নিত্যানন্দ স্মরণে

বিপুল-পুরট-ধামা কঞ্জদৃকপাদপাণিঃ
শুভদসুখদনামা কর্ণহৃদ্ধারিবাণিঃ
জলধরমদমোষে ডম্বর দিব্যবেশ
কুমল-হৃদয়কোষে ভাতু মে জাহ্নবেশঃ।।

পদ্মের মতো হস্তপদ, বিশাল কলেবর, পুণ্যনাম, “কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া” হৃদয়কে ধন্য করে দেয় এমন বাণী, বর্ষার মেঘের মতো বা রুদ্রের ডম্বরুর মতো গম্ভীর হুঙ্কার, লীলাবশে ধরেছেন দিব্যবেশ। জাহ্নবা দেবীর সেই হৃদয়বল্লভ মলিন হৃদয়কোষে প্রকাশিত হোন।

মঙ্গলাচরণের এই শ্লোকটি পেয়েছি হরিদাস দাস মহাশয়ের গৌড়ীয় বৈষ্ণব অভিধান থেকে।

আজ বাঙালির প্রেমের হাটের রাজা নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি। তিনি অবধূতশ্রেষ্ঠ; তন্ত্রের মহাসাধক। মস্তকে ধারণ করেছেন ত্রিপুরাসুন্দরীর তত্ত্ব। তাঁর হরিনামের হুঙ্কারে কম্পিত হয়েছে মধ্যযুগের অত্যাচারী শাসক আর পথভ্রষ্ট সমাজপতিদের কুচক্র। তিনি পরম মমতায় সমাজে স্থান দিয়েছেন পাল-সেনযুগের তন্ত্রধারার উত্তরাধিকারী বাউল, সহজিয়াদের। জগাই মাধাইয়ের কলসির কানার আঘাতকে হেলায় অগ্রাহ্য করে হয়ে উঠেছেন সেই মহাকরুণার অবতার; যে মহাকরুণার পথেই একদিন বাঙালি সিদ্ধাচার্য তারা, লোকনাথ, প্রজ্ঞাপারমিতার সাধনা করেছিল।
তিনি চৈতন্যদেবের অভিন্নহৃদয় সহচর। তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের কর্ণধার। তাঁর তত্ত্ব বোঝা বড়ো দায়। শ্রীবাস অঙ্গনের রুদ্ধদ্বার কীর্তনকে তিনিই নবদ্বীপের পথে নিয়ে এসেছিলেন। গৃহী সাধকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সন্ন্যাসের পথ ত্যাগ করে বসুধা ও জাহ্নবা দেবীর সাথে বিবাহ করেছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে নারীদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী। চৈতন্যজীবনী কাব্যসমূহের গ্রন্থনায় সূত্রধর রূপে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তাঁর ধর্ম কঠোরতায় মলিন নয়; আনন্দের সমস্ত বর্ণে বর্ণময়। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর প্রধান সহচর দ্বাদশ গোপালের মাধ্যমে মধ্যযুগের বিধ্বস্ত বাঙালির কাছে তিনি সার্বভৌম রাজার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বাঙালি মহাজাতির পুনরুত্থানে তাঁর ভূমিকা সহস্র মুখেও বলে শেষ করা যায় না। তিনি ছিলেন বলেই আঘাতে আঘাতে দীর্ণ বাঙালি অত্যাচারী শাসককে বলতে পেরেছিল: ঝাট কৃষ্ণ বোল নইলে ছিণ্ড এই মাথা। খড়দহের শ্রীপাটে তিনি শারদীয়া কাত্যায়নী দুর্গার পূজা প্রচলন করেছিলেন। বুঝিয়েছিলেন বাঙালির শাক্ত আর বাঙালির বৈষ্ণব দুই ধারাই তন্ত্রের সূত্রে বাঁধা। পানিহাটির মহোৎসবে ছত্রিশ জাতির সমন্বয় ঘটিয়ে বাঙালির আদি সমাজভাবনার পুনরুদ্ধার করেছিলেন।
তাঁর নাম নিতে উদ্ধারণ দত্ত, রঘুনন্দনের মতো বিত্তবান থেকে বৃন্দাবনদাস, কৃষ্ণদাস কবিরাজের মতো নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব সাধক, শাক্ত, বাউল, ফকির, সহজিয়া সবাই একাকার হয়ে যান। আজও সহজিয়া বাউল পদ ধরেন:
হরিনাম দিয়ে জগত মাতালে আমার একলা নিতাই

রক্তিম মুখার্জ্জী

বজ্রশারদার তত্ত্ব নিরূপণ

বজ্রসারদা। পালযুগের বাঙালির আরাধ্যা সরস্বতীর বজ্রযানী রূপ। হৃদয়ের বিশ্বপদ্মে চন্দ্রমণ্ডলের আভার মধ্যে তাঁকে ধ্যান করতেন সেযুগের মনস্বী সাধক। দেখতেন দেবীর প্রতিটি রোমকূপ থেকে প্রজ্ঞারশ্মির অমল প্রভার বিচ্ছুরণ। তিনি মহাবুদ্ধিবীজাঙ্কুরশ্রী অর্থাত মেধার তথা মানবচেতনার মহত্তম স্তরের উৎসরূপে বন্দিত হয়েছেন সাধনমালা গ্রন্থে।

নিচের ছবিটি নালন্দা মহাবিহারে প্রাপ্ত পালযুগের বজ্রশারদার। চার বছর আগে তুলেছিলাম। বর্তমানে নালন্দায় পুরাতত্ত্ব বিভাগের মিউজিয়ামে আছে। নালন্দা শব্দের অর্থে পদ্মের ব্যঞ্জনা নিহিত আছে। একদা বাঙালির যে জ্ঞানপীঠ সমগ্র জগতকে আলো দিয়েছিল; প্রজ্ঞার দেবী যেখানে অগণিত জ্ঞানতপস্বীর চেতনায় ধরা দিয়েছিলেন; সেখানেই তাঁর এই বিগ্রহ পূজিত হতো সেই স্বর্ণযুগে। এখানে দেবী চার সহচর পরিবৃত হয়ে বসে আছেন; ঠিক আমাদের শারদীয়া দুর্গার সপরিবার মূর্তির মতো। সারদা ও শারদার তত্ত্বে বিশেষ ব্যবধান তন্ত্রে নেই। বানানের দিক থেকেও বজ্রসারদা বহু স্থানেই বজ্রশারদা রূপে উল্লিখিত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সাধনমালায় দেবীর এই সহচরদের উল্লেখ নেই। যে শিল্পী এই মাতৃপ্রতিমা নির্মাণ করেছিলেন তিনিই এই মণ্ডলের রচনা করেছেন। এবং এই মণ্ডল মাতৃসাধনার প্রাচীন ধারার এক ধ্রুব বৈশিষ্ট্যকেই প্রকাশ করেছে। সাঙ্খ্যের পঞ্চ তন্মাত্রা, মহাযানের পঞ্চ তথাগত, ভাগবতধর্মের পঞ্চ বৃষ্ণিবীরের উপাসনা, পাঞ্চরাত্র উপাসনা, বৈদিক সাহিত্যে পঞ্চজনের দ্বারা সরস্বতীর উপাসনা, চার সন্তানের মাঝে গঙ্গারিডির দশায়ুধা মাতৃকার উপাসনা সবই সেই আদি ধারাটিরই ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তি। আজও শ্রীপঞ্চমীতেই মহাশ্বেতার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তন্ত্রের আদিমাতৃকার প্রজ্ঞাময়ী বিগ্রহ সরস্বতীর সর্বময়তা বর্ণিত হয়েছে একটি অপূর্ব শ্লোকে:

“তারা ত্বং সুগতাগমে ভগবতী গৌরীতি শৈবাগমে।
বজ্রা কৌলিকশাসনে জিনমতে পদ্মাবতী বিশ্রুতা।।
গায়ত্রী শ্রুতশালিনাং প্রকৃতিরিত্যুক্তাসি সাংখ্যযানে।
মাতর্ভারতি কিং প্রভূতভণিতৈর্ব্যাপ্তং সমস্তং ত্বয়া।।”

সুগতাগমে তুমি মা তারা। শৈব আগমে তুমি মা ভগবতী গৌরী। কৌলিক শাসনে তুমি মা বজ্রা। জৈনমতে তুমি মা পদ্মাবতী। বৈদিকের কাছে তুমি গায়ত্রী, সাংখ্য দর্শনে তুমি প্রকৃতি। হে মা সরস্বতী, বেশি বলে আর কি হবে, সমস্তই তোমার দ্বারা ব্যাপ্ত।

তিনিই বেদে “অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে” বলে সম্বোধিতা। বাক রূপে; গৌরী রূপে ইনিই অক্ষর জুড়ে জুড়ে ছন্দ সৃষ্টি করেছেন।

গৌরীমির্মায় সলিলানি তক্ষতীর্
একপদী দ্বিপদী সা চতুস্পদী
অষ্টাপদী নবপদী বভূবুষী
সহস্রাক্ষরা পরমে ব্যোমন্।।

