। দুর্গা কি প্রাথমিক রূপে নগরপালিকা দুর্গরক্ষিণী দেবী ছিলেন? দুর্গাধিষ্ঠাত্রী দেবী রূপেই কি তিনি সর্বশক্তিময়ী দেবীরূপে পূজিতা হইলেন? শক্তিময়ীর মহাদেবীত্ব লাভ আতি সহজেই সম্ভব হইয়াছিল। “
এই Dashley 3 BMAC temple forts প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথমত এখানে সিংহবাহিনী ইনন্যার সমতুল্য উপমহাদেশের দ্বারপ্রান্তের এক সুপ্রাচীন সিংহবাহিনী মাতৃকার সংযোগ পাই আমরা। তিনি হলেন নানা। নানা কুষাণ মুদ্রায়( যেমন সম্রাট হুবিষ্কের মুদ্রা) ও খ্রীষ্টীয় প্রথম শতকের গান্ধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। আসকো পারপোলা মনে করিয়ে দিচ্ছেন বর্তমান বেলুচিস্তানের সতীপীঠ মরুতীর্থ হিংলাজে দেবী হিংলাজ আজও বিবি নানী নামে পূজিত হন। এই নানী এবং নানা দুটি নামই ইনন্যার প্রতিধ্বনি হওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়ত এই আবিষ্কারের ফলে যুগপৎ মহিষমর্দিনী ও সিংহবাহিনী রূপে আদিমাতৃকার উত্থানের চিত্রটি আমরা দেখতে পাই; যার সূচনা তাম্রাশ্মযুগের ভারতীয় উপমহাদেশে। আসকো পারপোলা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত করেছেন: …. a goddess related to Hindu Durgā was worshipped in Afghanistan from at least as early as 2000 bce, then by the Iranian-speaking Dāsas who arrived there around 1500 bce, and then again by the Iranian-speaking Kuṣāṇas who arrived more than a thousand years later.
এই নানা সিংহবাহিনী। ইনন্যার মতোই “Lady of ladies, goddess of goddesses, directress of mankind, mistress of the spirits of heaven, possessor of sovereign power; the light of heaven and earth,
daughter of the Moon God, ruler of weapons, arbitress of battles; goddess of love; the power over princes and over the sceptre of kings”। অভিধাগুলি ব্যাবিলনের Marduk এর ইনন্যা মন্দিরের লিপি থেকে প্রাপ্ত। এর মধ্যে অধিকাংশ অভিধাই তাঁর সার্বভৌম সত্ত্বার এবং রাষ্ট্রশক্তির সাথে তাঁর একীভবনের দ্যোতক। দেবীসূক্তের “অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসুনাং”( এই গতিময় জগতের রাষ্ট্রী বা রাষ্ট্রশক্তি আমিই) উক্তির কথা স্মরণ করি। স্মরণাতীত কাল থেকে বাঙালির জাতীয় চেতনাও মাতৃকার সাথে অভিন্ন। গঙ্গারিডির গজলক্ষ্মী ও দশায়ুধা ছিলেন রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির প্রতীভূ। ধর্মপালের পালরাষ্ট্রের রাজচিহ্নে আর্যতারার চিত্র আঁকা থাকত। আবার আধুনিক যুগেও ঋষি বঙ্কিমের বন্দেমাতরম মন্ত্রে স্বদেশচেতনা মাতৃকারই রূপ ধারণ করেছে। যাই হোক। আপাতত একটি বিশেষ অভিধার দিকে দৃষ্টিপাত করছি। সিংহবাহিনী এই দেবীকে বলা হতো “daughter of the moon god”. চন্দ্রের সাথে দেবীর এই সংযোগ আমাদের মহিষমর্দিনী দুর্গার তত্ত্বের দুটি দিকের সংকেত দেয়। চন্দ্র শীতলতার