হেমন্তের অল্প কুয়াশার পেলব চাদরের সুখনিদ্রা ছেড়ে ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙছে মাঠভরা সোনালি ধানের। ঊষার নরম আলো সেই সোনার ফসলে ছড়িয়ে দিচ্ছে সোনালী রোদ। মাটির সোনা আকাশের সোনায় একাকার। আর সেই ধানের আগায় শিশিরের ফোঁটাগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন মহার্ঘ মুক্তা বৈদুর্যের সমাহার। হালিক করসুগমা এসেছেন কাস্তে হাতে। প্রৌঢ় হলেও বলিষ্ঠ শরীরে অফুরন্ত কর্মোন্মাদনা। কোমরে খাটো ধুতি। সঙ্গে পরিবারের সকলে। হালিক মহাশয়ের ছেলে, মেয়ে, বৌমা, জামাই, নাতি, নাতনি সব মিলিয়ে পরিবারটি যথেষ্ট বড়ো। আজ সকলেই ধান কাটবেন। শুধু হালিক মহাশয়ের নয়নের মণি ছোটো নাতনিটিকে ছাড়া। কারণ তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। তার নাম শ্রী। সে হাতে ধরে আছে মাটির মা লক্ষ্মীর একটি ছোট্ট মূর্তি। ধানেই মা লক্ষ্মীর বাস। এই ধানই কৃষকের ঘরে বয়ে আনে সোনা। করসুগমা অত্যন্ত ধনী কৃষক। এক কোটি হাল আছে তাঁর ঘরে। গঙ্গে নগরীর উপকন্ঠে গঙ্গাতীর বরাবর যতদূর দৃষ্টি পড়ে; ততদূর তাঁর ক্ষেত্র বিস্তৃত। আজ মুঠ সংক্রান্তি। শুদ্ধ ভাষায় মুষ্টি সংক্রান্তি। সূর্য তুলারাশি ছেড়ে বৃশ্চিকে প্রবেশ করবেন এবার। আজ তাঁদের ধান কাটার সূচনা। সকলে প্রথমে ধানের একটি করে গোছা কাটবেন। তারপর সেই ধানের গুচ্ছকে স্তূপীকৃত করা হবে। করসুগমা কড়ির পুঁটলিটা উপুড় করে দেবেন তার সামনে। সেই কড়ি আর ধানের স্তূপই তো মা ধান্যলক্ষ্মী। কপালে সিঁদুর পড়বেন সকলে। মৃদঙ্গ বাজিয়ে নাচগান হবে। তারপর শুরু হবে কর্মকাণ্ড। রাশি রাশি ধান কাটা হবে। আজ হালিক মহাশয়ের বাড়িতে কলার পাতায় ভাত আর রুই মাছের ঝোল খাওয়ার জন্য গঙ্গের সব কৃষক পরিবারের নিমন্ত্রণ আছে। ধান বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষেত্রের শেষে অশ্বত্থ গাছের নিচে বাঁধা আছে হালিক মহাশয়ের প্রিয় হাতি মেঘবরণ। সার্থকনামা বটে। যখন পর্বতের মতো বিশাল শ্যামবর্ণ কলেবর নিয়ে দোদুলগতিতে চলে তখন দূর থেকে সত্যিই মনে হয় যেন বর্ষার নীল মেঘমালা কোন মন্ত্রবলে সচল হয়ে উঠেছে। আপাতত মেঘবরণ পরম আহ্লাদে দুটো কলাগাছ উদরস্থ করছে। আজ তাকে বিশেষ যত্নে সাজানো হয়েছে। হালিক বাড়ির গৃহিণী সুসীমা নিজের হাতে হলুদ আর চন্দন দিয়ে ফুলের অলঙ্করণ এঁকে দিয়েছেন তার সর্বাঙ্গে। মাঠে ততক্ষণে করসুগমার পিতৃব্য বৃদ্ধ গলদন মা লক্ষ্মীর গাথা গাইতে শুরু করেছেন। করসুগমা প্রথম ধানের মুঠটি কাটলেন। শঙ্খধ্বনি শুরু হল। সকলে আভূমিলুন্ঠিত হয়ে প্রণাম করলেন। আর চোখের ভুল কিনা জানে না; তবে ছোট্ট শ্রীর মনে হল একটু দূরে ধানের জমি যেখানে নদীর সাথে মিশেছে; সেখানে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে।মুখখানি ঠিক তার মায়ের মতো। গায়ের রঙ যেন কাঁচা সোনা। মাথার খোঁপায় ধানের শিষের মুকুট। সন্ধ্যামণি পুজোর সময় তার মা তার মাথায় যেরকম ধানের মুকুট পড়িয়ে দেন; তার চেয়েও সুন্দর। হাতে দুটো মাছ। মুখে কি মিষ্টি হাসি। তাদের সকলের দিকে অপলকে চেয়ে আছে সেই মেয়ে। ঠিক তার হাতে ধরা মূর্তিটার মতো। আর ঠিক সেই সময়েই আকাশে বাতাসে অণুরণিত হল মেঘবরণের বৃংহণ। সেও কি দেখেছে সেই সোনার বরণ কন্যেকে?

[গত পরশু ছিল মুষ্টি সংক্রান্তি। নবান্নের ধান কাটার সূচনা হয় এইদিনে। ২২০০ বছর আগের গঙ্গারিডি যুগের বাঙালির মুঠ সংক্রান্তির একটি সম্ভাব্য রূপরেখা আঁকার চেষ্টা করলাম। ছবিতে গঙ্গারিডির মাতৃকা ধান্যমৎস্যা আর সেদিনের কৃষকদের ধান কাটার দৃশ্য। দুটিই চন্দ্রকেতুগড়ে পুরাতাত্ত্বিক উৎখননে প্রাপ্ত। সময়কাল আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক।]

রক্তিম মুখার্জী

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান