চৈতন্যহত্যা: পোস্ট স্ক্রিপ্ট – তমাল দাশগুপ্ত

চৈতন্যহত্যা : পোস্টস্ক্রিপ্ট (২০১৬ সালের লেখা)

(১)

চীনে ভাষায় (এই চীনে কথাটা বলতে গিয়েই মনে হল, অপমান করা হচ্ছে নাকি? উড়েদের উড়ে বললে নাকি অপমান হয় শুনছি) একটা অভিশাপ আছে, এরিক হবসবমের বইতে পড়েছিলাম। তুমি যেন আকর্ষণীয় সময়ে বেঁচে থাকো। মে ইউ লিভ ইন ইন্টারেস্টিং টাইমস।

চৈতন্যদেব যে সময়ে ধরাধামে অবতীর্ণ, সেটাকে ইন্টারেস্টিং টাইমস বলা যায়। বাংলায় নবদ্বীপ তখন সম্ভবত সারা পৃথিবীতে দর্শনচর্চার শ্রেষ্ঠ স্থান, ভারতের শ্রেষ্ঠতম তো বটেই। বঙ্কিম বলছেন যে এসময় বাংলায় একটা রেনেসাঁস হয়েছিল। সক্রেটিস প্লেটো অ্যারিস্টটলের প্রাচীন গ্রীস যেমন একসময়ে ছিল, যেমন প্রাচীন ভারতের নালন্দা ছিল একসময়ে, সে হচ্ছে চৈতন্যের নবদ্বীপ। অথচ ঘাড়ের ওপরে ঝুলছে কাজীর খাঁড়া, গৌড়ের সুলতান থেকে থেকেই অত্যাচার করছেন। পৃথিবীতে আর কোথাও এরকম পরিস্থিতির মধ্যে দার্শনিক কাজ কোনওদিনও হয়েছে বলে আমার জানা নেই। দার্শনিক কাজ তো ছেড়ে দিন, আহার নিদ্রা মৈথুনই চালানো যায় না। বাংলাদেশে অনবরত অত্যাচারের শিকার কোণঠাসা ছত্রভঙ্গ হিন্দুদের মধ্যে যদি এখন হঠাৎ করে একটা প্রবল ইন্টেলেকচুয়াল আন্দোলন ওঠে তখন যেমন অবাক হবেন, বা কাল যদি দেখতে পান পশ্চিমবঙ্গের যে সব হিন্দুত্ববাদীদের সর্বক্ষণ ওই মুসলমানে খেয়ে ফেলল বলে ফেসবুক টুইটারে পোস্ট করা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই তারা আচমকা মারাত্মক সব উঁচুদরের প্রবন্ধ কি কবিতা লিখে ফেলছে, দারুণ সব চিন্তাভাবনা করে ফেলছে, তখন যেমন হাঁ হয়ে যাবেন, সেরকম অবাক আমরা কিন্তু কেউই হইনা নবদ্বীপ রেনেসাঁস নিয়ে। অথচ সে সময়টা এমন, যে তখন হিন্দুসমাজে জগাই মাধাইয়েরই আবির্ভাব ঘটছে গণ্ডায় গণ্ডায়, ওদিকে কাজীর বিচার বলে যে বাংলা ইডিয়মটা চালু আছে, সেটা থেকে বোঝা যায়, মধ্যযুগে এইসব শরীয়া কোর্টগুলোতে বিচারের কিরকম ছিরি ছিল। চূড়ান্ত ডামাডোল আর অরাজকতার মধ্যেও, এহেন নবদ্বীপে রেনেসাঁস ঘটছে, বাসুদেব সার্বভৌম আসছেন, এ যে কি করে সম্ভব হয়েছিল, সে ভাবলে আমি আমার পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধায় অভিভূত হয়ে পড়ি।

