প্রসঙ্গ বাংলাদেশ: আওয়ামি ‘সেকুলারিজমের’ প্রপঞ্চ ও সংখ্যালঘুর সর্বনাশের ধারাবাহিকতা  – উত্তম দেব (মাৎস্যন্যায় পুজোসংখ্যা ১৪২৯)

সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশে আরও একবার রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘনাতে শুরু করেছে। তেইশের ডিসেম্বরে নির্বাচন হ‌ওয়ার কথা। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে কোনও একজন রাষ্ট্রপ্রধানের পক্ষে টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। শেখ হাসিনা ওয়াজেদ সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। ২০০৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাধিক্যে জিতে ঢাকায় সাত বছর পর সরকারে ফেরে আওয়ামি লিগ। এর পর আরও দুটি নির্বাচন লিগের নৌকা কীভাবে উতরেছে, তা নিয়ে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম বিশেষ উচ্চবাচ্য না করলেও হাসিনার দেশে‌ ব্যাপক হাসাহাসি চলে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সাউথ ব্লক যে পর্দার পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ে, তা হাসিনার দোস্ত-দুশমন, সব পক্ষই জানে।‌

শেখ হাসিনাকে বর্তমান সময়ের দক্ষিণ এশিয়ায় সব থেকে চতুর রাষ্ট্রনায়ক বললে ভুল হবে না।‌ গদিতে বসার দিন থেকে হাসিনার জন্য প্রতিটি মুহূর্তই বিপজ্জনক। কিন্তু তারপরেও এখনও পর্যন্ত হাসিনাকে কেউ গদি থেকে টলাতে পারে নি। শেখ হাসিনা ওয়াজেদ যে দলটির‌ নেতৃত্ব দেন, সেই আওয়ামি লিগের শরীরে একটি লেবাস আছে। লেবাসটি পরিয়ে দিয়ে গেছেন হাসিনার আব্বাজান শেখ মুজিবুর রহমান। লেবাসটি হল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতার। আওয়ামি লিগ ক্ষমতাচ্যুত হলেই বাংলাদেশ ইসলামিক মৌলবাদীদের খপ্পরে গিয়ে পড়বে- এই জুজু দেখিয়ে প্রতিবেশী ভারত ও আমেরিকা সহ পশ্চিমী শক্তিকে তাঁর পেছনে দাঁড়াতে একপ্রকার বাধ্য করেছেন হাসিনা। হাসিনা ভালোই জানেন, দিল্লি তাঁর পাশে থাকলে ওয়াশিংটন তাঁকে বড় বেশি ঘাঁটাঘাটি করবে না। বাংলাদেশ নিয়ে যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারতের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে থাকে পশ্চিমী দেশগুলি। এই কূটনৈতিক চ্যানেলের কারণেই তেরো ও আঠারো, পরপর দু’বার নির্বাচনের নামে প্রহসন করেও পার পেয়ে গেছে আওয়ামি লিগ। তেরোতে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি-জামাত সহ বিরোধীরা নির্বাচনে অংশ‌ই নেয় নি। একতরফা ভোটে ড্যাং ড্যাং করে সব আসন জিতে নেয় শাসকদল আওয়ামি লিগ। আঠারোর নির্বাচন আসতে আসতে নিবন্ধন কেড়ে নিয়ে জামাতের দফতরে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন হাসিনা। নেতৃত্বহীন ছন্নছাড়া বিএনপি‌ সহ বাকি বিরোধীরা ভোটে অংশ নিলেও লিগের ‘নৈশভোটের’ কাছে দাঁড়াতেই পারে নি। ভোট তো হয় দিনেদুপুরে। বাংলাদেশে রাতে কেন? বিরোধীদের অভিযোগ, আঠারোর সংসদ নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই পুলিশ দিয়ে বুথে বুথে ছাপ্পা মেরে ব্যালটবাক্স বোঝাই করার কাজটি সেরে ফেলেছিল শাসকদল।

সাউথ ব্লকের সঙ্গে আওয়ামি লিগের কূটনৈতিক বোঝাপড়া দীর্ঘদিনের এবং তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত আমাদের সকলের জানা। বাম-ডান নির্বিশেষে ভারতের রাজনৈতিক মহলের সঙ্গেই আওয়ামি লিগের খাতির ভালো। পশ্চিমবঙ্গের ‘সেকুলার’ বাঙালিকুলের মুজিব ও আওয়ামিপ্রীতিও নতুন নয়।