বাঙালির লাদাখ ভ্রমণ – অরুন্ধতী রায়

মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা, ২০শে নভেম্বর ২০২৫, মার্গশীর্ষ অমাবস্যা ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২

হিমালয়ের রত্ন লাদাখ, যেমন দুর্গম, তেমন অপরূপ সুন্দর। বাঙালি মধ্যবিত্তের চেনা দার্জিলিঙের মত নয়, জাঁস্কার রেঞ্জের কোলে লাদাখ একেবারেই অন্যরকম। ভারতের (এমনকি কোনোক্ষেত্রে পৃথিবীর) উচ্চতম গাড়ি যাতায়াতের উপযুক্ত রাস্তাগুলো লাদাখে, লাদাখের পথে পথে পড়বে এমনই অত্যুচ্চ সব পাস; খারদুং লা বা চাং লা-র সতেরো-আঠেরো হাজার ফুট উচ্চতা দেখে আঁতকে উঠলে চলবে না, উত্তেজিত হলেই অক্সিজেনের অভাবে কাবু হয়ে পড়তে হবে। পাহাড় এখানে রুক্ষ এবং ন্যাড়া, সবুজে ঢাকা দার্জিলিং হিমালয়ের একেবারে বিপরীত। মূলত উপত্যকাগুলোতেই যা কিছু সবুজ, আর পাহড়ের গা বেয়ে নেমে আসা বরফগলা বা পাহাড়ের ভিতরে জমে থাকা জলের ধারা যেখানে, তার দাগটুকু ধরে ন্যাড়া পাহাড়ের গায়ে একটু ঘাস, একটু শ্যাওলা, কখনো সামান্য ঝোপঝাড়। চাষ খুবই কম, লাদাখিরা মূলত পশুপালক; বড় উপত্যকায় একটু আধটু কৃষিজমি। তবে জাঁস্কার অঞ্চল অসম্ভব রকম খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ, এবং বিবিধ প্রকারের খনিজের সমাহার, ফলে পাশাপাশি দুটো পাহাড়ের কোনোটার মাটির রং একরকম দেখবেন না। কোথাও মূলতানি মাটির হলদেটে পাহাড়, কোথাও লৌহ আকরিকের লালচে পাহাড়, কোথাও আবার দূরে কারাকোরাম রেঞ্জের (নামের অর্থই কালো পাহাড়, সংস্কৃতে ছিল কৃষ্ণপর্বত) উঁচু কালো দেওয়াল। বিপুল উচ্চতার কারণে বেশকিছু পাহাড়ে গরমকালেও তুষারের আস্তরণ পুরো গলে না, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে অল্প অল্প বরফের চাঙড় কার্পেটের মত বিছানো। বিশেষ করে কারাকোরামের কালো পাহাড়ের গায়ে সেই আক্ষরিক অর্থেই তুষারশুভ্র একটুকরো বরফের আস্তরের ল্যান্ডস্কেপ একবার দেখলে ভোলা মুশকিল। এরকম বরফের চাদরের তলা থেকে অল্প অল্প গলে জল হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে চুঁইয়ে নেমে ছোট ছোট নালা হয়ে, ঝোরা হয়ে বয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ি গ্রামগুলোর ব্যবহারের জল আসে এরকম ছোটবড় ঝোরার জল ধরে; রাস্তার ধারের ছোটখাটো দোকানে জল বা ফলের রস খেতে গেলে চমকে যাবেনই, এমন ঠাণ্ডা আর মিষ্টি ওই জল। কোথাও কোথাও পাহাড়ের ভিতরে সালফার ইত্যাদির বিপুল ভাণ্ডার, মাটি থেকে সশব্দে ছিটকে, ফেনা তুলে বেরিয়ে আসছে গরম জল – হট স্প্রিং। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই জল সর্বরোগহর। প্রকৃতির আরেক বিচিত্র খেয়াল – লেহ শহরের উপকন্ঠে ম্যাগনেটিক হিল; এখানে এসে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করলেই মনে হবে ধীরে ধীরে রাস্তার ঢালের বিপরীতে গড়াতে শুরু করছে গাড়ি, যেন বিপুল চৌম্বক আকর্ষণে পাহাড়টি টেনে নিচ্ছে গাড়িকে। প্রাকৃতিক কারণেই এই ঘটনা, কিন্তু সামনাসামনি এমন প্রায় অতিলৌকিক সব ব্যাপার চাক্ষুষ করার সুযোগ ছাড়া উচিত নয়।

আর রয়েছে ফলের বাগান। কার্গিল থেকে লেহ, গোটা লাদাখ জুড়ে অ্যাপ্রিকট বা খোবানির প্রাচুর্য। বাগানমালিকের অনুমতি নিয়ে গাছ থেকে পেড়ে খেতে পারেন, জুস খেতে পারেন, এমনকি স্থানীয় মহিলাদের কাছ থেকে মশলা দিয়ে শুকোনো অ্যাপ্রিকট কিনেও আনতে পারেন; কোনোটাতেই নিরাশ হবেন না। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা শপিং মলের দামি ব্র্যান্ডের ইম্পোর্টেড ড্রাই ফ্রুটসকে বলে বলে দশ গোল দেবে, দামেও খুবই সস্তা সেই তুলনায়। কিছু বেরি জাতীয় ফলও পাওয়া যায়; নিয়ন্ত্রণরেখার ধারে শেষ গ্রাম থাং অবধি পৌঁছালে ভিউপয়েন্টের কাছে এসব কিনতে ভুললে চলবে না, গরমের কমাসে পর্যটকদের দৌলতে সামান্য যা আয় হয়, তাই ওখানকার সারা বছরের চালিকাশক্তি। লাদাখের স্থানীয় মানুষ সরকারপোষিত হিন্দিভাষী আর বেসরকারি কাশ্মীরি ব্যবসায়ীদের দাপটে কোণঠাসা – লেহ শহরের মার্কেটে লাদাখি হস্তশিল্প বা যেকোনো স্থানীয় প্রোডাক্ট খুঁজে পেতে আপনার কালঘাম ছুটে যাবে, এমনকি স্থানীয় খাবার খেতে চাইলেও মুশকিল। এখন অবধি শিক্ষা, চাকরি, হাসপাতাল সবই বেশ দূরের জিনিস ওঁদের কাছে। তবে আতিথেয়তা আর মুখের হাসিটুকুতে খাদ নেই।

সিন্ধু, শিয়ক, সুরু, জাঁস্কার, দ্রাস এরকম বেশকিছু বড় বড় নদীর উপত্যকা ধরে লাদাখের মূল জনবসতি এলাকাগুলো; নদীগুলো প্রায় সবই সিন্ধুতে মিশে গেছে, তবে বর্ষাকালে সবই বিশাল এবং খরস্রোতা। শিয়কের ধার ধরে নুব্রা উপত্যকার দিকে যাত্রা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা; নুব্রা উপত্যকা সাদা বালিতে ঢাকা, এখানে বিরল দুই কুঁজওলা ব্যাক্ট্রিয়ান উট দেখা যায়। কাছাকাছি ক্যাম্পিং এর ব্যবস্থাও আছে, বেশকিছু জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পটও। বাইকার এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য লাদাখ এক স্বর্গরাজ্য। সুরু নদীর ধারে কার্গিল লাদাখের শীতকালীন রাজধানী, আর সিন্ধুর পাড়ে লেহ গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। লাদাখের প্রাচীন শাসক নামগিয়াল রাজবংশের সময় থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে। লেহ এবং আশেপাশের অঞ্চল যেমন কিছুটা তিব্বতের সঙ্গে সম্পর্কিত, তিব্বতীয় জনগোষ্ঠীর মানুষের বাস এখানে, জনপ্রিয় ধর্ম দলাই লামার অনুগামীদের বজ্রযান ধর্ম; তেমন আবার লাদাখের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে কার্গিল বস্তুত একদিকে গিলগিট-বাল্টিস্তান হয়ে প্রাচীন সিল্ক রুট ধরে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে, অন্যদিকে জোজি লা গিরিপথ হয়ে কাশ্মীরের সঙ্গে লাদাখের যোগসূত্র। ফলে কার্গিল প্রাচীনকাল থেকেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ শহর। বহু উপজাতির বাস এখানে, তাদের কিছু অংশ মুসলিম ও বাকিরা তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। তবে জাদুটোনা, ভূতপিশাচ, অলৌকিকতা এবং চারপাশের প্রকৃতিকে পবিত্র মেনে চলার সংস্কার সার্বজনীন এখানে। কার্গিলের আশেপাশে সুরু উপত্যকা অঞ্চলে তিন জায়গায় পাহাড়ের গায়ে কুষাণ যুগের মৈত্রেয় বোধিসত্ত্বের দণ্ডায়মান মূর্তি খোদাই করা আছে। মুলবেকের মূর্তিটি সবচেয়ে অক্ষত অবস্থায়, মূর্তিটির পাদদেশে একটি ছোট তিব্বতী মনাস্ট্রি আছে; ভিতরে দেওয়ালজুড়ে থাঙ্কা শৈলীতে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের আচার্যদের ছবি আঁকা। বাঙালিরা অবশ্যই দেখবেন, কারণ আপনার অতীতকে ওঁরা পরম আদরে রেখেছেন, যা আপনি পারেননি; অতীশ দীপঙ্কর থেকে লুইপা – সকলের সাথেই ওখানে দেখা হয়ে যাবে একবার, চিনতে হয়তো পারবেন না অনেককেই, কারণ আপনার চোখে বহু শতকের আত্মবিস্মৃতির, আত্মঘৃণার ঠুলি। গোটা লাদাখ টুরেই এঁরা ঘুরে ঘুরে আসবেন, বিভিন্ন মনাস্ট্রি বা গোম্পায় গেলেই ওঁদের সঙ্গে দেখা হবে। আর আসবেন উড্ডিয়ানের মহাসাধক গুরু পদ্মসম্ভব। তিব্বতি বৌদ্ধদের গুরুপরম্পরা এঁদের নিয়েই; একবার ভেবে দেখুন, আপনার অতীত, আপনার পালসেনযুগ, আপনার নালন্দা-বিক্রমশীলা-সোমপুর-ওদন্তপুরের শেষ চিহ্ন এঁরা। এশিয়া জুড়ে এঁদের খ্যাতি ছড়িয়ে গিয়েছিল সেদিন।

লেহ শহরে এবং আশেপাশে প্রচুর দর্শনীয় জায়গা। দলাই লামাদের পোটালা প্রাসাদের অনুকরণে তৈরী শে প্রাসাদ, পরবর্তীতে কাশ্মীরের ডোগরা রাজাদের আক্রমণে শে প্রাসাদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন করে তৈরী লেহ প্যালেস, স্তোক প্রাসাদ ছাড়াও, শহরের বাইরে হেমিস ও থিকসে গোম্পা অবশ্য দর্শনীয়। হেমিস মঠ নামগিয়াল রাজাদের আনুকূল্যে পুষ্ট, এককালের রাজগুরুর বাসস্থান তথা রাজপুত্রদের শিক্ষাকেন্দ্র; তার আভিজাত্য অবশ্যই অন্যরকম। থিকসে বিশালায়তন; বহু ভিক্ষুর বাস সেখানে। অনেকগুলি মন্দিরের মধ্যে বিশাল মৈত্রেয় মূর্তির মন্দিরটি বিশেষ আকর্ষণীয়। সৌভাগ্যক্রমে আমি প্রার্থনার সময়ে মূল মন্দিরে উপস্থিত ছিলাম। দেড়মানুষ-সমান শিঙা, করতাল এবং ঢোল বাজিয়ে ওঁদের সমবেত সূত্রাদি পাঠের অনুষ্ঠান দেখা হয়ে গেল। লক্ষণীয়, ওঁদের সব মন্দিরে কিন্তু মঠপ্রধানের আসনের সামনেই দলাই লামার একটি ছবি অবশ্যই থাকে, যেন সশরীরে অথবা প্রতীকী উপস্থিতিতে – দলাই লামাই সকল অনুষ্ঠানের পৌরোহিত্য করছেন। প্রতি মঠের পদাধিকারীদের বিশেষ ঐতিহ্যবাহী পোষাক আছে, এমনকি লামাদের টুপির রংও বিশেষ অর্থবহ। হেমিস মঠের মিউজিয়ামে এমন অনেক কিছুই দেখতে ও জানতে পারবেন। এছাড়া শে প্রাসাদের পাশে এক স্থানীয় ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগে গড়া ছোট্ট রক মিউজিয়াম আছে। লাদাখের অসাধারণ খনিজের সম্ভার এবং স্থানীয় সংস্কৃতির নানা স্মারক সম্পর্কে মিউজিয়ামের সংগ্রহ বিস্ময়কর। আর হ্যাঁ, লেহ গেলে তিব্বতিদের প্রিয় মাখন চা খেয়ে দেখতেই হবে।

কার্গিল এবং লেহ-র আর্মি মিউজিয়াম, গুরুদ্বারা পাত্থর সাহিবও জনপ্রিয়। একবার ঘুরে আসা বাঞ্ছনীয়। তবে বিধিসম্মত সতর্কীকরণ, গোটা লাদাখ টুরে বার বার অক্সিজেনের অভাবে সমস্যা হতে পারে; শারীরিকভাবে মোটামুটি শক্তপোক্ত না হলে এই ভ্রমণ বেশ বিপজ্জনক। সাহস করে যেতে পারলে অবশ্য ভূস্বর্গ কথার অর্থ উপলব্ধি করতে পারা যাবে। পাহাড়ের মাথায় চমরী গাইদের চারণভূমি, ঘাসজমিতে তিরতির করে বয়ে চলা পাহাড়ি ঝরনার ধারে লক্ষ লক্ষ নানা রঙের বুনো ফুল আর বিরল হিমালয়ান মারমটদের বাসা; আর নীল আকাশের নীচে স্বচ্ছ হ্রদদের নিয়ে লাদাখ আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

 ★ ★ ★ ★ ★

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবথেকে বিপজ্জনক প্রতিবেশী হতে চলেছে বাংলাদেশ? – উত্তম দেব

মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা, ২০শে নভেম্বর ২০২৫, মার্গশীর্ষ অমাবস্যা ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২

২০২৪-এর ৪ অগাস্ট বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হয়েছে একটা অল্পদিনের গণ বিক্ষোভ অথচ অনেক রক্তপাতের পরে। আওয়ামী শাসনের এমন একটি হিংসাত্মক অবসান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরম্পরা অনুযায়ী অনিবার্য ছিল। আসলে বাংলাদেশ কী ছিল, কী হ‌ইয়াছে, আর কী হ‌ইবে- এটা নিয়ে অনেক কল্পকথা, গল্পকথা, তত্ত্ব, ধারণা পশ্চিমবঙ্গের বাজারে চালু আছে। চব্বিশের ৪ অগাস্টের পর থেকে বাংলাদেশে যা যা ঘটে চলেছে, তাতে বাংলাদেশকে ঘিরে এপার বাংলায় তৈরি হ‌ওয়া মিথগুলো ভেঙে পড়ায় কেউ কেউ মুষড়ে পড়েছেন বৈকি। অথচ হাসিনা বিদায়ের পর ইউনূস জামানায় বাংলাদেশে যা ঘটে চলেছে এবং যা অদূর ভবিষ্যতে ঘটবে, তার কোন‌ওটাই আকস্মিক নয়। 

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তবর্তীকালীন সরকারের বয়স ১৫ মাস হল। ফেব্রুয়ারিতে ইউনূস এক‌ই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ডাক দিয়েছেন বটে কিন্তু নির্বাচন ও গণভোট আদৌ শেষপর্যন্ত হবে কিনা তা নিয়ে ঘোরতর সংশয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহল। এদিকে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে হাসিনা সরকার যে জামাতে ইসলামির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, সেই জামাত অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগোচ্ছে। সংসদ নির্বাচন যদি যথাসময়ে হয়‌‌ও মধ্যপন্থী বিএনপি জামাতের জয় ঠেকাতে পারবে বলে মনে হয় না। ইতিমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বাংলাদেশের একের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একতরফা জয় ছিনিয়ে নিয়ে জামাত বড় নির্বাচনে জয়ের গন্ধ পেয়ে গেছে।

মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে জামাতে ইসলামির অনেক সাদৃশ্য আছে। দলটির ‘আমীর’ বা সর্বোচ্চনেতা এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী সহ জামাতের প্রায় সকল শীর্ষ নেতাদের হয় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরেছেন নয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন শেখ হাসিনা। কিন্তু তারপরেও নানা কৌশলে ‘সারভাইভ’ করেছে কট্টর সুন্নি ইসলামপন্থী এই দলটি। মুসলিম ব্রাদারহুডের মতোই বাংলাদেশে অনেক হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাঙ্ক, লাভজনক ব্যবসায়িক সংস্থা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও দাতব্য সংস্থা গড়ে তুলে এইসব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে নিজেদের সামাজিক ভিত্তি ও জনসমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে জামাতে ইসলামি। আওয়ামি লিগ জামানায় ছাত্র লিগ সহ আওয়ামি লিগের বিভিন্ন শাখা সংগঠনে ঢুকে পড়ে আত্মরক্ষা করেছে জামাতের কর্মীরা। জামাতে ইসলামির আর্থিক বুনিয়াদ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে নিয়মিত অর্থ পায় তারা।

৪ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের উৎখাতের পর দেখা গেল আওয়ামি লিগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে পিছনে ফেলে বাংলাদেশের মূলস্রোতের রাজনীতিতে প্রথম স্থানটি দ্রুত দখল করে নিয়েছে জামাত, যাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য বাংলাদেশকে ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আওয়ামি লিগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে ইসলামিক মৌলবাদের মূলোচ্ছেদ তো দূরের কথা উল্টে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বৃহদাংশের মধ্যে ইসলামপ্রীতি যে আর‌ও গভীর হয়েছে, হাসিনার পলায়নের তে-রাত্রির মধ্যেই জামাতের জমজমাট উত্থান ও জামাতের প্রতি উপচে পড়া জনসমর্থন তার প্রমাণ। মিশরে গণ বিক্ষোভের জেরে আমেরিকা ঘেঁষা প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের পর অনুষ্ঠিত ২০১১ সালের সাধারণ নির্বাচনে ৪২ শতাংশ আসন দখল করেছিল মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’। পরের বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন ব্রাদারহুড নেতা মুহাম্মদ মুরসি। বাংলাদেশে বর্তমানে জামাতে ইসলামিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৬৭ বছরের চিকিৎসক ড. শফিকুর রহমান। শফিকুর কি বাংলাদেশের মুরসি হতে পারবেন? সময়‌ই এই প্রশ্নের জবাব দেবে। তবে জামাত যাতে ক্ষমতায় আসতে পারে, তার জন্য জোরকদমে জমি তৈরির কাজ চলছে বাংলাদেশে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমেরিকাপ্রীতি সর্বজনবিদিত। তিনি ডেমোক্র্যাটদের ঘরের মানুষ। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বন্ধু এমনকি তাঁর পত্নী হিলারির সঙ্গে ইউনূসের বিশেষ সখ্যতা আছে। ২০১৬-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারির তহবিলে চাঁদা দিয়ে ইউনূস ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরাগভাজন পর্যন্ত হয়েছেন। পশ্চিমী বিশ্বের প্রিয়পাত্র ইউনূসের মনে কী আছে কে জানে! তবে ইউনুস প্রশাসনের ভেতরে জামাতের প্রতি সহানুভূতিশীল উপদেষ্টার অভাব নেই। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্পর্কে শেখ হাসিনার আত্মীয়। ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও সেই সূত্রেই নাকি ওয়াকারের সেনাপ্রধান পদলাভ। যদিও শেষ মুহূর্তে হাসিনার হুকুম তামিল করতে অস্বীকার করেন জেনারেল ওয়াকার। ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পেছন থেকে সাপোর্ট দিচ্ছে ওয়াকারের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী। যদিও সেনাবাহিনীর ভেতরে এই মুহূর্তে জেনারেল ওয়াকারের নিজের খুঁটি কতটা শক্ত, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। সেনাবাহিনীর অফিসারদের একটা বড় অংশ জামাত ও পাকিস্তানপন্থী। সাধারণ সৈনিকদের মধ্যেও জামাতের জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান।

মুসলিম ব্রাদারহুড ও ব্রাদারহুডের নেতা মুহাম্মদ মুরসিকে মিশরে মার্কিন স্বার্থের প্রতিপক্ষ শক্তি হিসেবেই দেখত হোয়াইট হাউস। মুসলিম ব্রাদারহুডকে শুধু মিশর কিম্বা মধ্যপ্রাচ্যেই নয় গোটা পৃথিবীতে ইসলামিক মৌলবাদের জন্মদাতা সংগঠন বলা চলে। মুসলিম ব্রাদারহুড ও আল-কায়দার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই আমেরিকার চোখে। আমেরিকার পরামর্শে

ক্ষমতায় বসার এক বছরের মাথাতেই মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন মিশরের সেনাপ্রধান আবদেল ফাল্লাহ এল-সিসি। ক্ষমতা হাতে নিয়েই ব্রাদারহুডকে নির্মমভাবে দমন করেন সিসি। ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ হয়। একাধিক অভিযোগে মুহাম্মদ মুরসিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় সামরিক সরকার। ২০১৯-এর ১৭ জুন কায়রোর তোরা প্রিজন কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে বিশেষ আদালতে শুনানি চলাকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মুরসির মৃত্যু হয়। জামাতে ইসলামির ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান ঠিক কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ঢাকায় জামাতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের অনেকবার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র সফর‌ও সেরে এসেছেন জামাতে ইসলামির আমীর শফিকুর রহমান। জামাত বাংলাদেশে ক্ষমতায় চলে এলে আমেরিকার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে, এখনও পর্যন্ত এমন কোনও ইঙ্গিত মার্কিন কূটনীতিক মহল দেয় নি।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির দাবিদার জামাত একা নয়। ইসলামপন্থীদের মধ্যে জামাতে ইসলামি নিঃসন্দেহে সবথেকে বড় ও সংগঠিত শক্তি। তবে চরমোনাই পীর সৈয়দ রেজাউল করিমের ‘ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ’ সহ আরও প্রায় এক ডজন রাজনৈতিক দল আছে, যারা বাংলাদেশে শরিয়ার শাসন ও খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে এখন ইসলামপন্থী রাজনীতির‌ই রবরবা। রোজ‌ই ঢাকায় তাদের বড় বড় মিছিলে মেদিনী প্রকম্পিত। খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জামাত সহ বিভিন্ন বর্গের ইসলামিক মৌলবাদী গোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামাত সহ বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠনের সমাবেশে মানুষের ঢল নামে। মুহাম্মদ ইউনূসের ১৫ মাসের শাসনে বাংলাদেশ জুড়ে চার হাজার মাজার ভাঙা হয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে যারা সুফি তরিকায় বিশ্বাসী, তাদের‌ মুসলমান বলেই স্বীকার করে না গোঁড়া ইসলামপন্থীরা। মাজারে গান-বাজনা তো দূরের কথা বাংলাদেশের মাটিতে কোনও সুফি সাধকের মাজার পর্যন্ত থাকতে দেবে না মৌলবাদীর। হাজার হাজার উন্মত্ত জনতা যখন মাজার ভেঙে দিতে হামলা চালায়, তখন পুলিশ নীরব দর্শক হয়ে দেখে। মাস খানেক আগে কবর থেকে এক ফকিরের দেহ তুলে প্রকাশ্য রাস্তায় জ্বালিয়ে দিয়েছে গোঁড়া মুসলমানরা!

মৌলবাদীদের চাপের মুখে খোদ রাজধানী ঢাকায় নাট্যোৎসব বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান পন্ড হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রামের যখন এই অবস্থা, তখন জেলা-উপজেলা ও গ্রামগুলির অবস্থা চিন্তা করুন। আগে শীতকাল জুড়ে বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে বাউলগানের আসর বসত। এখন বাউলশিল্পীরা মার খাওয়ার ভয়ে মঞ্চে উঠতে ভয় পান। বহু অনুষ্ঠানে মঞ্চের মধ্যেই শিল্পীদের শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হয়েছে। বাউলদের আখড়া হামলা করে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বাউল-ফকিরেরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মৌলবাদীদের মন রাখতে তাদের মেলা করার অনুমতি দিচ্ছে না প্রশাসন।

সঙ্গীত বিদ্যালয়ে ঢুকে বাদ্যযন্ত্র‌ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে মাদ্রাসার পড়ুয়ারা, সাদা টুপি ও সাদা জোব্বা পরা দাড়িওয়ালা মোল্লারা। বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে গান-বাজনার চর্চা হঠাৎ করে অনেক হ্রাস পেয়েছে। গান-বাজনা হারাম, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলমানরাও এখন এ কথা মানতে শুরু করেছে। মফস্বলে ভয়েই ছেলেমেয়েদের গানের শিক্ষকের কাছে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন অনেক অভিভাবক। খোদ ইউনূস সরকার মৌলবাদী সংগঠনগুলির চাপের কাছে নতিস্বীকার করে সরকারি স্কুলে সঙ্গীত ও শারীরশিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। সরকারের যখন ধর্মান্ধদের ভয়ে হাঁটু কাঁপছে, তখন সাধারণ মানুষ কী পরিস্থিতির মধ্যে আছেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। 

এই প্রতিবেদন লিখতে লিখতেই ঢাকা থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও হাসিনা সরকারের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করার খবর পাওয়া গেল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমাতে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের উপর মারণাস্ত্র প্রয়োগের মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হ‌ওয়ায় তাঁদের প্রাণদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।‌ স্বামী ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বার্লিনে থাকায় বেঁচে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোটবোন রেহানা। পঁচাত্তরে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর মিত্র মুজিবকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যদিও মুজিবের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এই তথ্য গোপনে খোদ মুজিবের কানে তুলে ছিলেন ‘র’ প্রধান আর‌এন কাও। কর্ণপাত করেন নি শেখ মুজিব।

সেনাবাহিনী সরে দাঁড়ানোর পর চব্বিশের ৪ অগাস্ট সকালে ঢাকার যে পরিস্থিতি হয়েছিল, তাতে নিজের সরকারি বাসভবন ‘গণভবনে’ উন্মত্ত জনতার হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়ে যেতেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, যদি তাঁদের উদ্ধারে সে’দিন দ্রুত পদক্ষেপ না করত সাউথ ব্লক। হাসিনা ও রেহানা গণভবন ত্যাগ করার মাত্র তিরিশ মিনিটের মধ্যে সেখানে জনস্রোত ঢুকে পড়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামি লিগকে  নিষিদ্ধ করেছে ইউনূস সরকার। ঢাকার ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত। বাংলাদেশের যেখানে যত বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য ছিল, সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

নিঃসন্দেহে দ়ক্ষিণ এশিয়ায় শেখ হাসিনার সরকার ছিল ভারতের সবথেকে বিশ্বস্ত মিত্র ও রাজনৈতিক সহযোগী। হাসিনা পাকিস্তানের মদতপুষ্ট বিভিন্ন ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলিকে ভারতের ভূখণ্ডে নাশকতা চালাতে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে দেন নি। ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা- শেখ হাসিনা ভারতের সব স্বার্থ‌ই সাধ্যমত রক্ষা করেছেন। তার বিনিময়ে হাসিনা সরকারকে একতরফা সমর্থন জুগিয়ে গেছে নয়াদিল্লি।

স্বার্থের খাতিরে অন্ধ হ‌ওয়ায় হাসিনা সরকারের বিচ্যুতিগুলো সাউথ ব্লকের নজরে পড়ে নি। কিন্তু অন্ধের জন্য তো প্রলয় বন্ধ থাকে না। তাই ঢাকায় শেখ হাসিনা রেজিমের পতনের খবর শুনে ২০২৪-এর ৪ অগাস্ট দুপুরে দিল্লিতে ভারতের কূটনীতিক মহল যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তাই হয়ে পড়েছিল। হাসিনার পতনের ১৫ মাস পরেও বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের বিভ্রান্তি কেটেছে বলে মনে হয় না। আসলে হাসিনা সরকারের যে আচমকা পতন হতে পারে, তা আঁচ করতে পারেন নি ভারতের দুঁদে কূটনীতিক ও ‘র’-এর চৌকস গোয়েন্দারাও। আওয়ামি রেজিমের পতনের খবর তাই মোদী সরকারকে ভীষণ অপ্রস্তুত করে ফেলে। হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশকে কীভাবে বোঝাপড়া করতে হবে, তা নিয়ে সাউথ ব্লকের সুস্পষ্ট ও দৃঢ় কোনও কূটনৈতিক অবস্থান আজকের দিন পর্যন্ত তৈরি হয়েছে কি? শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে তাঁদের প্রত্যর্পণ চেয়েছে বাংলাদেশ। জবাবে সাউথ ব্লক যে দায়সারা বিবৃতি দিয়েছে তাতে কিন্তু ভারতের দুর্বলতাই প্রকাশ পাচ্ছে।

এদিকে বর্তমান বাংলাদেশে ভারত বিদ্বেষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে পাকিস্তানপ্রেম। বাংলাদেশের মূল স্রোতের রাজনীতি কীভাবে ইসলামিক মৌলবাদীদের কবলে চলে গেছে তা নিয়ে আগেই আলোচনা করেছি। এমনকি পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনগুলি আবার নতুন করে বাংলাদেশের মাটিতে তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। ভারতের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাতে ফের বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে ইসলামপন্থী জঙ্গি সংগঠনগুলি। ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ৫২-র ভাষা আন্দোলনের চেতনা, আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারির আবেগ দিয়ে আর প্রতিবেশীকে মাপতে যাবেন না। বরং জন বিস্ফোরিত  বাংলাদেশ হতে চলেছে দক্ষিণ এশিয়া ও উপমহাদেশের সবথেকে অস্থির, বিপজ্জনক অঞ্চল।

চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে ইতিমধ্যেই তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি করে প্রতি বছর যা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে, তার  ৮০-৮৫ শতাংশ‌ই তৈরি পোশাক শিল্প থেকে আসে। হাসিনা যাওয়ার পর এই গার্মেন্টস ইন্ড্রাস্ট্রির অবস্থাও শোচনীয়। দেশটিতে কর্মসংস্থান তলানিতে। বেকারত্ব চরমে। বাংলাদেশের ঘোষিত জনসংখ্যা ১৮ কোটি। প্রকৃত পরিসংখ্যান অন্য রকম। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২২-২৩ কোটির কম নয়। জাতিসংঘ ও ইউরোপের দাতা দেশগুলির  সাহায্য অব্যাহত রাখতে জনসংখ্যা নিয়ে প্রকৃত তথ্য দীর্ঘদিন ধরেই গোপন করে আসছে বাংলাদেশ। দেড় থেকে দুই কোটি বৈধ-অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেক বছর বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান ধপাধপ করে পড়ছে। এখন উগান্ডার টুরিস্ট ভিসা পাওয়াও বাংলাদেশীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কলাপস করে গেলে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ৪০ ফুট উঁচু করেও অনুপ্রবেশ আটকাতে পারবে বলে মনে হয় না।

 ★ ★ ★ ★ ★

কার্ত্তিক মাসের কিছু বিশেষ রীতি – পীযূষ কান্তি মুখার্জী

মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা, ২০শে নভেম্বর ২০২৫, মার্গশীর্ষ অমাবস্যা ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২

“কার্ত্তিক মাসে তুলারাশিস্থে ভাস্করে”

কার্ত্তিক মাসে সূর্য থাকেন তুলারাশিতে। রাশিচক্রে সবথেকে নিম্নস্থ অবস্থায়। এই মাসের পরেই আসে মার্গশীর্ষ অগ্রহায়ণ মাস। যখন রাশিচক্রের মার্গে সূর্যের অগ্রগতির সূচনা হয়। অনেক প্রাচীনকালে কার্ত্তিক মাস দিয়ে বছর শেষ হতো। অগ্রহায়ণ ছিল বছরের প্রথম মাস। পরে ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা বৈশাখ মাস দিয়ে বছর গণনা আরম্ভ করেন। চৈত্র হয়ে যায় বছরের শেষ মাস। এবং এই চৈত্রে যেমন চড়ক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সারা বছরের যাত্রার চক্র শেষ করে মায়ের নাম নিয়ে নতুন বছর আরম্ভ করার রীতি আছে, কার্ত্তিক মাসেও তেমনি মাতৃসাধনার কিছু নিজস্ব রীতি আছে। এই মাস কৃত্তিকা নক্ষত্র এবং কৃত্তিকা মাতৃকাদের নামাঙ্কিত। আবার ঋতুচক্রে শরত শেষ হয়ে হেমন্তের আগমনের সময়। এই মাসের বাঙালির কিছু অনুষ্ঠানের কথা বলে এই সময়ের বিশেষত্ব নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করব।

১। কার্ত্তিক মাস গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের নিয়মসেবার মাস। এই গোটা মাসে তাঁরা সংযত জীবনযাপন করেন। পরিমিত আহার করেন। চুল দাড়ি কাটার বিষয়েও কিছু নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেন। এই রীতির পিছনে আছে মাতৃসাধনার প্রভাব। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ বলেন, হেমন্তের পূর্ণিমায় রাধাকৃষ্ণের রাসমণ্ডল হয়। তার আগে গোপীগণ ব্রজমণ্ডলে এক মাস মা কাত্যায়নীর ব্রত পালন করেছিলেন। প্রার্থনা করেছিলেন:

“কাত্যায়নী মহামায়ে মহাযোগিন্যধিশ্বরী

নন্দগোপসুতম্ দেবী পতিম্ মে কুরু তে নম:”

কার্ত্তিক মাসে বৈষ্ণবদের নিয়মসেবা আসলে এই কাত্যায়নী ব্রতের রূপ। বৈষ্ণব সাধক নিজের চেতনায় রাসমণ্ডলের সাধনা সম্পন্ন করার জন্য ব্রজমণ্ডলের অধিশ্বরীর সাধনা করেন এই নিয়মসেবার মাধ্যমে। অবিভক্ত বাংলার সর্বত্র এই রীতি পালিত হয়। আমরা জানি, নিত্যানন্দ মহাপ্রভু গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মকে রূপ দিয়েছেন। তিনি নিজে খড়দহ শ্রীপাটে মা কাত্যায়নীর পূজা করতেন। সম্ভবত নিতাইচাঁদের মাধ্যমেই এই নিয়মসেবার রীতি বাংলার সর্বত্র প্রচলিত হয়েছিল।

২। কার্ত্তিক মাসের একটি বিশেষত্ব হল জাগরণ গান বা টহল গান। এই সময় প্রত্যেক গ্রামে পালা করে কিছু মানুষ ভোরবেলায় এক একটি পাড়ায় কীর্তন গান করেন। এক জায়গায় থেমে না থেকে ধীর অথচ সুরেলা কণ্ঠে পদ গাইতে গাইতে প্রতিটি বাড়ির ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে যান তাঁরা। সেই কারণেই একে টহল গান বলে। এর বিনিময়ে গৃহস্থ তাঁদের সিধে দিয়ে থাকেন।

 মূলত যে পদটি সার্বজনীন ভাবে টহল গানে গাওয়া হয়, সেটি বৈষ্ণব পদকর্তা জ্ঞানদাসের লেখা জাগরণ লীলার একটি পদ।

“রাই জাগো রাই জাগো বনে শুক সারি বলে

কত নিদ্রা যাও গো রাই কালো মানিকের কোলে”

এর সাথে গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদও অঞ্চলবিশেষে গাওয়া হয়। যেমন:

“প্রভাত সময়ে শচীর আঙিনা মাঝে

গৌরচাঁদ নাচিয়া বেড়ায় রে

রাতুল চরণে সোনার নুপূর

রুনুঝুনু রুনুঝুনু বাজে রে”

পদকর্তা জ্ঞানদাস সহজিয়া সাধক চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য ছিলেন। তাঁর লেখা জাগরণ লীলার ঐ পদটি সহজিয়া সাধনার পদ, কুলকুণ্ডলিনী শক্তির বোধনের পদ। সেই অর্থে এই টহল গান সহজিয়া বাঙালির রীতি। আবার শীতের আগমনের আগের এই সময়ে ভোরবেলায় মধুর গানূর সুরে ঘুম থেকে জেগে ওঠার মধ্যে শরীর মন সুস্থ রাখার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিকও এখানে পালিত হয়।

৩। কার্ত্তিক মাসের বাঙালি শিশুরা একটি ব্রত পালন করে। যম পুকুর ব্রত। এই ব্রতের জন্য ছোটো পুকুর কেটে পুকুর কাটার মাটি পুকুরের চার পাশে চার জায়গায় জমা করা হয়। পুকুরের মাঝে রোপণ করা হয় ধান, হলুদ ও মানকচু গাছ। এই তিনটিই দুর্গাপূজার নবপত্রিকার অন্তর্গত। ধান মা মহালক্ষ্মীর রূপ। হলুদ মা দুর্গার রূপ। আর মানকচু মা চামুণ্ডার রূপ। যম পুকুরে বাঙালির এই তিন মাতৃকার অধিষ্ঠান হয়। এরপর ঐ চারকোণের মাটিতে রোপণ করা হয় পাঁচ কলাই, শীতের রবিশস্য। পাঁচ কলাই এখানে একদিকে তন্ত্রের পঞ্চ তত্ত্বের প্রতীক, আবার শরীরের পঞ্চভূতের পুষ্টির জন্যও এরা অপরিহার্য।

তারপর প্রতিদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগে উঠে পুকুরকে জলপূর্ণ করতে হয়। এই ভোরে ওঠার মধ্যে আসন্ন শীতকে সইয়ে নেওয়ার বিধি আছে। ফলে ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে শিশুরা রোগমুক্ত ও সবল থাকে। এইভাবে সারা মাস সংযমে থেকে শরীর ও ধর্মের এই উদযাপন হয় বলেই এই ব্রতের নাম যম পুকুর ব্রত।

৪। কার্ত্তিক মাসে সূর্য রাশিচক্রে সবথেকে নিচস্থ থাকে, আগেই বলেছি। ফলে এই মাসের অমাবস্যার রাত বছরের অন্ধকারতম রাত। মানুষের মন এই মহানিশায় কালের ভয়ে ভীত। তাই এই রাতেই আমরা কালরূপা মা কালীর শরণ নিই কালের ভয় থেকে উদ্ধার পেতে। ঠিক যেমন শিশু ভয় পেলে মাকেই আঁকড়ে ধরে।

আবার সহজিয়া ভাষায়:

রবি শশী হয় বিমুখা

মাসান্তে হয় একবার দেখা

সূর্য ও চন্দ্র, যারা সচরাচর পরস্পরের বিপরীতে অবস্থান করে, তারা অমাবস্যায় এক রাশিতে আসে। সাধকের দেহেও সূর্যনাড়ি ও চন্দ্রনাড়ি এই সময় এক হয়ে সহস্রারের দিকে ধাবিত হয়। ফলে এই অমাবস্যায় মাতৃসাধনার পথ সবথেকে সহজ এবং শীঘ্র ফলদায়ী হয়।

আবার কার্ত্তিকের এই অমাবস্যার আগের দিন হয় ভূত চতুর্দশী। চৌদ্দ ভূতকে দেহতত্ত্বের দৃষ্টিতে আমরা চৌদ্দ নাড়ি বা চেতনার রূপ বলতে পারি। এরা সকলেই এই সময়ে মাতৃমুখী হয়। তাই এই তিথি মাতৃসাধনার তিথি।

৫। কার্ত্তিক মাসের সংক্রান্তি মুঠ সংক্রান্তি বা মুষ্টি সংক্রান্তি নামে পরিচিত। সারা বছরের আহারের জন্য নতুন ধান ওঠার উৎসব নবান্ন। মুঠ সংক্রান্তি হল সেই নবান্নের আগমনী। ধান্যরূপে মা লক্ষ্মীর এক বিশেষ পূজার তিথি।

এই দিন প্রত্যেক বাড়ির একজন সদস্য ভোরবেলা শুদ্ধ বস্ত্র পরে নিজের জমিতে যান। জমির ঈশান কোণে গিয়ে ধানের গোছায় গঙ্গাজল ও সিঁদুর দেন। এরপর  ধানের দুটি গোছা ও একটি গোছার অর্ধেক মুঠোয় ধরে কাস্তে দিয়ে কাটেন। এই আড়াই গোছার তান্ত্রিক গুরুত্ব আছে। আমাদের দেহে কুলকুণ্ডলিনী মূলাধার চক্রে আড়াই পাকে অবস্থান করেন। মা লক্ষ্মীর আরাধনার তান্ত্রিক রীতিই সম্ভবত এখানে পালিত হয়। এরপর ঐ কাটা ধানের গোছা মাথায় নিয়ে (ধান সামনের দিকে ঝুলতে থাকে, গোড়া পিছনের দিকে থাকে এমনভাবে) শঙ্খধ্বনি করতে করতে বাড়ি ফিরতে হয়। এই সময় কোনো কথা বলতে নেই। বাড়িতে এসে ঠাকুরঘরে পিঁড়িতে ধানের গোছা রেখে সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। সামনে রাখা হয় জলপূর্ণ ঘট। তারপর মা লক্ষ্মীর পূজা হয়। মায়ের এখানে আলাদা মূর্তি হয় না। ঐ ধানের গোছাই মায়ের মূর্তি। যখন মূর্তি নির্মাণ আরম্ভ হয়নি, তখনো এভাবেই ধানের মধ্যেই সম্পদদায়িনী মায়ের উপাসনা হতো। এরপর ভিজে ভাত, দুধ দিয়ে, নারকেল নাড়ু বা পাটালি দিয়ে নূন্যতম তিন গ্রাস খেতে হয়। পুরোনো ভাত খাওয়া এবং নতুন ধান আনাই নবান্নের রীতি। সেটাই এখানে পালিত হয়।

৬। এই কার্ত্তিক মাসে শোল মাছ পোড়া খাওয়ার রীতি আছে। এই রীতি একদিকে তন্ত্রের সাথে যুক্ত। তন্ত্রে পোড়া শোল মাছ মাতৃকাকে নিবেদনের রীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার অন্যদিকে হেমন্তের এই সময়ে মাছ পোড়া খেয়ে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারে দেহের পুষ্টিবিধান করা হয়। রোগের হাত থেকেও দেহ সুরক্ষা পায়।

৭। কার্ত্তিক সংক্রান্তিতে বিভিন্ন অঞ্চলে কার্ত্তিক পূজা হয়। কার্ত্তিক কৃত্তিকাদের পুত্র। কৃত্তিকা অর্থাৎ যারা কর্তন করেন সেই মাতৃকারা। অন্যদিকে এই সময় মা কৌমারী শক্তির আরাধনার ও বটে।

ময়ূরকুক্কুটবৃতে মহাশক্তিধরেহনঘে

কৌমারীরূপসংস্থানে নারায়ণী নমোহস্তুতে।

মা কৌমারীর কৃপায় সাধনার মহাশক্তিতে অহঙ্কার রূপ অন্তরের দানব নাশ হয়।

এইভাবে কার্ত্তিক মাসে বাঙালির বিভিন্ন রীতির উদযাপন হয়। এগুলি একদিকে ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীরকে সবল রাখে, আমাদের কৃষিসম্পদের আগমনের সূচনা করে। অন্যদিকে আমাদের বারবার নিয়ে যায় সহজিয়া মাতৃসাধনার শিকড়ের দিকে।

 ★ ★ ★ ★ ★

গৌড় অঞ্চলে বাঙালির নবান্ন – নিবেদিতা মুখার্জী

মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা, ২০শে নভেম্বর ২০২৫, মার্গশীর্ষ অমাবস্যা ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২

         

ভূমিকা

বাঙালির শিকড়ের সুবাস মিশে আছে বিভিন্ন পালা পার্বণ, ব্রত ও অনুষ্ঠানের মধ্যে। গ্রামবাংলায় এখনো এদের অনেকগুলিই প্রচলিত এবং সযত্নে সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। এই সমস্ত ধারাগুলি মাতৃসাধনার সেই চিরন্তন ধারাতেই মিশেছে। তিনি কখনো লক্ষ্মী বা ধান্যলক্ষ্মী, কখনো দুর্গা, উমা, দশভুজা, কখনো কালী, চামুণ্ডা, চর্চিকা। বাঙালি তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এই ব্রত, উৎসব, অনুষ্ঠানগুলোকে আনন্দের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছে। এগুলি হয়ে উঠেছে তার দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। সমাজ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেলেও এই ব্রত, উৎসবগুলি বাঙালির জীবনকে এখনো ঘিরে আছে বলেই বাঙালি এখনো শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয় নি।

এইরকমই একটি উৎসব নবান্ন। গোটা অগ্রহায়ণ মাস জুড়েই বাংলার বিভিন্ন স্থানে পালিত হয় এই উৎসব। হেমন্ত ঋতু বাঙালির পরিপূর্ণতার ঋতু। মাঠে মাঠে নতুন ধান।

জননী তোমার আহ্বান ধ্বনি পাঠিয়ে দিয়েছ ভুবনে

নতুন ধান্যে হবে নবান্ন তোমার ভবনে ভবনে

ধান থেকে আসে বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত বা অন্ন। সেই অন্নের মধ্যে বাঙালি মা ধান্যলক্ষ্মীকে দর্শন করে। আর মাতৃপূজার সাথে বাঙালির শিকড় এমনভাবেই জড়িয়ে আছে যে, মাতৃদেবীকে উৎসর্গ না করে বাঙালি নতুন কিছু গ্রহণ করে না। এটাই অন্য জাতির থেকে বাঙালিকে স্বতন্ত্র করেছে। এবার মুর্শিদাবাদের (উত্তর রাঢ়ের গৌড় অঞ্চলের) বাঙালির নবান্ন উৎসব নিয়ে একটু সংক্ষিপ্ত ধারণা দিই।

চাল-নবান্ন

নবান্নের দিন ভোরে নতুন ধান বা চাল (আতপ ও উষ্ণ) ঠাকুরঘরে স্তূপীকৃত করে লাল বস্ত্র ঢাকা দিয়ে সিঁদুর, কড়ি, ধান দূর্বা দিয়ে সাজানো হয়। কাঠের পেঁচা পেঁচী সাজানো হয় তার চারিদিকে। ইনিই অন্নলক্ষ্মী। এই লাল বস্ত্র দেওয়া কড়ি আর ধানের রাশিই মায়ের মূর্তি। মায়ের আলাদা করে পুরোহিত দিয়ে কোনো পূজার প্রয়োজন হয় না। গৃহকর্ত্রীই মায়ের পূজা করেন। এরপর নতুন আতপ চালের গুঁড়ো, দুধ, কলা, নারকেল, ক্ষীর, সন্দেশ প্রভৃতি উপাদেয় উপকরণ দিয়ে মাখা হয় পাথর বা পিতলের পাত্রে। সেটা প্রথমে গৃহদেবতার কাছে নিবেদন করা হয়। তারপর রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর, গৃহদেবতার মন্দির, উঠোন, খিড়কি, তুলসীতলায় অর্থাৎ সোজা কথায় বাড়ির সর্বত্র কলাপাতায় সেই নবান্ন নিবেদন করা হয় বাস্তুদেবতা, পক্ষী, পোষ্য জীব (কুকুর, বিড়াল, গোরু, ছাগল) কে। নবান্নের ভাগ থেকে কোনো প্রাণী বঞ্চিত হয় না। বাঙালির উৎসবের এ এক অপূর্ব বৈশিষ্ট্য। এরপর পাড়া-প্রতিবেশী সকলের বাড়িতে গিয়ে সকলে নবান্ন গ্রহণ করে। এই পর্বকে বলে চাল-নবান্ন।

ভাত-নবান্ন

এরপর উষ্ণ চাল রান্না করা হয়। রান্না করা হয় শাক, দুই প্রকার ডাল, লাউয়ের তরকারি, কুমড়োর তরকারি, পেঁপে-নারকেলের তরকারি,ফুলকপির রসা, ফুলকপির ডাঁটা -আলু-বেগুন-মুলো দিয়ে সর্ষে, পোস্ত সহযোগে চচ্চড়ি, পাঁচ বা সাত বা নয়রকম ভাজা (রাঙাআলু ভাজা, সাদা আলু ভাজা, বেগুন ভাজা, কাঁচাকলা ভাজা, নারকেলভাজা, আখভাজা, পটলভাজা, কুমড়োভাজা ইত্যাদি), মুলো-বেগুন-বড়ি-তেঁতুল দিয়ে নুন-টক, পায়েস, চাটনি। এগুলো সবই নিরামিষ রান্না করা হয়। এরপর বিশেষ কোনো ভোগ নিবেদনের রীতি নেই। তবে আগের মতোই বাড়ির বিভিন্ন স্থানে গৃহদেবতা, বাস্তুপুরুষ, পশু পাখিদের নিবেদন করে সেই অন্ন গ্রহণ করা হয়। এই পর্বকে বলে ভাত-নবান্ন। এই অন্নগ্রহণের মধ্যে দিয়ে সারা বছরের ভাত খাওয়ার পর্বটির সূচনা ঘটে।

মুলো-মহোৎসব

এরপর সন্ধ্যাবেলায় সাঁঝপ্রদীপ দেখানোর পর বেতের সের (একটি গোল পাত্র, ওজন মাপার একক ও বটে) নিয়ে নতুন চাল, একটা টাকা (ষোলো আনা), সোনা-রূপা, দূর্বা সহযোগে গৃহকর্ত্রীর সাথে সকলে মন্ত্র পড়ে।

” ন’ পুরোনো নাড়ি চাড়ি

নতুন বাঁধি পুরোনো খাই

নতুন বস্ত্র পুরোনো অন্ন

পাই যেন জন্ম জন্ম”

এরপর ঐ সেরটি মাথায় ঠূকিয়ে ঠাকুরঘরে রেখে দেওয়া হয়।

দিনে নিরামিষ খাওয়া হলেও রাতে হয় মাছ আর মুলো দিয়ে মুলো-মহোৎসব। আবহমান কাল থেকে বাঙালির মাঠে ধান আর নদী-পুকুরে মাছের কোনো অভাব ছিল না। সেই পুকুরের মাছ দিয়ে মুলো সহযোগে ঝোল রান্না করা হয়। এইভাবে নতুন চালের ভাত আর মুলো দিয়ে মাছের ঝোলে মুলো-মহোৎসবে রাতের আহার সম্পন্ন হয়। লক্ষ্য করার বিষয় হল এই সময়ে মুলো বাঙালির ব্রতকর্মে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মুলো দিয়ে নবান্নের মুলো-মহোৎসব, মুলো দিয়ে মূলাষষ্ঠীর ব্রত আর পৌষমাসে মুলোর নৈবেদ্য নিয়ে বিভিন্ন কালীক্ষেত্রে মা পৌষকালীর পূজা তার দৃষ্টান্ত।

লোক-উৎসব

নবান্নের দিনের একটি বিশেষ লোক উৎসব হল লবান-কার্ত্তিক (নবান্ন-কার্ত্তিক) এর পূজা। মূলত অপুত্রক নারীরা সন্তানকামনায় কার্ত্তিকের মূর্তি তৈরী করে এই পূজা করে থাকেন। এছাড়া নবান্ন উপলক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে।

বাসি নবান্ন

নবান্নের দিনেই কিন্তু এই উৎসব শেষ হয় না। পরের দিন হয় বাসি নবান্ন। আগের দিনের ভাত, তরকারি সহযোগে এই দিন দুপুরের আহার সম্পন্ন করা হয়। ফলে সেই দিন একপ্রকার অলিখিত অরন্ধন থাকে।

উপসংহার

সেই আদিকাল থেকেই অন্ন থেকে আরম্ভ করে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সবকিছুই মাতৃদেবীকে উৎসর্গ করে গ্রহণ করা বাঙালির ধর্মভাবনার মূল রীতি। নবান্নের মতো ব্রত-উৎসব-অনুষ্ঠানগুলি তারই দৃষ্টান্ত হয়ে বাঙালিকে তার শিকড়ে যুক্ত করে রেখেছে। এর মধ্যে দিয়েই সে নিজের আবহমান সত্ত্বাকে বারবার নিরীক্ষণ ও নতুন করে অনুভব করে। যুদ্ধ, মৃত্যু, দুর্ভিক্ষ, মহামারির মাঝেও এই উৎসবগুলির মধ্যে দিয়ে শিকড়কে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছে বাঙালির জীবনযাত্রা।

বর্তমান সমাজে আধুনিকতার উগ্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন অপসংস্কৃতি বাঙালিকে শিকড়বিচ্ছিন্ন করছে। তবুও আজও বাঙালির মাথায় সেই মাতৃদেবীর অভয় হস্ত বিরাজমান। তিনি থাকতে বাঙালির শিকড়ের বিনাশ সম্ভব নয়। মায়ের বরাভয়া মূর্তি কল্পনা করেই সমস্ত বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে বাঙালি নিজের শিকড়ে ফিরে আসবে, এই আশা রাখি। জয় মা।

 ★ ★ ★ ★ ★

পুণ্ড্রের মাতৃকথা – ডাঃ রক্তিম মুখার্জী

মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা, ২০শে নভেম্বর ২০২৫, মার্গশীর্ষ অমাবস্যা ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২

পুণ্ড্রের মাতৃকথা

 রক্তিম মুখার্জী

পুণ্ড্র আমাদের মাতৃভূমির একটি প্রধান সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ভৌগলিক বিভাগ। মহাভারতের যুগে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুণ্ড্র ও সুহ্ম এই পাঁচটি বিভাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য

বাঙালির এই জনপদগুলি কিন্তু উল্লেখ করা হত বঙ্গাঃ, পুণ্ড্রাঃ, রাঢ়াঃ, গৌড়াঃ এইভাবে, অর্থাৎ এই নামগুলি সেই অঞ্চলের প্রধান অধিবাসী জনজাতিটিকে চিহ্নিত করত। নামগুলি আদিতে জাতিবাচক ছিল।

আজকের নিরিখে বলতে গেলে, পুণ্ড্র হল উত্তরবঙ্গ। পুণ্ড্রের মধ্য থেকেই গৌড়ের উত্থান। নীহাররঞ্জন জানাচ্ছেন, বরেন্দ্র পুণ্ড্রেরই এক সুবৃহৎ অংশ ছিল। পুণ্ড্র-বরেন্দ্র আবার রাঢ়ের উত্তরাংশ অর্থাৎ আজকের বীরভূম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ (যে অঞ্চল শশাঙ্কের সময়ে গৌড়রাষ্ট্রের কেন্দ্রস্থল) এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। সহজ কথায় পুণ্ড্র ছিল গাঙ্গেয় অববাহিকার উত্তর অংশ। অবশ্য আমরা যদি অজয় অববাহিকার পাণ্ডুরাজার ঢিবির সভ্যতার সাথে পুণ্ড্রের এবং পৌণ্ড্রক বাসুদেবের সম্ভাব্য যোগসূত্র বিচার করি, তবে বলতে হয় সভ্যতার আদিপর্বে আজকের রাঢ়বাংলার উত্তরাংশ এবং গাঙ্গেয় অববাহিকার উত্তর পশ্চিম দিকটিও পুণ্ড্রের অন্তর্গত ছিল।