এই বাসুদেব সার্বভৌম, সেযুগের ভারতের শ্রেষ্ঠতম দার্শনিক ও পণ্ডিত। সার্বভৌম পুরীতে চলে যান, রাজার আমন্ত্রণে। চৈতন্য যে পুরীতে গিয়ে আস্তানা গাড়লেন, সেটা বাসুদেবের সাহায্য ও প্রশ্রয় ছাড়া হতই না। প্রতাপরুদ্রের গুরুদেব তিনি, অতএব জগন্নাথ মন্দিরে এইবার এক বাঙালির প্রাধান্য শুরু হয়। পাণ্ডাচক্র বাসুদেবকে ভয় পেত। তিনি অকুস্থলে এসে চৈতন্যদেবকে না বাঁচালে জগন্নাথ মূর্তিকে আলিঙ্গনের অপরাধে প্রথম দিনই চৈতন্যকে পাণ্ডারা খুন করতে উদ্যত হয়েছিল।

গৌড়তন্ত্র কথাটা শশাঙ্কের রাজত্ব সম্পর্কে ব্যবহার করা হয়। আমরা যদি গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনকে বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে দেখব, এই আন্দোলনকেও গৌড়তন্ত্র বলা যায়। অনেকগুলো কারণেই বলা যায়, সেগুলো এর পরে এক এক করে লিপিবদ্ধ করার ইচ্ছে আছে। এই আন্দোলন গৌড়ের মনীষাকে বাকি ভারতের কাছে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, গৌড়ের প্রজ্ঞার ছায়ায় মধ্যযুগের ভারতকে ধর্মসংস্কারে ব্রতী করতে পেরেছিল।

এবং এই গৌড় মানেই মুসলমান, ম্লেচ্ছ, পাণ্ডাদের কাছে। আজকের হিন্দুত্ববাদীদের মত সেযুগের পাণ্ডাও নিজের মলমূত্র ছাড়া আর কিছু ত্যাগ করত না, কাজেই মৌরসীপাট্টা ত্যাগ করার তো প্রশ্নই নেই। হরিদাসকে যারা কোনওদিন জগন্নাথ মন্দিরে ঢুকতে দেয়নি, সে পাণ্ডাচক্র চৈতন্য আন্দোলনকেও গৌড়ের মুসলমান শাসকের ষড়যন্ত্র বলবে, এতে আর আশ্চর্যের কি! তবে একটা ব্যাপার হল, বাসুদেব আর চৈতন্য না হয় গৌড়ের মুসলমান শাসকের স্পাই, কিন্তু উড়িষ্যার বিপদ কি শুধু মুসলমান শাসকের কাছ থেকে আসছিল?

না।

প্রতাপরুদ্রের ওপরে তো বিজয়নগরের হিন্দু রাজা কৃষ্ণদেবও অনবরত আক্রমণ চালাচ্ছিলেন। বারংবার পরাজয়ের পরে প্রতাপের পুত্র বন্দী হয়, প্রতাপকে এক অপমানজনক সন্ধির শর্ত মেনে নিতে হয়, তাঁর সুন্দরী বিদুষী কন্যা তুক্কা কৃষ্ণদেবের হারেমে স্থান পায়। তুক্কা ধর্ষিতা হয়েছিলেন কৃষ্ণদেবের হাতে। হিন্দুর হাতে ধর্ষিতা হলে সম্ভবত ধর্ষণের অপমানটা হয় না। আমি ব্যঙ্গ করছি বটে, কিন্তু গেরুয়া মর্কটদের শুধিয়ে দেখবেন, এরা অনেকে সত্যি সত্যিই এমন ভাবে। মস্তিষ্কে ঘিলুর জায়গায় গোবর থাকলে যা হয়।

