মাৎস্যন্যায় বিশেষ সংখ্যা, ২০শে নভেম্বর ২০২৫, মার্গশীর্ষ অমাবস্যা ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪৩২
পুণ্ড্রের মাতৃকথা
রক্তিম মুখার্জী
পুণ্ড্র আমাদের মাতৃভূমির একটি প্রধান সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ভৌগলিক বিভাগ। মহাভারতের যুগে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুণ্ড্র ও সুহ্ম এই পাঁচটি বিভাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য
বাঙালির এই জনপদগুলি কিন্তু উল্লেখ করা হত বঙ্গাঃ, পুণ্ড্রাঃ, রাঢ়াঃ, গৌড়াঃ এইভাবে, অর্থাৎ এই নামগুলি সেই অঞ্চলের প্রধান অধিবাসী জনজাতিটিকে চিহ্নিত করত। নামগুলি আদিতে জাতিবাচক ছিল।
আজকের নিরিখে বলতে গেলে, পুণ্ড্র হল উত্তরবঙ্গ। পুণ্ড্রের মধ্য থেকেই গৌড়ের উত্থান। নীহাররঞ্জন জানাচ্ছেন, বরেন্দ্র পুণ্ড্রেরই এক সুবৃহৎ অংশ ছিল। পুণ্ড্র-বরেন্দ্র আবার রাঢ়ের উত্তরাংশ অর্থাৎ আজকের বীরভূম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ (যে অঞ্চল শশাঙ্কের সময়ে গৌড়রাষ্ট্রের কেন্দ্রস্থল) এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। সহজ কথায় পুণ্ড্র ছিল গাঙ্গেয় অববাহিকার উত্তর অংশ। অবশ্য আমরা যদি অজয় অববাহিকার পাণ্ডুরাজার ঢিবির সভ্যতার সাথে পুণ্ড্রের এবং পৌণ্ড্রক বাসুদেবের সম্ভাব্য যোগসূত্র বিচার করি, তবে বলতে হয় সভ্যতার আদিপর্বে আজকের রাঢ়বাংলার উত্তরাংশ এবং গাঙ্গেয় অববাহিকার উত্তর পশ্চিম দিকটিও পুণ্ড্রের অন্তর্গত ছিল।
পুণ্ড্র সম্বন্ধে একটি চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে, বাঙালির আদি ইতিহাসের প্রায় সবটুকুই বৈদিক ও পৌরাণিকগণ মুছে দিলেও পুণ্ড্রকে কখনোই পুরোপুরি মুছতে পারে নি। মহাভারতে পুণ্ড্রভূমির সাথে অসুররাজ বলির একটা যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। হরিবংশে কৃষ্ণ এবং পৌণ্ড্রক দুজনে বাসুদেব পদবীর দুই দাবিদার, দুজনে প্রবল যুদ্ধে অবতীর্ণ, এবং কৃষ্ণের মুখে মুক্তকণ্ঠে পৌণ্ড্রকের অসামান্য বীরত্বের প্রশংসা শোনা যাচ্ছে। আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পে অসুরভাষী রাষ্ট্র রূপে পুণ্ড্রের উল্লেখ আছে। সোমদেবের কথাসরিৎসাগর থেকে পুণ্ড্রের রাজকন্যা দুঃখলব্ধিকার স্বয়ম্বরের কথা জানা যায়। পুণ্ড্রের প্রতি অনিচ্ছা সত্ত্বেও বৈদিক বলয়ের এই সম্ভ্রমকে বাঙালির এই ভূখণ্ডের প্রবল প্রতিপত্তির একটি পরোক্ষ সাক্ষ্য বলে গ্রহণ করা চলে। বাঙালির মাতৃভূমির চিরন্তন বৈশিষ্ট্য মেনে এই পুণ্ড্র অঞ্চলেও সভ্যতার আদিপর্ব থেকে মাতৃসাধনার ধারা সবেগে বহমান। আবার পুণ্ড্র নিজেই মাতৃসাধনার একাধিক প্রাচীন প্রবাহের সাথে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রেখেছে। এই প্রবন্ধে তারই কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা করব।
পুণ্ড্র আখ ও মাতৃপূজা
পুণ্ড্র নামে একপ্রকার আখ হয়। নীহাররঞ্জন মহাশয় জানাচ্ছেন এই পুণ্ড্র আখের নাম থেকেই পুণ্ড্র ভূখণ্ডের নাম হয়েছে। পুণ্ড্রের আখ থেকে গুড় উৎপন্ন হতো। সেই গুড় সমুদ্রবণিকদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনত বলেই আমাদের ভূখণ্ডের নাম গৌড়। অবশ্য পুণ্ড্রের আখের সাথে বাংলা তথা উপমহাদেশের মাতৃসাধনার ধারার দুটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র আছে।
প্রথমত এই পুণ্ড্রেক্ষু (পুণ্ড্রের ইক্ষু বা আখ), যার থেকে পুণ্ড্র অঞ্চলের নামকরণ, সেই আখের ধনুক তন্ত্রের শ্রীকুলে মা ত্রিপুরাসুন্দরীর আয়ুধ। তন্ত্র ও পুরাণে পুণ্ড্র আখের ধনুক ও বাণপূর্ণ তূণ নিয়ে আদ্যাশক্তি ত্রিপুরাসুন্দরী চিদগ্নিকুণ্ড থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভণ্ডাসুরকে বধ করতে। শ্রীকুলের সাধনাতেই আবার এই পুণ্ড্র আখের ধনুক হয়েছে সাধকের মনের প্রতীক, বাণগুলি হয়েছে পঞ্চ তন্মাত্রার প্রতিভূ। অর্থাৎ সাঙ্খ্যের তত্ত্বের ভিত্তিতে শ্রীকুলে অদ্বৈত মাতৃকার যে ধ্যান ও তত্ত্ব নির্মিত হয়েছে, পুণ্ড্রের আখ তার সাথে ওতপ্রোত হয়ে জড়িয়ে আছে। হয়তো পুণ্ড্র অঞ্চলে তাম্রাশ্মযুগে বা তারও আগে যে মাতৃপূজক অবৈদিক আর্য ও দ্রাবিড় জাতির বসবাস ছিল, আখের ধনুক হাতে মায়ের এই বিশেষ রূপ তাঁরাই প্রথম ধারণা করেছিলেন। আদিবিদ্বান কপিলের সাঙ্খ্য সেই মাতৃরূপের প্রথম দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। যে জাতির সমৃদ্ধি আখ ও আখের গুড় থেকে, তাদের পক্ষেই পুণ্ড্র অঞ্চলের এই বিশেষরকম দীর্ঘ ও শক্ত আখকে মায়ের হাতের আয়ুধ রূপে ধারণা করা সম্ভব। মায়ের সেই রূপই অনেক পরে দাক্ষিণাত্যে শ্রীকুলে আজকের রূপ পেয়েছে।
পুণ্ড্রাসুর
দ্বিতীয়ত: পুণ্ড্রাসুর। ইনি ইক্ষুযন্ত্র অর্থাৎ আখ মাড়াইয়ের যন্ত্রের দেবতা। ইনি মহিষবাহন। ক্রুদ্ধ হলে শস্যভূমি ধ্বংস করেন। পুণ্ড্রাসুরের এই মহিষ বাহনের একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। মহিষ আমাদের উপমহাদেশে বিশেষ ভাবে নদীমাতৃক বদ্বীপ অঞ্চলের সাথে যুক্ত। সিন্ধু সভ্যতায় ঊষা মাতৃকার পূজায় মহিষমেধ হতো। আবার সিন্ধু সভ্যতার ঠিক পরেই বারাহী রূপে পৃথিবীমাতার তত্ত্বের যে সাধনা হতো, সেখানেও দেবী মহিষবাহনা। সেই মাতৃতত্ত্ব কিছুটা রূপায়িত হয়েছে মা বিশালাক্ষীর মধ্যে, গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয় লক্ষ্য করেছেন। মহিষের সাযুজ্যে বাংলার কৈবর্ত রাষ্ট্রের একটি অংশ মাহিষ্য রূপে পরিচিত। মা চণ্ডীর মন্দিরে মহিষের খুর রাখার রীতিও কোথাও কোথাও দেখা যায়। নদীমাতৃক ভূখণ্ডের মহিষের সাথে মাতৃসাধনার এই সংযোগের বিষয়টিই পুণ্ড্রাসুরের মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে।
পুণ্ড্রাসুরকে আখ থেকে নতুন গুড় তৈরীর আগে মাটির ঢিবির আকৃতিতে পূজা করা হয়। এরপর আখের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরী আরম্ভ হলে প্রথম সোনালি গুড় তাঁকে অর্ঘ্য রূপে নিবেদন করা হয়। আমরা অনুমান করতে পারি, এই পুণ্ড্রাসুর পুণ্ড্র অঞ্চলের বাঙালির এক প্রাচীন মনীষী। তাম্রাশ্মযুগে প্রথম সভ্যতার নির্মাণকালে ইনি এই অঞ্চলে আখ মাড়াইয়ের যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন। বৈদিক ও আদি বৌদ্ধ পরিমণ্ডল তখনকার বাঙালিকে পক্ষীভাষী, অসুর, ব্রাত্য বলতো। “অসুরানাম্ ভবেৎ বাচা গৌড়পুণ্ড্রোদ্ভবা সদা” (আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প)
কারণ বাঙালি পক্ষীমাতৃকার পূজারী, ব্রতকর্মে উৎসাহী। হয়তো সেই কারণেই পুণ্ড্রের সেই মনীষী পুণ্ড্রাসুর বলে পরিচিত হয়েছিলেন। তবে যেভাবে মাটির আকৃতিতে, গুড়ের নৈবেদ্যে, ব্রতকর্মের মতো সহজ বিধিতে ইনি পূজিত হন, তাতে বোঝা যায় ইনি বাঙালির আবহমান মাতৃপূজক সংস্কৃতির সাথে একীভূত হয়ে মিশে গিয়েছেন।
পুণ্ডরীক পদ্ম
পুণ্ডরীক শব্দটি এসেছে পুণ্ড্রীক থেকে। যার অর্থ পুণ্ড্রের সাথে সম্পর্কিত। পুণ্ডরীক অর্থাৎ শ্বেত পদ্ম। এই ভূখণ্ডের করতোয়া, তিস্তা, মহানন্দা, কৌশিকী প্রভৃতি প্রাচীন নদী ও সুবিস্তীর্ণ সরোবর, পুকুর, দীঘিতে বিপুল সংখ্যায় শ্বেত পদ্ম পাওয়া যেত বলেই হয়তো শ্বেত পদ্মের নাম পুণ্ড্রের সাথে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু পদ্ম আর পুণ্ড্রের এই সংযোগ আরো গভীর। আজও বাংলার পৌণ্ড্র জাতির লোকরা নিজেদের পদ্মরাজ বা পুণ্ডরীক বলে পরিচয় দেন। পুণ্ডরীক বা শ্বেত পদ্ম হয়ে উঠেছে পুণ্ড্রজাতির অভিজ্ঞান। আবার আমরা যদি মহাভারত ও হরিবংশে উল্লিখিত পৌণ্ড্রক বাসুদেবের বিষয়ে দেখি, তাহলে পুণ্ড্রের সাথে পদ্মের আরেকটি চমকপ্রদ যোগ খুঁজে পাবো। হেমাদ্রির সিদ্ধান্তসংহিতা অনুযায়ী বাসুদেব কৃষ্ণের চার হাতের আয়ুধ শঙ্খ চক্র গদা ও কৃপাণ। আর হরিবংশ অনুযায়ী পৌণ্ড্রক বাসুদেবের আয়ুধ পদ্ম চক্র গদা ও কৃপাণ। আজকের বাসুদেব মূর্তিতে আমরা আর কৃপাণ দেখি না। এক হাতে শঙ্খ, আরেক হাতে পদ্ম দেখি। সম্ভবত বৈষ্ণব ধর্মের প্রাচীন অনুসারীরা এভাবেই কৃষ্ণ ও পৌণ্ড্রকের দুই ধারাকে সম্মিলিত করেছেন। সেই সম্মিলিত ধারায় কৃষ্ণের বিশেষ চিহ্ন শঙ্খ, আর পৌণ্ড্রকের বিশেষ চিহ্ন শ্বেত পদ্ম বা পুণ্ডরীক। শুধু তাইই নয়, বৈষ্ণব ধর্মে পরবর্তী সময়ে বিষ্ণুর একটি জনপ্রিয় নামই হয়ে গিয়েছে পুণ্ডরীকাক্ষ, পুণ্ডরীকের মতো চোখ যাঁর।
লক্ষ্য করার বিষয় পদ্ম আজও তন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। আমাদের দেহতত্ত্বে মূলাধার থেকে সহস্রার অবধি সমস্ত চক্রকে পদ্মের আকারে ভাবনা করা হয়। এক একটি পদ্মের পাপড়ি সংখ্যা আলাদা। প্রতিটিতে মাতৃকার এক একটি বিশেষ রূপের (ডাকিনী, রাকিনী, লাকিনী, শাকিনী, কাকিনী, হাঁকিনী) অধিষ্ঠান হয়। এই পদ্মের আকারে বর্ণিত চক্রগুলিতে আদিজননী কুলকুণ্ডলিনী হংসীরূপে লীলা করেন বলে সাধক ধারণা করেন। আজও পদ্মের আকারে তন্ত্রের সমস্ত মণ্ডল রচিত হয়। দুর্গাপূজায় সর্বতোভদ্রমণ্ডল থেকে চর্যাপদে চৌষট্টি পাপড়ির পদ্মে ডোম্বিনী রূপে মাতৃকার নৃত্য, মহাবিহারের স্থাপত্য থেকে বল্লালঢিবির নগর পরিকল্পনা, সর্বত্র তন্ত্রনিষ্ঠ বাঙালি পদ্মের আকৃতি ব্যবহার করেছে। আর এর আদিতম নিদর্শন আমরা দেখি বীরভূমের অজয় অববাহিকায় পাণ্ডুক গ্রামে বাঙালির প্রথম নগরসভ্যতা পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে। এখানে পাণ্ডুরাজার ধর্মাধিকরণ নামে যে প্রত্নক্ষেত্রটি আছে, তার আকার পদ্মের মতো। পাণ্ডুক, পাণ্ডুরাজার নামে পুণ্ড্র ও পৌণ্ড্রকের প্রভাব থাকা খুব স্বাভাবিক। এবং সেক্ষেত্রে পুণ্ড্র ভূখণ্ড ও পুণ্ড্ জাতির সাথে পুণ্ডরীক পদ্মের যোগ, পৌণ্ড্রক বাসুদেবের সাথে পদ্মের সংযোগের একটি বিশদ পটভূমি আমরা খুঁজে পাই, যা মাতৃসাধনার তথা তন্ত্রাশ্রিত আদি বৈষ্ণব সাধনার ধারার সাথে পুণ্ড্রকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করে।
