পঞ্চানন ঃ- বাংলার শিশুরক্ষক দেবতা

পঞ্চানন বা পঞ্চানন্দ বা পাঁচু ঠাকুর বাংলার এক খ্যাতিমান লৌকিক দেবতা। লোকবিশ্বাসে ইনি মহাদেব শিবের এক অর্বাচীন রূপ; অন্যমতে, ইনি শিবের পুত্র। মূলত গ্রামরক্ষক, শিশুরক্ষক রূপে পঞ্চানন পূজিত হন; তবে সন্তানদাতা, শস্যদেবতা হিসাবেও বাঙালি হিন্দু সমাজে তার পূজার প্রচলন আছে। রক্তবর্ণ পঞ্চাননের মুণ্ড-মূর্তি ও ঘট প্রতীক পূজিত হয়।

মূলত রাঢ়-বঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, হাওড়া-হুগলী-কলকাতা, বর্ধমান, নদিয়া ও বাঁকুড়াতে এঁর পূজা হয়ে থাকে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার স্থানবিশেষে ইনি ‘বাবাঠাকুর’ নামেও পরিচিত।

মহাদেব শিবের সঙ্গে পঞ্চানন ঠাকুরের দেহাকৃতি ও বেশভূষার সাদৃশ্য আছে, তবে উভয়ের রূপকল্পনায় পার্থক্যও বিদ্যমান। পঞ্চাননের গাত্রবর্ণ লাল এবং চোখমুখের ভঙ্গি রুদ্ররূপী; বেশ বড় গোলাকার ও রক্তাভ তিনটি চোখ ক্রোধোদ্দীপ্ত। প্রশস্ত ও কালো টিকালো নাক, দাড়ি নেই, গোঁফ কান অবধি বিস্তৃত। মাথায় পিঙ্গলবর্ণের জটা চূড়া করে বাঁধা এবং তার মধ্যে জটা কিছু বুকে পিঠে ছড়ানো। কানে ধুতুরা ফুল।

উর্ধাঙ্গ অনাবৃত; নিম্নাঙ্গ বাঘছাল পরিহিত, আবার স্থানবিশেষে কাপড় পরানো থাকে। তবে গলায় ও হাতে বেশ বড় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষমালা থাকে। হাতে ত্রিশূল ও ডমরু; পায়ে খড়ম এবং মাথায় বা দেহের উপর সাপ বিদ্যমান। পাশে থাকে পঞ্চরংয়ের বা পাঁচমুখো গাঁজার কলকে।

এঁর অনুচর হলেন লৌকিক দেবতা জরাসুর ও ধনুষ্টংকার নামক দুজন অপদেবতা। এঁর সঙ্গে থাকে মামদো ভূত, ঘোড়া, বাঘ প্রভৃতি।

গ্রামদেবতা রূপে মন্দিরমধ্যে কিংবা গাছতলায় শনি ও মঙ্গলবারে ইনি পূজিত হন; কোথাও মাটির মূর্তিতে, কোথাও শিলা বা ঘটের প্রতীকে। শিশুদের ধনুষ্টংকার এবং গর্ভস্থ শিশু রক্ষা করা বা নষ্ট ভ্রূণ থেকে প্রসূতিকে রক্ষা করা পঞ্চাননের কাজ। তার উদ্দেশ্যে ছাগবলির প্রচলন আছে।

উল্লেখ্য, রাঢ়-বাংলার মুখ্য লোকদেবতা ধর্মঠাকুর ক্রমে ভাগীরথী প্রবাহের নিম্নধারার জনসংস্কৃতিতে পঞ্চানন রূপের ভিতর দিয়ে পরিপূর্ণ শিবমূর্তিতে রূপান্তরিত হয়েছেন।মধ্যযুগীয় বেশকিছু মঙ্গলকাব্য-এর পুঁথিতে পঞ্চানন ঠাকুরের উল্লেখ দৃষ্ট হয়। দ্বিজ দুর্গারাম রচিত পঞ্চাননমঙ্গল সংগীতাংশে আছে, “পঞ্চমুখে গান কর ত্রিলোচন।”

রূপরামের ধর্মমঙ্গলে আছে,

“কামারহাটে পঞ্চানন্দ বন্দে জোড় হাতে।
ছেলেদের জন্য কত মেয়ে ওষুধ যায় খেতে।”

‘তারকেশ্বর শিবতত্ত্ব’ নামক মধ্যযুগীয় কাব্যাংশে আছে,

“পঞ্চানন দেব প্রায় অশ্বত্থ তলায়।
মধ্যমাঠে সরোবর তীর দেখা যায়।।”

File:Panchananda - Baba Panchananda Mandir - Mahiari - Howrah 2014 ...

ওলাবিবিঃ এক বিস্মৃতপ্রায় লৌকিক দেবী

ওলাদেবী  অন্যতম লৌকিক দেবতা। ময়দানবের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত ওলাদেবী ওলাউঠা বা বিসূচিকা বা  কলেরা রোগের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি ওলাইচন্ডী, ওলাবিবি, বিবিমা ইত্যাদি নামেও পরিচিত। অতীতে প্রায়শই ওলাউঠা রোগ মহামারী আকারে দেখা দিত এবং এতে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটত। তাই এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পল্লিবাসীরা ওলাদেবীর পূজা করত।

ওলাদেবী অসাম্প্রদায়িক দেবতা অর্থাৎ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এঁর পূজা করা হতো। তবে দেবীর মূর্তি ও পূজাপদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য ঘটত। হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে এঁর আকৃতি হতো লক্ষ্মী-সরস্বতীর মতো, গায়ের রঙ গাঢ় হলুদ বর্ণ, হাত দুটি প্রসারিত, কখনও দন্ডায়মান, কখনওবা শিশুসন্তান ক্রোড়ে নিয়ে আসনে উপবিষ্টা, পরনে সাধারণত নীল শাড়ি এবং সর্বাঙ্গে নানা প্রকার অলঙ্কার। এঁর কোনো বাহন নেই।

মুসলমান-প্রধান অঞ্চলে ওলাদেবীর আকৃতি ও পোষাকে ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়। সেখানে এঁর মূর্তি অভিজাত ঘরের কোনো সুন্দরী কিশোরীর মতো, পরনে পিরান, পাজামা, টুপি, ওড়না এবং গায়ে নানা প্রকার অলঙ্কার। এ ছাড়া পায়ে থাকে নাগরা জুতা এবং কখনও কখনও মোজাও। এঁর এক হাতে থাকে আসাদন্ড যা দিয়ে ভক্তের মুশকিল আসান করেন।

ওলাদেবীর পূজা এককভাবেও হয় আবার ঝোলাবিবি, আজগৈবিবি, চাঁদবিবি, বাহড়বিবি, ঝেটুনেবিবি ও আসানবিবি এ ছয়জনের সঙ্গে একত্রেও হয়। এঁদের একত্রে বলা হয় সাতবিবি। কারও কারও মতে এঁরা ব্রাহ্মী, মহেশ্বরী, বৈষ্ণবী, বারাহী, ইন্দ্রাণী প্রভৃতি পৌরাণিক দেবীর লৌকিক রূপ। এঁদের একত্র পূজার প্রথা প্রাগৈতিহাসিক যুগেও প্রচলিত ছিল বলে মনে করা হয়, কারণ মহেঞ্জোদারো থেকে প্রাপ্ত একটি মৃণ্ময় ফলকে সাতটি নারীমূর্তি পাশাপাশি দন্ডায়মান দেখা যায়।

সাতবিবির মধ্যে ওলাদেবীই প্রধান; ভক্তরা তাঁর উদ্দেশ্যেই পূজা দেয়, তবে অন্যরাও সে পূজার ভাগ পায়। ওলাদেবীর পূজা হয় পল্লীর বৃক্ষতলে পর্ণকুটিরে। হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে শনি অথবা মঙ্গলবারে পূজা হয় এবং পূজায় নিরামিষ নৈবেদ্য দেওয়া হয়। পূজার পৌরোহিত্যে যেকোনো বর্ণ বা সম্প্রদায়ের লোকের, এমন কি নারীরও অধিকার আছে। মুসলমান-প্রধান অঞ্চলে এঁকে ওলাবিবি বা বিবিমা নামে মানত করা হয়। হাড়ি বা ডোম-প্রধান অঞ্চলে তারাই পৌরোহিত্য করে এবং সেখানে তাদেরই অগ্রাধিকার থাকে। ওলাদেবীর পূজা তিন রকম। শনিবার ও মঙ্গলবার অনাড়ম্বরে যে পূজা হয় তা বারের পূজা নামে পরিচিত। কারও মানত উপলক্ষে সামান্য আড়ম্বরের সঙ্গে যেকোনো সময় এঁর পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে। তাছাড়া কোথাও কলেরা রোগ মহামারী আকারে দেখা দিলে সে এলাকার লোকজন গ্রামের মোড়লের নেতৃত্বে সমষ্টিগতভাবে এঁর পূজা দেয়।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ওলাইচণ্ডীকে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মিলিত মূর্তি মনে করে। তাঁর গায়ের রং গাঢ় হলুদ।তাঁর মাথায় থাকে মস্তকাবরণী, গলায় গলবস্ত্র ও গয়না। তিনি নীল শাড়ি ও গয়না পরে থাকেন। হাতে বিশেষ কোনো মুদ্রা দেখা যায়না | দুটি হাত প্রসারিত অবস্থায় থাকে, দেবী কখনো দন্ডায়মান আবার কখনো মূর্তিতে তাঁর কোলে একটি শিশুকে দেদেবীর সালংকারা ও এলোকেশী রূপ দুইই দেখা যায়।[১] মুসলমানরা তাঁকে ‘ওলাবিবি’ বা ‘বিবিমা’ বলে। এই নামটি এসেছে বিবির গান আখ্যান থেকে। এই আখ্যান অনুসারে, তিনি এক কুমারী মুসলমান রাজকন্যার সন্তান। তিনি অলৌকিক উপায়ে অদৃশ্য হয়ে যান এবং পরে দেবী রূপে আবির্ভূত হন। তাঁর আবির্ভাবের কারণ ছিল তাঁর দাদামশাইয়ের (‘বাদশা’) ও রাজ্যের মন্ত্রীদের সন্তানদের আরোগ্য দান করেন।

ওলাদেবীর পূজায় কোনো সাম্প্রদায়িকতা নেই। হিন্দু-মুসলমান এক সঙ্গে একই পুরোহিতের হাতে পূজার নৈবেদ্য ও মানতের দ্রব্য প্রদান করে। পুরোহিত নিম্নবর্ণের হিন্দু কিংবা মুসলমান হলেও কেউ তাঁর নিকট থেকে নৈবেদ্য গ্রহণে দ্বিধা করে না। ওলাদেবীর নৈবেদ্য অতি সাধারণ সন্দেশ, বাতাসা ও পান-সুপারি; কোথাও কোথাও আতপ চাল ও পাটালিও দেওয়া হয়। এ পূজায় বিশেষ কোনো মন্ত্র নেই; তবে কোনো কোনো হিন্দু পুরোহিত পূজার সময় ‘এসো মা ওলাদেবী, বেহুল রাঢ়ির ঝি’ এরূপ আবেদন করে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের চবিবশ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া, বর্ধমান, বীরভূম, মেদিনীপুর প্রভৃতি অঞ্চলসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন পল্লীতে একসময় খুব গুরুত্বের সঙ্গে ওলাদেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হতো। বর্তমানে আধুনিক শিক্ষা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভাবে সমাজ থেকে এসব আচার এক প্রকার উঠে গেছে বলা যায়।

🕗 Ola Bibi Darga Kolkata åbningstider, kontakter

খড়দহের শ্যামসুন্দর

চিত্রে থাকতে পারে: এক বা আরও বেশি ব্যক্তি
মহাপ্রভুর আদেশে প্রভু নিত্যানন্দ গৃহস্থ আশ্রমে প্রবেশ করেছিলেন।

ছুটির দিনে ঘরে কি করব কি করব এই সময় আমার অনুজপ্রতিম অভিষেকের একটা কথা মনে পড়ল। ঘরের কাছেই তো শ্রীপাট খড়দহ৷ আর পুরাতন মন্দির দর্শন তো আমার অন্যতম কাজের মধ্যে পড়ে। এই সম্পর্কিত অনেক লেখা ফেসবুকে দিয়েছি, আপনাদের ভাল লাগলে আরো দেব। সে যাই হোক শনিবার ৭ মার্চ সকাল ১০ টায় আমরা খড়দহ স্টেশনে নামলাম। খড়দহ স্টেশনের আপ প্ল্যাটফর্ম এর দিকে লাইন ক্রস করে এসে একটা টোটো ভাড়া করলাম। টোটো বি.টি. রোডে উঠে প্রায় ফাঁকা রাস্তা ধরে ছুটে চলল। কাল রাত্রে প্রবল বৃষ্টি হয়ে গেছে। মেঘলা আবহাওয়া, টিপ টিপ বৃষ্টিও পড়ছে। আবহাওয়া গরম তো নয়ই বরং একটু ঠান্ডা ঠান্ডাই। যাই হোক টোটো গলিখুঁজি পার করে এসে পৌছাল শ্যামসুন্দরতলার মোড়ে।

এবার একটু খড়দহের আর শ্যামসুন্দর এর ইতিহাসটা আলোচনা করে নিই।

উত্তর ২৪ পরগণায় শিয়ালদহ মেইন লাইনের উপর অবস্থিত ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের অন্তর্গত খড়দহ একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ। এই স্থানের খ্যাতি নিত্যানন্দ প্রভুর বাসস্থান হিসাবে।  এই স্থান গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান। খড়দহের সমৃদ্ধির ইতিহাস শুরু হয় ষোড়শ শতকের শেষদিকে নিত্যানন্দ প্রভু এখানে এসে তাঁর দুই স্ত্রী বসুধা ও জাহ্নবার সাথে বসবাস স্থাপন করার পর। কিংবদন্তি এই স্থানে বাসস্থানের জন্য স্থানীয় ভূস্বামীর কাছে তিনি একখন্ড জমি প্রার্থনা করলে সেই ভূস্বামী বিদ্রূপ করে গঙ্গায় একটি খড় ফেলে সেখানে নিত্যানন্দ প্রভুকে বাসস্থান নির্মাণ করতে বলেন। নিত্যানন্দের প্রভাবে  সত্যিই গঙ্গাগর্ভে একটি চরের সৃষ্টি হল এবং সেখানেই তিনি গৃহ নির্মান করে বাস করতে লাগলেন। বসুধার গর্ভে বীরভদ্র ও গঙ্গাদেবী নামে এক পুত্র ও এক কন্যা জন্মান। ১৫৪৫ সালে ৬৮ বছর বয়সে প্রভু নিত্যানন্দ বৈকুন্ঠলোকে যাত্রা করেন। নিত্যানন্দের বংশধরই খড়দহের গোস্বামী বংশ নামে পরিচিত।  এই খড়দহের প্রখ্যাত মন্দিরগুলির বিবরণ হলঃ-

শ্রীশ্যামসুন্দর জীউর মন্দির

—————————————

নিত্যানন্দের তিরোধানের পর বীরভদ্র খড়দহের প্রখ্যাত শ্যামসুন্দর বিগ্রহ স্থাপন করেন। নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর জন্মস্থান একচক্রা থেকে আনিত তাঁদের কুলবিগ্রহ বঙ্কিমদেব, ত্রিপুরাসুন্দরী ও অনন্তদেব শিলার নিত্য পূজা করতেন। এখনো শ্যামসুন্দর মন্দিরে ত্রিপুরাসুন্দরী ও অনন্তদেব পূজিত হন। বঙ্কিমদেব নোতাগ্রামে অধিষ্ঠিত। এই শ্যামসুন্দর বিগ্রহ নির্মানের কিংবদন্তী সংক্ষেপে হল-