বিশ্বহিন্দুরা আজ যেমন ইতিহাস পড়ে না, সেযুগের পাণ্ডাদের অনুগত চামচারাও নিশ্চয়ই অনুরূপভাবে নির্বোধ ছিল। চৈতন্যসহ গৌড়ীয়রা নাহয় মুসলমানের স্পাই (চৈতন্যের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে মাধব পটনায়কের প্রথম দুশ্চিন্তা, “গৌড়ীয় কদর্থ করিবে, ম্লেচ্ছ রাজাকে খর বলিবে”, অর্থাৎ বাঙালিরা কুকথা বলবে আর মুসলমান শাসককে গিয়ে উড়িষ্যার বিরুদ্ধে খ্যাপাবে)। তা বিজয়নগরে তো হিন্দু রাজা, সেই হিন্দু রাজ্যও তো উড়িষ্যাকে সেযুগে বিধ্বস্ত করতে ছাড়েনি। বিশ্বহিন্দুত্বের পলকা ফানুস সামান্য ইতিহাসজ্ঞান থাকলেই ফেটে চৌচির হয়ে যায়। উড়ে পাণ্ডা একদিন চৈতন্যকে হত্যা করেছিল, চৈতন্যহত্যার অনুসন্ধান করতে গেছিলেন যিনি, সেই লেখক জয়দেব মুখোপাধ্যায়কে হত্যা করেছিল। আর আজ তাদের সরকারের মদতে একদল উড়ে মহোল্লাসে চর্যাপদ, জয়দেব, রসগোল্লা চুরি করছে। হ্যাঁ হে গেরুয়া, কোথায় আছে তোমাদের বিশ্বহিন্দুত্ব? কোন পাপোষের তলায়, কোন বিছানার নিচে লুক্কায়িত আছে?

(২)

পূজ্যপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। অদ্বৈত আচার্যের বংশধর। প্রথমে ব্রাহ্ম, পরে উনিশ শতকের বাংলার নববৈষ্ণব আন্দোলনের পুরোধা। পুরীতে ছিলেন, অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিলেন, জগন্নাথ পাণ্ডারা পুনরায় শঙ্কিত, এবং উনি মারা যান মাত্র আটান্ন বছর বয়েসে। বিষপ্রয়োগে মৃত্যু? সেরকম একটা তত্ত্বই সামনে আসছে।

আবার, যেসময়ে চৈতন্য হত্যা নিয়ে প্রায় কোনও বাঙালিই ওয়াকিবহাল নয়, সেসময় বিজয়কৃষ্ণ নাকি চৈতন্য অন্তর্ধান নিয়ে মাথা ঘামাতেন, এবং এ নিয়ে চৈতন্য মহাপ্রভুর উদ্দেশ্যে তাঁর আকুল প্রশ্ন ছিল, এ কথা বিজয়কৃষ্ণের শিষ্য কুলদানন্দ লিখে গেছেন সদগুরুসঙ্গ নামক পুস্তকে।

যদি বিজয়কৃষ্ণ বিষপ্রয়োগে পুরীতে মারা গিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে পাণ্ডাচক্রের ওপরে আমাদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

আমাদের প্রতিবেশী রাজ্যের একটা তীব্র বাঙালিবিদ্বেষী চক্র সেই মহাপ্রভুর সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই কুকাজগুলো করে বেড়াচ্ছে, অথচ বাঙালির কোনও তাপোত্তাপ নেই। আত্মবিস্মৃত জাতি কি বঙ্কিম সাধে বলেছেন!

এক ফেসবুক বন্ধু জানিয়েছেন বিজয়কৃষ্ণ জটিয়াবাবা বলে পরিচিত ছিলেন সেখানে সাধারণের মধ্যে। আবার পাণ্ডারা আধিপত্য ক্ষুন্ন হবার ভয়ে চক্রান্ত শুরু করে। একদিন মহাপ্রসাদ বলে একটি লাড্ডু নিয়ে এসে দেয় তারা। এবং তৎক্ষণাৎ সেটি খেতে বলে। বলে, এই মহাপ্রসাদ ফেলে রাখতে নেই।
তার পরই চূড়ান্ত অসুস্থতা। এবং মৃত্যু।

(৩)

চৈতন্যকে হত্যা করা হয়েছিল, এটা যারা কোনওমতেই মানতে চান না এমন যে কোনও বাঙালিকে জিগ্যেস করুন, যে মহাপ্রভুর অন্তর্ধান কি করে হল, তিনি বলবেন, ওই তো তিনটে মত আছে। ভক্ত বলে জগন্নাথে বিলীন, যুক্তিবাদী বলে পায়ে ইঁটের খোঁচায় মৃত্যু, এছাড়া পুরীর সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিয়ে মহাপ্রভু দেহত্যাগ করেছিলেন, ভক্তিবাদী ও যুক্তিবাদী দুজনেরই পছন্দের এই মতটাও আছে।