পুণ্ডরীক বলাকা
আবার পুণ্ডরীক শব্দের আরেকটা অর্থ বলাকা বা সারস জাতীয় সাদা পাখি। পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে আমরা সবথেকে বেশি পাই বলাকার মুখবিশিষ্ট মাতৃমূর্তি। পক্ষীমাতৃকার এই বিশেষ রূপ বাঙালির প্রথম সভ্যতায় সবথেকে জনপ্রিয় ছিল। গবেষক Marija Gimbutas এর মতে, পাখি রূপে মাতৃকা আকাশে উড্ডিয়ান, মায়ের নীল আকাশে ডানা মেলা বিহঙ্গ রূপ এই জগতের দুঃখচক্র থেকে উত্তরণ বা কৈবল্যের প্রতীক। বলাকা মাতৃকার এই আদি উপাসনা থেকেই আজকের কালী সাধনা এসেছে। আজও মা কালীর পনেরো জন নিত্যা শক্তির একজন হলেন বলাকা। কালিদাসের কুমারসম্ভবে এবং রঘুবংশে যথাক্রমে কপালমালিনী মা কালী এবং রামের সাথে যুদ্ধরতা তাড়কা কে নীল আকাশে বলাকার সাথে তুলনা করা হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মহাভারতের যুগে তাড়কা ছিলেন কালীর মতোই এক প্রাচীন পূজনীয় মাতৃকা। এছাড়া দশমহাবিদ্যার মধ্যে মা বগলামুখী ও মায়ের সহচরী বাড়বামুখী বলাকা ও সারসের সাথে সংযুক্ত। পক্ষীমাতৃকার এইরকম বিশদ তত্ত্ব যে পাখির সাথে যুক্ত, সেই বলাকা তথা সারসের পুণ্ডরীক নামটি আমাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পুণ্ড্রের মাতৃসাধনার সাথে যুক্ত বলেই কি বলাকার এই পুণ্ডরীক উপাধি? আবার একটু আগেই মাতৃসাধনার সাথে সম্পর্কিত যে পুণ্ড্রের আখের কথা আলোচনা করলাম, সেই আখ বা আখের রসও সাদা রঙের, গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয় লক্ষ্য করেছেন। শ্বেত বলাকা মাতৃকার উপাসনায় আখের সংযোগ কাজেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পুণ্ডরীক সেক্ষেত্রে বক/বয়াংসি, পুণ্ড্র আখ, এবং সম্পূর্ণ আদি বাঙালি জাতি অর্থাৎ পুণ্ড্রর সঙ্গে সম্পৃক্ত নাম।
আমরা দেখলাম পুণ্ড্র ভূখণ্ড ও পুণ্ড্র জাতির নাম মাতৃসাধনার বিভিন্ন ধারাকে কিভাবে ধারণ করে আছে। এবার পুণ্ড্র অঞ্চলের প্রাচীন মাতৃপীঠের কথা।
পুণ্ড্রের সতীপীঠ
দীনেশচন্দ্র সরকার মহাশয় The Sakta Pithas গ্রন্থে পীঠনির্ণয়তন্ত্র ও শিবচরিত উদ্ধৃত করে সতীপীঠের যে তালিকা দিয়েছেন, তার মধ্যে পুণ্ড্রে দুটি সতীপীঠের নাম পাই। একটি করতোয়া নদীর তটে, অন্যটি ত্রিস্রোতা অর্থাৎ তিস্তা নদীর অববাহিকায়। লক্ষণীয় বিষয় হল পুণ্ড্রের নদীগুলি তান্ত্রিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই সতীপীঠ দুটি আলাদা নামের পরিবর্তে করতোয়া-তট এবং ত্রিস্রোতা নামেই উল্লিখিত হয়েছে।
করতোয়া প্রাচীন পুণ্ড্রের প্রধান নদী ছিল, তার মহিমা নিয়ে করতোয়া মাহাত্ম্য গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। পুণ্ড্রনগর, মহাস্থানগড়ের মতো বিখ্যাত নগর এবং বহু মাতৃপীঠ এই সুবিশাল নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল। এহেন করতোয়ার তীরে সতীপীঠের অবস্থান তাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। এই স্থানে সতীর বামকর্ণ পড়েছিল। পীঠের দেবী অপর্ণা, তবে লোকমুখে দেবী ভবানী রূপে প্রসিদ্ধ। পীঠরক্ষক ভৈরব বামন/বামেশ। বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের বগুড়া জেলার শেরপুরে করতোয়াতটে ভবানীপুরে এই পীঠ অবস্থিত।
এই অঞ্চলে পাল-সেনযুগের বেশ কিছু প্রাচীন মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। অন্যদিকে মায়ের ভবানী নাম একটি বিশেষ সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। পালসম্রাট মহীপাল মা ভবানীর পূজারী ছিলেন, পুণ্ড্র-বরেন্দ্র অঞ্চলের সাথে পালবংশের নিবিড় যোগসূত্র ছিল। মহীপালের সময় বাঙালির এক নবজাগরণ ঘটেছিল, সহজ আন্দোলন নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সতীপীঠের সর্বভারতীয় বিস্তারও এই সময়েই। করতোয়া তটের এই সতীপীঠের মা অপর্ণার ভবানী নামে প্রসিদ্ধি হয়তো মহীপালের সমকালীন মাতৃসাধনার সেই গৌরবময় অধ্যায়ের স্মৃতি। আবার চমকপ্রদভাবে এই মাতৃপীঠের সাথে নাটোরের রাণী ভবানীর ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। প্রতি বৎসর মাঘ মাসে মাঘী পূর্ণিমায় এবং চৈত্র মাসে শুক্লা নবমীতে ভবানী মন্দির প্রাঙ্গনে দুটি বড় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও শারদীয় দুর্গোৎসব, দীপান্বিতা শ্যামাপূজা এবং নবান্ন উৎসবের আয়োজনও এখানে করা হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় যে সতীপীঠটি ত্রিস্রোতা অর্থাৎ তিস্তা নদীর অববাহিকায়, সেখানে সতীর বামপদ, মতান্তরে বাম গুলফ বা গোড়ালি পড়েছিল। দেবী ভ্রামরী। ভৈরব অম্বর।
শ্রীসূক্ত অনুযায়ী মধু শব্দটি বসুন্ধরা বা পৃথিবীমাতৃকার দ্যোতক। মাতৃকা আনন্দময়ী। সমস্ত প্রাণরস তাঁর থেকেই উৎসারিত। তাই তিনিই মধুতত্ত্ব। আবার এই মধুর আস্বাদকও তিনিই। কমলাকান্তের ভাষায়:
আপন মায়ায় আপনি বাঁধা সে
আপন মহিমা আপনি গায়
তাই তন্ত্রে তিনি সরঘ বা ভ্রমর রূপে বন্দিতা। তাঁর ভ্রামরী রূপের মূল তত্ত্ব এইই। আবার শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুযায়ী ভবিষ্যতে অরুণাসুর বধের জন্য অসংখ্য ভ্রমর পরিবৃত হয়ে তেজোময়ী ভ্রামরী রূপে মা আবির্ভূত হবেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মাতৃকার এই মধুতত্ত্ব জগতবাসীকে দান করেন বলেই তন্ত্রাশ্রিত বৈষ্ণব ধর্মের উপাস্য দেবতা বিষ্ণুর নাম মাধব এবং মধুসূদন।
তবে ভ্রামরী মাতৃকার পীঠের অবস্থান নিয়ে দুটি মাতৃপীঠের দাবি আছে।
প্রথমটি হল জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের বোদাগঞ্জে দেবী ভ্রামরীর মন্দির। মা ভ্রামরীর বিগ্রহ এখানে নীলবর্ণা, অষ্টভুজা, পদতলে ভৈরব জল্পেশ ও সিংহ। উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত শৈবতীর্থ জল্পেশের অধিষ্ঠাতা শিবই মা ভ্রামরীর পীঠরক্ষক ভৈরব অম্বর রূপে পরিগণিত হন। মা ভ্রামরীর মন্দিরে নিত্যপুজো ছাড়াও প্রতি মঙ্গল ও শনিবার, অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় দুপুরে মাকে বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয়। শারদীয়া দুর্গাপুজো ও দীপান্বিতা কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয় মন্দিরে, এছাড়া বাৎসরিক বিশেষ পুজো হয় মাঘী পূর্ণিমায়। সেসময় চার দিনের মেলা বসে, সমগ্র উত্তরবঙ্গ থেকে ভক্তরা ভিড় করেন এই মন্দিরে।
ভ্রামরী পীঠের সম্ভাব্য দ্বিতীয় অবস্থান যে মন্দিরে, সেটি হল বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের বোদেশ্বরী গ্রামে, করতোয়া নদীর তীরে। প্রাচীন ত্রিস্রোতা বা তিস্তা নদীর দক্ষিণ প্রবাহ থেকে করতোয়া, আত্রাই ও পুনর্ভবা নদী উৎপন্ন হয়েছিল। তাই করতোয়া অববাহিকায় ত্রিস্রোতা পীঠের অবস্থান খুব অসম্ভব নয়। এই মন্দিরেও দেবী ভ্রামরী, ভৈরব অম্বর বা অমর। মূল মন্দির পালযুগে নির্মিত। পাল ও সেনযুগে এই অঞ্চল মহাস্থানগড়ের অন্তর্গত ছিল এবং তিস্তার প্রধান ধারা করতোয়ার তীরের এই মাতৃপীঠ তখনও প্রসিদ্ধ ছিল। বোদেশ্বরী নামটি খুব সম্ভবত এই পীঠের আদি নাম বরদেশ্বরী থেকে এসেছে।
বখতিয়ার খলজি তিব্বত অভিযান থেকে বিপর্যস্ত হয়ে প্রত্যাবর্তনকালে এ মন্দির চত্বরে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল বলে প্রসিদ্ধি আছে। এখানে করতোয়া পার হতে গিয়ে বখতিয়ারের বেশ কিছু ঘোড়া মারা যায় বলে নদীর ঘাটের নাম ঘোড়ামারা। বাঙালির শিকড়ের শত্রুরা মহাকালের দণ্ড ভোগ করার পর এভাবেই মাতৃকার চরণে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়।
মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর সাথে যুদ্ধে পরাজিত কোচবিহারের রাজা প্রাণনারায়ণ এই মাতৃপীঠে তিন বছর মায়ের সাধনা করে জয়লাভ করেছিলেন। তিনি ও তাঁর পুত্র মদননারায়ণ ১৬৬৮ খ্রীষ্টাব্দে এই জীর্ণ মাতৃপীঠ সংস্কার করেন।
একটি লক্ষণীয় বিষয় হল এই দুই সতীপীঠেই বাম অঙ্গের অবস্থান। একটিতে বামকর্ণ, আরেকটিতে বাম পদ। আবার একটি পীঠে ভৈরব বামেশ।
এটি কাকতালীয়ও হতে পারে। আবার তন্ত্রের বামমার্গ বা বামাচারের ইঙ্গিতও হতে পারে। তন্ত্রে বাম হাতে দেবীকে অর্ঘ্যদান বামাচারের সঙ্কেত। মঙ্গলকাব্যে চাঁদ বণিকের বাম হাতে মা মনসার পূজা এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। সেক্ষেত্রে হয়তো পুণ্ড্রের এই দুই সতীপীঠের বাম অঙ্গ তন্ত্রের বামমার্গের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
দেবীকোট