প্রতীক। সারাদিনের দাবদাহের পর তার স্নিগ্ধ কিরণে স্নাত ও শীতল হয় জগত। তাই চাঁদের নাম হিমকর হিমাংশু শীতাংশু ইত্যাদি। অন্যদিকে হিম বা শীতলার সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত; চাঁদের মতোই শ্বেতশুভ্র এক প্রাকৃতিক সত্ত্বা জড়িয়ে আছে ভারতের আধ্যাত্মিক ধারণার সাথে। সেটি হল উত্তরের বিখ্যাত পর্বতমালা হিমালয় বা হিমগিরি। চন্দ্রের দেবতার কন্যা সিংহবাহিনী ইনন্যার সাথে আমাদের হিমালয়কন্যা গিরিনন্দিনী সিংহবাহিনী দুর্গার এই সাদৃশ্য চমকপ্রদ। ঊষার সাথেও হিমগিরির সংযোগের কথা সুকুমার সেন লক্ষ্য করেছিলেন।
আবার পালযুগে বজ্রযানে আমরা এক মাতৃকার উপাসনার বিবরণ পাই যাঁর সাথে চন্দ্রের সংযোগ আছে। তিনি হলেন চুন্দা বা চুন্দী( প্রাকৃত নাম; সংস্কৃত চন্দ্রা বা চন্দ্রী থেকে আগত)। এঁর বিগ্রহ সাধকের হৃদয়ের চন্দ্রমণ্ডলে অধিষ্ঠিত। বর্ণ চন্দ্রের মতো শুভ্র। ললাটে অর্ধচন্দ্র। কন্ঠে চন্দ্রের মালা। এঁকে সমস্ত বুদ্ধগণের জননী বলে ধারণা করা হতো। ইনি পালসম্রাট গোপালের ইষ্টদেবী ছিলেন। সুকুমার সেন মহাশয়ের মতে এই চুন্দির সাথে চণ্ডীর সংযোগ আছে। চুন্দা বা চুন্দিও চণ্ডীর মতোই অবৈদিক পরিমণ্ডলের মাতৃকা এবং বিশ্বজননী। চুন্দা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সার্কিটে জনপ্রিয় ছিলেন। জাভা, মঙ্গোলিয়া, জাপান, চীন, সর্বত্র তিনি পূজিত হতেন। ইলোরার গুহাচিত্রে চুন্দা আছেন। অষ্টসহস্রিকাপ্রজ্ঞাপারমিতার একাদশ শতকের একটি পুঁথিতে পট্টিকেরা (এখনকার নোয়াখালি-কুমিল্লা-ত্রিপুরা) অঞ্চলে পূজিত চুন্দার চিত্র আছে, এছাড়া রাঢ়দেশে পূজিত চুন্দার ছবিও পাওয়া গেছে এই পুঁথিতে। জাপানে তাঁকে শিবের স্ত্রী অর্থাৎ শক্তি/দুর্গার সঙ্গে এক ভাবা হয়েছে। তাঁকে শরৎকালের চাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। পালযুগে তাঁর উপাসনা সম্ভবত শরত কালে হত।
চুন্দার হাতে মুদ্গর (গদা), কুন্ত (ভল্ল), বজ্র, পাত্র/কলস, পদ্ম, দণ্ড, অনেক সময় পুস্তক। চতুর্ভুজ থেকে শুরু করে দ্বাদশভুজ, অষ্টদশভুজ এমনকি ছাব্বিশহস্ত চুন্দার মূর্তিও পাওয়া গেছে।
চুন্দার সাথে চণ্ডীর এই সংযোগও ইনন্যার চন্দ্রদেবতার কন্যারূপের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে এই মহিষমেধের তাৎপর্য কী? একটি লৌকিক কারণ তো অবশ্যই প্রবল আরণ্যক পাশবিক শক্তিকে প্রতিহত করে মানবসভ্যতার পত্তন করা। কিন্তু এ ছাড়াও কী অন্য তাৎপর্য ছিল? এর উত্তর নিহিত আছে সুমেরের কালগণনার রীতিতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য অধিকাংশ প্রাচীন সভ্যতায় কালকে চক্রের আকারে ধারণা করা হতো। কালচক্রের ধারণা আমাদের তান্ত্রিক ধর্মভাবনার একদম কেন্দ্রীয় ধারণাগুলির একটি। যাই হোক; সুমেরের প্রাচীন বর্ষগণনার রীতিতে সূর্যের উত্তরায়ন ও দক্ষিণায়নের ভিত্তিতে বছরের দুই ভাগকে সিংহ ও বৃষের রূপকে প্রকাশ করা হতো। ষাঁড় ও সিংহ ছিল প্রকৃতির দুই বিপরীতমুখী