জল কেটে কেটে গৌরী নির্মাণ করলেন- একপদী দ্বিপদী চতুষ্পদী অষ্টাপদী নবপদী – পরমব্যোমে সহস্রাক্ষর হতে ইচ্ছা করে।

সেখানে তিনি গৌরী। তাঁর এই বর্ণাত্মিকা জলময়ী রূপের সূক্তটিকে সুকুমার সেন মহাশয় বলেছেন: “প্রহেলিকাময় এবং অত্যন্ত দুর্বোধ্য, প্রায়-আধুনিক কালের যোগীদের আর্য্যা- তর্জার মতো।”

অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ সরস্বতীর তিন প্রাচীন রূপের সন্ধান পেয়েছেন- ইড়া ভারতী ও সরস্বতী। জলরূপা মাতৃকা ও বাক তথা বর্ণাত্মিকা মাতৃকার এই সংযুক্তির ধারা তাম্রাশ্মযুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিদ্যমান। সর্পমাতৃকা জগতগৌরীও এই সূত্রেই হংসাসনা সরস্বতীর সাথে একাত্ম হয়ে আছেন। তিনিই নীলসরস্বতী তারা; উপমহাদেশের নীলবর্ণা কালরূপা মাতৃকার এক মধুর বিগ্রহ। অজ্ঞানতার বিষে মৃতপ্রায় চেতনাকে তিনিই সঞ্জীবিত করেন।

সরস্বতী উপমহাদেশে স্মরণাতীত কাল থেকে পূজিতা। তাঁর নামটি পর্যন্ত সেই আদিকাল থেকে এখনও অবিকৃত। গৌড় সারস্বতগণ ( পরবর্তী সময়ের সাতশতী) সুদীর্ঘকাল তাঁর উপাসনার গৌরব জাতিগতভাবে ধারণ করেছেন। তিনি নদীরূপা, তিনি বাকরূপা। বাঙালির জ্ঞানপীঠ থেকে কবির রসনা সর্বত্রই তাঁর নিত্য অধিষ্ঠান। পদকর্তা নীলকণ্ঠের ভাষায়:

প্রভাতে কুমারী মধ্যাহ্নে যুবতী
সায়াহ্নে বৃদ্ধারূপা হও নিতি নিতি
নবদ্বীপধামে নীলসরস্বতী
নীলকণ্ঠের কন্ঠে আনন্দদায়িকে

তথ্য কৃতজ্ঞতা তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়।

আনন্দময়ী কালী; কালীপূজা আনন্দের সাধনা

মা কালীর পূজা আর কৃচ্ছ্রসাধনকে অনেকেই এক করে ফেলেন। কালীপূজা মানেই সমস্ত দিন উপবাস, কঠোর বিধিনিয়ম, সংযমের আতিশয্য, শরীর পাতনের সংকল্প। এমনটাই ধারণা আমাদের সমাজের সিংহভাগ মানুষের। কিন্তু …. মায়ের পূজার তন্ত্রোক্ত বিধি কি আদৌ তাইই বলে?

বাঙালির তন্ত্রের কেন্দ্রে আছেন মা কালী। কলৌ কালী কলৌ কালী কলৌ কালী ন সংশয়:। আর কালীকেন্দ্রিক এই তন্ত্রধর্মের নামকরণের অগণিত ব্যাখ্যার একটি হল : ” তনুকে ত্রাণ করা।” যদিও এটি অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন ব্যাখ্যা। তন্ত্রের আদি অর্থ তন্তু বা weaving এর সাথে সংযুক্ত। প্রকৃতির সমস্ত শৃঙ্খলা, মানবদেহ ও চেতনার সমস্ত নিয়মের নির্যাসই এই তন্ত্রধর্মের প্রাণ। তাই যে ব্যাখ্যাই ধরি না কেন; তন্ত্রে সব অর্থেই দেহকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তন্ত্র মতে:
“ব্রহ্মাণ্ডে যে গুণা সন্তি তে তিষ্ঠন্তি কলেবরে”
বাঙালি সাধকের ভাষায়:
যাহা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তাহাই আছে দেহভাণ্ডে
এই দেহ মায়ের অধিষ্ঠান। কালীকিঙ্কর কবিরঞ্জন রামপ্রসাদের পদে আমরা তার সোচ্চার ঘোষণা শুনি:
“আনন্দে রামপ্রসাদ রটে মা বিরাজে সর্বঘটে
ঘটে ঘটে যত রূপ মা আমার সে রূপ ধরে”

উপমহাদেশে যত সুপ্রাচীন শক্তিপীঠ আছে; তন্ত্র তাদের প্রতিটির দ্যোতনা খুঁজে পেয়েছে মানবদেহে। এই তত্ত্বটি কৌলাচারে তোড়লতন্ত্রে এভাবে প্রকাশিত হয়েছে:

মূলাধারে কামরূপ, হৃদয়ে জলন্ধরপীঠ, তার ঊর্ধ্বে পূর্ণগিরি ও উড্ডিয়ান। ভ্রূমধ্যে বারাণসী। নেত্রে জ্বালামুখী। মুখে মায়াবতী।

এ হেন তন্ত্রমার্গে মা কালীর উপাসনা কখনোই শরীরকে ক্লেশ দিয়ে সম্ভব নয়।

রামপ্রসাদের পদে আমরা দেখি:

চব্য চোষ্য লেহ্য পেয় যত রস এ সংসারে
আহার করো মনে করো আহুতি দেই শ্যামা মা’রে

এটাই হল তন্ত্রের মানসপূজার তত্ত্ব। তোমার দেহে মায়ের অধিষ্ঠান। যা কিছু তোমার প্রিয়; তোমার শরীরের পুষ্টির জন্য আবশ্যক; তার আস্বাদনের মাধ্যমেই জগতজননীকে তৃপ্ত করো। অনাবশ্যক উপবাস, অতি অল্পাহারের ক্লেশ এই পথে একান্তই নিরর্থক। বরং এই জগতে আনন্দের যে অপূর্ব ধারা বয়ে যাচ্ছে; তার বারংবার আস্বাদন এবং তার গভীরে যে অপূর্ব প্রজ্ঞা নিহিত আছে; বারংবার তার উপলব্ধির পথেই তন্ত্রে কৈবল্যের বিধান আছে। কৌলমার্গের সেই সুবিখ্যাত শ্লোক এই প্রসঙ্গে স্মরণ করি:
পিত্বা পিত্বা পুনঃ পিত্বা পপাত ধরণীতলে
উত্থিত্বা চ পুনঃ পিত্বা পুনর্জন্মং ন বিদ্যতে

কৌলমার্গে তো এমন নির্দেশও আছে যে উপবাসক্লিষ্ট অশক্ত দেহে যে কালীপূজা করে সে কখনোই অভিষ্ট লাভ করে না।

সহজযানের সিদ্ধাচার্যরাও একই কথা বলেছেন। সরহবজ্র জটিল ধর্মাচরণের অনর্থক পরিশ্রমকে তিরস্কার করে বলেছেন:

এস জপ হোমে মণ্ডল কম্মে
অনুদিন আচ্ছসি বাহিউ ধম্মে
তো বিন তরুণী নিরন্তর নেহে
বোহি কি লবভই প্রণ বি দেহে

এই হোম, মণ্ডল রচনার কঠিন বিধি তোমাকে ধর্মের বহিরঙ্গেই আটকে রাখে। এই দেহে বোধিলাভ তখনই সম্ভব; যখন সেই তরুণী স্নেহধারা বর্ষণ করেন। এই তরুণীই অদ্বৈতা আদিমাতৃকা; বাঙালির মা কালী।

আমাদের তন্ত্রধর্ম; আমাদের মা কালীর সাধনা আমাদের নিঃশ্বাসের মতোই জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। জগতবিচ্ছিন্ন হয়ে; প্রকৃতির স্বাভাবিক গতির বিরুদ্ধাচরণ করে মর্কট বৈরাগ্যকে তন্ত্র সযত্নে পরিহার করেছে। এই পথ এতটাই জীবনসম্পৃক্ত যে অনায়াসেই বস্তুবাদী ধারণা আর গূঢ় তত্ত্বকে আমরা একাকার করতে পারি। ঐহিক চেতনায় যা সুখদায়ক বলে পরিচিত; সেই মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুনকেই আমরা পঞ্চ ম কারের তত্ত্বে মাতৃসাধনার সোপানে পরিণত করি। আমাদের চর্যাপদের কবি পদ্মার খালে বজ্রনৌকা চালনা করে আত্মোপলব্ধির সর্বোচ্চ পর্যায়কে বঙ্গালী নাম দেন।

পুণ্যের জন্য সুদূর তীর্থে পাড়ি দেওয়াকেও তন্ত্রে অপ্রয়োজনীয় বলা হয়েছে।
তীর্থভ্রমণ দুঃখসাধন মন উচাটন হয়ো না রে
তুমি আনন্দত্রিবেণীর মূলে শীতল হও না মূলাধারে

সাধক কবি রামপ্রসাদ গেয়েছিলেন।

আবার সাধক কমলাকান্তের মৃত্যুকালে যখন বর্ধমানের রাজা তেজশ্চন্দ্র তাঁকে গঙ্গাতীরে নিয়ে যেতে চান; তখন সাধক কমলাকান্ত বলেছিলেন:

আমি কেন কি কারণে গঙ্গাতীরে যাব?
কেলে মায়ের ছেলে হয়ে বিমাতার কি শরণ লব?