রুদ্ররাম গৌড়ের বাদশাহের কাছ থেকে একটি পাথর এনে শ্যামসুন্দর, রাধাবল্লভ ও নন্দদুলাল নামে তিনটি বিগ্রহ নির্মান করান। শ্যামসুন্দর বিগ্রহ বীরভদ্র রুদ্ররামের কাছে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি রাজী হননি। একদিন রুদ্ররাম যখন তার পিতৃশ্রাদ্ধ করছিলেন তখন অকস্মাৎ প্রবল বর্ষণে শ্রাদ্ধ পন্ড হওয়ার উপক্রম হল। নিমন্ত্রিত বীরভদ্র অলৌকিক শক্তির প্রভাবে শ্রাদ্ধকান্ড রক্ষা করেন। এতে প্রীত হয়ে রুদ্ররাম বীরভদ্রকে এই বিগ্রহ দান করেন। মতান্তরে, স্বয়ং গৌড়ের বাদশাহের কাছে বীরভদ্র উপস্থিত হয়ে তাঁর অলৌকিক শক্তির প্রভাবে বাদশাহকে মুগ্ধ করে শ্যামসুন্দর বিগ্রহ নির্মাণের জন্য শিলা নিয়ে আসেন। বীরভদ্র এই বিগ্রহ এনে খড়দহে নিজের বাসস্থান কুঞ্জবাটীতে স্থাপন করেন এবং পরে একটি সাধারণ মন্দির নির্মাণ করে পূজা-পাঠ আরম্ভ করেন। কিন্তু কালান্তরে এই মন্দির জীর্ণ হয়ে পড়লে বর্তমান মন্দির নির্মাণ করা হয়। এই মন্দির খড়দহের কিশোর পরিবারের কূলবধূ পট্টেশ্বরী মাতা ঠাকুরাণী দ্বারা নির্মিত বলে শোনা যায়। ১৯৬৭ সালে বিড়লা জনকল্যাণ ট্রাস্ট দ্বারা এই মন্দির পুনঃসংস্কার করা হয়৷

পূর্বমুখী সুবৃহৎ আটচালার মন্দিরের ভেতরে বেদীর উপরে রুপা নির্মিত মঞ্চে শ্যামসুন্দর নামে খ্যাত রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত।  শ্রীকৃষ্ণ কষ্টিপাথর এবং শ্রীরাধা অষ্টধাতু নির্মিত। বিগ্রহ দুটি অনন্যসুন্দর। মন্দির ঘরের মেঝে সিমেন্টের এবং বাইরের সামনের দরদালানের মেঝে শ্বেতপাথর নির্মিত। মন্দিরের সামনে শ্বেতপাথর নির্মিত প্রশস্ত পাকা নাটমন্দির আছে৷ প্রতিদিন সকালে শ্যামসুন্দর জীউর মঙ্গলারতি, স্নানভিষেক, বেশ পরিবর্তন,  বাল্যভোগ ও মধ্যাহ্নে অন্নভোগের পর বেলা ১২.৩০ টায় মন্দিরের দ্বার বন্ধ হয়ে যায় এবং আবার বিকাল ৪.৩০ এ মন্দিরের দ্বার খুলে গাত্রোত্থান, সেবা, সন্ধ্যারতি ও শীতল ভোগের পর রাত্রি ৯.৩০ এ মন্দিরের দ্বার বন্ধ করা হয়৷ প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় মন্দিরে কীর্তন হয়। বর্তমানে একটি ট্রাষ্টি দ্বারা মন্দিরের আয়-ব্যয় নির্বাহিত হয়। মন্দিরে নিত্যানন্দ সেবিত অনন্তদেব শিলা, ত্রিপুরাসুন্দরী, নীলকন্ঠ মহাদেব ছাড়াও নীলাচলে দন্ডভঙ্গের একটি খন্ড, শ্রীনিত্যানন্দের নিজের হাতে রচিত ভাগবত পুঁথি রক্ষিত আছে। এগুলির চিত্র তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আমরা বহু অনুনয় করার পর শ্রীশ্যামসুন্দরের একটি ফটো তুলতে পেরেছি যা আপনাদের দর্শনের জন্য দিলাম।

জাগোনি গো শচীমাতা গৌর আইল প্রেমদাতা

আজ গৌরহরি মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের শুভ আবির্ভাব তিথিতে এই লেখাটি দিলাম।

চৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬ খ্রিঃ – ১৫৩৩ খ্রিঃ) ছিলেন একজন বৈষ্ণব সন্ন্যাসী এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বৈষ্ণব ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। তিনি অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার মনে করেন। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ছিলেন ভাগবত পুরাণ ও ভগবদ্গীতা-য় উল্লিখিত দর্শনের ভিত্তিতে সৃষ্ট বৈষ্ণব ভক্তিযোগ মতবাদের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা। তিনি বিশেষত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে পরম সত্ত্বার পূজা প্রচার করেন এবং জাতিবর্ণ নির্বিশেষে আচণ্ডাল-ব্রাহ্মণের কাছে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রটি জনপ্রিয় করে তোলেন। এটি হল:

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।

সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষাষ্টক নামক প্রসিদ্ধ স্তোত্রটিও তারই রচনা। গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতানুসারে, ভাগবত পুরাণের শেষের দিকের শ্লোকগুলিতে রাধারাণীর ভাবকান্তি সংবলিত শ্রীকৃষ্ণের চৈতন্যরূপে অবতার গ্রহণের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাঁর জন্মতিথি প্রতিবছর গৌরপূর্ণিমা রূপে উদযাপন করা হয়।

চৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের নাম ‘গৌরাঙ্গ’, ‘গৌরচন্দ্র’, বা ‘নিমাই’। তার গাত্রবর্ণ স্বর্ণালি আভাযুক্ত ছিল বলে তাকে ‘গৌরাঙ্গ’ বা ‘গৌরচন্দ্র’ নামে অভিহিত করা হত; অন্যদিকে, নিম বৃক্ষের নীচে জন্ম বলে তার নামকরণ হয়েছিল ‘নিমাই’। ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী সাহিত্য বাংলা সন্তজীবনী ধারায় এক নতুন যুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। সে যুগে একাধিক কবি চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর চৈতন্য চরিতামৃত, বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের চৈতন্য ভাগবত, এবং লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্যমঙ্গল।
চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি (২৩ ফাল্গুন, ১৪০৭ শকাব্দ) দোলপূর্ণিমার রাত্রে চন্দ্রগ্রহণের সময় নদিয়ার নবদ্বীপে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম। তাঁর পিতামাতা ছিলেন অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার অন্তর্গত নবদ্বীপের অধিবাসী জগন্নাথ মিশ্র ও শচী দেবী। চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন পূর্ব বাংলার শ্রীহট্টের (অধুনা সিলেট, বাংলাদেশ) আদি বাসিন্দা। তাঁর পিতা জগন্নাথ মিশ্র শ্রীহট্ট থেকে দক্ষিণবঙ্গের নবদ্বীপে অধ্যয়ন ও সংস্কৃত শাস্ত্রচর্চার জন্য এসে বসতি স্থাপন করেন।

চৈতন্যদেবের পিতৃদত্ত নাম ছিল বিশ্বম্ভর মিশ্র। শৈশবাবস্থায় তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত। তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল সংস্কৃত গ্রন্থাদি পাঠ ও জ্ঞানার্জন। ব্যাকরণশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জনের পর মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি ছাত্রদের অধ্যয়নের জন্য একটি টোল স্থাপন করেন। তর্কশাস্ত্রে নবদ্বীপের নিমাই পণ্ডিতের খ্যাতি ছিল অবিসংবাদিত। কেশবকাশ্মীর নামক এক দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতকে তরুণ নিমাই তর্ক-যুদ্ধে পরাস্ত করেন। জপ ও কৃষ্ণের নাম কীর্তনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ যে ছেলেবেলা থেকেই বজায় ছিল, তা জানা যায় তাঁর জীবনের নানা কাহিনি থেকে।তাঁর প্রথমা পত্নী লক্ষ্মীপ্রিয়াদেবীকে বিয়ের পর একবার সিলেটে গিয়েছিলেন তিনি। পূর্ববঙ্গে পর্যটনকালে লক্ষ্মীপ্রিয়াদেবীর সর্পদংশনে মৃত্যু ঘটলে তিনি মায়ের অনুরোধে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর জলগ্রহণ করেন।