শক্তির প্রতীক। কখনও দুই সিংহের উপর প্রভুত্ব করছে এক অতিকায় ষাঁড় এবং কখনও দুই ষাঁড়কে দমন করছে এক বিশাল সিংহ; এই দুই ছবি ছিল সূর্যের গতির সাথে বছরের দুই ভিন্ন সময়ের প্রতীক। যে সময় সিংহ বৃষকে দমন করছে; বছরের সেই সময়টিই ছিল বৃষমেধ করে সিংহবাহিনী মাতৃকার উপাসনার লগ্ন। একই বৈশিষ্ট্য দেখা যেত এলামাইট সভ্যতায়; সেখানে পৃথিবীর দেবী বা আদিমাতৃকা হলেন KI. তাঁর প্রতীক ছিল সিংহ। তাঁর সামনেও ষাঁড় বলি দেওয়ার রীতি ছিল। হরপ্পার মহিষমেধ এবং সুমেরের বৃষমেধ যেহেতু মহিষমর্দিনী সিংহবাহিনী মাতৃকার একই উপাসনারীতির দুই ভিন্ন স্থানীয় প্রকাশ; তাই বলা যায় উপমহাদেশে মহিষমর্দিনীর আদিরূপটি কালচক্রের ধারণার সাথে সংযুক্ত হয়েই বন্দিত হয়েছিল। উৎস থেকেই তাই মা মহিষমর্দিনীর মধ্যে কালরূপা মাতৃকার প্রকাশ বর্তমান।
আবার এই যে দুই ষাঁড়কে একটি সিংহ দমন করছে; অর্থাত দুইদিকের দুই প্রবল শক্তিকে মধ্যস্থলের একটি শক্তি নিয়ন্ত্রিত করছে; এর সমতুল্য দৃষ্টান্ত আছে হরপ্পার একটি সিলে যেখানে মাতৃকা দুই বাঘের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। দুই বাঘ পরস্পরের দিকে আক্রমণে উদ্যত এবং মাঝে মাতৃকা এই দুই শক্তিকে প্রতিহত করে সামঞ্জস্য রক্ষা করছেন। এর মধ্যে গবেষকগণ দেখেছেন সূর্যের ত্রিমুখী অয়নের সংকেত। এই মাতৃকার সিলে একটি চক্রের চিহ্নও আছে যা স্পষ্টতই কালচক্রের সাথে এঁকে সংযুক্ত করে। ইনি ভাগবতধর্মের প্রাচীন মাতৃকা একানংশার আদিরূপ হতে পারেন। সেক্ষেত্রে মহিষমর্দিনী মাতৃকার সাথে কালতত্ত্বের সংযোগের বিষয়টি আরো সুদৃঢ় হয়। কারণ একানংশা মাতৃকাই মহাভারতে মহিষাসৃকপ্রিয়া ( মহিষের রক্তে তৃপ্ত) ও বিন্ধ্যবাসিনী রূপে পূজিত হয়েছেন।
হরপ্পার মাতৃকার মহিষমেধকে যদি কালচক্রের এবং সূর্যের অয়নের সাথে সংযুক্ত ভাবা যায় সেক্ষেত্রেও আমরা ভবিষ্যতের উপমহাদেশের মাতৃসাধনার একটি দিক খুঁজে পাই। সেটি হল ঊষার উপাসনা; যা আজকের দুর্গাপূজার মূল তত্ত্বের সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট। কারণ ঊষা বাস্তবে প্রকৃতির এক বিশেষ ক্ষণ বা লগ্ন যা রাত্রির অবসান ও দিনের সূচনাকে নির্দেশ করে। সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বা কালকেই আমরা ঊষা বলি।
ঊষা কিম্ভূত অন্ধকারের দৈত্যকে প্রতিহত করেন।
বি তিষ্ঠতে বাধতে কৃষ্ণম্ অন্বম্
ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বন্য মহিষকে বধ করে রক্তধারার মধ্যে মহিষমর্দিনীর উপাসনা ঘোর অন্ধকার ভেদ করে রক্তবর্ণ ঊষার আগমনেরই দ্যোতক ছিল। কাজেই মহিষমর্দিনী দুর্গার আদিরূপের মধ্যে কালতত্ত্বের ধারণা অঙ্গাঙ্গীভাবে নিহিত ছিল।