অর্থাত সহজ পথে স্থির থাকো। কালীতত্ত্বে অটল থাকো। আর কিছুই দরকার নেই। এই পথে চলেই রাণী রাসমণি কাশীযাত্রা না করে বাংলার বুকে তন্ত্রপীঠ দক্ষিণেশ্বরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে শারীরিক ক্লেশ, জটিল আচার, ক্লান্তিকর যাত্রা কোনো কিছুই তন্ত্রের অপরিহার্য অঙ্গ নয়। মায়ের এই সাধনমার্গ বড়ো সরল; বড়ো ঋজু। অহেতুক জটিলতার দুর্গম পথে তাঁকে পাওয়া যায় না। কালী ধরা দেন প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিতে; একান্ত সহজ পথেই।

উজুরে উজু ছাড়ি মা জাহু রে বঙ্ক
নিঅড়ি বোহি মা জাহু রে লঙ্ক

© কালীক্ষেত্র আন্দোলন

আলিপুর মিউজিয়াম: অগ্নিযুগের ইতিহাস

“সকল দেশেই জন-কতক লোক থাকে মা, যাদের জাতই আলাদা….. দেশের মাটি এদের গায়ের মাংস, দেশের জল এদের শিরার রক্ত; শুধু কি কেবল দেশের হাওয়া-আলো, – এর পাহাড় পর্বত, নদীনালা, চন্দ্রসূর্য যেখানে যা কিছু আছে- সব যেন সর্বাঙ্গ দিয়ে এরা শুষে নিতে চায়! বোধহয় এদেরই কেউ কোন্ সত্যকালে জননী- জন্মভূমি কথাটা প্রথম আবিষ্কার করেছিল।” ( পথের দাবি; শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

এক শতাব্দী প্রাচীন কারাগার তার দৈত্যাকার প্রাচীর, পাথরে বাঁধানো রাস্তা, প্রকাশ্য ফাঁসিমঞ্চ আর দমবন্ধ ছোট্ট কুঠুরির অন্ধকার নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। সেই কারাগারের প্রতিটি কোণে বন্দি প্রাণের দীর্ঘশ্বাস, অত্যাচারিতের হাহাকার আর অসহায়ের অশ্রুজল জমে আছে পুঞ্জীভূত হয়ে। তবুও আজ তার অপূর্ব মহিমা। আজ তার প্রতিটি ধূলিকণা তীর্থের রজের মতো পবিত্র। আজ সেই কারাগারে বন্দেমাতরম ধ্বনিত হলে চাবুকের বন্যা নামে না; নীরবে অশ্রুর মালা গাঁথা হয় দর্শকদের চোখে। আর যাঁদের জন্য এই অসাধ্যসাধন সম্ভব হয়েছে; তাঁরা কালসমুদ্রের অপর পারে মৃত্যুঞ্জয়ীর সিংহাসনে চিরগৌরবে অধিষ্ঠিত।
বলছি ব্রিটিশ ভারতের কলকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের কথা। এখন যার পরিচিতি আলিপুর জেল মিউজিয়াম। তারই ওয়ার্ড নং চার, পাঁচ, ছয় ও সাতে রাখা হতো পরাধীন দেশের রাজনৈতিক বন্দিদের। পাশেই জেল হাসপাতাল। অমানুষিক অত্যাচারে, অনাহারে রোগগ্রস্ত বন্দিদের যেখানে মৃত্যুর পথে ঠেলে দেওয়া হতো। এখানেই বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাইকে চিরতরে চুপ করিয়ে দিয়েছিলেন কানাইলাল আর সত্যেন। এই জেলেই আলিপুর বোমা মামলার মুখ্য আসামী অরবিন্দ পেয়েছিলেন আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ। ফাঁসির আগে দীনেশচন্দ্র গুপ্তের কবিতাগুলো শেষবারের মতো আগুন হয়ে জ্বলে উঠেছিল। আরো কত … সব ঘটনার কথাও আজ আমরা জানি না। সেই ঘটনার পিছনের নায়কদের মুখও ঢেকে রেখেছে বিস্মৃতির আঁধার।

তত্ত্বকথা অনেক হল। এবার একটু কেজো তথ্য দিই। মিউজিয়াম খোলা থাকে সপ্তাহে সোমবার বাদে বাকি ছয়দিন; বেলা এগারোটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত। মিউজিয়াম ঘোরার টিকিট অবশ্য পাঁচটার পর আর দেয় না। আমরা যে কয়েকজন বন্ধু আজ গিয়েছিলাম; পাঁচটা দশে পৌঁছেছি বলে মিউজিয়াম দেখার টিকিট জোটে নি। তবে সেটা পুষিয়ে দিয়েছে এখানকার লাইট এণ্ড সাউণ্ড শো। দুটো শো হয় চল্লিশ মিনিটের। একটা সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ছয়টা চল্লিশ; হিন্দিতে। অন্যটা সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাতটা চল্লিশ; বাংলায়। শীতের রাতে আটটা পর্যন্ত বাইরে থাকা কঠিন বলে হিন্দি শোতেই গিয়েছিলাম। শো দেখার জায়গাটা এমনই যাতে সামনের মাঠের অপর পাড়ে উপরিউক্ত চারটি ওয়ার্ড আর জেল হাসপাতাল একসাথেই চোখে পড়ে। প্রোজেক্টারের সাহায্যে অগ্নিযুগের ইতিহাসের অনেকটাই তুলে ধরা হয়েছে; উপযুক্ত নেপথ্য কন্ঠ এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে। পরিবেশনায় নিষ্ঠা ও সদিচ্ছার কোনো খামতি ছিল না। কয়েকটি তথ্যগত ত্রুটি ছিল। ফরাজি আন্দোলনের নেতা দুদু মিঞাকে নীলবিদ্রোহের অগ্রণী নেতৃত্ব দেখানোর চেষ্টা শুরুতেই তালভঙ্গ করেছিল। তবুও বাকিটা যথেষ্ট চলনসই। পূর্ণিমার আলো ভরা খোলা আকাশের নিচে পুরোনো এই কারাগার যেন উগরে দিচ্ছিল তার গর্ভে জমে থাকা সমস্ত ইতিহাসের উত্তাপ। প্রবেশপথ থেকে শো দেখানোর জায়গা পর্যন্ত যাওয়ার আর ফেরার পথদুটোও এমনই যে কারাগারের প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলো ( ফাঁসির মঞ্চ, শহীদ বেদী, কারাগারের কক্ষগুলি) সবই চোখে পড়ে। এক জায়গায় দেখলাম মা দুর্গার একটি বিগ্রহ আছে। এই ভূমির আদিজননী দশভুজা মহিষমর্দিনী রূপে দাঁড়িয়ে আছেন অগ্নিযুগের দেশমাতৃকার প্রতীক হয়ে; ঋষি বঙ্কিমের “মা যা হইবেন” হয়ে। সব দেখতে দেখতে একটাই বেদনা বারবার মনকে বিষণ্ণ করছিল। এত ত্যাগ, এত রক্তের মূল্য কি হল? বাংলাকে স্বাধীনতা দেখতে হল অর্ধেক অঙ্গচ্ছেদের রক্ত মেখে। বাঙালি বিপ্লবীরা দেশের স্বাধীনতা আনার পাহাড়প্রমাণ দায়িত্বের সিংহভাগ বহন করলেন। তবুও স্বাধীনতার পর ব্রাত্য দশা আজও ঘুচলো না। কারণ আমরা আত্মবিস্মৃত, পদদলিত; আমরা বিশ্বমানবিক সাজতে গিয়ে জাতির শক্তিকেন্দ্র নির্মাণের কৌশলই ভুলে গিয়েছি।
ইতিহাস আর উপভোগ্য শো ছাড়াও এখানে একটি কফি হাউস আছে। ইতিহাসের গন্ধ মেখে সুলভে সান্ধ্য আড্ডার উপযুক্ত পরিবেশ। চারিদিকে ইতিহাসের যে পরিমাণ অবমাননা দেখতে পাই; তার বিপরীতে এই মিউজিয়ামে অগ্নিযুগের ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যম সত্যিই সাধুবাদের যোগ্য।

বছরের শীতলতম রাতে ফিরে আসার সময় রীতিমতো কাঁপুনি ধরেছিল আমাদের। তার কতটা শৈত্যের জন্য আর কতটা শিহরণের জন্য; বলা বড়ো কঠিন। মনে পড়ছিল কথাশিল্পীর পথের দাবি উপন্যাসেরই কথাগুলো:

তুমি দেশের জন্য সমস্ত দিয়াছ, তাই তো দেশের খেয়াতরী তোমাকে বহিতে পারে না, সাঁতার দিয়া তোমাকে পদ্মা পার করিতে হয়; তাই তো দেশের রাজপথ তোমার জন্য রুদ্ধ, দুর্গম পাহাড় পর্বত তোমাকে ডিঙাইয়া চলিতে হয়; – কোন্ বিস্মৃত অতীতে তোমারই জন্য তো প্রথম শৃঙ্খল রচিত হইয়াছিল, কারাগার তো শুধু তোমাকে মনে করিয়াই নির্মিত হইয়াছিল, সেই তো তোমার গৌরব! …. দুঃখের দুঃসহ গুরুভার তুমি বহিতে পারো বলিয়াই তো ভগবান এত বড় বোঝা তোমারই স্কন্ধে অর্পণ করিয়াছেন! …. মুক্তিপথের অগ্রদূত! পরাধীন দেশের হে রাজবিদ্রোহী! তোমাকে শতকোটি নমস্কার।

রক্তিম মুখার্জ্জী

বড়িশার চণ্ডীপূজার ইতিহাস

বড়িশার চণ্ডীপূজা এবছর দুশো ত্রিশ বছর অতিক্রম করল। ১৭৯২ সালে সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের সন্তোষ রায়চৌধুরীর বংশধর মহেশচন্দ্র রায়চৌধুরী এই চণ্ডীপূজার সূচনা করেছিলেন। সংক্ষেপে এই চণ্ডীপূজার ইতিহাস নিয়ে কয়েকটি সূত্র পর্যালোচনা করব।

প্রথমেই বড়িশার প্রসঙ্গে বলি। তন্ত্রে দক্ষিণবঙ্গের কালীক্ষেত্র সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ তথ্য আছে। দক্ষিণেশ্বর থেকে আরম্ভ করে বহুলাপুর পর্যন্ত তিন যোজন ধনুকাকার ক্ষেত্রই কালীক্ষেত্র; আজকের কলকাতা। এই ক্ষেত্রে দেবী কালী এবং ক্ষেত্রের আটটি কোণে অষ্টচণ্ডী অধিষ্ঠান করেন। বহুলাপুর আজকের বেহালা অঞ্চল। সেক্ষেত্রে বড়িশার এই চণ্ডীপূজার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য আছে। গঙ্গারিডির সময়কালে খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে এই অঞ্চল কালীগ্রাম নামে পরিচিত ছিল; টলেমির মানচিত্র অনুযায়ী। কালীঘাটে গুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল। সেক্ষেত্রে অষ্টচণ্ডীকে নিয়ে কালীর এই সুবৃহৎ অধিষ্ঠানভূমির ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন।

হরিবংশ অনুযায়ী চণ্ডী হলেন শবর ও পুলিন্দগণের উপাস্য দেবী; বসুবন্ধুর ‘বাসবদত্তা’ অনুযায়ী গঙ্গাতীরে কুসুমপুরে( বর্তমান মগধ ও গৌড়বঙ্গ সংলগ্ন অঞ্চলে) কাত্যায়নীরূপে তিনি শুম্ভনিশুম্ভনাশিনী, প্রণত মহাদেবের জটাস্থিত গঙ্গায় তাঁর চরণ অভিষিক্ত, আবার তিনিই বেতালাভিধানা( বেতাল প্রমুখ ভীষণ অনুচরগণ পরিবৃতা)। বৈন্যগুপ্তের বৈগ্রাম তাম্রশাসনে উত্তরবঙ্গে পূজিতা কোকামুখী চণ্ডী ও কোকামুখস্বামী বিষ্ণু মূর্তির কথা জানা যায়। কোক শব্দের অর্থ বৃক বা নেকড়ে। চণ্ডীতে রক্তবীজের সাথে সংগ্রামের সময় আবির্ভূতা মাতৃকাদের মধ্যে চণ্ডিকা দেবী ছিলেন; যিনি শত শত শিবা অর্থাত শৃগালের মতো চিৎকার করেন। শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয় এঁকেই কোকামুখী বলেছেন। বাঙালির লৌকিক দেবী শিবিখ্যাও সম্ভবত এই শিবামুখী মাতৃকারই রূপভেদ। কোকামুখী বা শৃগালমুখী মাতৃকার সিল মঙ্গলকোটেও পাওয়া গিয়েছে। নীহাররঞ্জন মহাশয় রাজশাহীর ক্ষীরহর গ্রামে প্রাপ্ত খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতকের একটি চণ্ডী মূর্তির কথা উল্লেখ করেছেন; সেখানে দেবী চতুর্ভুজা, বরাভয়া, পদতলে দুই গোধিকা উপবিষ্ট, দেবীর দুই পাশে মঙ্গলসূচক কদলীবৃক্ষ শোভিত। তাঁর মতে বাঙালির প্রকৃতিমাতৃকার অরণ্যচারিণী রূপ এবং শস্যদায়িনী নবপত্রিকা রূপ দুইই এখানে পরিস্ফুট হয়েছে এবং এই ভাবনাই পরবর্তী সময়ে চণ্ডীমঙ্গলের আখেটক খণ্ডে কালকেতুর কাহিনীতে মধুরতর রূপ ধারণ করেছে।

বড়িশার চণ্ডীপূজার ইতিহাস প্রসঙ্গে জানা যায়; সাবর্ণ বংশের মহেশচন্দ্র রায়চৌধুরী নিজের বসতবাটি সংলগ্ন পুকুরে মায়ের অষ্টধাতুর ঘট এবং ডাব পেয়েছিলেন। তাই দিয়েই চণ্ডীর আদি অবয়ব নির্মাণ করে পূজা শুরু করেন নিজের গৃহে। এই রীতি বাঙালির ব্রাত্য সংস্কৃতিতে অত্যন্ত প্রাচীন। মাতৃকা জগত প্রসব করেন। জলরূপে সমস্ত সৃষ্টির বীজ তাঁর গর্ভে নিহিত থাকে। শস্য, বৃক্ষলতা তাঁরই রূপ। তাই ঘট, আমপাতা ও ডাবের সমন্বয়ে তাঁরই আদিরূপ নির্মিত হয়। মঙ্গলঘটের স্বস্তিক চিহ্নটিও তারই প্রতীক।
এই স্ফীতোদর প্রসবরতা আদিজননীর উপাসনা তাম্রাশ্মযুগ এবং গঙ্গারিডির সমকালে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। বেহালার চণ্ডীপীঠ যদি গঙ্গারিডির সমকালীন হন( যেটা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে); তাহলে এই মঙ্গলঘটের রূপে তাঁর উপাসনাকে সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যেরই পুনরুজ্জীবন বলতে হবে।

জগদ্ধাত্রী পূজার ঠিক একমাস পরের শুক্লা অষ্টমীতে বড়িশায় চণ্ডীর বিশেষ পূজা হয়। এই সময় চণ্ডীর যে মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মিত হয়; সেখানে দেবীর বর্ণ উদীয়মান সূর্যের মতো লাল। ত্রিনয়না। চার হাতে বিদ্যা, জপমালা, বর ও অভয়। তিনি পঞ্চমুণ্ডের আসনে অধিষ্ঠিতা। তন্ত্রে এই রূপ পরাবিদ্যা রূপা আদি মাতৃকার। তিনিই বর্ণমালার অধীশ্বরী। আবার এই রূপের সাথে জ্ঞানরূপা মহাবিদ্যা ভৈরবীর সাদৃশ্য আছে। এখানে দেবী চণ্ডীর সাথে অষ্টসখী অবস্থান করেন। চার বা আট সহচরীর সাথে মাতৃকার মণ্ডলের ধারণা তন্ত্রে অত্যন্ত প্রাচীন।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল; চণ্ডী শব্দটি মাতৃকার অগণিত রূপের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়। মা মহিষমর্দিনী দশভুজা দুর্গাও চণ্ডী। তাঁর মন্দিরকে আমরা চণ্ডীমণ্ডপ বলি। ব্রতকর্মে অরণ্যভূমির ঈশ্বরী গোধাবাহনা দ্বিভুজা রূপে মঙ্গলচণ্ডীর পূজা হয়। সপ্তশতী চণ্ডীতে আদিমাতৃকাই চণ্ডী। আবার রক্তবীজ বধের সময়ের চণ্ডিকা শিবামুখী ভীষণা মাতৃকা। সদুক্তিকর্ণামৃতে কালীর সাথে চণ্ডী একাকার। সেখানে কালীর বিশ্বব্যাপী সহস্রবাহু আর করালবদন দেখে কবি ভাসোক চণ্ডী ভৈরবী কালরাত্রির জয়ধ্বনি করেছেন। আবার এক অজ্ঞাতনামা কবি চণ্ডীর স্তব করেছেন এইভাবে:
দেহে যেন একটুও মাংস নেই। তাই অস্থিসমূহ অতি প্রকট। উদর এত শীর্ণ যেন পাতালে প্রবেশ করেছে। চোখ যেন গভীর কূপের তলায় থাকা জলরাশির মতো অতলান্ত। মস্তকে অপূর্ব জটাজুটের অরণ্য। দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা দৈত্যদের চর্বন করতে তিনি ব্যস্ত হয়ে আছেন। সেই উগ্রা তীক্ষ্ম নখযুক্তা; অখণ্ড দন্তরাশিতে হাস্যযুক্তা শোভিতা চণ্ডীকে বন্দনা করি।
এখানে চর্চিকা চামুণ্ডা ও চণ্ডীর একীভবন স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে।
এছাড়া বাংলার সর্বত্র বিভিন্ন স্থানের নামে, নদীর নামে চণ্ডীর অগণিত লৌকিক রূপ আছে। বড়িশার চণ্ডী সুপ্রাচীন কালীক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থিতা। তাঁর মধ্যে তন্ত্রের জ্ঞানদা মাতৃকার অপূর্ব প্রকাশ। তাঁর চণ্ডী নামের মধ্যে ধরা আছে বাঙালির মাতৃপূজার একাধিক সুপ্রাচীন ধারার নির্যাস। সব মিলিয়ে বেহালার এই মাতৃপূজার ঐতিহ্য এক জাজ্বল্যমান আলোকশিখার মতো বাঙালির মাতৃসাধনার আকাশে বিরাজমান।