‌ এই কথা সত্যি, ঢাকার তখতে আওয়ামি লিগ থাকলে পূর্ব সীমান্ত নিয়ে অনেক স্বস্তিতে থাকে দিল্লি। শেখ হাসিনার জামানায় ভারত-বাংলাদেশ‌ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অতীতের যে কোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি মজবুত। বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় পুঁজির প্রভাব ক্রমবর্ধমান। হাসিনা সরকার সহায় থাকায় উত্তরপূর্বাঞ্চলের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলিকে দমন করা ভারতের পক্ষে সহজ হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ভারত বাংলাদেশে হাসিনাকেই চায় অথবা হাসিনা সরকারকে হাতে রাখতে চায়। দিল্লির হাসিনাপ্রীতির কারণটা বোঝা গেল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ‘সেকুলার’ বাঙালি কেন আওয়ামি লিগের প্রতি দুর্বল? তারা মনে করে,‌ একমাত্র আওয়ামি লিগ ক্ষমতায় থাকলেই বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পতাকা পতপত করে উড়তে থাকে। সত্যিই কি বাংলাদেশকে উদার-ধর্মনিরপেক্ষ এবং সংখ্যালঘু সহিষ্ণু রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখার কোন‌ও ঠিকা আওয়ামি লিগ অথবা শেখ হাসিনা নিয়েছে? মদিনা সনদ মেনে দেশ চালানোর অঙ্গীকার করা একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আপনি কীভাবে ‘সেকুলারিজম’ আশা করতে পারেন?

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার গরজে, নির্বাচনের আগে মক্কা থেকে ওমরাহ সেরে দেশে ফিরে মাথায় হিজাব ধারণ করতে হয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু’ কন্যাকে। সেবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পাঁচটি আসন কম থাকায় নির্বাচন শেষে সরকার গড়তে জামায়াতে ইসলামির‌ও সাহায্য নিতে হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ, বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামি লিগকে।‌ ২০০১ থেকে ২০০৬- বাংলাদেশ শাসন করে বিএনপি-জামাত জোট। এই পাঁচ বছরে নিজেদের কৃতকর্মের কারণেই সাউথ ব্লকের বিরাগভাজন হয় বিএনপি-জামাত জোট সরকার। হাওয়া ভবন থেকে খালেদাপুত্র তারেক রহমান পরিচালিত সমান্তরাল সরকারের দৌলতে বিএনপি-জামাত আমলে বাংলাদেশ‌ হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের সিক্রেট এজেন্সি ‘আইএসআই’-এর মুক্তাঞ্চল। ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে বাংলাদেশের মাটি ও প্রশাসনের বিভিন্ন উইংসকে খুল্লামখুল্লা কাজে লাগায় আইএস‌আই। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের গভর্নর ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ঢাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে ভারত সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল ম‌ঈন ইউ আহমেদ। জেনারেল ম‌ঈনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপর প্রভাব খাটায় দিল্লি। ভারতের চাপে আইএসআই- এর এলিমেন্টদের প্রশাসন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন আহমদের সরকার। ঢাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকতে থাকতেই বিএনপিকে সবক দিতে চোয়াল শক্ত করে ফেলে সাউথ ব্লক। এরপর আর ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ ছিল না খালেদা জিয়ার। ভাগ্য খোলে শেখ হাসিনার। ২০০৮-এর ডিসেম্বরে বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ভোটে প্রত্যাশিতভাবেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন মুজিবের মেয়ে। সেই থেকে বাংলাদেশে ক্ষমতায় আওয়ামি লিগ।