আবার সুকুমার সেন লক্ষ্য করেছেন ঊষা ও নিশাকে একাধিক সূক্তে অভিন্ন বলা হয়েছে। নিশা হলেনকৃষ্ণী বা কালো মেয়ে যিনি রাত্রি এবং গৌরবর্ণা ঊষা যিনি দশদিকে কিরণ বিস্তার করেন বলে দশভুজা আখ্যা পেয়েছেন। নিশা ও ঊষার মধ্যে পরস্পর ভগ্নী সম্পর্ক কল্পিত হয়েছে ঋগ্বেদে। তমাল দাশগুপ্ত মহাশয় লক্ষ্য করেছেন এঁরা একজন সৃষ্টির সূচনাকালে এবং অন্যজন সৃষ্টির বিস্তার ও স্ফুরণকালে অধিষ্ঠান করেন। আজও দুর্গাপূজার সময় মহাসপ্তমীর পূজার সূচনা ঘটে চামুণ্ডার উদ্দেশ্যে মাষভক্ত দিয়ে। কালো মাষকলাইকে সিঁদুর দিয়ে রঞ্জিত করে এই মাষভক্ত বলি খুব সম্ভবত কৃষ্ণবর্ণ নিশা ও রক্তবর্ণ ঊষার অদ্বৈত তত্ত্বেরই প্রকাশ। অন্যদিকে চামুণ্ডা কালরূপা কালীর এক প্রাচীন রূপ। ইনিই আবার দুর্গাপূজার অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজার সময় অষ্টচণ্ডীর সাথে বলিগ্রহণ করেন। মহাপূজার বিশেষ ক্ষণ বা মুহূর্তে কালীর সাথে মহিষমর্দিনীর এই সরাসরি অভিন্নত্ব দুর্গাতত্ত্বের মধ্যে সংশ্লিষ্ট হরপ্পার কালরূপা মাতৃকার আদি ধারাটির নিরবচ্ছিন্নতাকেই প্রকাশ করে।
সমতুল্য দৃষ্টান্ত সুমেরীয় সভ্যতাতেও আছে। সেখানে ইনন্যার বোন পাতাললোকের দেবী এরেশকিগল। তিনি মৃত্যুর এবং পুনর্জীবনের দেবী। সুমেরীয় পুরাণে ইনন্যার এরেশকিগলের মৃত্যুপুরীতে যাওয়া ও ফিরে আসার আখ্যানটি সবথেকে জনপ্রিয় ছিল। এই আখ্যানকে ঋতুচক্রের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। ভোরের শুকতারা ও সন্ধ্যার সন্ধ্যাতারা রূপে একই শুক্র গ্রহের দ্বিমুখী গতির সাথে ইনন্যা ও এরেশকিগলের তত্ত্বকে সংযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাত কালরূপা মাতৃকা নিশা ও মহিষমর্দিনী ঊষার অভিন্নতার সমতুল্য একটি দার্শনিক বোধ সুমেরের মাতৃপূজক সংস্কৃতিতেও ছিল।
কালরূপা মাতৃকার একটি বৈশিষ্ট্য হল তিনি অভয়া; আবার তিনিই অতি ভীষণা। হরপ্পায় ভীষণা মাতৃকার এইরকম একটি সিল পাওয়া গিয়েছে যাকে দুর্গার বর্তমান কাল অবধি প্রচলিত একটি রূপের সাথে সংযুক্ত করা যায়। সেই সিলে মাতৃকা ব্যাঘ্রবাহিনী। দুই হাতে দুটি অস্ত্র নিয়ে acacia জাতীয় কাঁটাগাছের নিচে তাঁর অধিষ্ঠান। মুখমণ্ডল করাল। কাঁটাগাছের নিচে মাতৃকার এই অধিষ্ঠান বাঙালির যে লৌকিক দেবীর কথা মনে করিয়ে দেয়; তিনি হলেন বনদুর্গা বা কান্তারদুর্গা।
আমাদের মাতৃকা হয়ে উঠেছেন যুগপৎ ভয়ঙ্করী ও অভয়া। ভয় এবং অভয়ের এই আশ্চর্য সমন্বয় বা ভয়াভয়া রূপ উপমহাদেশের মাতৃকা উপাসনার এক ধ্রুব বৈশিষ্ট্য। আর এইটিই উপমহাদেশে মাতৃকার প্রাচীনতম মূর্তিকল্পের খোঁজে আমাদের সহায়কও বটে। আর এই সূত্রেই সর্বপ্রাচীন যে প্রত্নমূর্তিগুলি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেগুলি হল সিন্ধু সরস্বতী বদ্বীপের উত্তরে মেহরগড় ঝোব অঞ্চলের মাতৃমূর্তি। প্রশ্ন উঠতে পারে বাঙালির কালীসাধনার ইতিহাস খুঁজতে ভারতের অপর প্রান্তের প্রসঙ্গ আনার কারণ কী? কারণ এই অঞ্চলেই উপমহাদেশের প্রাচীনতম মাতৃপূজক নগরসভ্যতার পত্তন ঘটেছিল তাম্রাশ্মযুগে। সিন্ধু সভ্যতায় ভবিষ্যতের বাঙালির মাতৃসাধনার ধারার সমস্ত আদি লক্ষণ বিদ্যমান। অতুল সুর মহাশয় অনুমান করেছিলেন এই অঞ্চলের অধিবাসীরাই তাম্রাশ্মযুগের শেষদিকে