রক্তিম মুখার্জ্জী

তথ্য কৃতজ্ঞতা তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়।

কার্ত্তিকের সাথে মাতৃপূজার ধারার সংযোগ

আজ কার্ত্তিক সংক্রান্তি। বাঙালির কার্ত্তিক উপাসনার তিথি। কার্ত্তিকের উপাসনার সাথে উপমহাদেশের মাতৃসাধনার ধারার সংযোগ নিয়েই আজ আলোচনা করব।

কার্ত্তিকের জন্মের কাহিনীটি পুরাণসাহিত্যে অত্যন্ত ঘটনাবহুল। বিভিন্ন পুরাণে তাঁকে কখনও শিব তথা অগ্নির পুত্র রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু সমস্ত কাহিনীর মধ্যেই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল মাতৃকাগণের দ্বারা তিনি রক্ষিত। তাঁর কার্ত্তিকেয় নামটি এসেছে “ছয় কৃত্তিকা মাতার পুত্র” এই কারণে। তিনি কুমার; শিশুপুত্র। স্কন্দরূপে তিনি সিংহবাহিনী আদিজননীর কোলে অধিষ্ঠিত এবং আদিশক্তির সেই রূপ স্কন্দমাতা নামে নবদুর্গার পঞ্চম বিগ্রহ রূপে পূজিত হয়। তাঁর সাথে ষষ্ঠী তথা হারিতির সংযোগ আছে; যিনি শিশুদের রক্ষাকারিণী বলে সমগ্র উপমহাদেশে এবং বাঙালির ব্রাত্য পরিমণ্ডলে বারো মাসে তেরোবার পূজিত হন।
সন্তানকোলে মাতৃকার মূর্তি উপমহাদেশের মাতৃসাধনার প্রাচীনতম অধ্যায়ের অন্তর্গত। হরপ্পার সমস্ত মাতৃমূর্তির মধ্যে সন্তান কোলে মাতৃকার মূর্তি সবথেকে বেশি পাওয়া গেছে; আসকো পারপোলা জানাচ্ছেন। কার্ত্তিকের শিশুরূপ সেই মাতৃকার কোলের সন্তানের তত্ত্বটিকেই প্রকাশ করে। বাংলায় যে শিশুরূপ ন্যাঙটা কার্ত্তিকের পূজা এত জনপ্রিয়; তার একটি সম্ভাব্য কারণ এইই। গণেশজননী, কার্ত্তিক গণেশ দুইজন পুত্র নিয়ে উমা বিশালাক্ষী, চার সন্তান নিয়ে গঙ্গারিডির দশায়ুধা থেকে আজকের দুর্গা, পালযুগের দেবী পূর্ণেশ্বরী, শিশুপুত্র কোলে সর্পমাতৃকা মনসা সকলেই এই তত্ত্বকেই প্রকাশ করেন। প্রকৃতি সমস্ত সৃষ্টির আদি উৎস। তাঁর গর্ভ থেকেই সকলের উৎপত্তি। আমাদের মাতৃকা যদি সেই অব্যক্ত জগদকারণ প্রকৃতির ধ্যানগম্য রূপ হন; তবে তাঁর কোলে শিশুর মতো আশ্রিত জগতসংসারের প্রতীভূ হলেন কুমার কার্ত্তিক।

আবার মাতৃসাধনার আরেক সুপ্রাচীন ধারা সপ্তমাতৃকার উপাসনার সাথেও তাঁর সংযোগ আছে। হরপ্পাতে আমরা অশ্বত্থ গাছে পূজিতা মহিষমর্দিনীর আদিরূপ ঊষা মাতৃকার চারপাশে সপ্তমাতৃকার মণ্ডলের আদিতম নিদর্শন দেখতে পাই। চণ্ডীতে এই সপ্তমাতৃকার অন্যতম মাতৃকা কৌমারী কার্ত্তিকের স্বরূপ ধারণ করেন। তিনি শক্তি অস্ত্র হাতে ময়ূর ও কুক্কুটদের দ্বারা পরিবৃতা। কার্ত্তিকের সাথেও এই ময়ূর ও কুক্কুটদের বারংবার উল্লেখ পাই। কার্ত্তিক শিখিবাহন, কুক্কুটকেতু। পক্ষীমাতৃকার উপাসনার সুপ্রাচীন রীতিটিও কি এখানে নিজের প্রভাব রেখেছে? সম্ভবত তাইই।

মাতৃকাদের সাথে কার্ত্তিকের এই সংযোগের প্রসঙ্গে জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় লক্ষ্য করেছেন; দাক্ষিণাত্যের কদম্বদিগের বহু লেখে নৃপতিগণ হারিতীপুত্র এবং স্বামি-মহাসেন ও মাতৃকাদিগের পূজক বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন (স্বামিমহাসেন-মাতৃগণানুধ্যাতানাং…হারিতীপুত্রাণাং)।
চালুক্যদের লেখসমূহেও এই বিষয়টি দেখা যায়।  “হারিতীপুত্রানাং সপ্তলোকমাতৃভিঃ সপ্তমাতৃভিরভিবর্ধিতানাং কার্তিকেয়ানুগ্রহ পরিরক্ষণ প্রাপ্তকল্যাণ পরম্পরাণাং)। এজন্য Fleet যথার্থই বলিয়াছেন যে স্বামী মহাসেন (স্কন্দ কার্তিকেয়) ও সপ্তমাতৃকাগণ প্রাচীন কদম্ব ও প্রাচীন চালুক্য কুলের বাস্তুদেবতা বা ইষ্টদেবী স্বরূপ ছিলেন।…’
মধ্যভারতের গুপ্তোত্তরযুগের গাঙ্গধর মন্দিরের শিলালেখে ডাকিনীগণ এবং উগ্রা ভীষণ হুঙ্কারকারিণী মাতৃগণের বিবরণ পাওয়া যায়। এঁরা বিষ্ণুর মন্দির রক্ষা করেন। এঁদের সাথেই স্কন্দের উল্লেখ আছে। অর্থাত কার্ত্তিকের সাধনক্রম মাতৃকার উগ্র ভৈরবী সহচরীগণের সাধনার সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত ছিল। অন্যদিকে ছয় বা সাত সংখ্যক মাতৃকার সাথে তাঁর সংযোগ তন্ত্রের দেহতত্ত্বের ষটচক্রের নিগূঢ় তাৎপর্যের ইঙ্গিত দেয়। আবার আজকের দিনেই বাংলার স্থানবিশেষে মাতৃকার নিত্য সহচর ভৈরবগণের পূজা হয়। বিষয়টি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ সন্দেহ নেই।

আবার কার্ত্তিকের বাহন ময়ূর; সর্পভীতি থেকে উত্তরণের দ্যোতক। এই তত্ত্ব তন্ত্রের মহামায়ূরী এবং মনসার ত্বরিতা রূপের সাথে অভিন্ন। শবরীপার চর্যাপদে ময়ূরপুচ্ছ মস্তকে নিয়ে গলায় গুঞ্জাফুলের মালা ধারণ করে যে শবরবালিকা উচ্চ পর্বতে বিচরণ করেন; তাঁরও একই তত্ত্ব।

সব মিলিয়ে উপমহাদেশে কার্ত্তিকের উপাসনার ধারা অন্যান্য সাধনক্রমের মতোই মাতৃপূজার আবহমান পরম্পরার দ্বারাই সম্পৃক্ত। তিনি ধুরন্ধর যোদ্ধারূপে ভীষণা মাতৃগণের মণ্ডলে বিচরণ করেন। তিনিই শিশুপুত্র রূপে আদিজননীর কোলে অবস্থান করেন। তাঁর পূজা ন্যাঙটা কার্ত্তিক রূপেই হোক বা শিখিবাহন দেবসেনাপতি রূপেই হোক; তাতে তান্ত্রিক সংস্কৃতির চিরন্তন গরিমাই ধ্বনিত হয়।

রক্তিম মুখার্জ্জী

তথ্য কৃতজ্ঞতা তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়।
ছবিতে মুর্শিদাবাদের নবগ্রামে প্রাপ্ত পালযুগের ময়ূরবাহন কার্ত্তিক। ছবি কৃতজ্ঞতা জ্যোতির্ময় মিত্র মহাশয়।

রাধাতত্ত্বের এক ঝলক

মেঘৈর্মেদুরমম্বরম্ বনভূঃ শ্যামাস্তমালদ্রুমৈঃ
নক্তং ভীরুরয়ং ত্বমেব ত্বদিমং রাধে গৃহং প্রাপয়
ইত্থং নন্দনিদেশতশ্চলিতং প্রত্যধ্বকুঞ্জদ্রুমম্
রাধামাধবোর্জয়ন্তি যমুনাকুলেরহ কেলয়।।