প্রাচীন ভারতে পুণ্ড্রের যে মাতৃপীঠ সবথেকে বিখ্যাত ছিল, তা হল দেবীকোট। এই স্থান কোটিবর্ষ ও শোনিতপুর নামেও খ্যাত এবং বিখ্যাত প্রত্নক্ষেত্র বাণগড় এখানেই অবস্থিত। দেবীকোট, কোটিবর্ষ ও বাণগড় নামগুলি এখানকার প্রাচীন কোট বা গড়ের স্মৃতি বহন করে। এই মাতৃপীঠের সাথে দুর্গ বা কোট এতটাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল যে দুর্গাপূজার নবমী তিথিতে আজও দেশবাসিনী মাতৃকাদের পূজা করার সময় পুণ্ড্রের অধিষ্ঠাত্রী রূপে মা কোটেশ্বরীর পূজা হয়। শশিভূষণ দাশগুপ্ত লক্ষ্য করেছিলেন দুর্গ রক্ষার সাথে মা দুর্গার সাধনার আদিপর্বের যোগ ছিল। নগরের দুর্গে মাতৃমন্দির স্থাপন প্রাচীন যুগের একটি বিশেষ রীতি ছিল। সিন্ধু সভ্যতার সমকালে বালোচিস্তানে যে দুর্গনগরী আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানেও প্রধান দেবী সিংহবাহিনী মাতৃকা। গঙ্গারিডি যুগের বর্ধমানের মা মঙ্গলচণ্ডীর নামাঙ্কিত মঙ্গলকোটের মতোই গঙ্গারিডি যুগের বাণগড় বা দেবীকোটও মাতৃকার নামাঙ্কিত হয়ে সেই আদি ধারাকেই বহন করেছে।
জহুরা চণ্ডী
যদিও মালদহ অঞ্চল প্রাচীন গৌড় ভূখণ্ডের অন্তর্গত, তবুও এখানকার একটি মাতৃপীঠ পুণ্ড্র প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হল মা জহুরাচণ্ডীর মন্দির। লোকমুখে কথিত আছে সেনযুগে বল্লাল সেনের সময় থেকে এই জায়গায় মা কালী পূজিত হচ্ছেন। পুরোনো মূর্তিটি মুসলমান আমলে মাটির স্তূপে ঢেকে দেওয়া হয় আক্রমণ এড়াতে। পুনরায় পুজো যখন শুরু হল, ওই সিঁদুরমাখা মাটির স্তূপের ওপরে মায়ের তিনটি মুখ তৈরি করা হয়, নবাবী আমল থেকে, প্রায় তিনশ বছর আগে। তখন এই অঞ্চলে ভগ্নদশাগ্রস্ত পুরোনো গৌড়ের গড়ে গজিয়ে ওঠা ঘন অরণ্যে সাধনা করতেন তেওয়ারী পদবীর এক কালীসাধক। তিনি জহুরা চণ্ডীর দিব্যদর্শন লাভ করে এখানে পুজো শুরু করেন, গড়ের চূড়ায় বিস্তৃত প্রাঙ্গণে বেদী স্থাপন করে জহুরা চণ্ডীমাতার উপাসনা শুরু হয়। যদিও মা আজ সর্বত্র জহুরা কালী নামেই পরিচিত।
মা রক্তবর্ণা, লোলজিহ্বা, বরাহদন্তিকা, ত্রিনেত্রা, করালবদনা। মায়ের তিনটি মুখ নিঃসন্দেহে তন্ত্রের ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্নার দ্যোতনা বহন করে। এছাড়াও, মায়ের তিনটি মুখ প্রাচীন বাঙালি অর্থাৎ গৌড়ীয় জাতির তিনটি প্রধান ভৌগলিক অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, সিদ্ধান্ত করেছেন গবেষক তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়। চমকপ্রদভাবে মালদহের এই অঞ্চল প্রাচীন পুণ্ড্র, গৌড় ও বরেন্দ্রের সংযোগস্থলে অবস্থিত। তাই মা জহুরাচণ্ডী এক অর্থে পুণ্ড্রের প্রান্তবাসিনী, গৌড়ের দ্বারবাসিনী মাতৃকা।
সারা বছরই মঙ্গল ও শনিবারে মায়ের পুজো হয়, কিন্তু বৈশাখ মাসের প্রথম শনি/মঙ্গলবার থেকে শেষ শনি/মঙ্গলবার অবধি মায়ের বাৎসরিক পুজোয় এখানে মহা ধুমধাম হয়, অগণিত মানুষের উপস্থিতিতে মহাসমারোহে উৎসব ও মেলা বসে। তবে মায়ের পুজোয় অন্নভোগ হয় না এখানে। বাতাসা, সন্দেশ আর জবাফুলেই মা সন্তুষ্ট হন।
পাটলাচণ্ডী
সেনযুগে গৌড় নগরীর চারিদিকে মা চণ্ডীর চারটি পীঠ ছিল। উত্তরে মা মাধাইচণ্ডী, পশ্চিমে মা দ্বারবাসিনী, পূর্বে মা জহুরাচণ্ডী ও দক্ষিণে মা পাটলাচণ্ডী। বর্তমান মালদহের পাতালচণ্ডী এই পাটলাচণ্ডী পীঠের বর্তমান রূপ।
পদ্মপুরাণের উত্তরখণ্ডে ভারতব্যাপী পবিত্র তীর্থের মধ্যে পুণ্ড্রের পাটলা পীঠের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিপাশায়াং বিপাপস্তু পাটলং পুণ্ড্রবর্ধনে
দেবীপুরাণের সপ্তম স্কন্ধেও মা পাটলাচণ্ডীর উল্লেখ আছে। বৃহন্নীলতন্ত্র আবার এই পীঠকে চণ্ডীপুর বলে উল্লেখ করেছে এবং এখানে মা প্রচণ্ডার অধিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেছে।
চণ্ডীপুরে প্রচণ্ডা চ চণ্ডা চণ্ডবতী শিবা
শ্রীশ্রীচণ্ডীতে মায়ের ১০৮ নামের তালিকায় পাওয়া যায় পাটলা তথা পাটলাবতী নাম।
অপর্ণানেকবর্ণা চ পাটলা পাটলাবতী
পট্টাম্বরপরিধানা কলমঞ্জীররঞ্জিনী
পাটল শব্দের অর্থ হালকা লাল বা গোলাপী। মাতৃকার যে রূপ পাটলবর্ণ, তিনিই পাটলাবতী বা পাটলাচণ্ডী।
মালদা শহর থেকে ১২ নম্বর রাজ্য সড়ক ধরে পশ্চিমে অন্তত ১০ কিলোমিটার এগোলেই ব্যাসপুর। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, জঙ্গলাকীর্ণ ওই এলাকায় মাটির নীচ থেকে পাওয়া গিয়েছিল দেবী চণ্ডীর মূর্তি। বর্তমানে বহু প্রাচীন একটি তেঁতুলগাছের নীচে বেদির ওপর প্রতিষ্ঠিত মা পাতালচণ্ডী। চৈত্র মাসে বাসন্তীপুজোর শেষ তিনদিন মা পাতালচণ্ডী এখানে পূজিত হন। বর্তমান মন্দিরটির অদূরে দক্ষিণা কালীর মন্দিরও রয়েছে।
মা পাটলাচণ্ডীর পীঠে বর্তমানে রাখা শিলাখণ্ডটি খুব সম্ভবত অতীতের চণ্ডীমূর্তির মাথার উপরের কীর্তিমুখের অংশ। অর্ধচন্দ্রাকারে জ্যোতির তোরণ মাকে ঘিরে আছে। আকাশে বিদ্যাধরীগণ মাকে বন্দনা করছেন। মূর্তির এই অংশটুকুই এখানে রাখা আছে। সাথে আছে মায়ের একটি মুখমণ্ডল। মায়ের রঙ পাটলবর্ণ বা হালকা লাল। ত্রিনয়নী মায়ের মুখে প্রসন্ন হাসি। তেঁতুলগাছের আশেপাশে আরো কয়েকটি মূর্তির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়।
মায়ের এই পাটলবর্ণ উদীয়মান সূর্যের বর্ণ। সিন্ধু সভ্যতায় এবং বৈদিক সাহিত্যে মাতৃকার ঊষা রূপের উপাসনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দশদিকে কিরণের বাণ হেনে ঊষারূপে মা অন্ধকাররূপী দানবকে পরাজিত করেন। তিনি আসেন, তাই জগত জাগে। আজও আমরা দশভুজা মহিষমর্দিনী দুর্গার শারদীয়া বোধন ও মহাপূজায় ঊষার সেই আদি তত্ত্ব ধরে রেখেছি। পাটলাচণ্ডী মাতৃকাও সেই আদি তত্ত্বেরই প্রকাশ। তাঁর রূপেরও শেষ নেই, বর্ণেরও শেষ নেই। সাধক কমলাকান্তের ভাষায়:
মা কখনও শ্বেত কখনও পীত কখনও নীল লোহিত রে
আমি আগে নাহি জানি কেমন জননী ভাবিতে জনম গেল রে
চামুণ্ডা পূজা
উত্তর দিনাজপুরের হিলিতে আজও প্রচলিত আছে চামুণ্ডা পূজা। মাহিষ্য, বৈশ্য এবং তিলি সম্প্রদায়ের মানুষের এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। জ্যৈষ্ঠ মাসে অমাবস্যার পর প্রথম শনিবার বেশ আড়ম্বর করে এই পুজো হয়। ঢাক ও কাঁশি বাদ্যের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি নাচ গান করে সিধা বা মাগণ তুলে পূজা আরম্ভ হয়। মা চামুণ্ডা পূজিত হন মুখা বা কাঠের মুখোশের প্রতীকে। মায়ের এই মুখোশ পরে পূজারীরা মশালের আলোয় বাদ্য সহযোগে নৃত্য গীত করেন।
বন্দো মাতা ছিন্ন মুন্ড বিভূষিতা।।
অদৃশ্য হাত দুঃখানি বন্দিনু দেবী।।
বন্দো দেবী অদৃশ্য চরণ দুখানি।।
মা গো তোর নিবাস হিলি হাটে।।
যমুনা বারি দিয়া আপ্লব শরীর।।
আজ্ঞা দে তবে মা গো পরিচয় দিব।।
ছাই মাখা আনি পাতালি ভবানী।।
ভোগের মধ্যে থাকে ভক্তদের নিয়ে আসা সন্দেশ, আম, কাঁঠাল, কলার ছড়ি। পুজো উপলক্ষে তিনদিন ধরে মেলা হয়। মেলার মূল আকর্ষণ হলো লোহার বিভিন্ন জিনিসপত্রের সওদাপত্র। রণরঙ্গিণী মায়ের উৎসবে লোহার অস্ত্রের বাণিজ্য বাঙালির যোদ্ধা জাতিদের সাথে মাতৃসাধনার একটি আবহমান সহজ যোগসূত্রকেই তুলে ধরে।
চামুণ্ডা পূজার সমতুল্য একটি রীতি এই অঞ্চলে প্রচলিত। সেটি হল হাজরা নৃত্য। গাজনের রাতে এই নৃত্য পরিবেশিত হয়। ভক্তরা মা কালীর মুখোশ পরে হাতে খড়্গ নিয়ে নৃত্য করেন। এই একই রাতে গৌড়বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে মড়ার খুলি, শবদেহ নিয়ে লাল, কালো রঙে দেহ রাঙিয়ে, সাদা ফুলের মালায় সেজে ভক্তরা নৃত্য করেন। ভক্তেরা কেউ হন “কালিকাপাতা”, কেউ “লাউসেনপাতা”। অর্থাৎ মা কালীর সাধনক্রম, লাউসেনের তান্ত্রিক হাকন্দ সাধনক্রমের স্মৃতি নিয়ে এই নৃত্য। হাজরা নাচও তান্ত্রিক সাধনার এই নৃত্যরীতির সাথে যুক্ত। এবং চমকপ্রদভাবে এই নৃত্যরীতিগুলির মধ্যে বজ্রযানের অক্ষোভ্যকুলের উপাসনার প্রভাব আছে। হাজরা শব্দটি কি কোনোভাবে হেবজ্রের অপভ্রংশ হতে পারে? বিশদে গবেষণা ছাড়া বলা কঠিন।
চামুণ্ডা মূর্তি
পুণ্ড্রের কিছু স্থানে পাল-সেনযুগের মা চামুণ্ডার বিগ্রহ আজও পূজিত হচ্ছে। মধ্যযুগের ক্রান্তিকাল মাতৃসাধনার এই অধ্যায়কে মুছতে পারে নি। এমনই দুটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করব।
দক্ষিণ দিনাজপুরের শিববাড়ি গ্রামে আজও পূজিত হন পালযুগের মা সিদ্ধচর্চিকা বা সিদ্ধচামুণ্ডা। তিনি দশভুজা। হাতে তর্জনীমুদ্রা, খট্বাঙ্গ, নরকপাল, মুণ্ড, খড়্গ, খেটক, ডমরু, কাস্তে, শূল ও ভক্ষণমুদ্রা। দুই পাশে নৃত্যরতা ডাকিনী যোগিনী। দেবী স্বয়ং একটি বেতালের কাঁধে দাঁড়িয়ে নৃত্য করছেন। সমতুল্য মূর্তি নেপাল, বগুড়া সহ প্রাচীন পালসাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে। আজকের দিনাজপুরে একসময় পালরাষ্ট্রের রাজধানী ছিল। আজও মাতৃসাধনার কিছু ধারা সেখানেই সেই আদি আকারেই আছে। এই চামুণ্ডা পূজা তারই নিদর্শন।
অন্যদিকে মা চর্চিকার পূজার এক অপূর্ব পরম্পরা আজও বহমান উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়িতে মা চর্চিকার মন্দিরে। ১৯৩৫-৪০ সালে ঐ গ্রামে একটি প্রাচীন পুকুর খননের সময় দেবীমূর্তি পাওয়া যায়। মূর্তিটি কষ্টিপাথরের; প্রায় সাত ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। করালবদনী শীর্ণকায়া মুণ্ডমালিনী মায়ের মাথায় সাপের মুকুট, গলায় ঝুলছে নরমুণ্ডের মালা, সারা শরীরজুড়ে সর্পমালা। বাঁদিকের একটি হাত ভাঙা। বাকি চারটি হাতে রয়েছে হাতির লেজের দিক, ঘণ্টা, ছিন্ন নরমুণ্ড, নরমূর্তি। ডানদিকের তিনটি হাতে রয়েছে হাতির মাথার দিকটি, মানুষের কঙ্কাল, ঘণ্টা। অপর দু’টি হাত ভাঙা। অস্থি-চর্মসার বুক, পেটের উপরের দিকে রয়েছে কাঁকড়া বিছে। পায়ের নীচে এক নারী মূর্তি, শেয়াল এবং প্যাঁচা। মায়ের মূর্তির একটি বিশেষত্ব হল অতি শীর্ণ উদরে একটি বৃশ্চিক বা বিছে আঁকা রয়েছে।