পুণ্ড্র সম্বন্ধে একটি চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে, বাঙালির আদি ইতিহাসের প্রায় সবটুকুই বৈদিক ও পৌরাণিকগণ মুছে দিলেও পুণ্ড্রকে কখনোই পুরোপুরি মুছতে পারে নি। মহাভারতে পুণ্ড্রভূমির সাথে অসুররাজ বলির একটা যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। হরিবংশে কৃষ্ণ এবং পৌণ্ড্রক দুজনে বাসুদেব পদবীর দুই দাবিদার, দুজনে প্রবল যুদ্ধে অবতীর্ণ, এবং কৃষ্ণের মুখে মুক্তকণ্ঠে পৌণ্ড্রকের অসামান্য বীরত্বের প্রশংসা শোনা যাচ্ছে। আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পে অসুরভাষী রাষ্ট্র রূপে পুণ্ড্রের উল্লেখ আছে। সোমদেবের কথাসরিৎসাগর থেকে পুণ্ড্রের রাজকন্যা দুঃখলব্ধিকার স্বয়ম্বরের কথা জানা যায়। পুণ্ড্রের প্রতি অনিচ্ছা সত্ত্বেও বৈদিক বলয়ের এই সম্ভ্রমকে বাঙালির এই ভূখণ্ডের প্রবল প্রতিপত্তির একটি পরোক্ষ সাক্ষ্য বলে গ্রহণ করা চলে। বাঙালির মাতৃভূমির চিরন্তন বৈশিষ্ট্য মেনে এই পুণ্ড্র অঞ্চলেও সভ্যতার আদিপর্ব থেকে মাতৃসাধনার ধারা সবেগে বহমান। আবার পুণ্ড্র নিজেই মাতৃসাধনার একাধিক প্রাচীন প্রবাহের সাথে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রেখেছে। এই প্রবন্ধে তারই কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা করব।

পুণ্ড্র আখ ও মাতৃপূজা

পুণ্ড্র নামে একপ্রকার আখ হয়। নীহাররঞ্জন মহাশয় জানাচ্ছেন এই পুণ্ড্র আখের নাম থেকেই পুণ্ড্র ভূখণ্ডের নাম হয়েছে। পুণ্ড্রের আখ থেকে গুড় উৎপন্ন হতো। সেই গুড় সমুদ্রবণিকদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনত বলেই আমাদের ভূখণ্ডের নাম গৌড়। অবশ্য পুণ্ড্রের আখের সাথে বাংলা তথা উপমহাদেশের মাতৃসাধনার ধারার দুটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র আছে।

প্রথমত এই পুণ্ড্রেক্ষু (পুণ্ড্রের ইক্ষু বা আখ), যার থেকে পুণ্ড্র অঞ্চলের নামকরণ, সেই আখের ধনুক তন্ত্রের শ্রীকুলে মা ত্রিপুরাসুন্দরীর আয়ুধ। তন্ত্র ও পুরাণে পুণ্ড্র আখের ধনুক ও বাণপূর্ণ তূণ নিয়ে আদ্যাশক্তি ত্রিপুরাসুন্দরী চিদগ্নিকুণ্ড থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভণ্ডাসুরকে বধ করতে। শ্রীকুলের সাধনাতেই আবার এই পুণ্ড্র আখের ধনুক হয়েছে সাধকের মনের প্রতীক, বাণগুলি হয়েছে পঞ্চ তন্মাত্রার প্রতিভূ। অর্থাৎ সাঙ্খ্যের তত্ত্বের ভিত্তিতে শ্রীকুলে অদ্বৈত মাতৃকার যে ধ্যান ও তত্ত্ব নির্মিত হয়েছে, পুণ্ড্রের আখ তার সাথে ওতপ্রোত হয়ে জড়িয়ে আছে। হয়তো পুণ্ড্র অঞ্চলে তাম্রাশ্মযুগে বা তারও আগে যে মাতৃপূজক অবৈদিক আর্য ও দ্রাবিড় জাতির বসবাস ছিল, আখের ধনুক হাতে মায়ের এই বিশেষ রূপ তাঁরাই প্রথম ধারণা করেছিলেন। আদিবিদ্বান কপিলের সাঙ্খ্য সেই মাতৃরূপের প্রথম দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। যে জাতির সমৃদ্ধি আখ ও আখের গুড় থেকে, তাদের পক্ষেই পুণ্ড্র অঞ্চলের এই বিশেষরকম দীর্ঘ ও শক্ত আখকে মায়ের হাতের আয়ুধ রূপে ধারণা করা সম্ভব। মায়ের সেই রূপই অনেক পরে দাক্ষিণাত্যে শ্রীকুলে আজকের রূপ পেয়েছে।

পুণ্ড্রাসুর

দ্বিতীয়ত: পুণ্ড্রাসুর। ইনি ইক্ষুযন্ত্র অর্থাৎ আখ মাড়াইয়ের যন্ত্রের দেবতা। ইনি মহিষবাহন। ক্রুদ্ধ হলে শস্যভূমি ধ্বংস করেন। পুণ্ড্রাসুরের এই মহিষ বাহনের একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। মহিষ আমাদের উপমহাদেশে বিশেষ ভাবে নদীমাতৃক বদ্বীপ অঞ্চলের সাথে যুক্ত। সিন্ধু সভ্যতায় ঊষা মাতৃকার পূজায় মহিষমেধ হতো। আবার সিন্ধু সভ্যতার ঠিক পরেই বারাহী রূপে পৃথিবীমাতার তত্ত্বের যে সাধনা হতো, সেখানেও দেবী মহিষবাহনা। সেই মাতৃতত্ত্ব কিছুটা রূপায়িত হয়েছে মা বিশালাক্ষীর মধ্যে, গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয় লক্ষ্য করেছেন। মহিষের সাযুজ্যে বাংলার কৈবর্ত রাষ্ট্রের একটি অংশ মাহিষ্য রূপে পরিচিত। মা চণ্ডীর মন্দিরে মহিষের খুর রাখার রীতিও কোথাও কোথাও দেখা যায়। নদীমাতৃক ভূখণ্ডের মহিষের সাথে মাতৃসাধনার এই সংযোগের বিষয়টিই পুণ্ড্রাসুরের মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে।

পুণ্ড্রাসুরকে আখ থেকে নতুন গুড় তৈরীর আগে মাটির ঢিবির আকৃতিতে পূজা করা হয়। এরপর আখের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরী আরম্ভ হলে প্রথম সোনালি গুড় তাঁকে অর্ঘ্য রূপে নিবেদন করা হয়। আমরা অনুমান করতে পারি, এই পুণ্ড্রাসুর পুণ্ড্র অঞ্চলের বাঙালির এক প্রাচীন মনীষী। তাম্রাশ্মযুগে প্রথম সভ্যতার নির্মাণকালে ইনি এই অঞ্চলে আখ মাড়াইয়ের যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন। বৈদিক ও আদি বৌদ্ধ পরিমণ্ডল তখনকার বাঙালিকে পক্ষীভাষী, অসুর, ব্রাত্য বলতো। “অসুরানাম্ ভবেৎ বাচা গৌড়পুণ্ড্রোদ্ভবা সদা” (আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প)

কারণ বাঙালি পক্ষীমাতৃকার পূজারী, ব্রতকর্মে উৎসাহী। হয়তো সেই কারণেই পুণ্ড্রের সেই মনীষী পুণ্ড্রাসুর বলে পরিচিত হয়েছিলেন। তবে যেভাবে মাটির আকৃতিতে, গুড়ের নৈবেদ্যে, ব্রতকর্মের মতো সহজ বিধিতে ইনি পূজিত হন, তাতে বোঝা যায় ইনি বাঙালির আবহমান মাতৃপূজক সংস্কৃতির সাথে একীভূত হয়ে মিশে গিয়েছেন।

পুণ্ডরীক পদ্ম

 পুণ্ডরীক শব্দটি এসেছে পুণ্ড্রীক থেকে। যার অর্থ পুণ্ড্রের সাথে সম্পর্কিত। পুণ্ডরীক অর্থাৎ শ্বেত পদ্ম। এই ভূখণ্ডের করতোয়া, তিস্তা, মহানন্দা, কৌশিকী প্রভৃতি প্রাচীন নদী ও সুবিস্তীর্ণ সরোবর, পুকুর, দীঘিতে বিপুল সংখ্যায় শ্বেত পদ্ম পাওয়া যেত বলেই হয়তো শ্বেত পদ্মের নাম পুণ্ড্রের সাথে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু পদ্ম আর পুণ্ড্রের এই সংযোগ আরো গভীর। আজও বাংলার পৌণ্ড্র জাতির লোকরা নিজেদের পদ্মরাজ বা পুণ্ডরীক বলে পরিচয় দেন। পুণ্ডরীক বা শ্বেত পদ্ম হয়ে উঠেছে পুণ্ড্রজাতির অভিজ্ঞান। আবার আমরা যদি মহাভারত ও হরিবংশে উল্লিখিত পৌণ্ড্রক বাসুদেবের বিষয়ে দেখি, তাহলে পুণ্ড্রের সাথে পদ্মের আরেকটি চমকপ্রদ যোগ খুঁজে পাবো। হেমাদ্রির সিদ্ধান্তসংহিতা অনুযায়ী বাসুদেব কৃষ্ণের চার হাতের আয়ুধ শঙ্খ চক্র গদা ও কৃপাণ। আর হরিবংশ অনুযায়ী পৌণ্ড্রক বাসুদেবের আয়ুধ পদ্ম চক্র গদা ও কৃপাণ। আজকের বাসুদেব মূর্তিতে আমরা আর কৃপাণ দেখি না। এক হাতে শঙ্খ, আরেক হাতে পদ্ম দেখি। সম্ভবত বৈষ্ণব ধর্মের প্রাচীন অনুসারীরা এভাবেই কৃষ্ণ ও পৌণ্ড্রকের দুই ধারাকে সম্মিলিত করেছেন। সেই সম্মিলিত ধারায় কৃষ্ণের বিশেষ চিহ্ন শঙ্খ, আর পৌণ্ড্রকের বিশেষ চিহ্ন শ্বেত পদ্ম বা পুণ্ডরীক। শুধু তাইই নয়, বৈষ্ণব ধর্মে পরবর্তী সময়ে বিষ্ণুর একটি জনপ্রিয় নামই হয়ে গিয়েছে পুণ্ডরীকাক্ষ, পুণ্ডরীকের মতো চোখ যাঁর।

লক্ষ্য করার বিষয় পদ্ম আজও তন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। আমাদের দেহতত্ত্বে মূলাধার থেকে সহস্রার অবধি সমস্ত চক্রকে পদ্মের আকারে ভাবনা করা হয়। এক একটি পদ্মের পাপড়ি সংখ্যা আলাদা। প্রতিটিতে মাতৃকার এক একটি বিশেষ রূপের (ডাকিনী, রাকিনী, লাকিনী, শাকিনী, কাকিনী, হাঁকিনী) অধিষ্ঠান হয়। এই পদ্মের আকারে বর্ণিত চক্রগুলিতে আদিজননী কুলকুণ্ডলিনী হংসীরূপে লীলা করেন বলে সাধক ধারণা করেন। আজও পদ্মের আকারে তন্ত্রের সমস্ত মণ্ডল রচিত হয়। দুর্গাপূজায় সর্বতোভদ্রমণ্ডল থেকে চর্যাপদে চৌষট্টি পাপড়ির পদ্মে ডোম্বিনী রূপে মাতৃকার নৃত্য, মহাবিহারের স্থাপত্য থেকে বল্লালঢিবির নগর পরিকল্পনা, সর্বত্র তন্ত্রনিষ্ঠ বাঙালি পদ্মের আকৃতি ব্যবহার করেছে। আর এর আদিতম নিদর্শন আমরা দেখি বীরভূমের অজয় অববাহিকায় পাণ্ডুক গ্রামে বাঙালির প্রথম নগরসভ্যতা পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে। এখানে পাণ্ডুরাজার ধর্মাধিকরণ নামে যে প্রত্নক্ষেত্রটি আছে, তার আকার পদ্মের মতো। পাণ্ডুক, পাণ্ডুরাজার নামে পুণ্ড্র ও পৌণ্ড্রকের প্রভাব থাকা খুব স্বাভাবিক। এবং সেক্ষেত্রে পুণ্ড্র ভূখণ্ড ও পুণ্ড্ জাতির সাথে পুণ্ডরীক পদ্মের যোগ, পৌণ্ড্রক বাসুদেবের সাথে পদ্মের সংযোগের একটি বিশদ পটভূমি আমরা খুঁজে পাই, যা মাতৃসাধনার তথা তন্ত্রাশ্রিত আদি বৈষ্ণব সাধনার ধারার সাথে পুণ্ড্রকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করে।

পুণ্ডরীক বলাকা

আবার পুণ্ডরীক শব্দের আরেকটা অর্থ বলাকা বা সারস জাতীয় সাদা পাখি। পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে আমরা সবথেকে বেশি পাই বলাকার মুখবিশিষ্ট মাতৃমূর্তি। পক্ষীমাতৃকার এই বিশেষ রূপ বাঙালির প্রথম সভ্যতায় সবথেকে জনপ্রিয় ছিল। গবেষক Marija Gimbutas এর মতে, পাখি রূপে মাতৃকা আকাশে উড্ডিয়ান, মায়ের নীল আকাশে ডানা মেলা বিহঙ্গ রূপ এই জগতের দুঃখচক্র থেকে উত্তরণ বা কৈবল্যের প্রতীক। বলাকা মাতৃকার এই আদি উপাসনা থেকেই আজকের কালী সাধনা এসেছে। আজও মা কালীর পনেরো জন নিত্যা শক্তির একজন হলেন বলাকা। কালিদাসের কুমারসম্ভবে এবং রঘুবংশে যথাক্রমে কপালমালিনী মা কালী এবং রামের সাথে যুদ্ধরতা তাড়কা কে নীল আকাশে বলাকার সাথে তুলনা করা হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মহাভারতের যুগে তাড়কা ছিলেন কালীর মতোই এক প্রাচীন পূজনীয় মাতৃকা। এছাড়া দশমহাবিদ্যার মধ্যে মা বগলামুখী ও মায়ের সহচরী বাড়বামুখী বলাকা ও সারসের সাথে সংযুক্ত। পক্ষীমাতৃকার এইরকম বিশদ তত্ত্ব যে পাখির সাথে যুক্ত, সেই বলাকা তথা সারসের পুণ্ডরীক নামটি আমাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পুণ্ড্রের মাতৃসাধনার সাথে যুক্ত বলেই কি বলাকার এই পুণ্ডরীক উপাধি? আবার একটু আগেই মাতৃসাধনার সাথে সম্পর্কিত যে পুণ্ড্রের আখের কথা আলোচনা করলাম, সেই আখ বা আখের রসও সাদা রঙের, গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয় লক্ষ্য করেছেন। শ্বেত বলাকা মাতৃকার উপাসনায় আখের সংযোগ কাজেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পুণ্ডরীক সেক্ষেত্রে বক/বয়াংসি, পুণ্ড্র আখ, এবং সম্পূর্ণ আদি বাঙালি জাতি অর্থাৎ পুণ্ড্রর সঙ্গে সম্পৃক্ত নাম।

আমরা দেখলাম পুণ্ড্র ভূখণ্ড ও পুণ্ড্র জাতির নাম মাতৃসাধনার বিভিন্ন ধারাকে কিভাবে ধারণ করে আছে। এবার পুণ্ড্র অঞ্চলের প্রাচীন মাতৃপীঠের কথা।

পুণ্ড্রের সতীপীঠ

দীনেশচন্দ্র সরকার মহাশয় The Sakta Pithas গ্রন্থে পীঠনির্ণয়তন্ত্র ও শিবচরিত উদ্ধৃত করে সতীপীঠের যে তালিকা দিয়েছেন, তার মধ্যে পুণ্ড্রে দুটি সতীপীঠের নাম পাই। একটি করতোয়া নদীর তটে, অন্যটি ত্রিস্রোতা অর্থাৎ তিস্তা নদীর অববাহিকায়। লক্ষণীয় বিষয় হল পুণ্ড্রের নদীগুলি তান্ত্রিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই সতীপীঠ দুটি আলাদা নামের পরিবর্তে করতোয়া-তট এবং ত্রিস্রোতা নামেই উল্লিখিত হয়েছে।

করতোয়া প্রাচীন পুণ্ড্রের প্রধান নদী ছিল, তার মহিমা নিয়ে করতোয়া মাহাত্ম্য গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। পুণ্ড্রনগর, মহাস্থানগড়ের মতো বিখ্যাত নগর এবং বহু মাতৃপীঠ এই সুবিশাল নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল। এহেন করতোয়ার তীরে সতীপীঠের অবস্থান তাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। এই স্থানে সতীর বামকর্ণ পড়েছিল। পীঠের দেবী অপর্ণা, তবে লোকমুখে দেবী ভবানী রূপে প্রসিদ্ধ। পীঠরক্ষক ভৈরব বামন/বামেশ। বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের বগুড়া জেলার শেরপুরে করতোয়াতটে ভবানীপুরে এই পীঠ অবস্থিত।

এই অঞ্চলে পাল-সেনযুগের বেশ কিছু প্রাচীন মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। অন্যদিকে মায়ের ভবানী নাম একটি বিশেষ সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। পালসম্রাট মহীপাল মা ভবানীর পূজারী ছিলেন, পুণ্ড্র-বরেন্দ্র অঞ্চলের সাথে পালবংশের নিবিড় যোগসূত্র ছিল। মহীপালের সময় বাঙালির এক নবজাগরণ ঘটেছিল, সহজ আন্দোলন নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সতীপীঠের সর্বভারতীয় বিস্তারও এই সময়েই। করতোয়া তটের এই সতীপীঠের মা অপর্ণার ভবানী নামে প্রসিদ্ধি হয়তো মহীপালের সমকালীন মাতৃসাধনার সেই গৌরবময় অধ্যায়ের স্মৃতি। আবার চমকপ্রদভাবে এই মাতৃপীঠের সাথে নাটোরের রাণী ভবানীর ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। প্রতি বৎসর মাঘ মাসে মাঘী পূর্ণিমায় এবং চৈত্র মাসে শুক্লা নবমীতে ভবানী মন্দির প্রাঙ্গনে দুটি বড় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও শারদীয় দুর্গোৎসব, দীপান্বিতা শ্যামাপূজা এবং নবান্ন উৎসবের আয়োজনও এখানে করা হয়ে থাকে।

দ্বিতীয় যে সতীপীঠটি ত্রিস্রোতা অর্থাৎ তিস্তা নদীর অববাহিকায়, সেখানে সতীর বামপদ, মতান্তরে বাম গুলফ বা গোড়ালি পড়েছিল। দেবী ভ্রামরী। ভৈরব অম্বর।

শ্রীসূক্ত অনুযায়ী মধু শব্দটি বসুন্ধরা বা পৃথিবীমাতৃকার দ্যোতক। মাতৃকা আনন্দময়ী। সমস্ত প্রাণরস তাঁর থেকেই উৎসারিত। তাই তিনিই মধুতত্ত্ব। আবার এই মধুর আস্বাদকও তিনিই। কমলাকান্তের ভাষায়:

আপন মায়ায় আপনি বাঁধা সে

আপন মহিমা আপনি গায়

তাই তন্ত্রে তিনি সরঘ বা ভ্রমর রূপে বন্দিতা। তাঁর ভ্রামরী রূপের মূল তত্ত্ব এইই। আবার শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুযায়ী ভবিষ্যতে অরুণাসুর বধের জন্য অসংখ্য ভ্রমর পরিবৃত হয়ে তেজোময়ী ভ্রামরী রূপে মা আবির্ভূত হবেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মাতৃকার এই মধুতত্ত্ব জগতবাসীকে দান করেন বলেই  তন্ত্রাশ্রিত বৈষ্ণব ধর্মের উপাস্য দেবতা বিষ্ণুর নাম মাধব এবং মধুসূদন।

তবে ভ্রামরী মাতৃকার পীঠের অবস্থান নিয়ে দুটি মাতৃপীঠের দাবি আছে।

প্রথমটি হল জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের বোদাগঞ্জে দেবী ভ্রামরীর মন্দির। মা ভ্রামরীর বিগ্রহ এখানে নীলবর্ণা, অষ্টভুজা, পদতলে ভৈরব জল্পেশ ও সিংহ। উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত শৈবতীর্থ জল্পেশের অধিষ্ঠাতা শিবই মা ভ্রামরীর পীঠরক্ষক ভৈরব অম্বর রূপে পরিগণিত হন। মা ভ্রামরীর মন্দিরে নিত্যপুজো ছাড়াও প্রতি মঙ্গল ও শনিবার, অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় দুপুরে মাকে বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয়। শারদীয়া দুর্গাপুজো ও দীপান্বিতা কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয় মন্দিরে, এছাড়া বাৎসরিক বিশেষ পুজো হয় মাঘী পূর্ণিমায়। সেসময় চার দিনের মেলা বসে, সমগ্র উত্তরবঙ্গ থেকে ভক্তরা ভিড় করেন এই মন্দিরে।

ভ্রামরী পীঠের সম্ভাব্য দ্বিতীয় অবস্থান যে মন্দিরে, সেটি হল বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের বোদেশ্বরী গ্রামে, করতোয়া নদীর তীরে। প্রাচীন ত্রিস্রোতা বা তিস্তা নদীর দক্ষিণ প্রবাহ থেকে করতোয়া, আত্রাই ও পুনর্ভবা নদী উৎপন্ন হয়েছিল। তাই করতোয়া অববাহিকায় ত্রিস্রোতা পীঠের অবস্থান খুব অসম্ভব নয়। এই মন্দিরেও দেবী ভ্রামরী, ভৈরব অম্বর বা অমর। মূল মন্দির পালযুগে নির্মিত। পাল ও সেনযুগে এই অঞ্চল মহাস্থানগড়ের অন্তর্গত ছিল এবং তিস্তার প্রধান ধারা করতোয়ার তীরের এই মাতৃপীঠ তখনও প্রসিদ্ধ ছিল। বোদেশ্বরী নামটি খুব সম্ভবত এই পীঠের আদি নাম বরদেশ্বরী থেকে এসেছে।

 বখতিয়ার খলজি তিব্বত অভিযান থেকে বিপর্যস্ত হয়ে প্রত্যাবর্তনকালে এ মন্দির চত্বরে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল বলে প্রসিদ্ধি আছে। এখানে করতোয়া পার হতে গিয়ে বখতিয়ারের বেশ কিছু ঘোড়া মারা যায় বলে নদীর ঘাটের নাম ঘোড়ামারা। বাঙালির শিকড়ের শত্রুরা মহাকালের দণ্ড ভোগ করার পর এভাবেই মাতৃকার চরণে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়।

মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর সাথে যুদ্ধে পরাজিত কোচবিহারের রাজা প্রাণনারায়ণ এই মাতৃপীঠে তিন বছর মায়ের সাধনা করে জয়লাভ করেছিলেন। তিনি ও তাঁর পুত্র মদননারায়ণ ১৬৬৮ খ্রীষ্টাব্দে এই জীর্ণ মাতৃপীঠ সংস্কার করেন।

একটি লক্ষণীয় বিষয় হল এই দুই সতীপীঠেই বাম অঙ্গের অবস্থান। একটিতে বামকর্ণ, আরেকটিতে বাম পদ। আবার একটি পীঠে ভৈরব বামেশ।

এটি কাকতালীয়ও হতে পারে। আবার তন্ত্রের বামমার্গ বা বামাচারের ইঙ্গিতও হতে পারে। তন্ত্রে বাম হাতে দেবীকে অর্ঘ্যদান বামাচারের সঙ্কেত। মঙ্গলকাব্যে চাঁদ বণিকের বাম হাতে মা মনসার পূজা এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। সেক্ষেত্রে হয়তো পুণ্ড্রের এই দুই সতীপীঠের বাম অঙ্গ তন্ত্রের বামমার্গের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

দেবীকোট

প্রাচীন ভারতে পুণ্ড্রের যে মাতৃপীঠ সবথেকে বিখ্যাত ছিল, তা হল দেবীকোট। এই স্থান কোটিবর্ষ ও শোনিতপুর নামেও খ্যাত এবং বিখ্যাত প্রত্নক্ষেত্র বাণগড় এখানেই অবস্থিত। দেবীকোট, কোটিবর্ষ ও বাণগড় নামগুলি এখানকার প্রাচীন কোট বা গড়ের স্মৃতি বহন করে। এই মাতৃপীঠের সাথে দুর্গ বা কোট এতটাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল যে দুর্গাপূজার নবমী তিথিতে আজও দেশবাসিনী মাতৃকাদের পূজা করার সময় পুণ্ড্রের অধিষ্ঠাত্রী রূপে মা কোটেশ্বরীর পূজা হয়। শশিভূষণ দাশগুপ্ত লক্ষ্য করেছিলেন দুর্গ রক্ষার সাথে মা দুর্গার সাধনার আদিপর্বের যোগ ছিল। নগরের দুর্গে মাতৃমন্দির স্থাপন প্রাচীন যুগের একটি বিশেষ রীতি ছিল। সিন্ধু সভ্যতার সমকালে বালোচিস্তানে যে দুর্গনগরী আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানেও প্রধান দেবী সিংহবাহিনী মাতৃকা। গঙ্গারিডি যুগের বর্ধমানের মা মঙ্গলচণ্ডীর নামাঙ্কিত মঙ্গলকোটের মতোই গঙ্গারিডি যুগের বাণগড় বা দেবীকোটও মাতৃকার নামাঙ্কিত হয়ে সেই আদি ধারাকেই বহন করেছে।

জহুরা চণ্ডী

যদিও মালদহ অঞ্চল প্রাচীন গৌড় ভূখণ্ডের অন্তর্গত, তবুও এখানকার একটি মাতৃপীঠ পুণ্ড্র প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হল মা জহুরাচণ্ডীর মন্দির। লোকমুখে কথিত আছে সেনযুগে বল্লাল সেনের সময় থেকে এই জায়গায় মা কালী পূজিত হচ্ছেন। পুরোনো মূর্তিটি মুসলমান আমলে মাটির স্তূপে ঢেকে দেওয়া হয় আক্রমণ এড়াতে। পুনরায় পুজো যখন শুরু হল, ওই সিঁদুরমাখা মাটির স্তূপের ওপরে মায়ের তিনটি মুখ তৈরি করা হয়, নবাবী আমল থেকে, প্রায় তিনশ বছর আগে। তখন এই অঞ্চলে ভগ্নদশাগ্রস্ত পুরোনো গৌড়ের গড়ে গজিয়ে ওঠা ঘন অরণ্যে সাধনা করতেন তেওয়ারী পদবীর এক কালীসাধক। তিনি জহুরা চণ্ডীর দিব্যদর্শন লাভ করে এখানে পুজো শুরু করেন, গড়ের চূড়ায় বিস্তৃত প্রাঙ্গণে বেদী স্থাপন করে জহুরা চণ্ডীমাতার উপাসনা শুরু হয়। যদিও মা আজ সর্বত্র জহুরা কালী নামেই পরিচিত।

 মা রক্তবর্ণা, লোলজিহ্বা, বরাহদন্তিকা, ত্রিনেত্রা, করালবদনা। মায়ের তিনটি মুখ নিঃসন্দেহে তন্ত্রের ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্নার দ্যোতনা বহন করে। এছাড়াও,  মায়ের তিনটি মুখ প্রাচীন বাঙালি অর্থাৎ গৌড়ীয় জাতির তিনটি প্রধান ভৌগলিক অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, সিদ্ধান্ত করেছেন গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়। চমকপ্রদভাবে মালদহের এই অঞ্চল প্রাচীন পুণ্ড্র, গৌড় ও বরেন্দ্রের সংযোগস্থলে অবস্থিত। তাই মা জহুরাচণ্ডী এক অর্থে পুণ্ড্রের প্রান্তবাসিনী, গৌড়ের দ্বারবাসিনী মাতৃকা।

সারা বছরই মঙ্গল ও শনিবারে মায়ের পুজো হয়, কিন্তু বৈশাখ মাসের প্রথম শনি/মঙ্গলবার থেকে শেষ শনি/মঙ্গলবার অবধি মায়ের বাৎসরিক পুজোয় এখানে মহা ধুমধাম হয়, অগণিত মানুষের উপস্থিতিতে মহাসমারোহে উৎসব ও মেলা বসে। তবে মায়ের পুজোয় অন্নভোগ হয় না এখানে। বাতাসা, সন্দেশ আর জবাফুলেই মা সন্তুষ্ট হন।

পাটলাচণ্ডী

সেনযুগে গৌড় নগরীর চারিদিকে মা চণ্ডীর চারটি পীঠ ছিল। উত্তরে মা মাধাইচণ্ডী, পশ্চিমে মা দ্বারবাসিনী, পূর্বে মা জহুরাচণ্ডী ও দক্ষিণে মা পাটলাচণ্ডী। বর্তমান মালদহের পাতালচণ্ডী এই পাটলাচণ্ডী পীঠের বর্তমান রূপ।

পদ্মপুরাণের উত্তরখণ্ডে ভারতব্যাপী পবিত্র তীর্থের মধ্যে পুণ্ড্রের পাটলা পীঠের উল্লেখ পাওয়া যায়।

বিপাশায়াং বিপাপস্তু পাটলং পুণ্ড্রবর্ধনে

দেবীপুরাণের সপ্তম স্কন্ধেও মা পাটলাচণ্ডীর উল্লেখ আছে। বৃহন্নীলতন্ত্র আবার এই পীঠকে চণ্ডীপুর বলে উল্লেখ করেছে এবং এখানে মা প্রচণ্ডার অধিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেছে।

চণ্ডীপুরে প্রচণ্ডা চ চণ্ডা চণ্ডবতী শিবা

শ্রীশ্রীচণ্ডীতে মায়ের ১০৮ নামের তালিকায় পাওয়া যায় পাটলা তথা পাটলাবতী নাম।

অপর্ণানেকবর্ণা চ পাটলা পাটলাবতী

পট্টাম্বরপরিধানা কলমঞ্জীররঞ্জিনী

পাটল শব্দের অর্থ হালকা লাল বা গোলাপী। মাতৃকার যে রূপ পাটলবর্ণ, তিনিই পাটলাবতী বা পাটলাচণ্ডী।

মালদা শহর থেকে ১২ নম্বর রাজ্য সড়ক ধরে পশ্চিমে অন্তত ১০ কিলোমিটার এগোলেই ব্যাসপুর। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, জঙ্গলাকীর্ণ ওই এলাকায় মাটির নীচ থেকে পাওয়া গিয়েছিল দেবী চণ্ডীর মূর্তি। বর্তমানে বহু প্রাচীন একটি তেঁতুলগাছের নীচে বেদির ওপর প্রতিষ্ঠিত মা পাতালচণ্ডী। চৈত্র মাসে বাসন্তীপুজোর শেষ তিনদিন মা পাতালচণ্ডী এখানে পূজিত হন। বর্তমান মন্দিরটির অদূরে দক্ষিণা কালীর মন্দিরও রয়েছে।

মা পাটলাচণ্ডীর পীঠে বর্তমানে রাখা শিলাখণ্ডটি খুব সম্ভবত অতীতের চণ্ডীমূর্তির মাথার উপরের কীর্তিমুখের অংশ। অর্ধচন্দ্রাকারে জ্যোতির তোরণ মাকে ঘিরে আছে। আকাশে বিদ্যাধরীগণ মাকে বন্দনা করছেন। মূর্তির এই অংশটুকুই এখানে রাখা আছে। সাথে আছে মায়ের একটি মুখমণ্ডল। মায়ের রঙ পাটলবর্ণ বা হালকা লাল। ত্রিনয়নী মায়ের মুখে প্রসন্ন হাসি। তেঁতুলগাছের আশেপাশে আরো কয়েকটি মূর্তির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়।

মায়ের এই পাটলবর্ণ উদীয়মান সূর্যের বর্ণ। সিন্ধু সভ্যতায় এবং বৈদিক সাহিত্যে মাতৃকার ঊষা রূপের উপাসনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দশদিকে কিরণের বাণ হেনে ঊষারূপে মা অন্ধকাররূপী দানবকে পরাজিত করেন। তিনি আসেন, তাই জগত জাগে। আজও আমরা দশভুজা মহিষমর্দিনী দুর্গার শারদীয়া বোধন ও মহাপূজায় ঊষার সেই আদি তত্ত্ব ধরে রেখেছি। পাটলাচণ্ডী মাতৃকাও সেই আদি তত্ত্বেরই প্রকাশ। তাঁর রূপেরও শেষ নেই, বর্ণেরও শেষ নেই। সাধক কমলাকান্তের ভাষায়:

মা কখনও শ্বেত কখনও পীত কখনও নীল লোহিত রে

আমি আগে নাহি জানি কেমন জননী ভাবিতে জনম গেল রে

চামুণ্ডা পূজা

উত্তর দিনাজপুরের হিলিতে আজও প্রচলিত আছে চামুণ্ডা পূজা। মাহিষ্য, বৈশ্য এবং তিলি সম্প্রদায়ের মানুষের এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।  জ্যৈষ্ঠ মাসে অমাবস্যার পর প্রথম শনিবার বেশ আড়ম্বর করে এই পুজো হয়। ঢাক ও কাঁশি বাদ্যের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি নাচ গান করে সিধা বা মাগণ তুলে পূজা আরম্ভ হয়। মা চামুণ্ডা পূজিত হন মুখা বা কাঠের মুখোশের প্রতীকে। মায়ের এই মুখোশ পরে পূজারীরা মশালের আলোয় বাদ্য সহযোগে নৃত্য গীত করেন।

বন্দো মাতা ছিন্ন মুন্ড বিভূষিতা।।

অদৃশ্য হাত দুঃখানি বন্দিনু দেবী।।

বন্দো দেবী অদৃশ্য চরণ দুখানি।।

মা গো তোর নিবাস হিলি হাটে।।

যমুনা বারি দিয়া আপ্লব শরীর।।

আজ্ঞা দে তবে মা গো পরিচয় দিব।।

ছাই মাখা আনি পাতালি ভবানী।।

ভোগের মধ্যে থাকে ভক্তদের নিয়ে আসা সন্দেশ, আম, কাঁঠাল, কলার ছড়ি। পুজো উপলক্ষে তিনদিন ধরে মেলা হয়। মেলার মূল আকর্ষণ হলো লোহার বিভিন্ন জিনিসপত্রের সওদাপত্র। রণরঙ্গিণী মায়ের উৎসবে লোহার অস্ত্রের বাণিজ্য বাঙালির যোদ্ধা জাতিদের সাথে মাতৃসাধনার একটি আবহমান সহজ যোগসূত্রকেই তুলে ধরে।

চামুণ্ডা পূজার সমতুল্য একটি রীতি এই অঞ্চলে প্রচলিত। সেটি হল হাজরা নৃত্য। গাজনের রাতে এই নৃত্য পরিবেশিত হয়। ভক্তরা মা কালীর মুখোশ পরে হাতে খড়্গ নিয়ে নৃত্য করেন। এই একই রাতে গৌড়বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে মড়ার খুলি, শবদেহ নিয়ে লাল, কালো রঙে দেহ রাঙিয়ে, সাদা ফুলের মালায় সেজে ভক্তরা নৃত্য করেন। ভক্তেরা কেউ হন “কালিকাপাতা”, কেউ “লাউসেনপাতা”। অর্থাৎ মা কালীর সাধনক্রম, লাউসেনের তান্ত্রিক হাকন্দ সাধনক্রমের স্মৃতি নিয়ে এই নৃত্য। হাজরা নাচও তান্ত্রিক সাধনার এই নৃত্যরীতির সাথে যুক্ত। এবং চমকপ্রদভাবে এই নৃত্যরীতিগুলির মধ্যে বজ্রযানের অক্ষোভ্যকুলের উপাসনার প্রভাব আছে। হাজরা শব্দটি কি কোনোভাবে হেবজ্রের অপভ্রংশ হতে পারে? বিশদে গবেষণা ছাড়া বলা কঠিন।

চামুণ্ডা মূর্তি

পুণ্ড্রের কিছু স্থানে পাল-সেনযুগের মা চামুণ্ডার বিগ্রহ আজও পূজিত হচ্ছে। মধ্যযুগের ক্রান্তিকাল মাতৃসাধনার এই অধ্যায়কে মুছতে পারে নি। এমনই দুটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করব।

 দক্ষিণ দিনাজপুরের শিববাড়ি গ্রামে আজও পূজিত হন পালযুগের মা সিদ্ধচর্চিকা বা সিদ্ধচামুণ্ডা। তিনি দশভুজা। হাতে তর্জনীমুদ্রা, খট্বাঙ্গ, নরকপাল, মুণ্ড, খড়্গ, খেটক, ডমরু, কাস্তে, শূল ও ভক্ষণমুদ্রা। দুই পাশে নৃত্যরতা ডাকিনী যোগিনী। দেবী স্বয়ং একটি বেতালের কাঁধে দাঁড়িয়ে নৃত্য করছেন। সমতুল্য মূর্তি নেপাল, বগুড়া সহ প্রাচীন পালসাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে। আজকের দিনাজপুরে একসময় পালরাষ্ট্রের রাজধানী ছিল। আজও মাতৃসাধনার কিছু ধারা সেখানেই সেই আদি আকারেই আছে। এই চামুণ্ডা পূজা তারই নিদর্শন।

অন্যদিকে মা চর্চিকার পূজার এক অপূর্ব পরম্পরা আজও বহমান উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়িতে মা চর্চিকার মন্দিরে। ১৯৩৫-৪০ সালে ঐ গ্রামে একটি প্রাচীন পুকুর খননের সময় দেবীমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি কষ্টিপাথরের; প্রায় সাত ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। করালবদনী শীর্ণকায়া মুণ্ডমালিনী মায়ের মাথায় সাপের মুকুট, গলায় ঝুলছে নরমুণ্ডের মালা, সারা শরীরজুড়ে সর্পমালা। বাঁদিকের একটি হাত ভাঙা। বাকি চারটি হাতে রয়েছে হাতির লেজের দিক, ঘণ্টা, ছিন্ন নরমুণ্ড, নরমূর্তি। ডানদিকের তিনটি হাতে রয়েছে হাতির মাথার দিকটি, মানুষের কঙ্কাল, ঘণ্টা। অপর দু’টি হাত ভাঙা। অস্থি-চর্মসার বুক, পেটের উপরের দিকে রয়েছে কাঁকড়া বিছে। পায়ের নীচে এক নারী মূর্তি, শেয়াল এবং প্যাঁচা। মায়ের মূর্তির একটি বিশেষত্ব হল অতি শীর্ণ উদরে একটি বৃশ্চিক বা বিছে আঁকা রয়েছে।

প্রাচীন করতোয়া নদীর উত্তরে এই অঞ্চল প্রাচীনকালে পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত ছিল। গবেষক পরেশচন্দ্র দাশগুপ্ত মহাশয় প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন করে জলপাইগুড়ি অঞ্চলের চিল্লা রাজার গড়কে পুণ্ড্রেরই অন্তর্গত বলে সিদ্ধান্ত করেছিলেন।

নীহাররঞ্জন মহাশয়ের মতে উত্তরবঙ্গে দেবপালের সময় থেকে কম্বোজ পালবংশের রাজত্ব ছিল। সম্ভবত দেবপাল যখন পালসাম্রাজ্য হিমালয় পর্যন্ত বিস্তৃত করেন তখনই এই পার্বত্য কম্বোজবংশ পালবংশের সংস্পর্শে আসে। ইর্দা তাম্রশাসন অনুযায়ী পালসাম্রাজ্যের দুর্বলতার সময়ে এঁরা স্বাধীন রাজবংশ রূপে রাজত্ব করেছিলেন এবং প্রিয়ঙ্গু নামক স্থানে এঁদের রাজধানী ছিল। মহীপাল ও নয়পালের সময়ে এঁরা বোধহয় পুনরায় পালসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হন। তবে একথা অনস্বীকার্য যে এঁরা পালবংশ ও তৎকালীন বাঙালির সাথে একই সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করতেন। সেক্ষেত্রে এই পেটকাটি চর্চিকা দেবীর প্রতিষ্ঠা ও উপাসনা তাঁদের মাধ্যমে হওয়াই সম্ভব।

যেভাবে পুকুরের অনেক গভীরে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় এই মূর্তি পাওয়া গেছে তা থেকে বোঝা যায় তুর্কি আক্রমণের সময় এই মূর্তিকে এই স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মিনহাজের বিবরণ থেকে জানা যায় তিব্বত অভিযানকালে বখতিয়ার উত্তরবঙ্গে আক্রমণ করেছিল এবং পুণ্ড্রের দেবীকোট ছিল তার সামরিক রাজধানী। সম্ভবত সেই সময়েই এই মূর্তি এই পুকুরের গভীরে স্থান পায়। এবং যেহেতু অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে; সুতরাং বলাই যায় তুর্কি আক্রমণের বর্বরতা থেকে এই মূর্তি রক্ষা পেয়েছিল। দীর্ঘ শিকড়বিচ্ছিন্নতার কাল কাটিয়ে আধুনিক যুগে এখানে আবার মাতৃপূজার সেই আদি ধারা আত্মপ্রকাশ করেছে।

মাশান পূজা

আমাদের মাতৃসাধনার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল মায়ের মণ্ডলে ভীষণ ভৈরব ও গণ বা সহচরদের উপস্থিতি। এঁরা ক্ষেত্রপাল রূপে ভূখণ্ড রক্ষা করেন, দ্বারপাল পীঠরক্ষক রূপে শক্তিপীঠের অতন্দ্র প্রহরায় থাকেন। পুণ্ড্র অঞ্চলে মায়ের এই ভীষণ সহচরগণ মাশান ঠাকুর রূপে পূজিত। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী নৃত্যরত মা কালীর ঘাম থেকে মাশানদের আবির্ভাব ঘটেছিল। মৃগাঙ্ক চক্রবর্তী মহাশয় ক্ষেত্রসমীক্ষা করে জানিয়েছেন, জলুয়া মাশান, নিষ্কিন্দা মাশান, টসা মাশান, বহতা মাশান, শূর মাশান, কাল মাশান, যখা মাশান, কালী মাশান, সিংহ মাশান, নাঙ্গা মাশান, কুহুলিয়া মাশান প্রভৃতি অনেক রূপে মাশানগণ পুণ্ড্র অঞ্চলে পূজিত হন। মাশান সাধারণত ভীষণ মূর্তি, নীলবর্ণ, লম্বোদর। তাঁর দৃষ্টি বিস্ফারিত ক্রুদ্ধ। এই ক্রুদ্ধ রূপ, নীলবর্ণ ও মোটা পেট বজ্রযানে অক্ষোভ্যকুলে মহাকাল, ভৈরব প্রমুখের বৈশিষ্ট্য ছিল। এই অক্ষোভ্য কুলের দেবমণ্ডলী কালীসাধনার বর্তমান রূপটির নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। সম্ভবত মাশান পূজার আদি ধারাও পাল-সেনযুগের সেই তন্ত্রের সাধনক্রমের থেকেই প্রকাশ পেয়েছিল।

অধিকাংশ মূর্তিতে মাশান ঠাকুরের মাথায় ঝাঁকড়া চুল, মুখে গোঁফ, কপালে ফেট্টি বাঁধা, হাতে গদা। বাহন কখনো শোলমাছ, কখনো কচ্ছপ, কখনো শূকর, কখনো ভেড়া, কখনো হাতি, কখনো সিংহ। মাশান ঠাকুরের এই অদ্ভুত বাহন বৈচিত্র্য দেখে চৌষট্টি যোগিনীদের মণ্ডলের কথা মনে আসে। যোগিনীদের ও বিচিত্র বাহন, বিচিত্র সজ্জা, কেউ পশুমুখী, কেউ পক্ষীমুখী, কেউ উগ্র, কেউ সৌম্য। এবং যোগিনীগণ ও মাশানদের মতোই মাতৃকার সহচরী। সেক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন মনে আসে। যোগিনীদের মণ্ডলে মাতৃকার এমন অনেক রূপ আছে, যেগুলি প্রাগৈতিহাসিক সময়ে পূজিত হতো। যোগিনীদের মণ্ডল তাই এক অর্থে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত মাতৃকার বিভিন্ন রূপের এক অপূর্ব সংকলন। মাশান ঠাকুরদের ক্ষেত্রেও কি তাই? অতীত থেকে আজ অবধি মায়ের ভীষণ সহচরদের যে বিবর্তন, তাই দিয়েই কি এত বিচিত্র মাশান ঠাকুরের উদ্ভব? উদাহরণস্বরূপ নিষ্কিন্দা মাশানের যে রূপ দেখি, ঘাড়ের পরিবর্তে দেহের মাঝখানে বিশাল মুখমণ্ডল এবং তাকে ঘিরে হাত পা, এই রূপ প্রাগৈতিহাসিক মূর্তি নির্মাণশৈলীর সাথে আশ্চর্য সাদৃশ্য বহন করে।

মাশান ঠাকুরেরা সাধারণত বট বা শ্যাওড়া গাছের নিচে বা পাকা দেওয়াল ঘেরা টিনের ঘরে পূজিত হন। মাশানের নারী রূপকে মা কালী রূপেই পূজা করা হয়। এমনকি মাশানের কোপে আক্রান্ত মানুষকে সুস্থ করার জন্য পূজারী যে মন্ত্র বলেন, সেখানেও বলা হয়,

এসো কালী বসো চালে

কথা কও কর্ণমূলে

এর থেকে বোঝা যায় রূপভেদে মাশান ঠাকুর মা কালীর ই তত্ত্ব ধারণ করেন। আদিমাতৃকার কোনো লিঙ্গভেদ হয় না। তিনি “কখনো পুরুষ কখনো প্রকৃতি কখনো শূন্যাকার”।

মাশানের মতোই বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে ক্ষেতরাল ঠাকুর পূজিত হন। নাম থেকেই বোঝা যায়, ইনি ক্ষেত্রপাল। অতীতের কোনো মাতৃপীঠের ভূমি রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। পীঠ লুপ্ত হয়ে গেলেও তাঁর উপাসনা লোকসমাজে থেকে গিয়েছে। সেনযুগের সদুক্তিকর্ণামৃত থেকে জানা যায়, সেই সময়েও রক্ত ও বলি উৎসর্গ করে ক্ষেত্রপালের পূজা পল্লীসমাজে জনপ্রিয় ছিল।

ভাণ্ডারনী দেবী

পুণ্ড্রে দুর্গাপূজার ঠিক পরেই দশমীর দিন মা ভাণ্ডারনীর পূজা হয়। মায়ের রূপ দুর্গার মতোই, কিন্তু বাহন বাঘ। তিনি কোথাও শারদীয়া মহিষমর্দিনী দুর্গারই রূপ, কোথাও মা দুর্গার বোন। আমরা বলতে পারি, তিনি দুর্গার এক প্রাচীন সাধনক্রমের সাথে যুক্ত।

সিন্ধু সভ্যতায় মায়ের বাহন রূপে বাঘকে দেখা যায়, সিংহকে নয়। একটি সিলে মা দুটি বাঘের মাঝে দাঁড়িয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্য একটি সিলে মাতৃকা ব্যাঘ্রবাহিনী। দুই হাতে দুটি অস্ত্র নিয়ে  acacia জাতীয় কাঁটাগাছের নিচে তাঁর অধিষ্ঠান। মুখমণ্ডল করাল। কাঁটাগাছের নিচে মাতৃকার এই  অধিষ্ঠান যে দেবীর কথা মনে করিয়ে দেয়; তিনি হলেন বনদুর্গা বা কান্তারদুর্গা। ইনি বাঙালির এক লৌকিক দেবী এবং এই দেবীই পূর্ববঙ্গে বুড়িঠাকুরাণী, উত্তরবঙ্গে ভাণ্ডারণী/ভাণ্ডালী ও দক্ষিণবঙ্গে নিস্তারিণী নামে পরিচিত । শেওড়া বাবলা বা শমী গাছে এঁর পূজা করেন বাঙালি নারীরা। এঁর পূজায় লৌকিক আরণ্যক সমাজের বলিদান ও উন্মত্ত নৃত্যের কথা সেনযুগের সদুক্তিকর্ণামৃতে পাওয়া যায়।

তৈস্তৈর্জীবোপহারৈর্গিরি কুহরশিলা সংশ্রয়ার্মচরিত্বা

দেবীম্ কান্তারদুর্গাম্ রুধিরমুপতরু ক্ষেত্রপালায় দত্বা

তুম্বীবীণা বিনোদব্যবহৃত সরকামহ্নি জীর্ণে পুরাণীং

হালাং মালুরকৌষের্যুবতি সহচরা বর্বরাঃ শীলয়ন্তি।।

বর্বর গ্রাম্যলোকেরা নানা জীববলি দিয়ে পাথরের পূজা করে; রক্ত দিয়ে বৃক্ষতলে কান্তারদুর্গার পূজা করে; ক্ষেত্রপালের উপাসনা করে; দিনের শেষে যুবতী সহচরীদের নিয়ে তুম্বীবীণা বাজিয়ে নাচগান করতে করতে বেলের খোলায় মদ্যপানে মত্ত হয়।

হারাধন দত্ত মহাশয় বাঙালির বনদুর্গা উপাসনার বিষয়ে চমৎকার আলোচনা করেছিলেন “বনদুর্গা” প্রবন্ধে। বনদুর্গা শিশুদের রক্ষাকারিণী। তাঁর অধিষ্ঠান শেওড়া গাছে; ভূত প্রেতাদি অনুচরের সাথে। তাঁর পূজায় স্মার্ত বিধানের চেয়ে ব্রতকর্মের গুরুত্ব বেশি।

বনদুর্গাকে তন্ত্রে দ্বাদশ দানব বা বারো ভূতের জননী বলা হয়েছে। মায়ের কন্যার নাম রণযক্ষিণী, ১২ পুত্রের নাম কৃষ্ণকুমার, পুষ্পকুমার, রূপকুমার, হরিপাগল, মধুভাঙ্গর, রূপমালী, গাভুরডলন, মোচরাসিংহ, নিশানাথ, সূচিমুখ, মহামল্লিক ও বালিভদ্র। নামগুলির প্রতিটিই বাঙালির প্রাচীন নাম, রূপকথায় ব্রতকথায় এমন নাম দুর্লভ নয়।

ধ্যান অনুযায়ী বনদুর্গা করালবদনা; তাঁর কেশ ঊর্ধ্বমুখী;ত্রিনেত্র রক্তবর্ণ, সর্বদাই মত্ত ভাব। আমরা আগেই বলেছি পূর্ব ভারতের অবৈদিক ব্রাত্য সংস্কৃতিকে অসুরভাষী বলা হতো। সম্ভবত সেই কারণেই মায়ের সহচররা দানব বা ভূত বলে উল্লিখিত হয়েছেন।

উপসংহার

এভাবেই তন্ত্র ও মাতৃসাধনার বিভিন্ন দিককে নিজের মধ্যে ধারণ করে পুণ্ড্র অঞ্চল হয়ে উঠেছে মাতৃপূজক বাঙালির সংস্কৃতির এক অভিজ্ঞান। আবার পুণ্ড্র নিজেই মাতৃসাধনার বহু ধারাকে প্রভাবিত করেছে। পৌণ্ড্রীক পুণ্ডরীক নামের স্পর্শ লেগেছে বাঙালির বলাকামাতৃকার চরণ থেকে পদ্মের শুভ্রতা পর্যন্ত। এখানে সতীপীঠে মাতৃসাধনার সুপ্রাচীন অনুষঙ্গ আছে। তন্ত্রের স্বর্ণযুগের সাক্ষী হয়ে চামুণ্ডা আছেন, চণ্ডী আছেন। আছেন মাশান ঠাকুর, পুণ্ড্রাসুর ও ভাণ্ডারনী বনদুর্গা। বৈদিক পৌরাণিক যে ভূমির সংস্কৃতিকে স্পর্শ করতে পারে না, যে ভূমির আখ ধনুক রূপে ধারণ করেন বিশ্বজননী, অবৈদিক ব্রাত্য সমাজের সেই পুণ্ড্র অঞ্চল তার নিজ গৌরবেই বঙ্গজননীর মুকুটের এক চিরভাস্বর রত্ন।

 ★ ★ ★ ★ ★

ত্র্যহস্পর্শে বাঙালি – জয়ন্ত মুখার্জি

মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা, ২০শে নভেম্বর ২০২৫, মার্গশীর্ষ অমাবস্যা ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২

রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ এবং মা সারদার ফটোওয়ালা ক্যালেন্ডার টাঙানো থাকে অনেক বাঙালির বাড়িতেই।

আমরা ছোট বেলা থেকে যে কজন মানুষ কে প্রাতঃস্মরণীয় বলে জেনে এসেছি তাঁদের মধ্যে এনারাও পড়েন।

শিকড়বিচ্ছিন্ন বাঙালি এনাদের নামেই নিজের বাঙালিত্বের পরাকাষ্ঠা খুঁএ পায়, এদের ভগবান বলে মানে, এদের মনে করে বাঙালি জাতির স্তম্ভ। তা এই সব স্তম্ভ কতটা মজবুত তা একটু বাজিয়ে দেখতে হবে না? রামকৃষ্ণ তো নিজেই বলে গেছেন – বাজিয়ে নিবি, তারপর মানবি।

মুস্কিল হল বাজালে যে সবসময় শ্রুতিমধুর আওয়াজ বেরোবে তা তো  নয়। অনেক সময় ঢপ ঢপ আওয়াজও বেরয়, তখন সব  অন্তসারশূন্যতা ধরা পড়ে যায়।  কিছু অন্ধ গুরুভজাইদের সে সব হজম হয় না।

এই তিন জনকেই কেন বেছে নিলাম,কথা উঠতে পারে।

আমরা জানি বাঙালি জাতী সঙ্গায়িত হয় তার মাতৃকা উপাসনার ধর্মে ।  এই ত্রয়ীর আচরণে তার পরিচয় পাই কি আমরা? আপামর বাঙালি  কিন্তু এদের মহাজন জ্ঞান করে, এদের অবলম্বন করে, এদের অনুসরণ করে অন্ধের মতো।

উনবিংশ শতকের যে সময়ে এনাদের আবির্ভাব সেই সময়টা কিন্তু ব্যামা ক্ষ্যাপারও। বাঙালি ঐ ত্রয়ীকে নিয়ে যত উৎসাহী তত মাতামাতি কিন্তু  প্রকৃত শাক্ত সাধক বামদেব কে নিয়ে হয়নি ! ব্রাহ্ম কেশব সেন রামকৃষ্ণ কে প্রোমোট করেছিলেন।

 কোনও বিশেষ কারনে কি? গবেষণার বিষয় হতে পারে ব্যাপারটা।

রামকৃষ্ণ  বিবেকানন্দ এবং মা সারদার উত্থান রানী রাসমণি নির্মিত দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের সঙ্গে জড়িত এটা বলাই যায়।

ঐ মন্দির তৈরি না হলে অভাবী রামকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ছোট ভাই গদাই কে নিয়ে মন্দিরের পূজারী হয়ে আসতেন না। পরবর্তী কালে গদাইয়ের চেলা হয়ে নরেনও বিখ্যাত হতেন না।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি রানী রাসমণি যখন গঙ্গার পূব পাড়ে হেস্টি সাহেবের ৫৪ বিঘা জমি কিনে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করছেন তখন কি ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিলেন এই মন্দির এবং তাকে অবলম্বন করে এই দুই ব্যক্তি এবং সারদা দেবী এতটাই বিখ্যাত হবেন যাদের প্রভাব বাঙালি হিন্দু সমাজ কে আগামী কালে আস্টেপৃষ্টে বেধে রাখবে?