আউলিয়াচাঁদ তত্ত্ব ইজ নট রিয়েলি অ্যান অপশন, কাজেই ওদিকে যাওয়ার দরকার নেই, আমিও যাচ্ছি না। যদিও জয়দেব মুখার্জি এবং মালীবুড়ো দুজনেই পরম ভক্তিভরে ওই তত্ত্বের এবং তার প্রোপোনেন্ট শান্তা মায়ীর উল্লেখ করেছেন, কিন্তু দুজনের কেউই ওটা মন থেকে বিশ্বাস করেন নি, করা যায়ও না (যারা জানেন না,

তাদের জন্যঃ চৈতন্য পুরী থেকে অন্তর্ধান করে আরও দুশো চুরাশি বছর বেঁচেছিলেন এবং কর্তাভজা সম্প্রদায়ের নেতা আউলিয়াচাঁদই চৈতন্য, এই মিথ হল আউলিয়াচাঁদ তত্ত্ব। এটা চৈতন্য হত্যা মানেন না এমন লোকেরা সাড়ে তিন নম্বর অপশন করতে পারেন, তবে অ্যাট দেয়ার ওউন রিস্ক)।

আশ্চর্য কথা হল, পুরীর সমুদ্রের জলে মহাপ্রভু বিলীন হয়েছিলেন, এটা বহুদিন ধরে প্রচলিত থাকলেও, আসলে কোনও বৈষ্ণব লেখক, মহাপ্রভুর কোনও জীবনীকারই কিন্তু এরকম লিখে যান নি, এবং এটা নিতান্তই রটনা। মহাপ্রভুর তিরোধান সমুদ্রে হয়েছিল কোনও জীবনীগ্রন্থ এমনটা বলেনি কোথাও।

দীনেশ সেন সর্বপ্রথমে এই ব্যাপারে আলোকপাত করেছিলেন, এবং এই মিথটিকে ভেঙেছিলেন তাঁর চৈতন্য অ্যান্ড হিজ এজ বইতে। কোথাও লেখা নেই, তাহলে এই সমুদ্রের জলে মিশে যাওয়ার কথাটা চালু হল কেন এবং কিভাবে? উত্তর হল, কৃষ্ণপ্রেমে উন্মাদ হয়ে সমুদ্রের জলে একবার চৈতন্য ঝাঁপ দিয়েছিলেন এবং দীর্ঘক্ষণ পরে তাঁকে উদ্ধার করা হয়, এরকম বর্ণনা কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতে পাওয়া যায়। চৈতন্যজীবনী ভালোভাবে পড়া নেই, এরকম কোনও ব্যক্তিই সম্ভবত প্রথম এই সমুদ্রে বিলীন হওয়ার কথাটা চালু করেছেন। মেলভিল টি কেনেডি তাঁর ইংরেজি বই দ্য চৈতন্য মুভমেন্ট বইতে এই সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার তত্ত্বেই বিশ্বাস করেছেন, সেটা নেহাতই আনাড়ির মত কাজ হয়েছে। মেলভিলের অনুমাননির্ভর যুক্তি, আগেও তো একবার ঝাঁপ দিয়েছিলেন, সুতরাং পরেও দিয়ে থাকতে পারেন। আগেও তো পাণ্ডারা চৈতন্যদেবকে খুন করতে উদ্যত হয়েছিল দেখেছি লিপিবদ্ধ আছে, সেক্ষেত্রে পরেও সেরকমটা তারা করে থাকতে পারে, এরকম অনুমানও তো করা যায়, তাই না? কিন্তু মেলভিল অনুমানের ব্যাপারে নিতান্তই পাণ্ডাবাঁচোয়া। চৈতন্যদেব সমুদ্রে লীন হয়ে থাকলে সেটার আভাস কোনও না কোনও বৈষ্ণব গ্রন্থকার দিতেন, সেটা কিন্তু কোথাও নেই। দীনেশ সেন থেকে শুরু করে হালের মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল, সবাই সমুদ্রে বিলীন হওয়ার তত্ত্বকে খারিজ করেছেন।