এরপর গয়ায় পিতার পিণ্ডদান করতে গিয়ে স্ত্রীবিয়োগকাতর নিমাই তাঁর গুরু ঈশ্বর পুরীর সাক্ষাৎ পান। ঈশ্বর পুরীর নিকট তিনি গোপাল মন্ত্রে দীক্ষিত হন। এই ঘটনা নিমাইয়ের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর শিক্ষাভিমানী পণ্ডিত থেকে কৃষ্ণভাবময় ভক্ত রূপে তাঁর অপ্রত্যাশিত মন পরিবর্তন দেখে অদ্বৈত আচার্যের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় বৈষ্ণব সমাজ আশ্চর্য হয়ে যান। অনতিবিলম্বে নিমাই নদিয়ার বৈষ্ণব সমাজের এক অগ্রণী নেতায় পরিণত হন। হিন্দুধর্মের জাতিভেদ উপেক্ষা করে তিনি সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষদের বুকে জড়িয়ে ধরে ‘হরি বোল’ ধ্বনি বিতরণ করতেন এবং হরিনাম প্রচারে খোল-করতাল সহযোগে অনুগামীদের নিয়ে নবদ্বীপের রাজপথে ‘নগর সংকীর্তন’এ বের হতেন। অত্যাচারী জগাই ও মাধাইকে তিনি ভক্তে পরিণত করেন। তাঁর প্রভাবে মুসলমান ‘যবন হরিদাস’ (হরিদাস ঠাকুর) বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নবদ্বীপের শাসক চাঁদকাজী তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেন। চৈতন্যভাগবত-এ আছে, জাতিভেদের অসারতা দেখানোর জন্য তিনি শূদ্র রামরায়কে দিয়ে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করিয়েছিলেন।
মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে কাটোয়ায় কেশব ভারতীর নিকট সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষিত হওয়ার পর নিমাই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নাম গ্রহণ করেন।সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি জন্মভূমি বাংলা ত্যাগ করে কয়েক বছর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান যথা: নীলাচল, দাক্ষিণাত্য, গৌড়, বৃন্দাবন পর্যটন করেন। পথে সত্যবাই, লক্ষ্মীবাই নামে বারাঙ্গনাদ্বয় এবং ভীলপন্থ, নারেজী প্রভৃতি দস্যুগণ তাঁর শরণ গ্রহণ করে। এইসব স্থানে ভ্রমণের সময় তিনি এতদাঞ্চলের ভাষা (যথা: ওড়িয়া, তেলুগু, মালয়ালম প্রভৃতি) বিশেষভাবে শিক্ষা করেন। এই সময় তিনি অশ্রুসজল নয়নে অবিরত কৃষ্ণনাম জপ ও কঠোর বৈরাগ্য সাধন (আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে কৌপীনসার হয়ে) করতেন। জীবনের শেষ চব্বিশ বছরের অধিকাংশ সময় তিনি অতিবাহিত করেন জগন্নাথধাম পুরীতে। ওড়িশার সূর্যবংশীয় হিন্দু সম্রাট গজপতি মহারাজা প্রতাপরুদ্র দেব চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণের সাক্ষাৎ অবতার মনে করতেন। মহারাজা প্রতাপরুদ্র চৈতন্যদেব ও তাঁর সংকীর্তন দলের পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়েছিলেন।ভক্তদের মতে, জীবনের শেষপর্বে চৈতন্যদেব ভক্তিরসে আপ্লুত হয়ে হরিনাম সংকীর্তন করতেন এবং অধিকাংশ সময়েই ভাবসমাধিস্থ থাকতেন। ১৫৩৩ খ্রীষ্টাব্দে আষাঢ় মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথিতে রবিবারে পুরীধামে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তাঁর লীলাবসান ঘটে।

তাঁর নরলীলা শেষ হয়েছে বহুদিন আগে। কিন্তু তাঁর আধাত্ম্যলীলা? ভক্তকবির লেখায় তাই মূর্ত হয়েছে-

অদ্যপিহ সেই লীলা করে গোরা রায়।
কোন কোন ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।।

চিত্রে থাকতে পারে: এক বা আরও বেশি ব্যক্তি