বীরভূম বর্ধমানের সীমায় অজয় অববাহিকায় পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে বাঙালির প্রথম নগরসভ্যতার নির্মাণ করেছিলেন। দুই সভ্যতার সমতুল্য মৃৎপাত্র( লাল কালো), খাদ্যাভ্যাস( মাছ), নৌ পরিবহনের আধিক্য, মাতৃমূর্তির এবং সেগুলোর নির্মাণশৈলীর সাদৃশ্য এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। নৃতাত্ত্বিক প্রমাণও দিয়েছিলেন রমাপ্রসাদ চন্দ মহাশয়। কাজেই বাঙালির কালীসাধনার আদিতম বীজটিও এখানেই নিহিত ছিল। এই বালুচিস্তান ঝোব অঞ্চলে অনেকগুলি মাতৃমূর্তি পাওয়া গেছে যাঁরা প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে ভয়ঙ্করী ভয়হারিণী রূপের আদিতম দৃষ্টান্ত। বেলুচিস্তানের কুল্লি ঢিপিতে আবিষ্কৃত এ-জাতীয় মূর্তির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে স্টেন মন্তব্য করেছেন, this strikingly confirms the view previously advanced that these figures represent a divinity of fertility, the ‘mother-goddess’ of many eastern cults। বেলুচিস্তানের মেহি-ঢিপিতে আবিষ্কৃত মূর্তিকা-প্রসঙ্গেও তাঁর মন্তব্য প্রায় একই।

ঝোব্ উপত্যকার মূর্তিকাগুলির রূপ কিন্তু ভীষণা, কখনও বা করোটির মত। তবুও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এগুলির মূলেও আদিম উর্বরতামূলক জাদুবিশ্বাসই অনুমান করেছেন। এ-জাতীয় মূর্তির বর্ণনায় পিগট্ যেমন বলেছেন, a grim embodiment of the mother-goddess who is also the guardian of the dead – an underworld deity connected like with the corpse and the seed-corn buried beneath the earth” (দেবীপ্রসাদ ভারতীয় দর্শন ৭২)।
অর্থাৎ যেভাবে মৃতদেহ ও বীজ উভয়েই মাটির নিচে চাপা থাকে, সেভাবে এই মাতৃকা উর্বরতাসূচক, এবং মৃতদের রক্ষক, তিনি পাতাললোকের ঈশ্বরী। ডান হাতে খড়্গ নিয়ে বাম হাতে শঙ্কাহরণ করা যে মাতৃকার অপূর্ব বৈশিষ্ট্য; এভাবেই তাঁর আদি রূপের উৎসরণ ঘটেছিল। প্রসঙ্গত মাতৃকাদেবী তন্ত্রে পৃথিবীর সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট। মার্কণ্ডেয় পুরাণে চণ্ডী হচ্ছেন মহীদেবী।
আধারভূতা যদস্তমেতাঃ মহীস্বরূপেন যতঃ স্থিতাসি
(সকলের আধার রূপে মহীরূপে তুমি নিত্য বিদ্যমান।)
আদিমাতৃকার বসুধারা রূপটি তার সার্থক দৃষ্টান্ত। প্রসঙ্গান্তরে এই নিয়ে আলোচনা করব।
বালুচিস্তান মেহেরগড়ের এই মাতৃকা ছিলেন পক্ষীমাতৃকা। অর্থাত পাখির মতো তীক্ষ্ম চঞ্চু; জননীর মতো স্তন্যদায়িনী; আবার দেবীর মতো ঐশ্বর্যলক্ষণ তাঁর মূর্তিতে। তাম্রাশ্মযুগের মাতৃমূর্তির এ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বস্তুত আজও তন্ত্রে মাতৃকার সাথে পক্ষীর অপূর্ব সংযোগ আছে। কালীসাধনার বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে আলোচনার সময় এটি বারবার প্রতিভাত হবে। সুকুমার সেন মহাশয় জানিয়েছেন ঊষা এবং নিশা নামে যে দুই ভগিনী দেবীর কথা বেদে