প্রাচীন করতোয়া নদীর উত্তরে এই অঞ্চল প্রাচীনকালে পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত ছিল। গবেষক পরেশচন্দ্র দাশগুপ্ত মহাশয় প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন করে জলপাইগুড়ি অঞ্চলের চিল্লা রাজার গড়কে পুণ্ড্রেরই অন্তর্গত বলে সিদ্ধান্ত করেছিলেন।
নীহাররঞ্জন মহাশয়ের মতে উত্তরবঙ্গে দেবপালের সময় থেকে কম্বোজ পালবংশের রাজত্ব ছিল। সম্ভবত দেবপাল যখন পালসাম্রাজ্য হিমালয় পর্যন্ত বিস্তৃত করেন তখনই এই পার্বত্য কম্বোজবংশ পালবংশের সংস্পর্শে আসে। ইর্দা তাম্রশাসন অনুযায়ী পালসাম্রাজ্যের দুর্বলতার সময়ে এঁরা স্বাধীন রাজবংশ রূপে রাজত্ব করেছিলেন এবং প্রিয়ঙ্গু নামক স্থানে এঁদের রাজধানী ছিল। মহীপাল ও নয়পালের সময়ে এঁরা বোধহয় পুনরায় পালসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হন। তবে একথা অনস্বীকার্য যে এঁরা পালবংশ ও তৎকালীন বাঙালির সাথে একই সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করতেন। সেক্ষেত্রে এই পেটকাটি চর্চিকা দেবীর প্রতিষ্ঠা ও উপাসনা তাঁদের মাধ্যমে হওয়াই সম্ভব।
যেভাবে পুকুরের অনেক গভীরে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় এই মূর্তি পাওয়া গেছে তা থেকে বোঝা যায় তুর্কি আক্রমণের সময় এই মূর্তিকে এই স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মিনহাজের বিবরণ থেকে জানা যায় তিব্বত অভিযানকালে বখতিয়ার উত্তরবঙ্গে আক্রমণ করেছিল এবং পুণ্ড্রের দেবীকোট ছিল তার সামরিক রাজধানী। সম্ভবত সেই সময়েই এই মূর্তি এই পুকুরের গভীরে স্থান পায়। এবং যেহেতু অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে; সুতরাং বলাই যায় তুর্কি আক্রমণের বর্বরতা থেকে এই মূর্তি রক্ষা পেয়েছিল। দীর্ঘ শিকড়বিচ্ছিন্নতার কাল কাটিয়ে আধুনিক যুগে এখানে আবার মাতৃপূজার সেই আদি ধারা আত্মপ্রকাশ করেছে।
মাশান পূজা
আমাদের মাতৃসাধনার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল মায়ের মণ্ডলে ভীষণ ভৈরব ও গণ বা সহচরদের উপস্থিতি। এঁরা ক্ষেত্রপাল রূপে ভূখণ্ড রক্ষা করেন, দ্বারপাল পীঠরক্ষক রূপে শক্তিপীঠের অতন্দ্র প্রহরায় থাকেন। পুণ্ড্র অঞ্চলে মায়ের এই ভীষণ সহচরগণ মাশান ঠাকুর রূপে পূজিত। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী নৃত্যরত মা কালীর ঘাম থেকে মাশানদের আবির্ভাব ঘটেছিল। মৃগাঙ্ক চক্রবর্তী মহাশয় ক্ষেত্রসমীক্ষা করে জানিয়েছেন, জলুয়া মাশান, নিষ্কিন্দা মাশান, টসা মাশান, বহতা মাশান, শূর মাশান, কাল মাশান, যখা মাশান, কালী মাশান, সিংহ মাশান, নাঙ্গা মাশান, কুহুলিয়া মাশান প্রভৃতি অনেক রূপে মাশানগণ পুণ্ড্র অঞ্চলে পূজিত হন। মাশান সাধারণত ভীষণ মূর্তি, নীলবর্ণ, লম্বোদর। তাঁর দৃষ্টি বিস্ফারিত ক্রুদ্ধ। এই ক্রুদ্ধ রূপ, নীলবর্ণ ও মোটা পেট বজ্রযানে অক্ষোভ্যকুলে মহাকাল, ভৈরব প্রমুখের বৈশিষ্ট্য ছিল। এই অক্ষোভ্য কুলের দেবমণ্ডলী কালীসাধনার বর্তমান রূপটির নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। সম্ভবত মাশান পূজার আদি ধারাও পাল-সেনযুগের সেই তন্ত্রের সাধনক্রমের থেকেই প্রকাশ পেয়েছিল।
অধিকাংশ মূর্তিতে মাশান ঠাকুরের মাথায় ঝাঁকড়া চুল, মুখে গোঁফ, কপালে ফেট্টি বাঁধা, হাতে গদা। বাহন কখনো শোলমাছ, কখনো কচ্ছপ, কখনো শূকর, কখনো ভেড়া, কখনো হাতি, কখনো সিংহ। মাশান ঠাকুরের এই অদ্ভুত বাহন বৈচিত্র্য দেখে চৌষট্টি যোগিনীদের মণ্ডলের কথা মনে আসে। যোগিনীদের ও বিচিত্র বাহন, বিচিত্র সজ্জা, কেউ পশুমুখী, কেউ পক্ষীমুখী, কেউ উগ্র, কেউ সৌম্য। এবং যোগিনীগণ ও মাশানদের মতোই মাতৃকার সহচরী। সেক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন মনে আসে। যোগিনীদের মণ্ডলে মাতৃকার এমন অনেক রূপ আছে, যেগুলি প্রাগৈতিহাসিক সময়ে পূজিত হতো। যোগিনীদের মণ্ডল তাই এক অর্থে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত মাতৃকার বিভিন্ন রূপের এক অপূর্ব সংকলন। মাশান ঠাকুরদের ক্ষেত্রেও কি তাই? অতীত থেকে আজ অবধি মায়ের ভীষণ সহচরদের যে বিবর্তন, তাই দিয়েই কি এত বিচিত্র মাশান ঠাকুরের উদ্ভব? উদাহরণস্বরূপ নিষ্কিন্দা মাশানের যে রূপ দেখি, ঘাড়ের পরিবর্তে দেহের মাঝখানে বিশাল মুখমণ্ডল এবং তাকে ঘিরে হাত পা, এই রূপ প্রাগৈতিহাসিক মূর্তি নির্মাণশৈলীর সাথে আশ্চর্য সাদৃশ্য বহন করে।