এই ১৪ বছরে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের কোন দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি করেছেন শেখ হাসিনা? তিনি বামহাতে জামাতকে নিষিদ্ধ করেছেন। ডানহাতে হেফাজতে ইসলামকে ‘সার-পানি’ দিয়েছেন। বাংলাদেশ জুড়ে আজ ‘দার-উল-উলুম দেওবন্দ’ ও ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত’ পরিচালিত ১৯ হাজার ১৯৯টি ক‌ওমি মাদ্রাসা। হাসিনা শুধু আজ শেখের বেটি‌ই নন ক‌ওমিজননীও বটে। ১৪ বছর আগেও ঢাকার রাস্তায় হিজাব পরিহিত নারীর দেখা মিলত হাতেগোনা। এখন হিজাব হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের মুসলমান নারীদের আত্মপরিচয়ের গর্বিত প্রতীক। শেখ হাসিনার জামানায় ‘ওয়াজ মাহফিল’ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সবথেকে ‌জনপ্রিয় বিনোদন। মাঠে-ময়দানে, টিভি-ইউটিউবে ওয়াজ করেই আলেম-উলেমারা কোটিপতি। ওয়াজ মাহফিলগুলিতে ১৫-২০ হাজার লোকের জমায়েতে প্রকাশ্যে ভিন্নধর্মকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন বক্তারা। ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা সংখ্যাগুরু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজটি নিখুঁতভাবেই করে চলেছে ওয়াজ মাহফিল। বাংলাদেশের মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজ আগের যে কোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক ও ধার্মিক এই আওয়ামি জামানায়। শেখ হাসিনা ভালো করেই জানেন, ক্রমবর্ধমান ইসলামিক মৌলবাদকে দমন করার শক্তি তাঁর নেই বরং ইসলামের খিদমতে খামতি থাকলে ‘তখত’ টিকিয়ে রাখাই মুশকিল। এই আওয়ামি শাসনের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বটবৃক্ষ যারা দেখতে পায়, তারা কারা?

দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লিগ ভেঙে আওয়ামি মুসলিম লিগের জন্ম ১৯৪৯ সালে। আওয়ামি মুসলিম লিগের দুই বড় খলিফার একজন ৪৬-এর দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস-এর মূল কারিগর হোসেন শহিদ সোর‌ওয়ার্দি অপরজন আব্দুল হামিদ খান ভাসানি। তিন ও চার নম্বরে ছিলেন শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিবের উচ্চশিক্ষা কলকাতায়। সোর‌ওয়ার্দিকে রাজনৈতিক গুরু মানতেন মুজিব। চুয়ান্নর প্রাদেশিক নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত সাফল্য লাভের পর ‘মুসলিম’ শব্দটা বাহুল্য মনে‌ হতে থাকে আওয়ামি মুসলিম লিগের নেতাদের কাছে। পরের বছর দলের তৃতীয় কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি স্নানের পর গা থেকে জল ঝাড়ার মতো ঝেড়ে ফেলে দেন সোর‌ওয়ার্দি-ভাসানি-মুজিবেরা। পদবি থেকে সাম্প্রদায়িকতা খসে পড়লেও আওয়ামি লিগের অন্তরাত্মা এক‌ই থাকল। সোর‌ওয়ার্দি-ভাসানি-মুজিবদের লাভের লাভ যেটা হল, রাতারাতি উদার, পরধর্মসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক নেতায় পরিণত হলেন তাঁরা। সেই সময় থেকেই আওয়ামি লিগের অঙ্গে এবং সঙ্গে সংখ্যালঘু বা হিন্দুদরদী তকমা জুটে গেল। যা আওয়ামি লিগের জন্য বিড়ম্বনার কারণ না হয়ে রাজনৈতিকভাবে সুদূরপ্রসারী পরমপ্রাপ্তি হয়ে দাঁড়ায়। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রশ্নাতীত। ষাটের ‌দশকের শুরুতেই মুজিব বুঝে যান-‌ শুধু মাত্র ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অবসান অবধারিত। পূর্ব পাকিস্তানে কোন ধরণের রাজনীতি করলে ভারতের রাজনৈতিক মহলের সুনজরে আসা যাবে, তা আওয়ামি লিগের নেতাদের মধ্যে সবথেকে ভালো ভাবে বুঝতে পেরেছিলেন একমাত্র মুজিবুর রহমান‌ই। ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকেই ভারতের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন শেখ মুজিব। তিনি উদার, অসাম্প্রদায়িক ও হিন্দুদরদী না সাজলে এটা সম্ভব হত না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কতটা উদার-অসাম্প্রদায়িক ও সংখ্যালঘু বান্ধব ছিলেন শেখ মুজিব? কতটা তাঁর দল আওয়ামি লিগ?