 প্রসঙ্গত জানাই মন্দিরের জন্য নির্ধারিত জমিটি ছিল কচ্ছপের পিঠের আকারে, তন্ত্র সাধনার জন্য যা অত্যন্ত উপযুক্ত।

সেই সময়টা বাঙালি হিন্দুর জন্য ছিল দুর্যোগময়। তাদের  ধর্ম ঢাকা পড়েছিল নানান স্মার্ত রীতি ও প্রথায়। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে অনেকেই সেই পরিবেশে হাঁপিয়ে উঠে পথ খুঁজছিল নিস্তারের।

ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে য়ূরোপিয়  ভাবধারায় দীক্ষিত ইয়ং বেঙ্গলের দল ধর্ম সংস্কারের পথে না গিয়ে পুরো ধর্মটাকেই বিসর্জনের জন্য মানসীক ভাবে তৈরী ছিল। অনেকেই এই সময় খৃষ্টান হয়ে যায়। তাদের ঠেকাতে বেদ নির্ভর ব্রাহ্ম ধর্ম কিছুটা সফল হলেও তন্ত্রাশ্রয়ী বাঙালি হিন্দুর কাছে তা গ্রহনযোগ্য ছিল না।

এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির যে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তা অনেকেই স্বীকার করে। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে মথুর বিশ্বাসের protégé হিসেবে রামকৃষ্ণের উত্থানও তাই গুরুত্বপূর্ণ। তন্ত্রধর্মীয় বাঙালীর কাছে এক সরল গ্রাম্য সাধকের মা মা ডাক বড্ড কাছের মনে হতেই পারে।

দক্ষিণেশ্বর মন্দির কে ঘিরে শাক্ত ধর্মের যে ঋজু পথ নির্মাণ হতে পারতো তা ব্যর্থ হয়েছিল সেই আপাত সরল আলাভোলা সাধকের অদ্ভূত আচরণ ও তার থেকে উদ্ভূত যতমত তত পথের বায়বীয় তত্বে ।

এই যত মত তত পথের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে উনি কখনো মুসলমান হয়েছেন কখনো বা খৃষ্টান। ইসলাম ধর্মে যথারীতি দীক্ষিত হয়ে উনি ‘ সাধনা ‘ করেছিলেন জানা যায়। যদিও পরে প্রায়শ্চিত্ত করে হিন্দু ধর্মে ফেরত এসেছিলেন কি না তার কোন খবর পাওয়া যায় না।

এই সময় ওনার আচরণ  পালটে গিয়েছিল। গঙ্গায় ভেসে আসা মড়া গরু দেখে তার মাংস খেতে চেয়েছিলেন জানতে পারছি ‘ রামকৃষ্ণ পুঁথি ‘নামক এক রচনা থেকে।

ওনার প্রিয় শিষ্য ইসলামী সাধনা না করলেও ভারতবাসীদের মধ্যে ‘ ইসলামী দেহে বৈদিক মস্তিষ্ক ‘ চেয়েছিলেন! বেশ রোমহর্ষক ব্যপার না? আমার তো ফ্রান্কেনস্টাইনের গল্পটা মনে পড়ে যাচ্ছে। জোড়াতাপ্পি দিয়ে, এখান থেকে মগজ, ওখান থেকে ধড়।

যাই হোক এই সব ‘ আধ্যাত্মিক ‘ এক্সপেরিমেন্ট এর ফল হয়েছিল সুদূর প্রসারী। এখনো রামকৃষ্ণ মিশনে সাড়ম্বরে মহম্মদ ও যীশু পুজোর আয়োজন হয় ফি বছর। ধ্যান মন্ত্রও আছে এঁদের!

ভাবুন! যে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির ভাঙিয়ে এত কিছু, তারই একপ্রকার অবমাননা নয় এটা?

বিবেকানন্দ ও তাঁর পরমহংস গুরু রামকৃষ্ণের পরিচয় সর্বসমক্ষে শাক্ত হলেও তাঁদের আচরণ ও কথাবার্তায় তা বার বার খণ্ডিত হত। গেরুয়া ধারী বিবেকানন্দ বেদ বেদান্ত নিয়ে যতটা উৎসাহী ছিলেন আর তার প্রচারে যে সময় ব্যায় করতেন তার কনা মাত্র মাতৃ ধর্মের জন্য উৎসর্গ করেছেন কিনা সন্দেহ। আর ওর গুরু রামকৃষ্ণ ছিলেন আদতে রামায়েত বৈষ্ণব, পৈত্রিক বাড়ীতে রামলালার পুজো হত ঐতিহ্য গত ভাবে। অথচ আপামর বাঙালি একে শাক্ত ভেবে শ্রদ্ধা ভক্তি করে এসেছে এতকাল!

মা সারদা কে তো ওনার ভক্তরা স্বয়ং মা জগদম্বা বলে মান্য করত। বিবেকানন্দ তাঁকে ‘ জ্যান্ত দুর্গ ‘ রূপে পুজো করার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন একটি চিঠিতে। মা সারদাও নিজেকে তাই মনে করতেন!

কোন খ্রিস্ট ধর্মী নিজেকে যীশু রূপে জাহির করছে,কিম্বা কোনো মুসলমান মহম্মদ রূপে, চিন্তা করা যায়?! যায় না। তাদের ধর্মের পূর্ব নির্ধারিত কঠিন নিয়মে বাঁধা আবয়বে এই সব ধ্যাস্টামীর কোনো জায়গা নেই। কেও করলে তাকে পাগল বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে। কল্লাও যেতে পারে,দ্বিতীয় উদাহরনের ক্ষেত্রে।

চোখ কপালে, ভাবে বিভোর, পরনের কাপড় খসে খসে পড়ছে গা থেকে, মুখে আকুল স্বরে মা মা ডাক; এই ছবি আপামর বাঙালি কে একটি মানুষের কথাই মনে পড়িয়ে দেয়।

কিন্তু এই আপাত বিহ্বল ব্যক্তিত্বের আড়ালে যে এক  মধ্যবিত্ত মানসিকতার ছাপোষা, বৈষয়িক  হিসেবী মানুষ লুকিয়ে ছিলো  তা কটা লোকই বা জানে! জানতে পারলে তারা অবাকই হবে। মানুষটিকে অনেকটাই আর পাঁচটা মানুষের মতো সাধারণ মনে হবে।

এমন মানুষ যে স্ত্রীর ভবিষ্যতের ভালো মন্দের  কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়, তার গ্রাসাচ্ছাদনের উপায় নিয়ে মাথা ঘামায়।

কিন্তু ভক্তরা যে তাঁকে অবতার বানিয়ে রেখেছে! তার কি হবে?!

তার কথা ভক্তরাই ভাবুক, আর ভাবুক অগণিত সাধারণ মানুষ যারা তাঁকে ভগবানের আসনে বসিয়েছে।

আমি বরং সেই মানুষটির জীবনের এক ঘটনার কথা সবার সামনে মেলে ধরি। তারপর যে যার বোঝার বুঝুক।

উনি ছিলেন দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের সাত টাকা মাস মাইনের পূজারী। সেই টাকা ওনার ভাগ্নে হৃদয় একটি বাক্সে তুলে রাখত। উনি নিজের হাতে টাকা পয়সা ছুঁতে পারতেন না। তা না পারলেও নিজের উপার্জনের টাকার প্রতি ওনার বেশ সজাগ নজর ছিল।

এমনিতে স্ত্রী সারদা দেবীর জীবন নহবতের স্বল্পপরিসর ঘরে খুব কষ্টে  কাটলেও স্বামীর উপার্জনের পয়সায় ওনার এক ছড়া মোটা সোনার হার লাভ হয়েছিল। এছাড়াও সারদা দেবীকে দুই ছড়া মূল্যবান তাবিজ, সোনার বালা ইত্যাদি গড়িয়ে দিয়েছিলেন।  স্ত্রীর ভবিষ্যতের কথা ভেবে সম্ভবত কিছুটা দায়মুক্ত হতে চেয়েছিলেন এইভাবে। সোনার হারের দাম পড়েছিল সেই যুগে দুশ টাকা। বাঁকি বেচে যাওয়া একশ টাকা স্ত্রী সারদা দেবীর হাতে গিয়েছিল।

গবেষক সুনীত দের মতে রামকৃষ্ণ ভাগ্নে হৃদয়ের হাতে টাকা দিয়ে ভরসা করতে না পেরে এক ঢিলে দুই পাখী মারার ব্যবস্থা করেছিলেন!  ভাগ্নের হাত থেকে টাকাও উদ্ধার হল আবার স্ত্রীর ভবিষ্যতের আপদ বিপদের জন্য কিছু সোনাও জমিয়ে রাখা গেল! বেশ বুদ্ধিমান, বিষয়ী মানুষের মত কাজ কি বলেন?

সারদামনির বেশ খেয়াল রাখতেন যাই হোক। যদিও নহবতের সেই ছোট্ট ঘরে; রামকৃষ্ণ নিজেই যার নাম দিয়েছিলেন ‘ খাঁচা ‘ কতট ভালো থাকতেন সেটাও বিচার সাপেক্ষ। ভোর তিনটে য় উঠে ওনাকে বাহ্যে যেতে হত,স্নান সেরে ফিরতেন।তারপর আবার সন্ধ্যে নামলে যেতেন। ঐ ছোট্ট ঘরে ওনার সঙ্গে  থাকতেন ঠাকুরের ভাইজি লক্ষী দেবী।

একবার, নহবতে এসে জেনে নিলেন ক টাকা হলে স্ত্রীর  হাত খরচ চলে। তারপর জেনে নিলেন উনি বিকালে ক খানা রুটি খান!  সারদাদেবী লাজুক মুখে সেটা জানাতেই ঠাকুর টুক করে  খরচের পরিমাণ হিসেব করে বলরাম মারফৎ থোক টাকা জমিদারী তে খাটিয়ে সুদের টাকা ছয় মাস অন্তর স্ত্রীর হাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন!

ইহ জগত ত্যাগ করার আগে বিভিন্ন সময়ে সারদা কে ঠাকুর বলে গেছিলেন – ‘তুমি কামারপুকুরে থাকবে, শাক বুনবে, শাক ভাত খাবে আর হরিনাম করবে।’ (কালী নাম নয় ! ‘শাক্ত সাধকের থেকে যা প্রত্যাশিত ছিল)। আরো বলেছিলেন – ‘বরং পরভাতি ভাল পরঘরি ভাল নয়। কামারপুকুরের নিজের ঘরটা নষ্ট করো না।’ কি pragmatic! তাই না?

তবে  একটা কথা, স্ত্রীর ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেই মতো ব্যবস্থা করে যাওয়া মোটেও অপরাধ নয় বরং অত্যন্ত মানবিক এক আচরণ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে।

কিন্তু উনি তো সাধারণ ছিলেন না। বিবাহিত হলেও উনি ছিলেন সাধক সন্ন্যাসী। ভক্তরা তাঁকে ভগবানের অবতার মানতেন। তাঁর নিজের ধারনাও তাই ছিল। এমন এক মানুষ যার কাছে – টাকা মাটি, মাটি টাকা। এ হেন মানুষ যদি পাতি ছাপোষা মধ্যবিত্তের মত আচরণ করেন তাহলে ব্যপারটা কেমন কেমন ঠেকে তাই না!?

 রামকৃষ্ণ শাক্ত সাধক বলে পরিচিত হলেও ওনার কথায় ও আচরণে তীব্র নারী বিদ্বেষ প্রকাশ পেত। ‘ নারী নরকস্য দ্বারম ‘, মেয়ে ত্রিভূবন দিল খেয়ে ‘ প্রভৃতি অমৃত বচন রামকৃষ্ণ কথামৃতেই খুঁজে পাবেন।

রামকৃষ্ণদেবের বাণী কি সত্যিই শাক্তধর্মের মাতৃসাধকের বাণী? কথামৃতে আছে, রামকৃষ্ণদেব বলছেন: কেন ঈশ্বরের দিকে (জীবের) মন যায় না? ঈশ্বরের চেয়ে তাঁর মহামায়ার আবার জোর বেশি। জজের চেয়ে প্যায়দার ক্ষমতা বেশি। অর্থাত ঈশ্বর মায়ার ঊর্ধ্বে, পরম ব্রহ্ম। মা হলেন মহামায়া, সেই ব্রহ্মের “প্যায়দা”, দাসী। এ হচ্ছে সেই ধরণের বাণী, যা ইসকনের মতো সংস্থা প্রচার করে শাক্তধর্মের অবমাননার জন্য

 আবার যে রানী রাসমনির তৈরি মন্দিরে ওনার আশ্রয় তাঁকেই উদ্দেশ্য করে ,’ কৈবর্তের ভাত খাওয়ালি মা ‘ বলে হাহাকার তার জাতি বিদ্বেষী মনোভাবের পরিচয় দেয়। অথচ বাঙালির তন্ত্রাশ্রিত মাতৃ ধর্মে লিংগ বিভেদ , জাতপাতের বিভেদ সম্পূর্ণ বর্জিত।

বিবেকানন্দ কর্তৃক সতীদাহ সমর্থনের কথা তো অনেকেই জানেন।

তবে এই ধারা বজায় রেখেছে বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত রাকৃমি। সেখানে এখনও মহিলারা ব্রাত্য, যা শাক্ত ধর্মের লিঙ্গ সাম্যের বিরোধী। 

‘ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের কোন অনুষ্ঠানে মহিলারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন না। ১৮৯৭ সালে স্বামীজি যখন বেলুড়  মঠ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তখন থেকেই এই ঐতিহ্য ও ভাবধারা বহমান।’ লিখেছেন শ্রী অভিজিৎ রায়।

রামকৃষ্ণ মিশন, সংক্ষেপে রা কৃ মি যে এক সময়ে স্বতন্ত্র ধর্মীয় সংস্থার তকমা নিজের গায়ে চড়াতে চেয়েছিল, তার উৎস সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে ঐ সংস্থার সংস্থাপক সেই বিখ্যাত শিষ্য ও তাঁর বিখ্যাত গুরুর কাজকর্ম ঘেঁটে দেখলে।

আদতে কালেন্ডারে মা কালীর ফটোর সাথে এই ত্রয়ীর ছাপা ছবির কল্যাণেই  বহুলাংশে বাঙালিদের মধ্যে এনাদের শাক্ত পরিচয় প্রতিষ্টিত।

ভারতীয় জ্যোতিষে ত্র্যহ স্পর্শ যোগের উল্লেখ  আছে। এই সময় শুভ কাজ , যেমন বিবাহ বা যাত্রা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বাঙালির ভাগ্যাকাশে এই ত্রয়ীর আবির্ভাব কি সেই দুর্ঘটনা যোগের ইঙ্গিত দিয়েছিল?

 ★ ★ ★ ★ ★

যত মত তত পথঃ ব্রাহ্ম ধর্মের বিশ্বমানবতা ধার করেছেন রামকৃষ্ণ – সুমন কুমার ঘোষ

মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা, ২০শে নভেম্বর ২০২৫, মার্গশীর্ষ অমাবস্যা ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২

ব্রাহ্মধর্ম নামে এক বিশেষ ধর্ম, যেটা সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালির হাত ধরেই। কিন্তু, সেটা রামকৃষ্ণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে “যত মত তত পথ” দর্শনে বিলীন হয়ে গিয়েছে। বলা বাহুল্য, যত মত তত পথ দর্শনের উৎপত্তি হিসাবে আমরা যাকে দায়ী করে থাকি, তিনি অবশ্যই রামকৃষ্ণ। কিন্তু, রামকৃষ্ণকে “অবতার রামকৃষ্ণ” বানিয়ে তোলার পিছনে তার ভক্তমন্ডলীর অবদানটাই বাহুল্যাংশে দায়ী। অর্থাৎ বলা যায়, ব্রাহ্মদের মস্তিস্ক কাজ করেছে। এর একটা উদাহরণ হিসাবে দেখানো যায়- বিবেকানন্দও প্রথমে ছাত্রাবস্থায় কেশবচন্দ্রের অনুগামী হিসেবে কাজ করেছেন। কেশবচন্দ্র আবার প্রথম জীবনে বৈষ্ণব ছত্রছায়া থেকে উঠে এসে মধ্য জীবনে আদি ব্রাহ্মসমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে হয়ে শেষ জীবনেও নববিধান ব্রাহ্মসমাজ চালাতে চালাতে রামকৃষ্ণর সান্নিধ্যে এসে পরলোকে গমন করেছেন। অতএব, অস্পষ্ট একটা ইঙ্গিত এক্ষেত্রে দৃশ্যমান হচ্ছে যে, অবচেতনে ব্রাহ্মদের দর্শনটাই ‘যত মত তত পথ’ দর্শনের মধ্যে ঢুকে অস্তমিত হয়েছে। এবং শেষ পর্যন্ত সেটাই রামকৃষ্ণর ভক্তমন্ডলী দ্বারা রামকৃষ্ণর অবতারত্বর বাহনা দিয়ে তৈরি করা নতুন এক দর্শন – “যত মত তত পথ” হিসাবে আজ টিঁকে আছে।

ইতিহাসও সেই দিকটিকেই ইঙ্গিত করে। কেননা, এই “যত মত তত পথ” নামে দর্শনটার উৎস খুঁজতে বসলে দেখা যাবে, উক্তিটি শ্রীরামকৃষ্ণ কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থানে নয়, বরং তাঁর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভক্ত ও শিষ্যদের সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে প্রসঙ্গ হিসাবে উত্থাপিত করতেন। বলা বাহুল্য, রামকৃষ্ণ ভক্তমন্ডলীর মধ্যে যেমন সাধারণ মানুষ থাকতেন, তেমনি এলিট শ্রেণীর ব্রাহ্মরাও থাকতেন। কিন্তু, রামকৃষ্ণর জীবদ্দশায় রামকৃষ্ণকে প্রথম প্রচারের আলোয় আনেন তার এলিট ক্লাস ব্রাহ্ম শিষ্যরাই। পরবর্তীকালে, রামকৃষ্ণর মৃত্যুর পরে তার ভক্তমন্ডলী দুই ধারায় প্রবাহিত হয়ে যায়- গৃহী ভক্ত আর সন্ন্যাসী ভক্ত। এই দুই খাতে প্রবাহিত রামকৃষ্ণ ভাবধারার নেতৃত্বের ভরকেন্দ্র শেষ পর্যন্ত সন্ন্যাসী ভক্তদেরই নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

রামকৃষ্ণর সন্ন্যাসী ভক্তদের মধ্যে ছিলেন সংসার ত্যাগী ভক্তরা এবং এই ত্যাগীদের দলে যোগ দিয়েছিলেন বলরাম বসু, মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ওরেফ শ্রীম-র মত গৃহী ভক্তরাও। কিন্তু, এই সন্ন্যাসী ভক্তদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রথম দিকে ব্রাহ্ম ভাবধারার আকৃষ্ট নরেন্দ্রনাথ দত্ত ওরেফ বিবেকানন্দ। অন্যদিকে গৃহী ভক্তদের মধ্যে ছিলেন বিবেকানন্দেরই জ্ঞাতিসস্পর্কীয় দাদু- রামচন্দ্র দত্ত, সুরেন্দ্রনাথ মিত্র প্রমুখ। এই গৃহী ভক্তদের নেতৃত্বে ছিলেন রামচন্দ্র দত্ত। কিন্তু, রামচন্দ্র দত্ত নিয়ন্ত্রিত রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলন শেষ পর্যন্ত পরিণতি পায়নি। (উলটে এই রামচন্দ্র দত্তর বিহারি চাকর লাটু, সন্ন্যাসী ভক্তদের দলে ভিড়ে গিয়ে লাটু মহারাজ নামে পরিচিত হয়ে গেলেন।)

প্রায় একই সময়ে চলতে থাকা রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের ধারাটা সন্ন্যাসী ভক্তদের একচোটিয়া হবার দিকে ঝুঁকে যায় বিবেকানন্দের শিকাগো ভাষণ পরবর্তী প্রচারের ধাক্কায়। অন্যদিকে উনিশ শতকের শেষে রামচন্দ্র দত্তের মৃত্যুর পর রামচন্দ্র দত্ত প্রতিষ্ঠিত কাঁকুড়গাছি যোগোদ্যানের ভার তার অনুসারীদের হাতে থাকলেও সেটা একসময় বেলুড় মঠের দখলে চলে যায়। এভাবেই রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের ধারা সম্পূর্ণ একমুখীনতায় পর্যবসিত হয়ে সম্পূর্ণ সন্ন্যাসী ভক্তদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এটাই ইতিহাসের এক অপূরনীয় ক্ষতি করে দিয়ে যায়।

কেননা, কেশবচন্দ্র সেনের জননী, সারদাসুন্দরীর আত্মকথা (যোগেন্দ্রলাল খাস্তগীর অনুলিখিত) থেকে আমরা রামকৃষ্ণর একটা উক্তি পাই, যেটি উনি কেশবের মা সারদাসুন্দরী দেবীকে বলেছিলেন- “দ্যাখ মা, আমি অনেক কষ্টে মা-কে (কালী) ধরেছি, কিন্তু কেশবের সঙ্গে মিশে সেটুকু যায়, বুঝি আমি শেষে এসে নিরাকারে পড়ি”। -এই উক্তি বিশ্লেষণ করলে এটাই ইঙ্গিত করছে যে, কালী-সাধক রামকৃষ্ণ নিরাকার ব্রহ্মের প্রতি ঔদার্য প্রদর্শন করেছেন। এই ভাব আদান-প্রদানের মহিমামন্ডিত বিষয়টা রামকৃষ্ণর (গৃহী) ভক্তমন্ডলী সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিল। রামকৃষ্ণর গৃহী ভক্তমন্ডলী রামকৃষ্ণকে ‘গুরু’, কেশবচন্দ্রকে ‘শিষ্য’ হিসাবেই দেখতে স্বাচ্ছন্দ ছিলেন। এই একতরফাভাবে রামকৃষ্ণকে ‘দাতা’ ও কেশবচন্দ্রকে ‘গ্রহীতা’ বলে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন রামকৃষ্ণর গৃহী ভক্ত, রামচন্দ্র দত্ত।

এই রামকৃষ্ণ ভক্তমন্ডলী কোনোভাবেই যে কেশবের কাছে তাঁদের গুরুর ঋণ স্বীকারের প্রসঙ্গে রাজি ছিলেন না, এই ব্যাপারে রামচন্দ্র দত্তর ভূমিকার আভাস পাওয়া যায় রামকৃষ্ণর মৃত্যুর পর তত্বমঞ্জরী পত্রিকায়। সেখানে রামচন্দ্র দত্ত, কেশবচন্দ্রের নববিধান সমাজ প্রতিষ্ঠাকে ‘রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনফলের আভাসমাত্র’ বলে চিহ্নিত করে, কেশবচন্দ্র যে সর্বাংশে রামকৃষ্ণর অনুসারী নন -এটা উল্লেখ করে কেশবচন্দ্র সম্পর্কে কিছু তির্যক মন্তব্য করেন। এছাড়াও কেশবের অনুগামী, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার রামকৃষ্ণ বিষয়ে যে লেখাটি সেযুগে ইন্টারপ্রিটার মাসিক পত্রে লিখেছিলেন, সেই লেখার মধ্যে কিছু বৈসাদৃশ্য তুলে ধরে প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছিলেন রামচন্দ্র দত্ত। কিন্তু, কালের স্রোতে রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের ধারাটা সম্পূর্ণভাবে কেশবেরই একদা অনুগামী, বিবেকানন্দ – শ্রীম নামের সন্ন্যাসী ভক্তদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে, রামকৃষ্ণর শক্তি উপাসনার দর্শনে ব্রাহ্ম দর্শনের অনুপ্রবেশ রুখতে রামচন্দ্র দত্তর এই বিশেষ কর্মকাণ্ড যুগের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।

রামকৃষ্ণর কথা প্রথম সংবাদপত্রে ছাপা হয় ব্রাহ্ম ভাবাবিষ্ট, কেশবচন্দ্র সেনের রবিবাসরীয় দ্য ইন্ডিয়ান মিরর-এ, ১৮৭৫ সালের ২৮ শে মার্চ। এরই সূত্র ধরে তখনকার আরও কিছু সাময়িকীপত্রে রামকৃষ্ণর কথা ও উপদেশাবলি তুলে ধরা হয়। এগুলো সবই ছিল প্রত্যক্ষদর্শন সজ্ঞাত এবং রামকৃষ্ণ যখন ‘পরমহংস’ হয়ে ওঠেনি তখনকার রচনা। অর্থাৎ রামকৃষ্ণর “পরমহংস” হয়ে ওঠার পিছনে এইসব ব্রাহ্ম মস্তিস্কপ্রসূত সংবাদপত্রের লেখনীগুলর অপরিসীম অবদান ছিল। কিন্তু, এগুলোও ক্রমশ গুরুত্বহীন হয়ে যায় রামকৃষ্ণর মৃত্যুর পর তার সন্ন্যাসী ভক্তদের নিয়ন্ত্রিত ভাবধারার দাপটে। বলা বাহুল্য, রামকৃষ্ণর সেই সন্ন্যাসী ভক্তদের নেতৃত্বে ছিলেন ব্রাহ্ম ভাবাবিষ্ট বিবেকানন্দ। অর্থাৎ ব্রাহ্ম ভাবধারা সম্বলিত দর্শনটা লীন অবস্থায় (latent or dormant state) রয়ে যায় বর্তমান ‘রামকৃষ্ণর প্রবর্তিত’ বলে কথিত ‘যত মত তত পথ’ দর্শনের মধ্যে।

[বিবেকানন্দ ছাত্রাবস্থায় কেশবচন্দ্রের অনুগামী হিসাবে কেশবের প্রতিষ্ঠিত নববিধান ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেছিলেন। বর্তমানে রামকৃষ্ণর উপদেশাবলি সহ রামকৃষ্ণ জীবনীর আকর গ্রন্থ হিসাবে যেটি সর্বাধিক সমাদৃত, সেই কথামৃতের রচনাকার শ্রীম ওরেফ মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ছিলেন কেশবচন্দ্রের জামাই। অর্থাৎ শ্রীম-ও প্রথম দিকে ব্রাহ্ম ভাবাবিষ্ট। কেশবচন্দ্রের কাছেই রামকৃষ্ণর কথা প্রথম শোনেন শ্রীম।]

ব্রাহ্মধর্মের উৎপত্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও তত্বগত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রাণপুরুষ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও তন্ত্র দর্শনের বিশেষজ্ঞ পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়, নতুন ধর্মের সৃষ্টির বিষয়ে তত্বগত বিশেষ একটি কথা বলেছেন- “যখন একটি ধর্মের নিয়মকানুনে ও আচার আচরণের সংস্কৃতিতে কিছু মানুষের গোষ্ঠী অসুবিধা অনুভব করে, তখন সেই ধর্মের প্রতিবাদস্বরূপ নতুন আরেকটি ধর্ম ওই বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়া মানুষের গোষ্ঠীর দ্বারাই আত্মপ্রকাশ করে”। ব্রাহ্মধর্মের উৎপত্তি হবার ক্ষেত্রেও একই তত্ব খাটে। কেশবচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠিত নববিধান সমাজের নেতৃত্বে থাকা শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা “রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ” বইটিতে, ব্রাহ্মদের সংজ্ঞা হিসাবে শিবনাথ শাস্ত্রীর মন্তব্য- “যিনি শাস্ত্র ও লোকাচারের বাধা অতিক্রমপূর্বক প্রকাশ্যভাবে সুরা পান করিতে পারিতেন তিনি (ব্রাহ্ম) সংস্কারক দলের মধ্যে অগ্রগন্য ব্যক্তি বলিয়া পরিগণিত হইতেন।”

ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক হিসাবে যাঁর নাম উঠে আসে, সেই রামমোহন রায়ের পারিবারিক জীবনযাপনের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে, উপরিউক্ত তত্বটিই প্রস্ফুটিত হয়। বাস্তবিকই, জে কে মজুমদারের The Last Mughals বইটি থেকে রামমোহনের পুর্বপুরুষের তথ্য উঠে আসে। রামমোহনের পঞ্চম পুরুষ ঊর্ধ্বে প্রপিতামহ পরশুরাম, ব্রাহ্মনের পেশা যাজকবৃত্তি ও অধ্যাপনা ত্যাগ করে মুর্শিদকুলি খাঁ-র অধীনে নবাব সরকারের চাকরি নেন ও ‘রায় রায়ান’ উপাধি পান। এরপর বংশপরম্পরায় একই কাজ করে গেছেন ওনারা। এরপর জানা যাচ্ছে রামমোহনের পিতামহ বজ্রবিনোদ, আলিবর্দি খাঁ-র অধীনে কাজ করার সময়ে মুঘল সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহে ব্যস্ত দ্বিতীয় শাহ আলমকে সাহায্য করেন। এরপর রামমোহনের পিতা রামকান্ত নবাবের অধীনে চাকরি ছেড়ে খানাকুলে বর্ধমান রাজার অধীনে পত্তনদার হিসাবে জমিজমার মালিক হন ও রানী বিষ্ণুকুমারীর বিষয় সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন।

অতএব, রামমোহনের পারিবারিক দিকটির অধিকাংশটাই ছিল মুসলিম অধীনে কাজকর্মর চালিয়ে যাবার মত দক্ষ আদবকায়দাদুরস্ত। এরই ফল, রামমোহনের বাল্যকালে পড়াশোনার শুরু বলতে যে তথ্যটা পাওয়া যাচ্ছে, সেটা হল- তৎকালীন (রামমোহনের পারিবারিক) রীতি অনুযায়ী রামমোহন বাড়িতেই বাংলা ও ফার্সি শিখতে শুরু করেন। সেই আমলে ফার্সি ভাষা রাজভাষা ও আদালতের ভাষা হবার কারণে সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের সন্তানদের ফার্সি পড়ার যথেষ্ট চল ছিল। যেহেতু রামমোহনের পিতৃকুল রাজসরকারের (নবাবের) কর্মচারী ছিলেন বংশপরম্পরায়, সেই কারণে রামমোহনের ক্ষেত্রেও ফার্সি শিক্ষার্জনের ব্যতিক্রম ঘটেনি। এরপর রামমোহনের বয়স যখন ৯ বছর, তখন ফার্সি ভাষাশিক্ষায় উন্নতি ও আরবি শিক্ষার জন্য রামমোহনের বাবা তাকে পাটনায় প্রেরণ করেন। বলা বাহুল্য, সেই আমলে পাটনা ছিল আরবি ও ফার্সি শিক্ষার জন্য সেরা শিক্ষাকেন্দ্র।

নাহ, রামমোহনের পিতা, রামকান্ত রায়ের এই মহৎ প্রচেষ্টা বিফলে যায়নি।  মহাপ্রতিভাধর রামমোহন খুব দ্রুত তার আরবি ও ফার্সি শিক্ষার প্রতিভার বিচ্ছুরণ দেখিয়েছিলেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, ড. ল্যান্ট কার্পেন্টারের লেখা ‘বায়োগ্রাফিক্যাল স্কেচ’ বই থেকে জানা যাচ্ছে, আনুমানিক ১৬ বছর বয়সে রামমোহন হিন্দুদের পৌত্তলিকতার (পুতুল পুজো / মূর্তি পুজো) বিরুদ্ধে একটি পান্ডুলিপি রচনা করেন। সেই পান্ডুলিপিটির নাম ছিল ‘তুহফত-উল-মুওয়াহিদ্দিন’৷ যার বাংলা মানে- ‘একেশ্বরবাদীদের উপহার’। অবশ্য এই পান্ডুলিপির আর কোনো হদিশ পাওয়া যায় না। কিছু গবেষকের গবেষনা রিপোর্টের (গবেষক দিলীপকুমার বিশ্বাস) মধ্যেই টিঁকে ছিল। এরপর রামমোহনের মৃত্যুর ৫০ বছর পরে তৎকালীন আদি ব্রাহ্মসমাজের সভাপতি, রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে মৌলবি ওবেদুল্লা (Obaidullah El Obaide) গ্রন্থটি ইংরেজি অনুবাদ করলে, তুহফত-উল-মুওয়াহিদ্দিন চিরবিস্মৃতির হাত থেকে রক্ষা পায়।

অতএব, দেখাই যাচ্ছে রামমোহনকে বাল্যকাল থেকে তৈরি করা হয়েছিল ইসলামি দর্শনের আদর্শ মাথায় পুশ করেই। কিন্তু, এই ইসলামি দর্শন রামমোহনের কোনো কাজে লাগল না পারিবারিক বংশপরম্পরার চাকরির ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে। কেননা ততক্ষণে পলাশীর যুদ্ধ ঘটে গিয়ে মীর্জাফর-মীরকাশীমের নবাবীও ঘুচে গিয়ে ইংরেজ শাসন চলে এসেছে। বাস্তবিক ভাবেই ইসলামি দর্শনের ভাবধারায় বড় হওয়া রামমোহন ইংরেজদের খৃষ্টান দর্শনের ভাবধারার নিজেকে পরিবর্তিত করার দিকেই নিয়ে গিয়েছিল নিজের সুবিধাজনক অর্থপার্জনের প্রয়োজনেই। কিন্তু রামমোহনকে থাকতে হয়েছিল হিন্দু দর্শনের পরিমন্ডলে। কাজেই, এই বিসম মানসিক দর্শনের পরিবেশে একটা বিত্তশালী পরিবারের একজনের কোনোরকম অসুবিধা হলে, সেই বিত্তবানটি তার বিত্তশালী ও ক্ষমতাশালী তকমার প্রভাবে তার নিজস্ব সুবিধাজনক ধর্ম চালু করতে পিছপা হবেন না, এটা একপ্রকার তত্বগত ভাবে প্রমাণিত সত্য। এরই ফল, রামমোহন ‘আত্মীয়সভা’ আয়োজন করে ব্রাহ্মধর্ম নামে নতুন এক ধর্ম প্রচলন করেছিলেন। যেটির দর্শনটাই ছিল বেদান্তের ব্রহ্মা আর নিরাকার আল্লার সংমিশ্রণ। 

এদিকে, ইংরেজদের ভারতে আসা এবং নিজেদের শিকড় গেড়ে প্রতিষ্ঠিত হবার পিছনে শুধুমাত্র অর্থশোষনই উদ্দেশ্য ছিল না। অন্য উদ্দেশ্যটা ছিল ভারতের ধর্মীয় দর্শনটাকেই খৃষ্টীয় ধর্মের দর্শনের আয়ত্তাধীনে আনা। কিন্তু তৎকালীন ভারতের ধর্মীয় দর্শন বলতে বাংলার ধর্মীয় দর্শনকে দেখলে দেখা যাচ্ছে বাঙালির শক্তিশালী মাতৃধর্মীয় দর্শনের জন্য ভারতীয়রা সহজে ব্রিটিশদের আশানুরূপভাবে ওদের প্রবর্তিত খৃষ্টীয় দর্শনে উৎসাহী হলেন না। তখন ব্রিটিশরাও নেপথ্যে থেকে তাদের দ্বিতীয় পলিসি হিসাবে হিন্দুধর্মের বিপরীত, পৌত্তলিকতা বিরোধী আর খৃষ্টান ধর্মের নিকটবর্তী একটা ধর্মমতে উৎসাহ অবশ্যই দিয়েছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায়- রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, প্রতাপ মজুমদার -এনারা প্রত্যেকেই ছিলেন ইংরেজ ঘনিষ্ঠ ও ইংরেজদের হাতে গড়া নেতা। অবশ্য, তন্ত্রাশ্রয়ী বাঙালির মাতৃধর্মে ইংরেজদের কৃত এরকম ধর্মীয় আগ্রাসন ফলপ্রসূ হয়নি।

ব্রাহ্মনেতারা যে বাস্তবিকই ইংরেজদের আনুগত্যপ্রবণ ছিলেন, সে ব্যাপারে প্রমাণও রয়েছে। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, তাঁর ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ তৃতীয় খন্ডে, প্রসন্নকুমার ঠাকুর সম্পর্কে এই তথ্য দিয়েছেন- “ভগবান যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি স্বাধীনতা চাও, না ইংরেজের অধীন হয়ে থাকতে চাও, আমি মুক্তকন্ঠে ইংরেজের অধীনতাই বর বলে গ্রহণ করব।” অথচ ইতিহাস বলছে এই দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখ নেতাদের তৈরি করেছিলেন রামমোহন, তার ব্রাহ্ম ভাবধারা দিয়েই। ঠিক একই কারণে গবেষক অরবিন্দ পোদ্দারও তার ‘Renaissance in Bengal. 1800-1860’ বইতে বলে গেছেন- “রাজা রামমোহন কখনো ভারতে ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের বিরোধিতা করেননি কিংবা ভারতে জাতীয় স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেননি। বাস্তবিকপক্ষে দেশের স্বাধীনতার প্রতি রামমোহনের অনুরাগ ভারতস্থিত ব্রিটিশ শাসনের কাছে আত্মসমর্পণের নামান্তর মাত্র। ইংরেজ সরকারের প্রতি অবিচল আনুগত্য ও অসীম আস্থা প্রকাশ করে রাজা রামমোহন ও তার অনুগামীরা মনে করেছেন যে তাদের স্বার্থ এদেশে ব্রিটিশ শাসনের ন্যায় চিরস্থায়ী হবে।”

অর্থাৎ রামমোহন কেন ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন তার পিছনে ইংরেজদের ভূমিকা ও রামমোহনের নিজস্ব স্বার্থ সম্পর্কে বোঝা গেল। ব্রাহ্মদের এইসব কার্যকলাপ যে সেযুগে কেউ বুঝতে পারেননি, -তেমনটা নয়। গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী, তার ‘শ্রীরামকৃষ্ণ ও অপর কয়েকজন সাধুপুরুষ প্রসঙ্গে’ বইতে এই উল্লেখ করে গেছেন- “তা যাহা হউক, রামমোহন শুধু যীশু বা বাইবেল নহে, মহম্মদ ও কোরাণেও বিশ্বাসী ছিলেন। এবং সেই রামমোহনই আবার যজ্ঞোপবীত ধারণ করিয়া হিন্দু সমাজে অন্তর্ভুক্ত থাকিয়া শংকর শিষ্য বেদান্তবাদী হিন্দু বলিয়া পরিচয় দেবার জন্য প্রাণপণ সচেষ্ট ছিলেন।”

অর্থাৎ এখানে “যত মত তত পথ” নামের সর্বধর্মসমম্বয়বাদী দর্শনটার উৎস সম্পর্কে একটা প্রাথমিক আভাস পাওয়া গেল। ব্রাহ্মদের এহেন সুবিশাল কর্মকান্ডের মধ্যে রামকৃষ্ণ নেহাতই চুনোপুঁটি। কিন্তু, এই ‘যত মত তত পথ’ দর্শনের মধ্যে রামকৃষ্ণর নাম জড়িয়ে গেল কেন?? এর সুস্পষ্ট কারণ আছে।

রামকৃষ্ণ নেহাতই চুনোপুঁটি। কালী তথা মাতৃধর্মকে আঁকড়ে ধরে নিজের রুটিরুজি যোগাড় ব্যতীত ওনার কর্মকান্ডে আর কোনো দর্শনের প্রসারের কোনো ভূমিকাই নেই। তাসত্বেও রামকৃষ্ণর সারল্যতাকে কৌশলে ব্যবহার করেছেন শিক্ষিত ব্রাহ্মরাই। ব্রাহ্মদের প্রচার ব্যতীত রামকৃষ্ণর কর্মকান্ডে অন্তঃসারশূন্যতা স্পষ্ট। রামকৃষ্ণর ইসলামে দীক্ষা গ্রহন, খৃষ্টে দীক্ষাগ্রহন, তন্ত্রে দীক্ষাগ্রহন নেহাতই ছেলেমানুষী। কেননা, রামকৃষ্ণ কেবলমাত্র সব ভক্তদের উপদেশ দিয়েই বেড়াতেন না, ভক্তদের থেকে পরিপার্শ্বিক নানা বিষয়ে খোঁজখবরও নিতেন। তেমিনই ব্রাহ্ম শিষ্যদের থেকে শুনে সরল ছেলেমানুষী মননে রামকৃষ্ণরও ইসলামে, খৃষ্টে দীক্ষা নেবার বাসনা জাগা অসম্ভব কিছু নয়। তার উপরে রামকৃষ্ণর ছিল অবাধ স্বাধীনতা। এই অবাধ স্বাধীনতাই রামকৃষ্ণকে নিজের ইচ্ছাপুরণে সাহায্য করেছে, এটাকেই সুচতুর ব্রাহ্মরা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে নিজেদের দর্শনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, রামকৃষ্ণর বানী প্রচারের মাধ্যমে।

বাস্তবিক ভাবেই এটা বোধগম্য যে, রামকৃষ্ণকে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পুরোহিত হিসাবে নিযুক্ত করার ঐতিহাসিক কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বর্ণবাদে জর্জরিত সমাজে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের মাহিষ্য তথা শূদ্র মালিক রানী রাসমণী-ই কোনঠাসা ছিলেন সামাজিক সমীকরণের জালে জড়িয়ে। এরই ফল, রামকৃষ্ণর দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে অবাধ স্বাধীনতা ছিল। এই স্বাধীনতার জন্য রামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহে নিজের বিষ্ঠা নিয়ে এক্সপেরিমেন্টও করেছেন বাধাহীন ভাবে। এই একই স্বাধীনতার অংশ, মন্দির চত্বরে অবাধে আসা সাধুসন্তদের থেকে অবাধে দীক্ষাগ্রহন করেছেন রামকৃষ্ণ। দক্ষিণেশ্বর মন্দির চত্বরে বসে রামকৃষ্ণর ইসলামে দীক্ষাগ্রহনও ওই একই স্বাধীনতার পর্যায়ে পরে। এক্ষেত্রে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের মালিক, রানী রাসমণী অসহায়। রামকৃষ্ণকে তাড়ালে, শূদ্রর মন্দিরে পুজো করার আর কেউ-ই থাকবে না। এই সুযোগের অবচেতন সদ্ব্যবহার ব্রাহ্ম ভাবাবিষ্টরা অবশ্যই নিয়েছিল। এর প্রমানও রয়েছে।

ব্রাহ্মরা কেন রামকৃষ্ণর কাছে এসেছিল, সে বিষয়ে বিশ্লেষণের আগে, ব্রাহ্মরা কি কালীকে মেনেছিল?? -এই প্রশ্নটার বিশ্লেষণ জরুরি।

উত্তরটা কিন্তু অবশ্যই এই দিকেই নির্দেশ করছে- “না”।

ঐতিহাসিক সুমিত সরকারের পর্যবেক্ষণ – “রামকৃষ্ণ শেষ পর্যন্ত বৈষ্ণবধর্মের ঊর্ধ্বে শাক্তধর্মকে স্থান দেন, অন্য যে কোনো দেবদেবীর ঊর্ধ্বে কালীকে স্থান দেন।” অথচ এই রামকৃষ্ণই বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীকে, মূলত ব্রাহ্মদের কল্কে পাবার জন্য বলেছিলেন- “যিনি ব্রহ্ম, তিনি কালী (মা আদ্যাশক্তি)। যখন নিষ্ক্রিয়, তাকে ব্রহ্ম বলে কই। যখন সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়- এইসব কাজ করেন, তাঁকে শক্তি বলে কই। স্থির জল ব্রহ্মের উপমা। জল হেলচে দুলচে, শক্তি বা কালীর উপমা। কালী! কিনা- যিনি মহাকালের (ব্রহ্মের) সহিত রমন করেন। কালী সাকার আকার নিরাকার।”

রামকৃষ্ণর এহেন কালীতত্ব মেনে নিতে সৌন্দর্যপ্রিয় ব্রাহ্মরা প্রস্তুত ছিলেন না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৮৯৯ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারী অ্যালবার্ট হলে এবং ১৮শে মে কালীঘাট মন্দিরে দাঁড়িয়ে ভগিনী নিবেদিতা, কালী বিষয়ে রামকৃষ্ণর উপরিউক্ত মনোভাবের কথা তুলে ধরলে ব্রাহ্মরা অখুশি হয়েছিল। এটার প্রমান হল- ১৮৯৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী নিবেদিতা মিস জেসোফিন ম্যাকলাউডকে এক পত্রে লেখেন- “The Brahmos declare that was not Kali Worship – and that only what appealed to their lowest feelings was understood by the mob.” অর্থাৎ রামকৃষ্ণর কালী ভাবনাতে ব্রাহ্মদের মনে হয়েছিল রামকৃষ্ণর কালী ভাবনা আর বাস্তবের কালীপুজো এক বস্তু নয়..!!

নিবেদিতার ওই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ব্রাহ্মদের প্রতিক্রিয়া অনুধাবন করলে দেখা যাচ্ছে, তন্ত্রাশ্রয়ী মাতৃকাধর্মের আদর্শ ব্রাহ্মদের মধ্যে একেবারেই নেই। কাজেই এই তন্ত্রাশ্রয়ী মাতৃকাতন্ত্রের আদর্শ নিয়ে এলিট ক্লাস ব্রাহ্মদের সাথে লড়ে এই মাতৃতান্ত্রিক আদর্শ ব্রাহ্মদের মধ্যে ঢুকিয়ে সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করার মত সাহস রামকৃষ্ণ দেখাননি। বরং উনি চেষ্টা করেছিলেন এই এলিট ক্লাস ব্রাহ্ম শিষ্যদের হাত ধরে নিজের প্রচার ও প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে। কিন্তু, ওটা ব্রাহ্মদের দর্শনের সাথে মিশে এক বিশ্বমানবিক সর্বধর্মসমম্বয়বাদী দর্শন, ‘যত মত তত পথ’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল, এবং এটাই রামকৃষ্ণর ভক্তমন্ডলীর কাছে দার্শনিক আদর্শ হয়ে রইল।

তন্ত্রাশ্রয়ী মাতৃকাধর্মের আদর্শ ব্রাহ্মদের মধ্যে একেবারেই নেই, তবুও ব্রাহ্মরা রামকৃষ্ণর কাছে এলেন কেন?? অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে, ঐতিহাসিক সুমিত সরকারের পর্যবেক্ষণ, “শহুরে ভদ্রলোকশ্রেণীকে ভক্ত হিসাবে পেতে রামকৃষ্ণ যেভাবে আগ বাড়িয়ে উদ্যোগ নিতেন, ঠিক ততটাই বিরক্ত হতেন যখন রামকৃষ্ণ তার গ্রামের বাড়ি কামারপুকুরে আসতেন এবং তাকে দেখতে গ্রামের লোকেরা ভিড় জমাতো।” অর্থাৎ রামকৃষ্ণ ভদ্রলোক ভক্ত সংগ্রহ করতে আগ বাড়িয়ে উদ্যোগী হয়েছেন। অন্যদিকে আবার এলিট ক্লাস লোকেরা তন্ত্রাশ্রয়ী মাতৃধর্মের পরিবেশে বাস করেও নিজেদের বিত্তশালী ও প্রভাবশালী তকমাটা দিয়ে ব্রাহ্ম ভাবধারা নিয়ে চলতে গিয়ে নিজেরাই সামাজিক সমীকরণের জালে ফেঁসে গিয়েছিলেন। এদের কাছে কিছু একটা আঁকড়ে ধরার প্রয়োজন ছিল, সেটাই রামকৃষ্ণর মধ্যে পেয়েছিল ব্রাহ্মরা।

এর সবথেকে বড় উদাহরণ কেশবচন্দ্র সেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে মিশে ব্রাহ্ম আন্দোলন করতে গিয়ে, নিজেই নিজের মেয়ের বাল্যবিবাহ দিয়ে ফেলায় ব্রাহ্মসমাজের সাথে কেশবের বিরোধ বেঁধে যায়। এরই ফল- কেশব নিজের আলাদা ব্রাহ্মসমাজ সংগঠন তৈরি করেছিলেন। এভাবেই একসময়ে রামকৃষ্ণকে আঁকড়ে ধরে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছেন। বিনিময়ে রামকৃষ্ণকে দিয়ে গেছেন তার অসংখ্য ব্রাহ্ম ভাবধারায় দীক্ষিত অনুগামীকে। স্বয়ং বিবেকানন্দ ও শ্রীম-ও এই তালিকায় পড়ে।

অর্থাৎ এটা প্রমাণিত হয় যে, রামকৃষ্ণ ওই বিশেষ এলিট সমাজের মধ্যে কল্কে পাবার জন্যই বেছে বেছে ব্রাহ্মদের দলে মিশতেন। বিভিন্ন ব্রাহ্ম নেতাদের সাথে রামকৃষ্ণর সাক্ষাৎকার থেকে এটা প্রমাণিত যে ব্রাহ্মরা কেউ-ই নিজেরা রামকৃষ্ণর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেননি, রামকৃষ্ণই আগ বাড়িয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন (ব্যতিক্রম, কেশবচন্দ্র সেন)। ভাগ্যক্রমে আদি ব্রাহ্মসমাজ থেকে বিতাড়িত কিছু শিষ্যও জুটেছিল রামকৃষ্ণর। যেমন কেশবচন্দ্র সেন। এই রামকৃষ্ণর ধর্মমত প্রচারের জন্য কেশবচন্দ্র সেনের শক্তিশালী প্রচারের নেটওয়ার্ক প্রচন্ডভাবে কাজ করেছে। কিন্তু কেশবের ওই নেটওয়ার্ক ব্যপ্ত ছিল ব্রাহ্মদের মধ্যেই। ফলত, কেশবের মাধ্যমে রামকৃষ্ণর বানী যতটা প্রচার পায়, সেটা ওই ব্রাহ্ম ভাবধারার মধ্যে দিয়েই প্রকাশিত হয়। সেটাই কালক্রমে ‘যত মত তত পথ’ নামের দর্শনে প্রস্ফুটিত হয়।

তাহলে স্বভাবতই একটা প্রশ্ন ওঠে, ব্রাহ্মরা বিলুপ্ত হয়ে গেল কেন? তবুও ব্রাহ্মদের দর্শনটা ‘যত মত তত পথ’ হিসাবে রয়ে গেল কেন?