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। বনভূমি সেই অন্ধকারের পটভূমিতে তমালগাছের সমারোহে আশ্চর্য শ্যামলিমা ধারণ করেছে। এই ঘোর রাতে, হে রাধে! এই ভীরুকে তুমি গৃহে পৌঁছে দাও। নন্দের এই অনুরোধে যে রাধা যে কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে যমুনাতীরের কুঞ্জবনের পথে অগ্রসর হয়েছিলেন; সেই রাধামাধবের অপূর্ব কেলিলীলা জয়যুক্ত হোক।

( কবিপতি জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যের প্রথম শ্লোক)

বৈষ্ণব ধর্মে রাধা কে? তার উত্তর এক কথায় বলে দেয় এই শ্লোক। তিনি তন্ত্রাশ্রিত ভাগবতধর্মের মধ্যে নিহিত মাতৃকার আনন্দময়ী বিগ্রহ। তিনিই সাঙ্খ্যের প্রকৃতি। তাঁর সঞ্চালনেই নির্গুণ পুরুষতত্ত্ব রসরাজ পর্যায়ে উন্নীত। ধ্যানে ও স্তবে তিনি জগতপ্রসূ অর্থাত বিশ্বপ্রসবিনী। তাই সুপ্রাচীন কাল থেকে সন্তানকোলে মাতৃকার যে রূপ আমাদের সংস্কৃতিতে বহমান; তাইই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর মধ্যে; গীতগোবিন্দের এই শ্লোকে।
তিনি বৃন্দাবনের রাইরাজা।
আজ তাঁর উপাসনার লগ্ন। ঊষা রূপে শরতে মহিষমর্দিনী দুর্গার বোধনের আগে পর্যন্ত বর্ষার মধ্যলগ্ন থেকে শরতের সূচনাকালে বারবার মাতৃকা আবির্ভূত হন আমাদের চেতনায়। কখনও মনসা রূপে। কখনও একানংশা যোগমায়া রূপে। কখনও রাধাশক্তি রূপে।

তিনি বৈষ্ণবধর্মের আধারস্বরূপা। তাই আমাদের পদাবলীতে যখন
“শুক বলে আমার কৃষ্ণের চূড়া বামে হেলে”
তখন
“সারি বলে আমার রাধার চরণ পাবে বলে”

রক্তিম মুখার্জ্জী

প্রথম ছবিটি গঙ্গারিডির সন্তানকোলে মাতৃকার। গীতগোবিন্দের প্রথম শ্লোকের তত্ত্বই এখানেও ব্যক্ত হয়েছে।
দ্বিতীয় ছবিটি হোয়সলের সেনযুগের রাধামাধব বিগ্রহের। মা কালীর অপূর্ব মূর্তির পাশেই।

ছবি ও তথ্য কৃতজ্ঞতা তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়।

লোটনষষ্ঠীর মর্মার্থ

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আবার বারো মাসে তেরো ষষ্ঠী। সন্তানদায়িনী করুণার মূর্ত বিগ্রহ ষষ্ঠীর উপাসনা বাঙালির ঘরে কতটা জনপ্রিয় তার সবথেকে সহজ উদাহরণ বোধহয় এটিই। আজও পল্লীবাংলার পথে প্রান্তরে বিভিন্ন থানের লৌকিক দেবীদের মধ্যে ষষ্ঠী চণ্ডী শীতলা ও কালী অগ্রগণ্য। “বারোতে তেরো” এই শব্দবন্ধটি বাঙালির রূপকথা ব্রতকথায় বহুল ব্যবহৃত। এর সম্ভাব্য দেহতাত্ত্বিক তাৎপর্য হল ষটচক্রের দ্বৈত শক্তির প্রতিভূ বারোর উপরে সহস্রারে ত্রয়োদশ বা তেরোতম রূপে অদ্বৈতা প্রকৃতিমাতৃকার উপাসনা। বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বীজ; বারো ঘর তেরো উঠান; বিপত্তারিণীর তেরো ফুল তেরো ফল তেরোটি সুতো বাঁধার রীতি প্রমুখ অগণিত দৃষ্টান্ত আছে। ষষ্ঠীর এই পার্বণসংখ্যাও বাঙালির ব্রাত্য সংস্কৃতির তন্ত্রধর্মের সেই আদি ধারার সাথেই সম্পর্কিত।
ষষ্ঠী আদিজননীর রূপ। তাঁর যে চিহ্ন ব্রতের সময় আঁকা হয়; সেখানে তাঁর কোলে, কাঁখে এবং হাতে একটি করে শিশু থাকে। এই চিহ্নেরও তান্ত্রিক তাৎপর্য আছে; বলাই বাহুল্য। তবে সহজ প্রেক্ষিতে দেখলে তিনি যে তিন ভুবনের সমস্ত সৃষ্টির আদিমাতা; সেই ভাবনাটিই মূর্ত হয়ে ওঠে। প্রকৃতি অব্যক্ত; বিমূর্ত; বাক্য মনের অগোচর। তবুও তাঁর গর্ভ থেকেই সকলের উৎপত্তি; এই কারণে সেই পরম তত্ত্বকে তাম্রাশ্মযুগ থেকে আমাদের পূর্বসূরিরা মা বলে ভেবেছেন। আমরা গঙ্গারিডি যুগের সন্তানকোলে মাতৃকার অগণিত নিদর্শন পেয়েছি। কখনও শিশুকে কখনও শিশুরূপে পুরুষতত্ত্বকে কোলে নিয়ে আদিজননীর সেই রূপ; প্রসবরতা মাতৃকার মঙ্গলময়ী সেই বিগ্রহ আজকের ষষ্ঠী দেবীরই আদি দ্যোতনা বহন করে।

প্রতি মাসের মতো শ্রাবণ মাসেও ষষ্ঠীর এক বিশেষ রূপ পূজিত হয়। লোটনষষ্ঠী। লোটন শব্দটি সংস্কৃত নয়। বাঙালির দেশজ ব্রাত্য ভাষারীতির শব্দ। অভিধান অনুযায়ী লোটন শব্দের অর্থ ঝুঁটি( এবং ঝুঁটিযুক্ত পায়রা), চুলের খোঁপা এবং ভূমিতে পড়ে গড়াগড়ি দেওয়া। সংস্কৃতায়িত লুন্ঠন শব্দের সাথে এই লোটন শব্দের একটি সংযোগের চেষ্টা করা হয় বটে; লোটনষষ্ঠীকে লুন্ঠনষষ্ঠীও বলা হয়। কিন্তু লোটনষষ্ঠীর ব্রতকথা থেকেই বোঝা যায় শব্দটি লুন্ঠনের সাথে সম্পর্কিত নয়। ব্রতকথা অনুযায়ী এক ব্রাহ্মণী ও এক গোয়ালিনীর অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব ছিল। ব্রাহ্মণী ছিলেন মা ষষ্ঠীর উপাসিকা। শ্রাবণ মাসে তিনি সোনার লোটন নিয়ে মা ষষ্ঠীর আরাধনা করতেন। একবার লোভে পড়ে গোয়ালিনী একটি লোটন চুরি করেন এবং নানা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন। শেষে ব্রাহ্মণীর কাছে ক্ষমা চেয়ে এবং মা ষষ্ঠীর শরণাপন্ন হয়ে তিনি উদ্ধার পান। লোটন লুন্ঠিত হয়েছিল বলে এই ষষ্ঠীর নাম লুন্ঠনষষ্ঠী। কিন্তু লোটন যে লুন্ঠনের থেকে পৃথক একটি শব্দ; তা ব্রতকথাতেই পরিষ্কার।
এবার প্রশ্ন হল এই লোটন কী বস্তু? লোটনষষ্ঠীর সময় আজও বাঙালি মেয়েরা চাল সিদ্ধ করে ছোটো ছোটো ডিম্বাকৃতি পিণ্ড বানিয়ে রাখেন। খাওয়ার পরে সেগুলো জলে বিসর্জন দেওয়া হয়। সেগুলোকে লোটন বলা হয়। কাজেই অনুমান করা যায় ছোটো ডিম্বাকার বস্তুকেই লোটন বলা হয়। ব্রতকথার ব্রাহ্মণীর ক্ষেত্রে সেগুলো ছিল সোনার তৈরী। চাল অথবা সোনা; এই দুইয়ের মাধ্যমে নির্মিত হতো লোটন। দুটিই বাঙালির ঘরে সম্পদের দুই প্রতীক। সুতরাং ষষ্ঠীর সাথে শস্যদায়িনী ধনদায়িনী লক্ষ্মীর উপাসনারও সংযোগ ঘটেছে বলা যায়। ডিম্বাকৃতি ছোটো লোটনের সাথে আকৃতিগত সাদৃশ্যের কারণেই সম্ভবত খোঁপা কিম্বা ঝুঁটিকেও লোটন বলা হয়।