১৯৭১-এর ডিসেম্বরে দুই বাংলা ‌জুড়ে জয় বাংলার জয়জয়াকার। ১৬ ডিসেম্বর ‘মুক্তিযুদ্ধে’ মিত্রবাহিনীর বিজয়লাভ- স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। এক কোটির বেশি বাংলাদেশী শরণার্থী দেশে ফিরে গেলেও বহু হিন্দু পরিবার ওই রাস্তা মাড়ায় নি। যারা ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের দেশে ভাই-ভাই ঠাঁই-ঠাঁই হয়ে সুখে শান্তিতে বাস করবেন বলে দেশের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন, তাদের ভুল ভাঙতে দেরি হয় নি। আওয়ামি লিগ নেতাদের মধ্যে প্রতিবেশী হিন্দুদের পরিত্যক্ত জমি-বাড়ি দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। গায়ের জোরে যারা সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি জবরদখল করতে লাগলেন, তাদের অনেকেই ছিলেন ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। বাহাত্তরের অক্টোবরে শারদীয়া দুর্গাপূজায় প্রতিমাভাঙায় কোন‌ও ছেদ পড়ল না। মাত্র দশ মাসের ব্যবধানে কর্পূরের মতো বাংলাদেশের বায়ু থেকে কীভাবে মিলিয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা! একটা বিষয় খুব পরিস্কার- বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানস থেকে হিন্দু বিদ্বেষ-ঘৃণা দূর করতে ব্যর্থ হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ প্রসূত ক্ষণিকের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। স্বাধীন বাংলাদেশে মুজিবের শাসন স্থায়ী হয়েছিল ১৯৭৫-এর ১৫ অগাস্ট ভোর পর্যন্ত। ততদিনে হিন্দুরা বুঝে যায়, তাদের জন্য পাকিস্তান আর বাংলাদেশে কোনও প্রভেদ নেই। মুজিব বেঁচে থাকতেই বহু হিন্দু পরিবার জমি-বাড়ি খুইয়ে পাড়ি দেয় ভারতে। পাকিস্তান জামানা হোক কি বাংলাদেশ, আওয়ামি রাজত্ব হোক কি জিয়া-এরশাদ-খালেদার শাসন, পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দু নিষ্ক্রমণের ধারা কখনও বন্ধ হয় নি।

১৯৪১-এর আদমশুমারিতে পূর্ববঙ্গে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ২৮ শতাংশ। দেশভাগের বছর সংখ্যাটা তিরিশ-বত্রিশ থাকার‌ই সম্ভাবনা। দেশভাগের পর ১৯৫১-য় পাকিস্তানের প্রথম সেনসাসে দেশটির পূর্ব অংশে হিন্দুর সংখ্যা কমে দাঁড়াল ২২ শতাংশ। দেশভাগ-দাঙ্গার জেরে মাত্র চারবছরে পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দু হ্রাস পেল আট থেকে দশ শতাংশ। ১৯৬১-র জনগণনায় পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুর সংখ্যা নেমে হল ১৮.৫ শতাংশ। ৫১ থেকে ৬১- এই দশ বছরে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু কমল ৩.৫ শতাংশ। একাত্তর জুড়ে পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ- পূর্ব পাকিস্তান টালমাটাল। আদমশুমারি হল না। ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জনগণনা- হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা দেখা গেল ১৩.৫ শতাংশ। মুক্তিযুদ্ধের তিন বছর পর থেকে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা থিতু হওয়ার‌ই তো কথা। অথচ সাত বছর পর ১৯৮১-তে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জনগণনায় দেখা গেল দেশটিতে হিন্দুর সংখ্যা কমে ১২.১ শতাংশ। ৭৪ থেকে ৮১- এই সাত বছরে বাংলাদেশে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্ট ভোরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নিধন- রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে আওয়ামি লিগের দীর্ঘ বিচ্ছেদের সূচনা। সামরিক অভ্যুত্থান- পাল্টা অভ্যুত্থান। শেষে সেনানায়ক জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল। ৭৪-৮১, এই সাত বছরে বাংলাদেশে হিন্দু হ্রাস পেল ১.৪ শতাংশ। ১৯৯১ সালের আদমশুমারিতে বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা আরও কমে হল ১০.৫ শতাংশ। ৮১ থেকে ৯১- দশ বছরে হিন্দু কমল ১.৬ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ একুশ বছর পর বাংলাদেশে ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামি লিগ। পাঁচ বছর পরে সেনসাসে দেখা গেল, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতাপাদিত্যের দেশে হিন্দুর সংখ্যা কমে এক অঙ্কে- মাত্র ৯.২ শতাংশ! ১৯৯১ থেকে ২০০১- এই দশ বছরে বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ১.৩ শতাংশ। শেখ হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের শাসন‌ও হিন্দুদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিতে ব্যর্থ।

২০১১ সালে বাংলাদেশের পঞ্চম আদমশুমারিতে শেখ মুজিবের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের দেশ প্রথমবারের মতো নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে পরিণত হল। হিন্দুর সংখ্যা কমে দাঁড়াল মাত্র ৮.৫ শতাংশে! দশ বছরে হিন্দু কমল ০.৭ শতাংশ। ২০০১ থেকে ২০১১- এই সময়কালের মধ্যে পাঁচ বছর (২০০১-০৬) ছিল বিএনপি-জামাতের শাসন। একে বিএনপির সরকার, তায় দোসর জামায়াতে ইসলামি- সংখ্যালঘুদের অবস্থা কী হয়েছিল সহজেই অনুমেয়। আওয়ামি লিগ ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের হিন্দুরা এক ধরণের মানসিক স্বস্তিতে থাকে। আওয়ামি লিগ সরকার প্রদত্ত নিরাপত্তার ছদ্মআশ্বাস‌ই এই স্বস্তির কারণ। বিএনপির মতো দলের আমলে এই আশ্বাসটুকুও মেলে না। ২০০১ থেকে ০৬- বিএনপি-জামাতের শাসন সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত হয়ে আছে। করোনা অতিমারির কারণে নির্ধারিত বছরে বাংলাদেশে আদমশুমারি করা সম্ভব হয় নি। তবে বাইশের অগাস্টে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ষষ্ঠ আদমশুমারির রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। বিবিএস-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৭.৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ ১১ থেকে ২২- এই এগারো বছরে বাংলাদেশে হিন্দু কমেছে ০.৫৯ শতাংশ। এই এগারো বছরের পুরোটাই মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী (?) আওয়ামি লিগের অনমনীয় শাসনকাল। বিএনপি বিপর্যস্ত। জামায়াতে ইসলামি নিষিদ্ধ। মতিউর রহমান নিজামি সহ জামাতের চার শীর্ষনেতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ছেড়েছেন হাসিনা। কয়েকজন পচছে জেলে। কিন্তু তাতে সমাজ থেকে হিন্দু বিদ্বেষ বিন্দুমাত্র দূর হয় নি। বাংলাদেশ ‘ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস’-এর একটি হিসেব বলছে, স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরে দেশটিতে হিন্দু জনসংখ্যা কমেছে ৭৫ লক্ষ। প্রতি দশকে গড়ে ১৫ লক্ষের বেশি হিন্দু কমে যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। বিবিএস-এর প্রাথমিক সেনসাস প্রতিবেদন অনুযায়ী এই মুহুর্তে বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা ১ কোটি ৩১ লক্ষ ৩০ হাজার ১০৬। প্রতি দশকে ১৫ লক্ষ করে হিন্দু অদৃশ্য হতে থাকলে আগামী তিরিশ বছর পর অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের দেশে কটা হিন্দু অবশিষ্ট থাকবে?