অতএব, যারা চৈতন্যহত্যা মানেন না, তাদের অপশন তিন থেকে কমে দাঁড়ালো দুই। জগন্নাথ বিগ্রহে চৈতন্যদেব বিলীন হয়েছেন, আর ইঁটের টুকরোর খোঁচায় মৃত্যু হয়েছে। এই দুটো অপশনকে নেড়েচেড়ে দেখবেন? চলুন, দেখা যাক। জগন্নাথ বিগ্রহে রক্তমাংসের একটা মানুষ মিশে গেল, এরকম স্পেশাল এফেক্টে আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না, এক যদি না মন্দিরের (গুণ্ডিচাবাটী/জগন্নাথ মন্দির/তোটা গোপীনাথ মন্দির) ভেতরে চৈতন্যদেবকে পুঁতে ফেলার দিকেই ইঙ্গিতটা থেকে থাকে। সেক্ষেত্রে দ্বিমতের জায়গা নেই।

ইঁটের খোঁচায় সেপ্টিক হয়ে মারা যাওয়ার কথা শুধু দুজন বলেছেন। মাধব পটনায়ক, এবং মাধব পটনায়ককে অনুসরণ করে জয়ানন্দ।

আচ্ছা, ইঁটের খোঁচায় মারা গেলে মহাপ্রভুর মরদেহটি লোপাটের প্রয়োজন হল কেন, এবং মহাপ্রভুর অন্যান্য পরিকরদেরই বা রাতারাতি উধাও করা হল কেন?

চৈতন্য মহাপ্রভুর সমাধি দেখতে পাই না কেন পুরীতে? মহাপ্রভুর মরদেহটা কোথায় গেল? যদি অসুখে মৃত্যু হয়, মৃতদেহটি গুম করা হল কেন, কিসের ভয়ে?

(৪)

বাংলার কবিগান আর কবিয়ালদের নিয়ে একটা অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি বা জাতিস্মর ফিল্ম যা উৎসাহ সৃষ্টি করে গেছে, সেরকমটা প্রবন্ধ লিখে করা যেত না। ঈশ্বর গুপ্ত (নিজেও কবিগান বাঁধতেন এককালে) বাংলার কবিয়ালদের ইতিহাস প্রথম লিখে রাখেন, তিনি না লিখে রাখলে এগুলো কিচ্ছু পেত না পরবর্তী প্রজন্ম। তবে ঈশ্বর গুপ্তের লেখা কবিওয়ালাদের ইতিহাসের কথা আজ প্রায় কেউ জানে না। কারণ ইতিহাস লোকে পড়ে না, কিন্তু ফিল্ম দেখে। ফিল্ম সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টা পৌঁছে দিয়েছে।

সেরকম ভূমিকাই পালন করেছে চৈতন্য হত্যা নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলো। সবাই উল্লেখ করেন কালকূটের জ্যোতির্ময় শ্রীচৈতন্যর, সেটি চৈতন্যহত্যা নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস, এরকমই শুনেছি এতদিন। এরপরে কাঁহা গেলে তোমা পাই, জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের। রূপক সাহার ক্ষমা করো হে প্রভু খুব সাম্প্রতিককালে। অভিজিত তরফদারের গতবছর শুকতারায় প্রকাশিত লেখাটা খুবই কাঁচা তাই ধর্তব্য নয়।

চৈতন্যহত্যা নিয়ে আর কি কোনও উপন্যাস লেখা হয়েছে এখনও পর্যন্ত? আমার মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে।

আমি জ্যোতির্ময় শ্রীচৈতন্য সম্প্রতি পড়তে শুরু করেছি। পড়তে গিয়ে বেশ চমকে উঠলাম। তুহিন মুখোপাধ্যায় আর মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল – দুজনেই তাদের স্টাডিতে বলছেন যে কালকূট চৈতন্যকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। কালকূট কিন্তু উপন্যাস লেখেন নি। সাল তারিখ দিয়ে রীতিমত ইতিহাস লিখেছেন। স্রেফ তথ্যপঞ্জী দেন নি বলে সেটাকে উপন্যাস বলা যায় না, বরং এ লেখাটা পপুলার হিস্ট্রির পর্যায়ে পড়ে।

কালকূট ছদ্মনামে সমরেশ বসু উপন্যাস লিখেছেন অনেক, এবং জ্যোতির্ময় শ্রীচৈতন্যকেও উপন্যাস ভেবে নেওয়ার প্রবণতা সেখান থেকেই এসেছে। যেমন ধরা যাক, নীললোহিতের লেখা মানেই আমরা যেমন ধরে নেব ভ্রমণ-কাহিনী। কিন্তু কালকূটের এই লেখাটা তথ্যভিত্তিক ইতিহাস, আমি পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

এই “উপন্যাসে”র শুরুতে লেখক কি বলছেন দেখুন।
“সুলতান হোসেন শাহের আমলে হিন্দু বাঙালীদের প্রতি কী রকম আচরণ করা হত সে-সব ঘটনা আমাকে নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করতে হবে। আমাকে নিজেকে কিছু বানিয়ে বলতে হবে না। কারণ এখন আমি গৌড়-বঙ্গের সেই স্বাধীন সুলতানদের আমলেই চলেছি। আমি কালকূট। আমার পক্ষে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক নিয়ে

সাম্প্রদায়িকতা করার কোন দরকার নেই। কারণ কালকূটের কোনও জাত নেই। সম্প্রদায় নেই। যে-পথেই তার যাত্রা হোক, পাদভৌম ধুলা পথে, অথবা ইতিহাসের পাতায়, বুকের জ্বালা নিবারণের জন্য, সে তার হলাহলকে অমৃতে পরিণত করতে চায়।”

এটা পড়ে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে কালকূট ইতিহাস লিখছেন, কল্পকাহিনী নয়। হ্যাঁ, ইতিহাস লেখার পাদটীকা কণ্টকিত নিয়ম না মেনে, ফিকশন লেখার সহজবোধ্য চালেই লিখে গেছেন। কিন্তু ইতিহাসবিদের একটা প্রয়োজনীয় কোয়ালিটি হল কবিত্বগুণ, কলহন তো বলেই গেছেন।

(৫)

নরসিংহ নাড়িয়াল নামটা যদি আপনার চেনা চেনা না লাগে, তাহলে আশ্চর্যের কিছু নেই। রাজা গণেশের নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছেন। নরসিংহ নাড়িয়াল ছিলেন এই রাজা গণেশের মন্ত্রী, যার সু(বা কু, ডিপেন্ডিং অন দ্য পার্সপেকটিভ)পরামর্শে গণেশ সিংহাসনে আসীন হয়েছিলেন,ফলে মধ্যযুগে গৌড়ে অবিচ্ছিন্ন মুসলমান শাসনের মাঝখানে হিন্দু শাসন শুরু হয়েছিল।

এই নরসিংহ নাড়িয়াল ছিলেন অদ্বৈত আচার্যের পূর্বপুরুষ, ঈশান নাগরের অদ্বৈত প্রকাশ গ্রন্থে জানা যাচ্ছে। নরসিংহ শ্রীহট্টের মানুষ, পরে গৌড়ের রামকেলিতে চলে আসেন। গণেশ নামটাই তুর্কো-পাঠানদের কাছে প্রচণ্ড ধিক্কৃত, সুফি ধর্মগুরুরা গণেশের বিরুদ্ধে পবিত্র জেহাদের ডাক দিয়েছিলেন। কাফের হয়ে সিংহাসনে চেপে বসা নিতান্তই অনাসৃষ্টি ব্যাপার। সেই গণেশের রাজকাণ্ডের নাটের গুরু ছিলেন নরসিংহ নাড়িয়াল।

হুসেন শাহের সময়ে একটা গুজব উঠেছিল যে নবদ্বীপের কোনও ধনুর্ধারী ব্রাহ্মণ গৌড়ের রাজা হবে। ফলে প্রচণ্ড অত্যাচার শুরু হয় নবদ্বীপে। যদিও এর পরে সেই অত্যাচার কিঞ্চিত প্রশমিত হয়েছিল, কারণ অনেককে মেরেও তীরধনুকের খোঁজ মেলেনি। এখন নরসিংহর বংশধর অদ্বৈত আচার্য যে বৈষ্ণব আন্দোলনের নেতা, তার সম্বন্ধে নতুন করে গুজব ছড়ানোর সম্ভাবনা আশ্চর্য নয়! চৈতন্যকে যে রামকেলি থেকে উড়িষ্যায় পাঠিয়ে দেওয়া হল, তার কারণ অবশ্যই বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলন সেযুগের ইসলামিক শাসকের কাছে একটা থ্রেট।