মাশান ঠাকুরেরা সাধারণত বট বা শ্যাওড়া গাছের নিচে বা পাকা দেওয়াল ঘেরা টিনের ঘরে পূজিত হন। মাশানের নারী রূপকে মা কালী রূপেই পূজা করা হয়। এমনকি মাশানের কোপে আক্রান্ত মানুষকে সুস্থ করার জন্য পূজারী যে মন্ত্র বলেন, সেখানেও বলা হয়,
এসো কালী বসো চালে
কথা কও কর্ণমূলে
এর থেকে বোঝা যায় রূপভেদে মাশান ঠাকুর মা কালীর ই তত্ত্ব ধারণ করেন। আদিমাতৃকার কোনো লিঙ্গভেদ হয় না। তিনি “কখনো পুরুষ কখনো প্রকৃতি কখনো শূন্যাকার”।
মাশানের মতোই বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে ক্ষেতরাল ঠাকুর পূজিত হন। নাম থেকেই বোঝা যায়, ইনি ক্ষেত্রপাল। অতীতের কোনো মাতৃপীঠের ভূমি রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। পীঠ লুপ্ত হয়ে গেলেও তাঁর উপাসনা লোকসমাজে থেকে গিয়েছে। সেনযুগের সদুক্তিকর্ণামৃত থেকে জানা যায়, সেই সময়েও রক্ত ও বলি উৎসর্গ করে ক্ষেত্রপালের পূজা পল্লীসমাজে জনপ্রিয় ছিল।
ভাণ্ডারনী দেবী
পুণ্ড্রে দুর্গাপূজার ঠিক পরেই দশমীর দিন মা ভাণ্ডারনীর পূজা হয়। মায়ের রূপ দুর্গার মতোই, কিন্তু বাহন বাঘ। তিনি কোথাও শারদীয়া মহিষমর্দিনী দুর্গারই রূপ, কোথাও মা দুর্গার বোন। আমরা বলতে পারি, তিনি দুর্গার এক প্রাচীন সাধনক্রমের সাথে যুক্ত।
সিন্ধু সভ্যতায় মায়ের বাহন রূপে বাঘকে দেখা যায়, সিংহকে নয়। একটি সিলে মা দুটি বাঘের মাঝে দাঁড়িয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্য একটি সিলে মাতৃকা ব্যাঘ্রবাহিনী। দুই হাতে দুটি অস্ত্র নিয়ে acacia জাতীয় কাঁটাগাছের নিচে তাঁর অধিষ্ঠান। মুখমণ্ডল করাল। কাঁটাগাছের নিচে মাতৃকার এই অধিষ্ঠান যে দেবীর কথা মনে করিয়ে দেয়; তিনি হলেন বনদুর্গা বা কান্তারদুর্গা। ইনি বাঙালির এক লৌকিক দেবী এবং এই দেবীই পূর্ববঙ্গে বুড়িঠাকুরাণী, উত্তরবঙ্গে ভাণ্ডারণী/ভাণ্ডালী ও দক্ষিণবঙ্গে নিস্তারিণী নামে পরিচিত । শেওড়া বাবলা বা শমী গাছে এঁর পূজা করেন বাঙালি নারীরা। এঁর পূজায় লৌকিক আরণ্যক সমাজের বলিদান ও উন্মত্ত নৃত্যের কথা সেনযুগের সদুক্তিকর্ণামৃতে পাওয়া যায়।
তৈস্তৈর্জীবোপহারৈর্গিরি কুহরশিলা সংশ্রয়ার্মচরিত্বা
দেবীম্ কান্তারদুর্গাম্ রুধিরমুপতরু ক্ষেত্রপালায় দত্বা
তুম্বীবীণা বিনোদব্যবহৃত সরকামহ্নি জীর্ণে পুরাণীং
হালাং মালুরকৌষের্যুবতি সহচরা বর্বরাঃ শীলয়ন্তি।।
বর্বর গ্রাম্যলোকেরা নানা জীববলি দিয়ে পাথরের পূজা করে; রক্ত দিয়ে বৃক্ষতলে কান্তারদুর্গার পূজা করে; ক্ষেত্রপালের উপাসনা করে; দিনের শেষে যুবতী সহচরীদের নিয়ে তুম্বীবীণা বাজিয়ে নাচগান করতে করতে বেলের খোলায় মদ্যপানে মত্ত হয়।
হারাধন দত্ত মহাশয় বাঙালির বনদুর্গা উপাসনার বিষয়ে চমৎকার আলোচনা করেছিলেন “বনদুর্গা” প্রবন্ধে। বনদুর্গা শিশুদের রক্ষাকারিণী। তাঁর অধিষ্ঠান শেওড়া গাছে; ভূত প্রেতাদি অনুচরের সাথে। তাঁর পূজায় স্মার্ত বিধানের চেয়ে ব্রতকর্মের গুরুত্ব বেশি।
বনদুর্গাকে তন্ত্রে দ্বাদশ দানব বা বারো ভূতের জননী বলা হয়েছে। মায়ের কন্যার নাম রণযক্ষিণী, ১২ পুত্রের নাম কৃষ্ণকুমার, পুষ্পকুমার, রূপকুমার, হরিপাগল, মধুভাঙ্গর, রূপমালী, গাভুরডলন, মোচরাসিংহ, নিশানাথ, সূচিমুখ, মহামল্লিক ও বালিভদ্র। নামগুলির প্রতিটিই বাঙালির প্রাচীন নাম, রূপকথায় ব্রতকথায় এমন নাম দুর্লভ নয়।
ধ্যান অনুযায়ী বনদুর্গা করালবদনা; তাঁর কেশ ঊর্ধ্বমুখী;ত্রিনেত্র রক্তবর্ণ, সর্বদাই মত্ত ভাব। আমরা আগেই বলেছি পূর্ব ভারতের অবৈদিক ব্রাত্য সংস্কৃতিকে অসুরভাষী বলা হতো। সম্ভবত সেই কারণেই মায়ের সহচররা দানব বা ভূত বলে উল্লিখিত হয়েছেন।
উপসংহার
এভাবেই তন্ত্র ও মাতৃসাধনার বিভিন্ন দিককে নিজের মধ্যে ধারণ করে পুণ্ড্র অঞ্চল হয়ে উঠেছে মাতৃপূজক বাঙালির সংস্কৃতির এক অভিজ্ঞান। আবার পুণ্ড্র নিজেই মাতৃসাধনার বহু ধারাকে প্রভাবিত করেছে। পৌণ্ড্রীক পুণ্ডরীক নামের স্পর্শ লেগেছে বাঙালির বলাকামাতৃকার চরণ থেকে পদ্মের শুভ্রতা পর্যন্ত। এখানে সতীপীঠে মাতৃসাধনার সুপ্রাচীন অনুষঙ্গ আছে। তন্ত্রের স্বর্ণযুগের সাক্ষী হয়ে চামুণ্ডা আছেন, চণ্ডী আছেন। আছেন মাশান ঠাকুর, পুণ্ড্রাসুর ও ভাণ্ডারনী বনদুর্গা। বৈদিক পৌরাণিক যে ভূমির সংস্কৃতিকে স্পর্শ করতে পারে না, যে ভূমির আখ ধনুক রূপে ধারণ করেন বিশ্বজননী, অবৈদিক ব্রাত্য সমাজের সেই পুণ্ড্র অঞ্চল তার নিজ গৌরবেই বঙ্গজননীর মুকুটের এক চিরভাস্বর রত্ন।
★ ★ ★ ★ ★