আওয়ামি লিগের সবথেকে বড় রাজনৈতিক সাফল্য হল, ভারত সহ বহির্বিশ্বকে এটা বিশ্বাস করানো যে তাদের আমলে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা সবথেকে নিরাপদ ও শান্তিতে থাকে। আওয়ামি লিগ সংখ্যালঘুদের কেমন ভালবাসে, এই নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে অনেক রসিকতা চালু আছে। নিঃসন্দেহে আওয়ামি লিগ হিন্দুদের ঘনিষ্ঠ। কারণ হিন্দুদের ভোট ও জমিবাড়ি- দুটোর উপরেই সবথেকে বেশি হক মুজিবের দলের। বাহাত্তর থেকেই আওয়ামি লিগের নেতারা বুঝে যান, মালাউন মরলেও লাভ, বাঁচলেও লাভ। মালাউন দেশ ছাড়লেও লাভ, মার-গুঁতো খেয়ে দেশে থাকলেও লাভ। বাংলাদেশের নির্বল হিন্দুদের কাছে আওয়ামি লিগের অনুকম্পাটুকুই যথেষ্ট। তাই ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে নৌকা মার্কাতেই ছাপ মারে তারা। দেখা গেছে, হিন্দুর সম্পত্তি আত্মসাতে আওয়ামি লিগের নেতাদের অনেক পেছনে বিএনপি-জামাতের লোকেরা। বিএনপি-জামাতের লোকেরা হিন্দুর জমিবাড়ি, ভিটেমাটি লুটে খেয়েছে শত্রু হিসেবে। আওয়ামি লিগের মস্ত সুবিধা, তারা বন্ধু সেজেই নিষ্ক্রমণরত হিন্দুর সম্পত্তি জলের দরে হাতিয়ে নিতে পারে। আওয়ামি লিগের ধূর্ত কোন‌ও গ্রাম্যনেতা তাই পান চিবুতে চিবুতে বলতেই পারে- “মালাউন দ্যাশে থাকলে তাগো ভোটটা আমাগো। চ‌ইল্যা গ্যালে মালাউনের জমিডা আমাগো।” টানা ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশ আওয়ামি শাসনে। এই ১৪ বছরে কি জমিবাড়ি, ভিটেমাটি থেকে হিন্দুদের উচ্ছেদ বন্ধ আছে? বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের দাবি, শেখ হাসিনার আমলেও প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি হামলা-জুলুমের ঘটনা ঘটছে সংখ্যালঘুদের উপর। অধিকাংশ ঘটনাই সংবাদ মাধ্যমে আসে না। হামলা-হুমকি-ধামকির একটা বড় কারণ দুর্বল সংখ্যালঘু পরিবারের এক ছটাক জমি দখল অথবা পরিবারের কিশোরী মেয়েটির দিকে নজর। গ্রামের দিকে নীরবে হিন্দু পাড়াগুলির চরিত্র বদলে যাচ্ছে। হিন্দু ঘর কমছে। হিন্দুর জমি-বাড়ি গোপনে হস্তান্তর হয়ে যাচ্ছে মুসলমানের কাছে। দশ বছর আগেও যেই গ্রামে ১০০ ঘর হিন্দু পরিবার ছিল। এখন সেখানে ২০-৩০ ঘর হিন্দু বাস করছে। নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দাবি করা আওয়ামি লিগের ঘোর জামানাতেই সংখ্যালঘু গ্রামগুলি এইভাবে সংখ্যাগুরুদের দখলে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের অভিযোগ, গত দশ বছরে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ১০ হাজার হামলার ঘটনা ঘটেছে।