লক্ষ্য করুন, শাক্তরা কিন্তু থ্রেট ছিলেন না। সেযুগের শাক্তরা কোনও সংগঠিত জনআন্দোলনের ধার তো ধারতেনই না, ওদের প্রবণতা ছিল গুপ্তসাধনার দিকে। উপরন্তু নিজেরাই অনেক সময়ে বিজাতীয় শাসকের সঙ্গে মিশে দেশের মানুষের ওপর অত্যাচার করতেন। জগাই মাধাই চৈতন্য নিত্যানন্দের শ্রীচরণে ঠাঁই নেওয়ার আগে শাক্ত ছিলেন।

অদ্বৈতে ফিরি। অদ্বৈত আচার্যর বংশ বাংলার ইতিহাসে, বাঙালি মানসে যে স্থান অধিকার করে আছে, দুর্ভাগ্যের বিষয় ইতিহাসবিদ প্রায়ই সেটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে অক্ষম হন। পূজ্যপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর কথা এর আগে একদিন বলেছিলাম। অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখছেন, তিনি অদ্বৈতর বংশধর শুনে বৃন্দাবনে এক মৃতপ্রায় বাঙালি বৃদ্ধ তাঁর পা জড়িয়ে ধরে আধঘণ্টা ধরে হাউহাউ করে কেঁদেছিলেন, সে বর্ণনা দীনেশ সেনের বৃহৎ বঙ্গে আছে, পড়লে চক্ষু বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই লেভেলের জনপ্রিয়তা, আমাদের বৈষ্ণব নায়কেরা যেরকম পেয়েছেন, তাতে প্রমাণিত, এই জাতির নেতৃত্ব তাঁরাই করে আসছেন মধ্যযুগ থেকে।

চৈতন্য আন্দোলনের যে চেতনা, তা অবশ্যই রাজনৈতিক। চৈতন্য হত্যাকে এইজন্য রাজনৈতিক হত্যা হিসেবেই দেখতে হবেঃ চৈতন্য হত্যা একটা আদ্যোপান্ত রাজনৈতিক হত্যা। এবং আমার স্টেটাস পড়ার পরে এই প্রশ্নটা বারবার করেন অনেকে, আর আমাকেও বারবারই উত্তর দিয়ে যেতে হয়, এই উত্তর আবার তাই দিচ্ছি। হিন্দু হলেই বাই ডিফল্ট বাঙালি হয় না, মুসলমান হলেই বাঙালিত্ব-বিচ্যুত হয় না। যবন হরিদাসের ইতিহাস পাঠ করেও এ কথা যে বোঝেনি, তাকে বোঝানোর চেষ্টাই পণ্ডশ্রম। চৈতন্য আন্দোলনের শত্রু যতটা ইসলাম, ততটাই পাণ্ডা-হিন্দুত্ব, সে আন্দোলনের ইতিহাস পাঠ করলেই বোঝা যাচ্ছে।

নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে মিশন নেতাজি বলে একটা সংগঠন তৈরি হয়েছিল, অনুজ ধর তারপরে দুর্দান্ত কিছু বই লিখেছেন। মুখার্জি কমিশন হয়েছিল, তাতে অনেক অজানা তথ্য সামনে এসেছিল। খুব সম্প্রতি ডিক্ল্যাসিফিকেশনও হয়েছে কিছু।

চৈতন্য অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে কোনও মিশন চৈতন্য জাতীয় কিছু যে আজও তৈরি হয়নি, হতে পারেনি, সেটা প্রমাণ করে, যে গান্ধী পরিবার, কংগ্রেস দল আর আনন্দবাজারের মিলিত শক্তির থেকেও পাণ্ডাচক্র এবং চৈতন্যবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী লবি অনেক বেশি ভয়ানক, অনেক বেশি বিপজ্জনক।

© তমাল দাশগুপ্ত

http://fb.me/tdasgupto থেকে, ১৬ই এপ্রিল ২০২০

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s