উল্লিখিত হয়েছে; তাঁরাই দুর্গা ও কালীর আদিতম প্রকাশ। এর মধ্যে ঊষাই আদি দশভুজা; তাঁর পূজা উপলক্ষ্যে শূলাঘাতে মহিষমেধের প্রত্ন প্রমাণ উপস্থাপিত করেছেন আস্কো পারপোলা ও শিরিন রত্নাগর। অশ্বত্থ বৃক্ষে ঊষার সাথে সাতজন মাতৃকার পূজা করছেন পুরোহিত; বলিদান করছেন একটি সুবৃহৎ ছাগ; এমন সিলও পাওয়া গেছে। প্রসঙ্গত চণ্ডী অনুযায়ী সপ্তমাতৃকার মধ্যে কালী/চামুণ্ডাও আছেন। আজও বাংলা তথা দাক্ষিণাত্যে এই সপ্তমাতৃকার উপাসনার সুপ্রাচীন নিদর্শনের অভাব নেই। কাজেই সিন্ধু সভ্যতায় যে কালীর আদিতম রূপ প্রকাশিত হয়েছিল সেটা বোঝা কঠিন নয়। এর সাথে সিন্ধু সভ্যতার প্রান্তে ঝোব ও বালুচিস্তানের ভয়ঙ্করী ভয়হারিণী ঐ মাতৃমূর্তিগুলির প্রমাণকে যোগ করলে আমরা কালীসাধনার একদম গোড়ার দিকের চিত্রটি অনেকটাই উপলব্ধি করতে পারি। সিন্ধু সভ্যতার অন্তিম পর্বেই বীরভূমের পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে অবিকল একই রকম পক্ষীমাতৃকার মূর্তি পাচ্ছি। সাথে পাচ্ছি একদম সমতুল্য লাল কালো মৃৎপাত্র। এই লাল আর কালোর সমাহার মাতৃকা উপাসনার শুরু থেকে আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সিন্ধু ও বালুচিস্তানের মাতৃমূর্তিতেও এই দুই রঙের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। ঘোর অমানিশার অন্ধকার ভেদ করে ঊষাকালীন সূর্যের মতো রক্তবর্ণ ধারণ করে মাতৃকা উদিত হচ্ছেন বরাভয়ের আশ্বাস দিতে; সম্ভবত এটাই ছিল প্রথম মাতৃসাধকদের অন্তরের অনুভব। সেটাকেই তাঁরা এই দুই রঙে ধরে রেখেছিলেন। ঘন কালো চুলের মাঝে সিন্দুরের তিলক এবং সমুদ্র সন্নিহিত সভ্যতার অলঙ্কার রূপে শঙ্খও সম্ভবত এভাবেই যুক্ত হয়েছিল মাতৃপূজার ধারায়। হরপ্পার মাতৃমূর্তিতে তাই সিন্দুর ব্যবহার এবং শঙ্খের অলঙ্কারের বাহুল্য অত্যন্ত প্রচলিত ছিল। পরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সেই আনন্দময় উপাসনার রীতিকে সংকুচিত করেছে; শাঁখা সিন্দুরকে বিবাহিত নারীর জন্য বাধ্যতামূলক করে তার মূল তাৎপর্য হরণ করা হয়েছে। তবু আজও মাতৃসাধনার সময় সিন্দুরের তিলকে; মাষভক্ত বলির সময় কালো রঙের মাষকলাইয়ে লাল সিন্দুর মাখানোর রীতিতে; বিজয়া দশমীর সিন্দুর খেলায় এবং সর্বোপরি মা কালীর মূর্তিতে লাল কালোর অপূর্ব সমন্বয় বড়ো অনায়াসেই তন্ত্রের আদিপর্বের মধুর এক অধ্যায়ের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
তথ্যসূত্র:
গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়ের প্রবন্ধসমূহ
The roots of hinduism: the early Aryans and Indus valley civilization; Asko Parpola
ভারতীয় দর্শন; দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
ভারতের শক্তিসাধনা ও শাক্ত সাহিত্য; শশিভূষণ দাশগুপ্ত
Excavation at Pandu Rajar Dhibi ; Paresh Chandra Dasgupta
Electronic Corpus of Sumerian Literature ETCSL “Inanna and Enki”
