এ প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সেযুগের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে একটু বিচরণ করে আসতেই হয়। ব্রাহ্ম আন্দোলন যে সময় থেকে রামমোহনের হাত ধরে শুরু হয়, তখন ব্রাহ্ম নেতারা মোটামুটি ভাবে দেশে ইংরেজ শাসন সম্পর্কে খুশিই ছিলেন। ব্রাহ্মদের ইংরেজ ঘেঁষা মনোভাবে সেটা প্রস্ফুটিত হয় বারে বারে। কিন্তু, রামকৃষ্ণ আন্দোলনের সময়টা দেখলে দেখা যাবে তখন ইংরেজরা বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায়ে বিচরণ করছে।

বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ইংরেজদের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত এক দিনের বা এক বছরের পরিকল্পনা নয়। বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা বা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল ১৮৫৪ সাল থেকে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবিক ভাবে এগোতে থাকে ১৮৭২ সাল থেকে। এর মাঝখানে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহে দেশে ইংরেজদের বিরুদ্ধে একটা হাওয়া তৈরি হতে শুরু করেছিল। এরপর ইংরেজরা আদমশুমারী করে নিজেদের সুবিধা অসুবিধা বুঝে ১৮৭৪ সালে প্রথমে আসামকে বাংলা থেকে আলদা করল। -এটাই ছিল বঙ্গভঙ্গের প্রথম প্রশাসনিক পদক্ষেপ। এরপর ১৯০০ সালের দিকে যখন লর্ড কার্জন ভাইসরয় হয়ে এলেন, তখনই বৃহৎ আকারে বঙ্গভঙ্গের প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞ শুরু করলে, বাংলার স্থানীয় জমিদার সহ ব্যবসায়ীরা বিপাকে পরে যান। কেননা অনেক জমিদার দেখেছিল তাদের জমিদারি অন্য প্রদেশে চলে যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও দেখেছিল কলকাতার পরিবর্তে ঢাকা অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসাবে উঠে এলে তাদের ব্যবসার স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে যাবে। এইসব নানা কারণে তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছে একমাত্র পথ ছিল বঙ্গভঙ্গ রুখতে বাংলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা। তাই তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব হিন্দু-মুসলিম ঐক্য স্ট্র‍্যাটেজি নিয়ে চলছিলেন।

এতেই ওই সর্বধর্মসমম্বয়বাদী দর্শন, ব্রাহ্ম দর্শনটা জল হাওয়া পায়। কিন্তু ব্রাহ্মদের ফিজিক্যাল জীবনযাপন ইংরেজ ঘেঁষা হওয়ায়, এলিট ক্লাস জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্রাহ্মদের দিকে লোকজনের আকৃষ্ট হবার হাওয়াটা অন্যদিকে সরে যায়। এরই ফল, ব্রাহ্মদের সর্বধর্মসমম্বয়বাদী দর্শনটা টিঁকে রইল, কিন্তু ব্রাহ্মরা তাদের এলিট শ্রেণীর জীবনযাপন নিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেল।

বলা বাহুল্য, ব্রাহ্মধর্মর সৃষ্টি যে ব্রিটিশদের খৃষ্টধর্ম প্রসারের একটা কৌশল ছিল, সেটার স্পষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু বৃটিশদের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তে বাঙালির মধ্যে যে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্ম হল, এতেই ব্রাহ্মধর্মের মত সর্বধর্মসমম্বয়বাদী বিশ্বমানব এলিট শ্রেণীর দর্শনটা টিঁকে থাকলেও ওই এলিট শ্রেণিটা বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে গেল স্রেফ ইংরেজদের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে। কিন্তু রয়ে গেল দেশের স্বাধীনতা সহ বঙ্গভঙ্গ রদ করানোর জন্য সেযুগের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা- হিন্দু-মুসলিম ঐক্য। এই রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তাই রামকৃষ্ণ – বিবেকানন্দের মৃত্যুর পরেও ‘যত মত তত পথ’ নামের দর্শনটাকে বাঙালির মধ্যে টিঁকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। অর্থাৎ ‘যত মত তত পথ’ নামের সর্বধর্মসমম্বয়বাদী বিশ্বমানবিক দর্শনের জনক হিসাবে রামকৃষ্ণ এক্ষেত্রে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ব্রাহ্ম দর্শনের ঢাল হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র। কিন্তু আড়ালে ওই ব্রাহ্ম ভাবধারাটিরই প্রসার ঘটেছে ‘যত মত তত পথ’ নাম নিয়ে।

উপসংহারে একটি উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার ভাবে বিষয়টি বোঝানো যায়-

তাপবিজ্ঞানে একটা বিষয় খুব পরিচিত- “লীন তাপ” (Latent Heat)। লীন তাপ বলতে বোঝায় লুকিয়ে থাকা এক তাপশক্তি। যেমন বরফ গলনের লীন তাপ ৮০ ক্যালরি/গ্রাম বলতে বোঝায়, শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১ গ্রাম ওজনের বরফকে গলিয়ে শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রার ১ গ্রাম ওজনের জলে পরিণত করতে ৮০ ক্যালোরি তাপ লাগবে। অর্থাৎ আমরা সাধারণত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তাপমাত্রা বুঝি ডিগ্রি এককে। এই ডিগ্রি একক ছাড়াও আরো একটা সূক্ষ্ম তাপশক্তি বিদ্যমান রয়েছে, যেটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য না হলেও শক্তির বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেটি ক্যালোরি এককে চিহ্নিত রয়েছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বোঝা গেল লুক্কায়িত তাপশক্তির প্রয়োগে শূন্য ডিগ্রিতেই বরফ গলে জলে পরিণত হলেও জলের তাপমাত্রাও শূন্য ডিগ্রি বজায় রাখা সম্ভব। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতে আমরা পদার্থের অবস্থা পরিবর্তিত (কঠিন থেকে তরল) হয়ে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু এই অবস্থা পরিবর্তনের কারণটাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো কিছুতে বুঝতেই পারা যাচ্ছে না। এখানেই লুকিয়ে থাকা একটা শক্তি অর্থাৎ তাপশক্তি তথা লীন তাপের গুরুত্ব।

একই ভাবে দর্শনের ক্ষেত্রেও কিছু একক দর্শন লুক্কায়িত ভাবে থেকে প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। অথচ বাহ্যিক ভাবে সেই দর্শনকে প্রত্যক্ষ করা যায় না। সেই জিনিসটাই উপলব্ধ হয় ‘যত মত তত পথ’ দর্শনের মধ্যে এক বিশ্বমানবিক তথা সর্বধর্মসমম্বয়বাদী ভাবধারার প্রতিফলন হিসাবে ইসলামের নিরব উপস্থিত। ইসলামের দর্শন এক্ষেত্রে নীরব কেননা এক্ষেত্রে লীন ভাবে অনুঘটকের কাজটি করেছে এই ইসলামেরই একেশ্বরবাদী নিরাকার দর্শনের বেদান্ত রূপ- ব্রাহ্ম দর্শন।

আশা করি বোঝাতে পারলাম বাঙালির বিশ্বমানব হবার পিছনে “যত মত তত পথ” নামের দর্শনটা কিভাবে কাজ করেছে। বাঙালির এই বিশ্বমানবতাই তাকে শিকড়বিচ্ছিন্ন করে আত্মবিস্মৃত করেছে।

 ★ ★ ★ ★ ★

মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা ১৪৩২

মার্গশীর্ষ অমাবস্যা, ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২, ২০শে নভেম্বর ২০২৫

মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা ২০২৫

মার্গশীর্ষ অমাবস্যা, ৩রা অগ্রহায়ণ, ২০শে নভেম্বর ২০২৫

সম্পাদক ডঃ তমাল দাশগুপ্ত

সূচী

 ★রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আন্দোলনের সমালোচনা

প্রতিস্পর্ধাঃ রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ গুরুভজাই আবহের বিনির্মাণ ও গড্ডলিকা প্রবাহের বিপরীততরঙ্গ – একটি অনুক্রমণিকা

ডঃ তমাল দাশগুপ্ত

 ★রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আন্দোলনের সমালোচনা

যত মত তত পথঃ ব্রাহ্মধর্মের বিশ্বমানবতা ধার করেছেন রামকৃষ্ণ

সুমন কুমার ঘোষ

 ★রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আন্দোলনের সমালোচনা

ত্র্যহস্পর্শে বাঙালি

জয়ন্ত মুখার্জি

 ★বাঙালির ইতিহাস

পুণ্ড্রের মাতৃকথা

ডাঃ রক্তিম মুখার্জী

 ★লোকসংস্কৃতি

গৌড় অঞ্চলে বাঙালির নবান্ন

নিবেদিতা মুখার্জী

 ★লোকসংস্কৃতি

কার্ত্তিক মাসের কিছু বিশেষ রীতি

পীযূষ কান্তি মুখার্জী

 ★আন্তর্জাতিক রাজনীতি

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবথেকে বিপজ্জনক প্রতিবেশী হতে চলেছে বাংলাদেশ?

উত্তম দেব

 ★ভ্রমণকাহিনী

বাঙালির লাদাখ ভ্রমণ

অরুন্ধতী রায়

 ★গল্প

দেশ নেই দ্বেষ আছে

ডঃ ঋতুপর্ণা কোলে

চন্দ্রকেতুগড় থেকে প্রাপ্ত তথাকথিত পঞ্চচূড়া যক্ষী: পাঁচ সমস্যা – তমাল দাশগুপ্ত

এই যে অত্যন্ত জনপ্রিয় কিন্তু পরবর্তীতে সম্পূর্ণ বিস্মৃত এক মহামাতৃকার ফলক দেখি দক্ষিণে চন্দ্রকেতুগড় থেকে উত্তরে বাণগড়, মধ্যবঙ্গে মঙ্গলকোট, দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিমে তাম্রলিপ্ত থেকে পূর্বে তিলপি। ইনি কি পঞ্চচূড়া যক্ষী? হ্যাঁ, একজন ইতিহাসবিদ এরকম একটা ছাপ দিয়ে দেওয়ার পর বাদবাকি প্রত্নবিদ ইতিহাসবিদ মহলে এরকম একটা blanket categorization ঘটেছে, এবং সেটার conformist, uncritical acceptance ঘটেছে।

আসুন, এই তথাকথিত পঞ্চচূড়া যক্ষী তত্ত্বের পাঁচ সমস্যা দেখি আজকে।

এক, পঞ্চচূড়া যক্ষী অনেকটা নজরুলের লেখা রবীন্দ্রসঙ্গীত পর্যায়ের কাঁঠালের আমসত্ত্ব। আমসত্ত্ব আমেরই হয়, কাঁঠালের হয় না। হিন্দু পুরাণের পঞ্চচূড়া কোনও যক্ষী নন। পঞ্চচূড়া একজন অপ্সরা, পৌরাণিক মতে তিনি সমুদ্র মন্থনের ফলে উঠে এসেছিলেন। অতএব পঞ্চচূড়া যক্ষী বলে কিছু হয় না। পঞ্চচূড়া অপ্সরা। আসলে যা হয়েছে ইতিহাসবিদ মহলে পঞ্চচূড়া নামটা বেশ চালিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য কিছু মহল থেকে এই গঙ্গারিডাই যুগের মাতৃমূর্তিকে যক্ষী বলার প্রচলন ঘটে, অতএব বেড়ালের তালব্য শ আর রুমালের মা একত্রিত করে এই পঞ্চচূড়া যক্ষী এসেছেন। ইনি হাসজারু। এর কোনও পৌরাণিক ভিত্তি নেই, কারণ পুরাণে কোনও পঞ্চচূড়া যক্ষী নেই। পঞ্চচূড়া অপ্সরা আছে। যক্ষী আর অপ্সরা এক নয়। যারা যক্ষী আর অপ্সরার ফারাক জানে না, তারাই আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক ডিসকোর্স নিয়ে বোলচাল দেয়, অবস্থা এতটা খারাপ হওয়ার পেছনে আধুনিক যুগের বাঙালির চূড়ান্ত অজ্ঞতা, শেকড়বিচ্ছিন্নতা আছে।

দুই, এই পঞ্চচূড়া অপ্সরার সঙ্গে চন্দ্রকেতুগড় মহামাতৃকার সংযোগ একেবারে random এবং whimsical, কারণ আমার জানা মতে এমন একটিও প্রত্নফলক পাওয়া যায়নি যেখানে ইনি পঞ্চচূড়ার মত সমুদ্র মন্থনের ফলে উঠে আসছেন, অথবা অপ্সরা হয়ে বৈদিক ও পৌরাণিক আর্যদের দেবরাজসভায় নৃত্য করছেন। মাথার পেছনে চূড়া থাকলেই পঞ্চচূড়া? পাঁচটা চূড়াও তো নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তো দশটি hairpin বা চুলের কাঁটা যা আসলে অতি ক্ষুদ্র আয়ুধ। কিন্তু মূর্তিতত্ত্বের আলোচনা এভাবে হয় নাকি? পুরাণের পঞ্চচূড়া অপ্সরার সঙ্গে এই মহামাতৃকার কোন্ মিল খুঁজে পেয়ে তবে এই identification নির্ধারণ করা হল? আদৌ কোনও মিল আছে নাকি? ইনি কোন্ দৃষ্টিকোণ থেকে অপ্সরা? কোথায় কোন্ প্রত্নফলকে দেখি যে ইনি সমুদ্র মন্থনে উঠে এসেছেন?

তিন, যক্ষী উপাসনা যাকে বলে, তার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যর সঙ্গে সত্যিই চন্দ্রকেতুগড় মাতৃধর্মী সভ্যতার কিছু যোগ আছে, কিন্তু সে সংযোগ এমনকি এখনকার দুর্গাপুজোর মধ্যেও বহমান, সে নিয়ে অন্যত্র আলোচনা করেছি। কিন্তু একে তো পঞ্চচূড়া যক্ষী বলে কিছু হয় না, তার উপরে এই যক্ষী, প্রমাণ করা যায়, একরকম othering, আমাদের বিভিন্ন দেশজ ধর্মকে দেয়া বৈদিক পৌরাণিক গোবলয় tag হল এই যক্ষ উপাসনা। আমাদের পূর্বসূরীরা ঠিক এই নামে সম্ভবত নিজেদের সর্বোচ্চ উপাস্যকে আখ্যায়িত করতেন না। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই। মুসলমানরা আমাদের ধর্মকে পুতুলপুজোর ধর্ম বলেন, আমাদের কাফের বলেন। এই নামে আমরা নিজেরা আমাদের ধর্মকে অথবা আমাদের ধর্মের অনুসারীদের সম্প্রদায়কে আখ্যায়িত করি না। মুসলমানের কাছে আমি কাফের, কিন্তু আমি নিজেকে শাক্ত বলি, কাফের বলি না। গোবলয়ের কাছে হয়ত বাংলা বলি বলেই আমি বাংলাদেশি, কিন্তু আমি নিজেকে বাঙালিই বলি।

চার, চন্দ্রকেতুগড় থেকে পাওয়া মূর্তির সমস্ত ঐশ্বর্যলক্ষণ, এবং বিদেশের বিভিন্ন মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞ কর্তৃক এই মাতৃমূর্তিগুলিকে মাদার গডেস আখ্যা দেওয়া – এই পঞ্চচূড়া যক্ষী তত্ত্বের চূড়ান্ত কূপমণ্ডুকতা উন্মোচন করে। যারা পঞ্চচূড়া বলেন, তারা আসলে পশ্চিমবঙ্গের কলেজ ইউনিভার্সিটিতে বসে প্রাচীন ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্বের ক্লাসে বসে এদের প্রফেসরদের দেওয়া নোট মুখস্থ করেছেন মাত্র। না ভারতীয় ধর্ম, পুরাণ, myth, scripture, iconography সম্পর্কে কোনও পড়াশোনা আছে এদের, না এরা বিদেশের গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের কাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। পরীক্ষায় যেটা টুকে পাশ করেছেন, সেটাই ধ্রুব। কুয়োর ব্যাঙের কাছে যেমন সবার ওপরে পাতকুয়ো সত্য, তাহার উপরে নাই।

পাঁচ, হরপ্পা সভ্যতা হোক, পরবর্তী যুগে second wave of urbanization এর মগধ হোক, সেখান থেকে চন্দ্রকেতুগড় সভ্যতার বিভিন্ন ফলকে এই যে female figurine দেখা যায়, তাঁর মণ্ডল বিন্যাস সম্পর্কে, এবং যে কোনও ধর্মচর্চার মূর্তিতত্ত্ব সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান থাকলেই বুঝতে পারতেন, এই মাথার পেছনে চূড়া, এটা ভারতীয় মাতৃকাধর্মে একটা আবহমান motif, এইরকম একাধিক beam বা crest মাথার পেছনে আছে, এরকম মাতৃমূর্তি হরপ্পা সভ্যতায় দেখা যায়, মগধেও দেখা গেছে। এটাই পরে অনেকগুলো হাত হয়ে আজকের দশভুজা হয়েছে। একটু পড়াশোনা করে ভারতে কিভাবে মাতৃমূর্তির আবহমান motif থেকে আজকের মাতৃধর্মী বিবর্তন ঘটেছে, সেটা জানা থাকলে এভাবে অন্ধের হাতি দেখার মত করে হাতড়ে হাতড়ে কোথাকার কোন্ পুরাণে গিয়ে পঞ্চচূড়া নামটা এভাবে random তুলে আনার দরকার হত না।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মূল পোস্ট তেইশে আগস্ট দুহাজার পঁচিশ: বাঙালির ইতিহাস গ্রূপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/share/p/1Evw15hswX/

রাঢ় অধিষ্ঠাত্রী দেবী চণ্ডী ও হাওড়ার বণিক সমাজ

সায়ন দাস মুখার্জি

মাৎস্যন্যায় পুজোসংখ্যা ১৪৩১

“হাওড়া” হল পূর্ব ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় ও শিল্পনগরী জেলা হিসেবে পরিচিত। এছাড়া হাওড়া জেলাটি পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে ছোটতম জেলা। তবে হাওড়া জেলাটি ছোট হলেও এই জেলার ইতিহাস মোটেও ছোট নয়। হাওড়া নামের শব্দের উৎপত্তি নিয়েও ঐতিহাসিক মহলে বেশ মতবিরোধ রয়েছে। বিভিন্ন মতামতের মধ্যে দুটি মতামত ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। বর্তমান হাওড়া শহরের অদূরে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মালিপাচঘরা অঞ্চলে “হাড়িড়া” নামে একটি গ্রামের অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়। “হাওড়া” নামটি এই “হাড়িড়া” নামেরই অপভ্রংশ। অন্য মতটি হল,  “হাওড়া” নামটির উৎপত্তি দ্রাবিড় শব্দ “হাবড়” থেকে এসেছে। যার অর্থ ” পাঁক ও কাদা যুক্ত অঞ্চল। আবার কেউ কেউ মনে করেন, “হাওড়া” শব্দটির অর্থ “যে নিচু বা অবনত অঞ্চলে বর্ষার জল সঞ্চিত হয়”। হাওড়ার ভূমিরূপ এই জাতীয় ছিল বলে অঞ্চলটির এইরূপ নামকরণ হয়। ১৯০৮ সালের জরিপ অনুযায়ী দেখা যায় যে, ৮ বর্গ মাইল এলাকা জুড়ে হাওড়া শহরের ১৮০ এর বেশি ডোবা ছিল। ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেনের মতে, “হাওড়া” শব্দটি একটি ধ্বন্যাত্মক শব্দ থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে; এর অর্থ “কেবল জল-কাদাময় যুক্ত অঞ্চল”। পরবর্তীতে অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদিত ১৯৭২ সালের “বেঙ্গল ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ার” গ্রন্থে “হারিয়া” থেকে ‘হাড়িয়াড়া’ এবং রেলস্টেশন স্থাপনের পর ব্রিটিশ কোম্পানি”Howrah” নামকরণ করেন। তবে বর্তমানে হাওড়া শব্দের ইংরেজি বানান Howrah থেকে পরিবর্তিত হয়ে ” Haora” হয়েছে। তবে সর্বত্র এই বানান এখনো লেখা হয় না।

১৯৩৮ সালের ১লা জানুয়ারি হাওড়া” হুগলি জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পূর্বে হাওড়া জেলা কখনো হুগলি জেলায়, কখনো বর্ধমানের একটি অংশ হিসেবে পরিগণিত হতে। তবে হাওড়া জেলার ভূখণ্ড বহু প্রাচীন। এই ভূখণ্ডের প্রাচীনত্ব কম করে হলেও আঠেরো শত বৎসর পূর্বের। তবে বর্তমানে এই শহরের দৃশ্য বহু বদল হয়েছে। এই জেলার নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। পন্ডিত শ্রীধরাচার্য তাঁর ন্যায়কন্দলী গ্রন্থে ৯৯১CE – ৯৯২ CE তে “ভূরিশ্রেষ্ঠ” গ্রাম সম্পর্কে লিখেছেন। বাকপতিরাজ তাঁর শিলালিপিতেও এই গ্রামের উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিকের দৃঢ়ভাবে একমত হয়েছেন যে; এই ভূরিশ্রেষ্ঠ গ্রাম আজকের হাওড়া জেলার “ভূরশুট” অঞ্চল।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায় তাঁর রচিত গ্রন্থ “বাঙ্গালীর ইতিহাস” এ সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন;- “বর্ধমান জেলার দক্ষিণাংশ, হুগলি জেলার কিয়দংশ এবং হাওড়া জেলার সমগ্র ভূভাগ মিলে প্রাচীন “সূক্ষ্ম ভূমি” গড়ে উঠেছিল। যা পরে দক্ষিণ রাঢ় অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জৈনগ্রন্থ “আচারাঙ্গ সূত্রে” আমরা জানতে পারি যে; মহাবীর ষষ্ঠ শতাব্দীতে জৈন ধর্ম প্রচারের জন্য এই স্থানে পরিদর্শনের জন্য এসেছিলেন।

এই প্রাচীন অঞ্চল পাল রাজাদের এবং তারপরে সেন বংশের অধীনস্থ ছিল তা লক্ষ্মণ সেনের শিলালিপি থেকে থেকে জানা যায়। এই শিলালিপি তে আমরা যে “বেতড্ড চতুরষ্ক” নামক গ্রামের উল্লেখ পেয়েছি। তা সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবেন্দু মান্না, তাঁরাপদ সাঁতরা সহ বিভিন্ন গবেষকেরা শনাক্ত করেছেন যে; আজকের হাওড়া শহরের “বেতড়” অঞ্চলটি ছাড়া আর কোনো কিছু হতেই পারে না। ইতিহাসবিদ কল্যাণ কুমার গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর রচিত গ্রন্থ ” Howrah in Perspective Tradition and Culture” এ বেতড় অঞ্চলটির সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করেছেন।

কবিকঙ্কন তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে হাওড়ার বেশ কয়েকটি স্থানের কথা উল্লেখ রয়েছে। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকেই হাওড়া ‘আঞ্চলিক ইতিহাসের’ পরিপ্রেক্ষিতে তার নিজস্ব স্বকীয় পরিচয় পেয়েছিল। আদিকাল থেকেই এই স্থানটি বিভিন্ন দেবদেবীর পূজার জন্য জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বৈদিক এবং অ-বৈদিক উভয় স্থানীয় দেবতা যাদের একটি দীর্ঘকাল ধরে সমৃদ্ধ লোক ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষত অবৈদিক দেবদেবীর বিশদ উপাসনা-কেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠান বেশি হয়ে থাকে। যেমন ডাউকা বুড়ি, পঞ্চানন দেব, ধর্মরাজ, দক্ষিণ রায়, বসন্ত রায়, কালুরায়, মাকাল ঠাকুর, শিব, চন্ডী, মনসা, শীতলা, রক্তাবতী, জ্বরাসুর, পির, ওলাবিবি, বনবিবি, বনদূর্গা, খালকুমারী, কাত্যায়নী, বাংলা ঠাকুর প্রভৃতি।

তবে দেবী চণ্ডী হাওড়া তথা গোটা রাঢ়ী ভূমির এক জনপ্রিয় দেবী‌। এই প্রসঙ্গে হাওড়া জেলার বেশ কয়েকটি চন্ডী স্থানের দৃষ্টি আকর্ষণ করব। এই গবেষণাপত্রটি লিখে অকথিত ইতিহাস অনুসন্ধান করার এবং দেবী চণ্ডীর স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী লোককাহিনীকে অন্বেষণ করার একটি প্রচেষ্টা করা হয়েছে।

প্রাচীনকালে ভারতীয় উপমহাদেশের ভূখন্ডে নারী উপাসনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে প্রাক সিন্ধু -সরস্বতী বা হরপ্পা সভ্যতার প্রাক পর্ব থেকে। প্রাচীন মেহেরগড় সভ্যতায় প্রাপ্ত নারীমূর্তি যার প্রমাণ বহন করে। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় নারীকে শক্তিরূপে পুজো করা হয়। এই শক্তিরূপিনী দেবী প্রকৃত শক্তির আধার। এই নারীশক্তি কখনো দূর্গা, কখনো বা কালী, কখনো বা চন্ডী রূপে পুজিত হয়ে আসছে। “চন্ডী” বা “চন্ডীকা” দেবীর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় মার্কন্ডেয় পুরাণের ৮১ তম থেকে ৯৩ তম অধ্যায় পর্যন্ত এই তেরোখানা অধ্যায়কে “দেবী মাহাত্ম্যম” বা “শ্রী শ্রী চন্ডী” অধ্যায় বলা হয়। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুসারে, চন্ডী ব্রক্ষ্মশক্তি। অর্থাৎ আদি শক্তি। যার থেকে শুরু তার কাছেই সব শেষ। জ্ঞান, ইচ্ছা ও ক্রিয়া এই তিন শক্তির সমষ্টিগত রূপ হল “দেবী চন্ডী”।

রাঢ় বঙ্গে দেবী চণ্ডী স্থানীয় ওঁরাও উপজাতিদের দ্বারা উপাসনা হত। এই উপজাতিরা সমস্ত প্রাকৃতিক শক্তির বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে তাদের সুরক্ষার জন্য দেবীকে অদৃশ্য পরম শক্তি হিসাবে পূজা করত। তারা কোন নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করেনি; তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দেবীকে নিবেদন করেছিল। স্থানীয় উপজাতিরা বিশ্বাস করত যে এই প্রথা তাদের মন ও দেহকে শুদ্ধ করার জন্য দেবীর উপাসনা করা প্রয়োজন।

 অধ্যাপক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে এই সমস্ত উপাসনা কেন্দ্রিক লোক আচারের বিকাশ ঘটেছে। অনার্য গোষ্ঠীর দ্বারা পরবর্তী সময়ে যখন আর্য এবং অনার্য বৈশিষ্ট্যের সংশ্লেষণ প্রক্রিয়াটি পুরোদমে ছিল এবং তাদের উপাসনার জন্য নির্ধারিত আচার-অনুষ্ঠানগুলিকে আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্মে একত্রিত করা হয়েছিল। এই আত্তীকরণ প্রক্রিয়ার জন্য, অনেক স্থানীয় দেব-দেবী ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মূলধারায় তাদের যথাযথ আইকনিক রূপ এবং পরিচয় পেয়েছিলেন।

বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে মাতৃকা উপাসনা অবয়ব হীন। মাতৃকা উপাসনা কখনো শিলা খন্ডে, কখনো হৃৎপিন্ডে, কখনো বা এক বা একাধিক গাছের তলায় হয়ে আসছে। প্রথমে দেবী চন্ডী ওঁরাও সম্প্রদায়ের মধ্যে আরাধ্যা দেবী হয়ে থাকলেও মধ্যযুগে বিশেষত প্রচলিত ১৩০০ অব্দ থেকে এই দেবীর প্রভাব স্ত্রী সমাজ ও বণিক সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

মধ্যযুগীয় বাংলা কাব্য ধারায় মঙ্গলকাব্য অন্যতম জনপ্রিয় কাব্য। এই কাব্যের অন্যতম লেখকেরা হলেন মাণিক দত্ত, দ্বিজ মাধব, কবিকঙ্কন,  মুকুন্দ চক্রবর্তী প্রমুখ জনেরা। এই মঙ্গলকাব্য গুলির মধ্যে কালকেতু ও ফুল্লরা এবং ধনপতি ও শ্রীমন্ত সওদাগরের কাহিনী বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। কাহিনীটি সংক্ষেপে উল্লেখ করলে যা দাঁড়ায় তা হল এরূপ;

বণিকখণ্ডের সূচনায় শিবভক্ত ধনপতি সওদাগর উজানী নগরের বণিক ছিলেন। বণিক ধনপতি দেবী পূজায় অস্বীকার করেন। ইন্দ্রের সভার নর্তকী রত্নমালা শাপগ্রস্ত হয়ে ধনপতির প্রথম পত্নী লহনার খুড়তুত বোন খুল্লনারূপে জন্ম নেন। ধনপতি খুল্লনার সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিবাহের অচিরেই বিদেশযাত্রায় রওনা হলে, প্রথম পত্নী লহনা তার দাসী দুবলার কুপরামর্শে খুল্লনাকে প্রতিদিন ছাগল চড়াতে যেতে বাধ্য করেন। খুল্লনার অষ্টমঙ্গলার পূজায় দেবী সন্তুষ্ট হয়ে তাকে সমস্ত বিপত্তি থেকে রক্ষা করেন। ধনপতি পুনরায় সিংহলের উদ্দেশে বাণিজ্যযাত্রায় রওনা হন। দেবী ধনপতিকে লাঞ্ছনার মনসায় সিংহলের অনতিদূরে কালিদহে তাকে হস্তীনিধনরত কমলেকামিনী রূপদর্শন করান। কিন্তু দেবীর মায়ায় অন্য কোন নাবিক এই দৃশ্য দেখতে পায় না। সিংহলের রাজার কাছে ধনপতি কমলেকামিনীর বর্ণনা করলে, রাজা বিশ্বাস করেন না। ধনপতি রাজাকে কমলেকামিনী দর্শন করাতে ব্যর্থ হয়ে কারারুদ্ধ হন। পিতার সন্ধানে পুত্র শ্রীপতি সিংহলের উদ্দেশে যাত্রা করেন। দেবীর মায়ায় তিনিও কমলেকামিনী রূপদর্শন করেন এবং সিংহলের রাজার কাছে বর্ণনা করে একই রকম বিপদে পড়েন। রাজা তাকে প্রাণদন্ড দেন। কিন্তু মশানে দেবীর সৈন্যের কাছে পরাস্ত হয়ে রাজা স্ত্রীপতিকে মুক্তি দিয়ে কন্যা সুশীলার সঙ্গে তার বিবাহ দেন। পুত্র স্ত্রীপতির প্রয়াসে সিংহলের কারাগার থেকে উদ্ধার পেয়ে ধনপতিও দেবীর মহিমা স্বীকার করতে বাধ্য হন।

বণিক খন্ডের এই কাহিনীর পর থেকে বণিক সমাজের বঙ্গে দেবী চন্ডীর উপাসনা আরম্ভ হয়ে থাকে। তারপর থেকে বণিকেরা বাণিজ্যের যাত্রার পূর্বে দেবীর আরাধনা করে থাকে।