শেখ হাসিনার জামানায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে অপমান-অপদস্থ ও নির্যাতন করার সবথেকে বড় উছিলা, ধর্মানুভূতিতে আঘাত। কলেজ পড়ুয়া থেকে কলেজের অধ্যক্ষ, স্কুলের শিক্ষক থেকে গ্রামের‌ নিরীহ যুবক- হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউই নিরাপদ নন। ফেসবুকে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক পোস্ট করা হয়েছে- এই অভিযোগে যখন তখন যে কার‌ও বাড়িতে হামলা চলতে পারে। যে কার‌ও বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মিথ্যে অভিযোগ তুলে তাকে গ্রেফতার করানো যেতে পারে। এরপর বাকি থাকে- এই অজুহাতে গোটা হিন্দু গ্রাম আক্রমণ করে লুটপাট, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দেওয়া। হিন্দুদের মন্দির-উপাসনালয় অবাধে ভাঙচুর করা। মসজিদে মাইক ফুঁকিয়ে হাজার হাজার লোককে উত্তেজিত করে হিন্দু গ্রাম আক্রমণের ডাক দেওয়া হয়। পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখে। মালাউনের মহল্লা পুড়ে শ্মশান হ‌ওয়ার পর পুলিশ গিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। প্রত্যেকটি ঘটনায় পরে প্রমাণিত হয়েছে- হিন্দু সম্প্রদায়ের কার‌ও নামে ভুয়ো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য পোস্ট করে পরিকল্পনামাফিক উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে সত্যাসত্য যাচাই করার আগেই, ষড়যন্ত্রের শিকার হিন্দুকেই গ্রেফতার করে জেলে ভরেছে হাসিনার পুলিশ!

অদূর ভবিষ্যতে আওয়ামি লিগ ক্ষমতায় থাকুক আর নাই থাকুক, বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির ইসলামিকরণ থেমে থাকবে না। তেইশের শেষে বাংলাদেশে নির্বাচন। শেখ হাসিনা যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরীয়া বলেই মনে হচ্ছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হাসিনাকে ডবল গেম খেলে যেতে হবেই। একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হাসিনাকে প্রমাণ দিয়ে যেতে হবে, তিনি সাচ্চা ঈমানদার মুসলমান এবং নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে তাঁর চেয়ে ভালো ইসলামের খিদমত অন্য কেউ করতে অক্ষম। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে মুজিবকন্যাকে প্রমাণ করতে হবে ইসলামিক মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে তিনি একজন নিরলস যোদ্ধা। আওয়ামি লিগ সরকার কৌশলগত কারণে ভারতবান্ধব হলেও দেশের সংখ্যালঘুদের সুহৃদ নয়। হিন্দুদের প্রতি আওয়ামি লিগের ঐতিহাসিক প্রেমটিও আসলে একটি ধ্রুপদী রাজনৈতিক ছলনা। কোনও সন্দেহ নেই, আওয়ামির ছদ্ম ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি মোহ‌ পূর্ববঙ্গের বাঙালিহিন্দু জনগোষ্ঠীর সর্বনাশের অন্যতম কারণ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s