হাওড়ায় একদা সময়ে বহু নদনদীর কথা জানতে পারা যায়। আজকের ভাগীরথী বা গঙ্গা, দামোদর ও রূপনারায়ণ নদী ছাড়াও সরস্বতী, কৌশিকী নদীর মত বহু বেগবতী ও খরস্রোতা শাখা নদীও ছিল। যা আজকের কালের গর্ভে প্রায় অবলুপ্ত। আর তৎকালীন সময়ে এই নদীগুলিই ছিল প্রধান বাণিজ্যিক পথ। আর এই কারণে এইসব নদীর তীরে গড়ে উঠেছে দেবী চন্ডীর উপাসনাস্থল। সবার আগে আমতার মেলাইচণ্ডীর প্রসঙ্গে আলোচনা করব।

আমতার মেলাই চন্ডী সম্মৃদ্ধিলাভের আশায় পূজিতা হন। আমতার মেলাই চন্ডী ৫১ সতী পিঠের অন্যতম। কথিত রয়েছে যে সতীর মালাই চাকি থেকেই সৃষ্টি হয় মা মেলাই চন্ডীর। মায়ের দেহাংশ অসমের জয়ন্তী খাসিয়া পাহাড় থেকে নদীপথে চলে আসে দামোদরের তীরে। আর সেই তীরের নাম আমতা। সাধক জটাধারী চক্রবর্তী মায়ের স্বপ্নাদেশ পায়। স্বপ্নাদেশে সাধক দেখেন মায়ের দেহাংশ পরে রয়েছে নদীর তীরে। তাকে তুলে এনে স্থাপন করতে হবে। এমন আদেশ পেয়ে তিনি আর থেমে থাকেননি। নদীপথে তিনি আমতার দামোদরের পশ্চিম পাড়ে চলে যান। সেই নদী পেরিয়ে গিয়ে তিনি দেখেন যে একটি পাথরের খন্ড পড়ে রয়েছে। তারপর সাধক মায়ের দেহাংশ নিজের পূজার স্থানে নিয়ে আসেন। তারপর থেকে মায়ের দেহাংশ প্রস্তর খন্ডটি মায়ের বিগ্রহ রূপে আজও বিরাজ করছে এই মেলাইচন্ডীর গর্ভগৃহে। এই প্রসঙ্গে এখানে একটি চমকপ্রদ তথ্য আছে। পুরীর জগন্নাথ দেবের মূর্তি নির্মাণের সাথে যার অনেকাংশে মিল আছে। চণ্ডী ভক্ত জটাধারী মূর্তি নির্মাণের আগে ঘোষণা করলেন, “যতদিন না মূর্তি তৈরি শেষ হচ্ছে ততদিন মন্দিরের জানলা দরজা বন্ধ থাকবে, মন্দির অভ্যন্তরে আমি ব্যতীত অন্য কেউ থাকতে পারবে না। নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দরজা খোলা হবে না, খুললে কাজ অসমাপ্ত থাকবে”।

শুভ দিনক্ষন দেখে সাধক কাজ শুরু করলেন। ৪-৫ দিন অতিক্রান্ত হয়েছে দেখে  স্থানীয় ব্রাহ্মণদের কৌতুহল দিনের দিন বাড়ছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, মূর্তি আদৌ নির্মাণ হচ্ছে তো? কেমনই বা হচ্ছে দেবীর রূপ। নানান ভাবে দোচালা মন নাড়া দেয় তাদের মধ্যে। এমন নানা প্রশ্ন মনে চেপে রাখতে না পেরে একদিন তাঁরা খুলে ফেললেন মন্দিরের দরজা। স্তব্ধ হল নির্মাণ। ভিতরে বিষন্ন মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন জটাধারী। এতদিনে তিনি শুধু দেবীর মুখাবয়ব পর্যন্ত নির্মাণ করেছেন। মাঝপথে বাধা আসায় দেবীর হাত পা অন্যান্য অংশ বাকি রয়ে গেল। সেই থেকে এখনো দেবীর অসমাপ্ত মূর্তিই পূজিত হয়। ভারাক্রান্ত মনে বেরিয়ে এলেন জটাধারী মহাশয়। কিছুদিন অতিক্রান্ত হবার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, অসমাপ্ত মূর্তিকেই প্রতিষ্ঠা করবেন। পাঁজি পুঁথি দেখে বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিটি নির্বাচন করলেন। মন্দির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে বহু ভক্ত সমাগম ঘটল। মন্দির চত্ত্বরে মেলাও বসে গেল। সেই মেলা আজও বসে। আয়োজন হয় বিশেষ পূজার। ভক্তির টানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। একাধিক চাহিদাকে পূর্ণ করার জন্য অগণিত মানুষ ভিড় করেন মেলায়। মায়ের মালাইচাকি এখানে স্থাপন থাকায় সেখান থেকেই মায়ের নাম মেলাই চন্ডী হয়েছে।

বর্তমানে দেবীর মন্দিরটি অতি নয়নমনোহর। মন্দিরের কারুকাজ ও স্থাপত্য অতি সুচারু। প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রাচীনতার ছাপ দেখা যায়। হাওড়া জেলার গেজেটিয়ার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ১০৫৬ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ইংরাজির ১৬৪৬ এ এই মন্দির নির্মিত হয়েছে। মূল মন্দিরটির চারদিক বেশ উঁচু এবং মেঝে শ্বেত পাথর নির্মিত। সিঁড়ি ভেঙে ওঠার ব্যবস্থা আছে। কিছুদিন আগেই সিঁড়ির দু দিকে বসানো হয়েছে স্টিলের সুদৃশ্য রেলিং। মন্দিরটি প্রাচীর বেষ্টিত। মন্দিরের নহবতখানা ও সিংহদ্বার এখানকার ঐতিহ্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সিংহদ্বার ছাড়াও ৪ টি দরজা রয়েছে। রয়েছে একটি কারুকার্য করা স্থায়ী মঞ্চ। সিংহদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে বেশ বড়সড় একটি আটচালা। বর্তমানে এটি শ্বেতপাথর দিয়ে বাঁধানো। পাশেই ধর্মশালা এবং একটি বাঁধানো কূপ। এই কূপের জল অতি পবিত্র বলে মনে করা হয়। দেবীর প্রাত্যহিক স্নান, অঙ্গরাগ ও ভোগ এই কূপের জলেই হয়। কূপের পাশেই দূর্গেশ্বর শিবের একটি ছোটো মন্দির আছে।

বর্তমানে আটচালা মন্দিরটি কলকাতার হাটখোলার কৃষ্ণ চন্দ্র দত্ত নির্মাণ করেছিলেন। ওনার সেখানে একটি লবণের গোলা ছিল। যদিও এই মন্দির ভবনের উপরের ফলকটি সময়ের সাথে অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তবে এটি 1949-50 খ্রিস্টাব্দে কর্মকার নামক স্থানীয় ছুতারের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। মেলাই চণ্ডীর মূর্তিটি খুব সম্ভবত পাল যুগের (খ্রিস্টীয় 8ম – 10ম শতক) এর গোড়ার সময়ানুকালে। এই মন্দিরের সাথে একটি ভৈরবের মন্দির রয়েছে। যা দূর্গেশ্বর শিব মন্দির নামে পরিচিত। প্রতি বছর এপ্রিল-মে মাসে বৈশাখী পূর্ণিমায় জাঁকজমক ভাবে উৎসব পালিত হয়। এছাড়াও, দুর্গাপূজা এবং মাঘী পূর্ণিমা (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) সপ্তমী দোল উৎসবের সাথে আনন্দের সহিত পালিত হয়ে থাকে।

মেলাইচণ্ডীর মন্দির শুধুমাত্র দেবী চণ্ডীর ই অবস্থান নয়, কাল ভৈরব, শীতলা, কালী, ষষ্ঠী, তুলসী, মনসা সহ একাধিক দেব-দেবীর দর্শনের ব্যবস্থা আছে এখানে। তবে দেবী চণ্ডী ব্যতীত সকলকেই ঘটে পূজা করা হয়।শারদীয়া দুর্গাপূজার সময় এখানকার প্রধান উৎসব। অত্যন্ত নিষ্ঠা নিয়ে ৪ দিন ধরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও চলে। দেবী চণ্ডীর মনোরঞ্জনের জন্য আয়োজন করা হয় রামযাত্রার।বিজয়া দশমীর দিন আতশবাজির প্রদর্শনীর পর হয় শান্তিজল বিতরণ। এছাড়াও চৈত্র সংক্রান্তিতে ঝাঁপ চড়কের আয়োজন হয়। বুদ্ধ পূর্ণিমায় বিশেষ পুজো উপলক্ষে বসে মেলা। আগে এই দিন লাঠিখেলার আয়োজন হত।

এছাড়াও নবনির্মিত রামকৃষ্ণদেবের মন্দির রয়েছে। যা শ্বেত মর্মর মূর্তিটি অতি মনোহর । ১লা জানুয়ারি এখানে বেলুড় মঠের অনুকরণে কল্পতরু উৎসবের আয়োজন করা হয় , পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে। মন্দিরের প্রবেশপথে পথের ধারেই রয়েছে চণ্ডীর নামাঙ্কিত পুকুর। ভক্তরা এখানে স্নান করে মন্দিরে পূজা দেন। পুকুরঘাটটি শ্বেত পাথর দিয়ে বাঁধানো। এছাড়া আমার আরেকে উল্লেখযোগ্য স্থান হল, হাওড়ার গড়চণ্ডী। অর্থাৎ আমতা রসপুরের গড়চণ্ডী আর ঝিকিরা গ্রামের গড়চণ্ডী মাতা। বাংলার দারু বিগ্রহের অন্যতম সেরা নিদর্শন এই ঝিকিরা গ্রামের গড়চণ্ডী। হাওড়ার আমতার কাছে অবস্থিত এই ঝিকিরা গ্রাম। ১৭৯৫ সালে তৈরি এই পঞ্চরত্ন চন্ডী মন্দিরটির নির্মাতা শ্রী রামপ্রসাদ মিস্ত্রি। রায় পরিবারের দুর্বারচন্দ্র রায় তাঁর একমাত্র কন্যা পদ্মাবতীর আবদারে গড়চন্ডী দেবীর অধিষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন বলে শোনা যায়। দেবী গড়চণ্ডী এখানে দ্বিভুজা, গাঢ় পীতবর্ণা, ত্রি নয়না। দেবী এখানে সোনার গহনায় পরিহিত। দেবীর বাম হাত অভয় মুদ্রায় আর দক্ষিণ হাত বরদা মুদ্রায়। দেবীর মুকুটটি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

হাওড়ার আরেকটি বিখ্যাত জায়গা যেখানে মা চন্ডী “মাকরচন্ডী” রূপে পুজিত হয়ে আসছে। প্রায় ৬০০ বছরেরও বেশি পুরানো মাকড়চন্ডী মায়ের মন্দির, যা অবস্থিত হাওড়া জেলার ডোমজুর থানার অন্তর্গত মাকড়দহ গ্রামে। আর মায়ের নামের প্রভাবেই এই অঞ্চলের নাম “মাকড়দহ” হয়েছে। তবে এর পূর্বে এই স্থানের নাম ছিল “রামেশ্বর বাটি”। যা পূর্বে সরস্বতী নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল এই গ্রামটি। মায়ের পুজোর পর থেকে এই স্থানের নাম বদল হয়ে হল “মাতৃপুর”। এরও পরে মাকড়দহ নামকরণ হয়েছে। ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করেন যে বিখ্যাত মার্কন্ডেয় পুরাণ থেকে দেবীর নাম ‘মা মকরচণ্ডী’র উদ্ভব হয়েছে। মা মকরচণ্ডীকে কেন্দ্র করে অনেক জনপ্রিয় লোককাহিনী রয়েছে। এই গ্রামের পাশ দিয়ে শুধু সরস্বতী নদীই বয়ে যায়নি। সমগ্র এই গ্রামটি ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। পথচারী যখন জঙ্গলের মধ্যে সঠিক পথ নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হন, তখন দেবী ছোট মেয়ে (সম্ভবত ৭/৮ বছর বয়সী) হিসাবে পথ দেখান। আর পথিকদের কাছ থেকে এবং গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে থেকে আনন্দনাড়ু খেতে চান। তার পর পথিকেরা গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আর বাচ্ছা মেয়েটিকে দেখতে পেতেন না।

এছাড়াও আরেকটি লোককাহিনী রয়েছে যা হল, হঠাৎ একদিন মন্দিরের পূজারী পূজা করতে করতে মাকে নাকি বলেছিলেন- “মা রে তোর এত উচ্চতা যে আমি তোর সেবাই ভালোভাবে করতে পারিনা, তোর মুখ পর্যন্ত যে আমার হাতটা ভালোভাবে পৌঁছায় নারে মা, তুই একটু নিচু হতে পারিস নে মা!”। এর পরেই মায়ের মূর্তি নাকি পাতালে নেমে যেতে থাকে আর সেই পুরোহিত পূজা ছেড়ে মাকে জড়িয়ে ধরেন। আর আজ সেই কারনেই মায়ের মূর্তি এত ছোট। মায়ের মূর্তি ছোট হওয়ার এই পুরাকথা আজও মাকড়দহ গ্রামবাসী বৃন্দের মুখে শুনতেপাওয়া যায়। এর পর ক্রমেই মন্দিরের এলাকা  জুড়ে বেতের গাছ এবং লতা পাতার জঙ্গল হয়ে যায়।

অবশেষে ১৭৪৩ সালে মাহিয়াড়ীর জমিদার রামকান্ত কুণ্ডু চৌধুরী এই মন্দিরের পুনর্নির্মাণ করেন। শোনা যায় জমিদার প্রথম যেদিন এই মন্দিরে এসেছিলেন উনি ওনার দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেয়েছিলেন। আর সেই থেকে আজও এই মন্দিরে নিয়ম মেনে দুবেলা পূজা করা হয়। তো এই ছিল এই মন্দিরের ইতিহাস। এছাড়া  মন্দিরের পাশেই রয়েছে শিব মন্দির।

‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্য থেকে আমরা জানতে পারি যে বিখ্যাত বণিক শ্রীমন্ত সওদাগর যিনি সরস্বতী নদী দিয়ে বাণিজ্যের জন্য যাতায়াত করার সময় দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী তিনি কয়েকদিনের জন্য মকরদহ গ্রামে থামেন এবং দেবী চণ্ডীর জন্য একটি ছোট মন্দির তৈরি করেছিলেন। শ্রীমন্ত সওদাগর দেবী চণ্ডীর যাবতীয় দায়িত্ব স্থানীয় চৌধুরী পরিবারের উপর অর্পণ করে ছিলেন।

সরস্বতী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই বিখ্যাত আটচালা মন্দির এবং এর একটি আলাদা সুগঠিত নাটমন্দির (আকার-৪০ ফুট×২০ ফুট) রয়েছে। পুরো মন্দির চত্বরটি ইটের প্রাচীর দ্বারা ঘেরা রয়েছে। এছাড়া সেখানে একটি ভোগমন্দির এবং বাম দিকে একটি ভৈরব শিবের মন্দির রয়েছে। এখানে দেবীর প্রস্তর খন্ডটি একটি কালো বেসাল্ট শিলার আবরণ। এখানে বার্ষিক উৎসব, পঞ্চম দোল যা দোল উৎসবের ৫দিন পরে অনুষ্ঠিত হয়। সেই বিশেষ দিনে মহা অন্নকুটের ব্যবস্থা হয়ে থাকে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ দেবীর মহাপ্রসাদ গ্রহণের সুযোগ পায়। এই উপলক্ষে, নিকটতম মাঠে একটি বিশাল মেলা বসানো হয়েছে এবং এটি কমপক্ষে ১৫ দিন ধরে চলতে থাকে। নিয়মিত দেবী চণ্ডীর পূজা করার জন্য একজন পুরোহিত নিয়োগ করা রয়েছে। দেবীকে দুপুরে ভোগ দেওয়া হয়। যার মধ্যে রয়েছে ভাত, ফল, মিষ্টি এবং মাছ থাকে।  রাতে মা মকরচণ্ডীকে দুধ, দই, মিষ্টি নিবেদন করা হয়, দেবীর প্রিয় মিষ্টিগুলি হল ‘আনন্দনাডু’ এবং ‘রসবড়া’। শুধু মকরদহের স্থানীয় লোকজনই মা মকরচণ্ডীর পূজা করে না; অঙ্কুরহাটি, সালাপ এবং ডোমজুরের মতো প্রতিবেশী অঞ্চলের উপাসকরাও খুব জাঁকজমকের সাথে দেবীর পুজো করে থাকেন।

এবার হাওড়া সাঁতরাগাছির জগাছা অঞ্চলের জয়চন্ডী মায়ের কথায়। মাহিয়াড়ীর কুণ্ডুচৌধুরীরা পূর্বে এ অঞ্চলের ছিলেন ভূস্বামী। একসময়ে বর্তমান হুগলি জেলা সহ বাংলাদেশের যশোর জেলা থেকে আগত সদগোপ ঘোষ পদবীদের আগমন ঘটেছিল। জগাছার জিগাছা অঞ্চলে বেশিরভাগ পুরাতন বনেদি অধিবাসীরা ঘোষ পদবী উত্তরাধিকার। মাহিয়াড়ীর কুণ্ডুদের থেকে এই ঘোষেরা কিছু কিছু জমি কিনে জমিদারিত্ব করতেন। জগাছা তখন জঙ্গলাকীর্ণ গ্রাম। সমগ্র জগাছা অঞ্চল ওল বন, লেবু বন, হোগলা বন এবং কচু বনে ভরপুর।

ধীরে ধীরে বন কেটে বসত তৈরি হল। জিগাছার কোম্পানি পুকুর তৎকালীন সময়ে ছিল বিরাট জলাশয়। আর এই জলাশয় ছিল সরস্বতী নদীর বিরাট এক বেগবতী ও ধারা। ধীরে ধীরে সরস্বতী নদী মজতে মজতে হাওড়া ও হুগলি জেলার বহুকাংশে চর পড়ে পাড়ের সৃষ্টি হয়। এবং ধরে ধীরে বনজঙ্গল তারপর বসতি শুরু হয়। সেইসব বস্তিগুলো কেন্দ্র করে সরস্বতী নদীর ধারা বরাবর বহু অঞ্চলে কখনো বটবৃক্ষতলে তো অশ্বত্থ বৃক্ষর তলে আবার কখনো নিমবৃক্ষের তলে পূজিত দেবী চণ্ডী হয়ে উঠলেন গ্রাম্যর কূলদেবী জয়চণ্ডী। কথিত রয়েছে এই অঞ্চলের ঘোষেরাই পার্শ্ববর্তী জলাশয় অধুনা আজকের কোম্পানির পুকুর থেকে জয়চন্ডী শিলা মূর্তি পেয়ে পুজার্চনা শুরু করেছিলেন। তৎকালীন সময় থেকে চক্রবর্তী পরিবার মায়ের নিত্য সেবা করা শুরু করেছেন। বর্তমানে চক্রবর্তী পরিবারের জয়দেব চক্রবর্তী মায়ের সেবা করে চলেছেন (পুরোহিত জয়দেব চক্রবর্তীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য)।

তিনি বলেছেন মায়ের বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছরেরও অধিক। অর্থাৎ স্মরণাতীত কাল। এদিকে ঘোষেরা বলে থাকেন তাঁদের পূর্বপুরুষেরা এই শিলা বিগ্রহ পেয়েছেন। জানি না কতটা সত্যি। তবে শিলাটির বয়স যে সহস্রাধিক প্রাচীন তার নিঃসন্দেহে বলা যায়। আবার এও জানা যায় জগাছা অঞ্চলে একসময় প্রচুর ওঁরাও সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করতেন। আর তাদের হাত ধরেই এই মায়ের পুজার্চনার শুরু হয়েছিল। বর্তমানে জিগাছা অঞ্চলে ওঁরাও সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস না করলেও জগাছা, ধাড়সা, নয়াবাঁজ, ঊনসানি, দুইল্যা, ঝোড়হাট সহ একাধিক অঞ্চলে এরা বসবাস করছে। এনাদের হাবভাবে বোঝা যায় না, এরাও মানবজীবনে অনেকটাই উন্নত হয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে সিঁদুরলিপ্ত জয়চন্ডীর একটা সাধারন মন্দিরের অবস্থান ছাড়া জয়চন্ডীতলার পূর্বগৌরবের অন্যান্য সব স্মৃতিচিহ্ন ই আজ অবলুপ্ত। এখানে মায়ের নাম জয়ন্তী। আর মায়ের ভৈরব এখানে বুড়োরাজ বা বুড়োশিব। যা জগাছা ইলেকট্রিক সাপ্লায়ের নিকটবর্তী বুড়োশিবতলায় অবস্থান। এখানকার মায়ের নামেই এই অঞ্চলের নাম জয়চন্ডীতলা ও বৃহৎ জনপদটি “জগাছা” নামে  নামকরণ হয়েছে। তবে আরেকটি মতও রয়েছে এই অঞ্চলটি পূর্বে যেহেতু বনাঞ্চল ছিল, তাই সাঁতরাগাছির বাসিন্দারা এই অঞ্চলটিকে নেটিভ চোখে দেখত। এই সমগ্র অঞ্চল জলাশয় ও বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ থাকায় ‘জগাছা’ নামকরণ হয়েছে। আবার সুকুমার সেনের মতে ‘যব’ গাছের ক্ষেত্র থেকেও আগাছা নাম হতে পারে।

এবার আসি হাওড়ার অতি পরিচিত ব্যাতাইচন্ডীর মায়ের প্রসঙ্গে। দেবী আসলে বাংলার বিখ্যাত সেন রাজবংশের সময়ানুকালের। ‘মনসা বিজয় কাব্যে (1495) এবং ‘চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে (1544) হাওড়ার এই এলাকার নাম বহুবার উল্লেখ করা রয়েছে”। অধ্যাপক অলোক মুখোপাধ্যায়ের মতে, মা বেত্রা চণ্ডীর আরাধনা বেতড়ে সেনদের সময়ে শুরু হয়েছিল। তাই গবেষকরা অনুমান করেন যে মা বেতাই চণ্ডীর পূজা শুরু হয়েছিল খ্রিস্টীয় 10-12 শতক থেকে। স্থানীয় ইতিহাস থেকে জানতে পারা যায়, গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত হাওড়ার শিবপুর এলাকা যা আদিকালে একটি সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। কথাতেই রয়েছে “গঙ্গার পশ্চিম কূল বারানসীর সমতুল”। এই স্থানটি ব্যবসায়িক এলাকা হিসাবেও খুব বিখ্যাত ছিল যেখানে ব্যবসায়ীরা তাদের জন্য সৌভাগ্য ফিরে পেতে  চণ্ডীর পূজা করতেন। আমাকে আমার পিতামহীর কাছ থেকে জানানো হয়েছে যে দেবী চণ্ডী বিখ্যাত হালদার পরিবারের বাড়িতে থাকতেন যারা আসলে শিবপুর ক্ষেত্র ব্যানার্জী লেন এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে শিবপুর এলাকার প্রখ্যাত রায়চৌধুরী পরিবার বর্তমান মন্দিরটি বেতাইতলায় স্থানান্তর করে সংস্কার করেন। স্থানীয় ঐতিহাসিকবিদ সুকান্ত মুখোপাধ্যায় এই মতের সাথে একমত। এই রায়চৌধুরী পরিবার বর্তমান মন্দিরের সংরক্ষকের ভূমিকা পালন করে এবং হালদার পরিবার সর্বদা মা বেতাই চণ্ডীর প্রধান পুরোহিত হিসাবে নিযুক্ত রয়েছে।

মা বেতাই চণ্ডীর বর্তমান মন্দিরটি একটি পশ্চিমমুখী স্থাপত্য। দেবী গর্ভগৃহে বাস করেন এবং এখানে দেবীকে সিঁদুরের প্রলিপ্ত। এখানেও দেবী বেসাল্ট শিলার খন্ড। দেবীর মুখমণ্ডল ও শিরদাঁড়া একাধিক মূল্যবান পাথর দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। প্রতি বছর দুর্গাপূজার পর, দেবী দুর্গার মুকুট মা ব্যাতাইচন্ডীকে পরানো হয়ে থাকে।  গর্ভগৃহে ভগবান শিবের একটি ভাস্কর্যও থাকলেও, এখানে মায়ের আদি ভৈরব নেই। পাশের পাড়ায় রয়েছে মায়ের ভৈরব। তবে আজও তা পুজোহীনরত অবস্থায় রয়েছে। দেবীকে সকালে ‘অন্নভোগ’ এবং রাতে ‘শীতল ভোগ’ দেওয়া হয়ে থাকে।

এছাড়াও হাওড়ার ইছাপুরের শমীঁচন্ডী রয়েছে। এখানে পানগাছকে পোকার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মায়ের উপাসনা শুরু হয়েছিল। এমন বহু চন্ডী মন্দির হাওড়া জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে।

হাওড়া জেলার এই স্থানগুলো নিয়ে আলোচনা করার পরে বুঝেছি দেবী চণ্ডী এত দীর্ঘ সময় ধরে যে পূজিত হয়ে আসছেন, এটা আমাদের কাছে খুব স্পষ্ট যে মা চণ্ডী শুধুমাত্র ‘রক্ষার দেবী’ হিসেবেই পূজিত হননি বরং ‘বাণিজ্য ও বাণিজ্যের দেবী হিসেবেও পুজিত হযচ্ছেন। এছাড়া মা তার উপাসকদের সৌভাগ্য বৃদ্ধি করতেও সক্ষম। বর্তমানে, হাওড়া এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলাগুলিতে এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে স্থানীয় লোকেদের মধ্যে চণ্ডী পূজা খুবই জনপ্রিয়। তবে এই স্থানগুলি তাদের পুরানো ঐতিহ্য এবং আচার-অনুষ্ঠানের জন্য বিখ্যাত। যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র :

(১) ক্ষেত্রসমীক্ষা

(২) চন্ডী সপ্ততত্ত্ব; মাৎস্যন্যায় পোর্টাল; সম্পাদক তমাল দাশগুপ্ত

(৩) Geological survey of India র জার্নাল

(৪) বাংলার লোক মাতা “দেবী চন্ডী” pdf

(৫) Veneration of goddess Chandi in Howrah District: Historical Background & Local Traditional Folklore; Sanjukta De

(৬) হাওড়া শহরের ইতিবৃত্ত; অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

(৭) হাওড়া চর্চা; অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যা

(৮) নবীন আলো পত্রিকা, হাওড়া আমার হাওড়া; চতুর্থ বার্ষিক সংখ্যা ১৪২০,

     বালিটিকুরী নবীন ক্রীড়া সংসদ

(৯) বাঙালীর ইতিহাস আদি পর্ব; নীহাররঞ্জন রায়, দেশ পাবলিশিং, কলকাতা

(১০) প্রসঙ্গ শিবপুর; সম্পাদক সৌভিক ও সুকান্ত মুখোপাধ্যায়, ধ্যান বিন্দু

        প্রকাশনী

(১১) আশাবরী পত্রিকা ৫১ বর্ষ

(১২) হাওড়া জেলার ইতিহাস; অচল ভট্টাচার্য, শিব পাবলিশার্স, কলকাতা

সহযোগিতা

(১) জয়দেব চক্রবর্তী (জগাছা জয়চন্ডী মায়ের পুরোহিত)

(২) ঐতিহাসিকবিদ সুকান্ত মুখোপাধ্যায়

(৩) অধ্যাপক সায়ন দে সহ প্রমুখ ব্যক্তিগন

(৪) ছবি ঋণ; সায়নী মন্ডল