এখন প্রশ্ন হল এমন একটি বস্তুর ষষ্ঠীর ব্রতে এত গুরুত্ব কেন? কারণ হল এর আকৃতি। সুপ্রাচীন সময় থেকে মাতৃকার অনেকগুলি বিমূর্ত বা abstract প্রতীক হরপ্পায় তথা বাঙালির আদি নগরসভ্যতায় উপাসিত হতো। তার মধ্যে চক্র ছিল; যোনিচিহ্ন ছিল; প্রসবরতা মাতৃকার প্রতীক বসুধারা ছিল। আর ছিল ডিম্বাকৃতি মাতৃশিলার প্রতীক। একে সম্ভবত ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিভূ ভাবা যায় সম্ভবত। পুরাণে এবং লোককথায় অণ্ডের বা ডিমের আকারে জগতের উদ্ভবের বহু কাহিনী প্রচলিত আছে। এখনও কৃষ্ণের নাড়ুগোপাল মূর্তির হাতে ধরা লোটনের মতোই নাড়ুর পিণ্ডটিকে জগতের প্রতীক ভাবা হয়। যিনি জননীরূপে এই লোটনের মতো জগত সৃজন ও লয় করেন; তাঁর বিমূর্ত তত্ত্বই কি লোটনষষ্ঠীর মধ্যে প্রকাশিত? সম্ভবত তাইই। আবার শ্রাবণমাস বর্ষার মধ্যলগ্ন। নদীমাতৃক গৌড়বঙ্গের শস্যের প্রাচুর্য ঘটে এই সময়। যে প্রকৃতি মা আষাঢ়ের অম্বুবাচীর সময় বর্ষার আগমনের মাধ্যমে উর্বরতার সূচনা ঘটিয়েছিলেন; এখন তাঁরই কোলে শিশুর মতো পালিত হচ্ছে মাঠভরা ধান। নদীর জলে পালিত হচ্ছে মাছেরা। অরণ্যে পালিত হচ্ছে সমস্ত জীবজগত। এই সার্বিক মাতৃত্বের চরম প্রকাশের লগ্নেই তাই জগতরূপী লোটনের মা ষষ্ঠীর আরাধনার ক্ষণ। আবার এরই মাঝে নিহিত আছে ভবিষ্যতের ধান্যলক্ষ্মীর আগমনী। তাই চালের লোটন আর সোনার লোটন মায়ের পূজায় এত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রতের শেষে লোটন জলে ভাসিয়ে দেওয়ার রীতিটিও লক্ষণীয়। বাঙালির ব্রাত্য সংস্কৃতিতে যজ্ঞের অগ্নির থেকে জলপূর্ণ মঙ্গলঘটের গুরুত্ব বেশি। হরপ্পার সুবৃহৎ স্নানাগার তাঁদের ধর্মীয় আচারের সাথে সম্পর্কিত ছিল। স্নাত হয়ে; জলধারায় অভিষিক্ত হয়েই তাঁরা উপাসনায় ব্রতী হতেন। বাঙালির ব্রতেও সব কিছু জলধারায় সমর্পণের রীতিটি প্রণিধানযোগ্য। এখানে নদী পূজিত হন মাতৃরূপে। জলের পদ্মবনে আসন পাতেন পদ্মালয়া লক্ষ্মী এবং পদ্মাবতী মনসা। জলপ্রবাহ অবলম্বন করে বহিত্র ভাসান সমুদ্রবণিক। আবার বাঙালির মাতৃকার সবথেকে মহিমান্বিত মহাপূজা শুরু হয় সপ্তমীর মহাস্নানের মধ্যে দিয়ে। লোটন জলে ভাসানোর মধ্যেও তন্ত্রধর্মের সেই আবহমান ঐতিহ্যই অনুসৃত হয়েছে। ভাদ্রের চাপড়াষষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরো প্রকটভাবে চোখে পড়ে।

পরিশেষে বলতে পারি শ্রাবণের লোটনষষ্ঠী বাঙালির মাতৃসাধনার ধারার এক আদিরূপ। জগতজননীর মধুর রূপ এখানে প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতির স্নেহধারায় অভিষিক্ত চরাচরের জয়গীতি এখানে নিরন্তর ধ্বনিত হয়। যে তত্ত্ব বাক্য মনের অগোচর; তাকে বোধের সীমায় ধরে রাখার এই প্রয়াস যত প্রাচীন ততটাই মনোমুগ্ধকর।

রক্তিম মুখার্জ্জী

তথ্য কৃতজ্ঞতা তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়

শিবিখ্যা মাতৃকার উপাসনা

কাল ছিল আষাঢ়ের নবমী। রাঢ়ে এই তিথিতে শিবিক্ষা(শিবিখ্যা) মাতৃকার পূজা হয়। সুপুরের সুরথ রাজার ঢিবির কাছেও শিবিক্ষার থান আছে। বোলপুরের যেখানে সুরথ মহামায়ার নামে লক্ষবলি দিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে; সেখানেও শিবিক্ষা আছেন। এছাড়া অজয় অববাহিকার বিভিন্ন স্থানে তাঁর প্রাচীন পীঠ খুঁজে পাওয়া যায়। শিবিখ্যা অর্থাত শিবা এই আখ্যায় আখ্যায়িতা অথবা শিবারূপিণী। রাঢ়ের শিবিখ্যা থেকে মলুটির মা মৌলিখ্যা হয়ে কামরূপের কামাখ্যা পর্যন্ত নামের মিল লক্ষণীয়। বৃহৎ বঙ্গের ব্রাত্য সংস্কৃতির নিজস্ব ভাষারীতির অগণিত নিদর্শনের এটিও একটি। শিবিখ্যা রূপে মাতৃকার মুখাবয়ব শিবা অর্থাত শৃগালের মতো। তিনি শিবাদের দ্বারা পরিবেষ্টিতা। তাঁর এই মুখাবয়ব তন্ত্রের আদিতম অধ্যায়ের সাথে সংযুক্ত। হরপ্পায় এবং পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে পক্ষীর মুখাবয়ব সম্পন্না মাতৃকা পূজিতা হতেন। বলাকিনী; বগলামুখী; কাকীমুখ প্রমুখ নামে সেই উপাসনার রীতি আজও বিদ্যমান। একইভাবে এই নিশাচর শিবা কোক( নেকড়ে) প্রমুখ জীবের মুখাবয়বেও মাতৃকা আমাদের সংস্কৃতিতে বন্দিত হয়েছেন। তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়ের কাছে জেনেছি হরপ্পার ঝোব উপত্যকার পক্ষীমাতৃকাকে যুগপৎ মৃতদের রক্ষক এবং শস্যদায়িনী মাতৃকা রূপে উপাসনা করা হতো; এই বিষয়ে অধিকাংশ গবেষক সহমত। সম্ভবত মৃতের সমাধি এবং শস্যের উদ্ভব দুইই ধরণীর গর্ভে হয় বলেই এমন একীভবন। গ্রীসে পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী নেকড়েদের দ্বারা পরিবেষ্টিতা; সুকুমার সেন লক্ষ্য করেছেন। আবার বেদের রাত্রিসূক্তে নিশাদেবীর সন্তানরূপে নিশাচর বৃক বা নেকড়েদের প্রসঙ্গ এসেছে। নিশাদেবীর কোলে সমস্ত জগত কর্মক্লান্তি অপনোদন করে। তাঁর সন্তান বৃকগণ যেন তাদের ক্ষতি না করে; এমনটাই ছিল সেই সূক্তের প্রার্থনা। সুতরাং সমস্ত চরাচরকে যিনি ধারণ করে আছেন; সেই অব্যক্তা প্রকৃতির তত্ত্বই শিবামুখী শিবিখ্যার তত্ত্বে প্রকাশিত হয়েছে।
হরিবংশে শিবারূপে দেবী যোগমায়া বসুদেবকে কৃষ্ণকে নিয়ে গোলোকে আসার সময় পথপ্রদর্শন করেছেন। বৈন্যগুপ্তের বৈগ্রাম তাম্রশাসনে কোকামুখী মাতৃকা এবং কোকামুখস্বামী বিষ্ণুর উল্লেখ পাই। বিষ্ণুর নৃসিংহ ও বরাহ রূপ আজও পূজিত হলেও কোক অর্থাত শৃগাল বা নেকড়ের মুখ আজ অবলুপ্ত। কিন্তু এই উল্লেখ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ হরিবংশের একানংশা যোগমায়া ও বাসুদেবের মতোই এটিও প্রাচীন ভাগবতধর্মের সাথে মাতৃসাধনার আদিতম ধারার নিবিড় সংযোগের অনবদ্য দৃষ্টান্ত।
চণ্ডীতে রক্তবীজ এবং শুম্ভ নিশুম্ভের সাথে দেবী কৌশিকীর সংগ্রামের সময় যখন সপ্তমাতৃকা এবং চামুণ্ডা রণক্ষেত্রে অবতীর্ণা; তখনই দেবীর দেহ থেকে আবির্ভূত হচ্ছেন অত্যন্ত উগ্রা দেবী চণ্ডিকা। তিনি শত শত শৃগালের রবের মতো ধ্বনিতে দৈত্যদের সন্ত্রস্ত করেন। তিনি শিবদূতী। তিনি শিবকে শুম্ভের কাছে দূত হিসাবে প্রেরণ করে বলেছিলেন: যদি একান্তই যুদ্ধের অভিলাষ রাখো; তবে তোমাদের রক্ত ও মাংসে আমার শিবাগণকে তৃপ্ত করো। তাঁর অট্টহাস্যকে চণ্ডীর কথক অশিব বা অমঙ্গলসূচক বলেছেন। শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয়ের মতে; তাঁর শিবদূতী নামের সাথে শিবাগণের সংযোগও আছে। অন্যদিকে পালযুগে বজ্রযোগিনীর সাধনক্রমে দেবীকে অতিভয়াকুল শ্মশানে নিশাচর জীবদের দ্বারা পরিবৃত অবস্থায় ধ্যান করা হয়েছে। বাঙালির প্রাণের মাতৃকা কালী ও তারার সাথে আজও নিত্য সহচর রূপে শৃগালদের দেখি আমরা। শিবাভোগ আজও মা কালীর সাধনার এক রহস্যময় অনুষ্ঠান; যেখানে ধারণা করা হয় মাতৃকা স্বয়ং শৃগালের মাধ্যমে ভোগ গ্রহণ করেন। তাই শিবিখ্যা বাঙালির মাতৃসাধনার অগণিত ধারার উৎসে আছেন।

আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়। দেবীর উপাসনার তিথিটি বর্ষার মধ্যলগ্নে। প্রবল বর্ষণে যখন সমস্ত আকাশ অন্ধকার; অথচ সেই অন্ধকার আগামী দিনের শস্যের ও মাছের প্রাচুর্য, নদীমাতৃক সভ্যতার উর্বরতার চরম পর্যায়ের বার্তা বয়ে আনছে; সেই মুহূর্তেই দেবীর উপাসনার তিথি। হরিবংশের শিবারূপিণী যোগমায়ার উল্লেখটি যেন এই তিথিরই প্রতীকী। সেখানেও প্রবল বর্ষণের মধ্যে ভবিষ্যতের যুগাবতারের বার্তা বহন করছেন দেবী নারায়ণী। এই তিথি তাই নদীমাতৃক মাতৃপূজক বাঙালির সংস্কৃতির মহা উদযাপনের তিথি।

রক্তিম মুখার্জ্জী

তথ্য কৃতজ্ঞতা তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়।
ছবিতে ঝোব উপত্যকার মাতৃকা, পাণ্ডুরাজার ঢিবির পক্ষীমাতৃকা( কৃতজ্ঞতা তমাল দাশগুপ্ত মহাশয়) ; বাংলার টেরাকোটার মন্দিরে কোকমুখী কালী এবং মঙ্গলকোটের একটি প্রাচীন মুদ্রায় শিবামুখী মাতৃকা। শেষোক্ত ছবিটি পেয়েছি Ranadeb Mukherjee মহাশয়ের কাছে।

ষষ্ঠীর ব্রতের তাৎপর্য

বারো মাসে তেরো ষষ্ঠী। বারো মাসে তেরো পার্বণের মতোই সম্বৎসর ধরে ষষ্ঠীর বারংবার উদযাপন বাঙালির ধর্মভাবনার এক বৈশিষ্ট্য। ষষ্ঠী সন্তানদায়িনী মাতৃকা। সন্তান পরিবেষ্টিতাও তিনি। কাঁখে কোলে আর হাতে সন্তানদের ধারণ করে তাঁর মাতৃরূপের প্রতীক আজও আঁকা হয় ষষ্ঠীপূজার সময়। বসুন্ধরা মাতৃকার প্রতীক রূপে আঁকা বসুধারা চিহ্নের মতোই এই চিহ্নটিও আবহমান কাল ধরে বাঙালির কাছে মঙ্গলের প্রতীক। আদিমাতৃকার যে রূপগুলি তাম্রাশ্মযুগ থেকে প্রচলিত তার মধ্যে সন্তানকোলে জননীরূপে তাঁর বিগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশ্বচরাচর তাঁর থেকে উদ্ভূত। তাঁর কোলেই কীট থেকে মহামানব পর্যন্ত সকলের অস্তিত্ব। এই তত্ত্বই সন্তানকোলে মাতৃমূর্তির অন্তর্নিহিত ভাবনা। গঙ্গারিডির শিশু কোলে মাতৃমূর্তি; সন্তান কোলে ষষ্ঠী; শিশু শিবকে কোলে নিয়ে বশিষ্ঠারাধিতা তারা; গীতগোবিন্দের প্রথম শ্লোকে ভয়গ্রস্ত কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে রাধা; গণেশজননী উমা; স্কন্দমাতা; সবই এই তত্ত্ব থেকেই উৎসারিত।

ষষ্ঠীর নামের একটি ব্যাখ্যা হল তিনি আদি প্রকৃতির ষষ্ঠাংশ। আবার বাঙালির প্রাচীন সমাজে সাঙ্খ্য প্রভাবিত তন্ত্রে সংখ্যার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। সাঙ্খ্য শব্দটির একটি ব্যুৎপত্তিই হল : সংখ্যার মাধ্যমে তত্ত্ব আলোচনা। তন্ত্র ও ব্রতকর্মে তিন, পাঁচ, সাত, আট, নয়, তেরো, চৌদ্দ প্রভৃতি সংখ্যার বিশেষ গুরুত্ব দেখতে পাওয়া যায়। মনসার উনকোটি (৯৯৯৯৯৯৯) নাগ, ভূত চতুর্দশীর চৌদ্দ ভূত, বণিকদের সপ্তডিঙা, ভাগবতধর্মের পাঞ্চরাত্র, বিপত্তারিণী পূজার তেরো সুতো, রূপকথার সাত সাগর তেরো নদী সবই সংখ্যার তান্ত্রিক তাৎপর্যের দৃষ্টান্ত। পরবর্তী সময়ে চৌষট্টি যোগিনী, কালীর পঞ্চদশ নিত্যা, চুরাশি মহাসিদ্ধ, একান্ন পীঠের মধ্যেও এই ভাবনারই প্রতিফলন ঘটেছে। অন্যদিকে বারো মাসে তেরো ষষ্ঠীরও তান্ত্রিক তাৎপর্য আছে। দেহতত্ত্বে ষটচক্রের প্রতীক হিসাবে বারো এবং নিরালম্ব সহস্রার সেই বারোর উপরে তেরো;  এই তত্ত্বই সম্ভবত এখানে প্রকাশিত। বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বীজ, বারো চড়ুইয়ের তেরো ডিম, বারো ঘর তেরো উঠান, বারো মাসে তেরো পার্বণ প্রভৃতি রহস্যময় শব্দবন্ধও সম্ভবত একই তাৎপর্য বহন করে।

ষষ্ঠীর ব্রতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল অরণ্যপ্রকৃতির সাথে নিবিড় সংযোগ। সাতটি বাঁশপাতা ও সাতগাছি দূর্বা দিয়ে তাঁর রূপ নির্মিত হয় জৈষ্ঠ্য মাসের অরণ্যষষ্ঠীর দিনে। দুর্গাপূজার নবপত্রিকার মতোই এ হল অরণ্যানি তথা শস্যমাতৃকা প্রকৃতির প্রতীক। তাঁর বাহন কালো বেড়াল। আমরা জানি গোধা বা গোসাপ নিয়ে দেবী মঙ্গলচণ্ডীও অরণ্যপ্রকৃতির মধ্যে অধিষ্ঠিতা; নিষাদ, পুলিন্দ, শবরগণ কর্তৃক পূজিতা। ষষ্ঠীর উপাসনাও এর সাথে একই সূত্রে গাঁথা। আবার মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতে ষাঠ বা ষষ্ঠী এবং জাঠ বা জ্যেষ্ঠা চণ্ডিকার দুই সহচরী।

প্রকৃতির মধ্যে মাতৃকার যে অপূর্ব প্রকাশ বাঙালির আদি পূর্বসূরিরা উপলব্ধি করেছিলেন; ষষ্ঠীদেবী তারই অনবদ্য বিগ্রহ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর থান কোনো বটগাছ বা অশ্বত্থ গাছের নিচে। ত্রিকোণাকার শিলাখণ্ড, ডিম্বাকার নোটন, রান্নাঘরের শিল তাঁর প্রতীক রূপে পূজিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ত্রিকোণাকার শিলা তথা মৃৎফলক সমগ্র বিশ্বে মাতৃকার বিমূর্ত বা aniconic রূপসমূহের মধ্যে প্রাচীনতম এবং হরপ্পা থেকে পাণ্ডুরাজার ঢিবি পর্যন্ত তার বহুল প্রচলনের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মিলেছে। পূর্ববঙ্গে আজও টেপাটেপি পুতুলে ষষ্ঠীপূজার রীতি আছে। এই ধরণের গোল চোখ, ছোটো হাত, তীক্ষ্ম নাক আর মোটা পেটযুক্ত schematic মূর্তি তাম্রাশ্মযুগের মূর্তিশৈলীর বৈশিষ্ট্য এবং সিন্ধু সভ্যতা, পাণ্ডুরাজার ঢিবির উৎখননে তো বটেই; কালীঘাটের মা কালী এবং পুরীর জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রার মূর্তিতেও আজও তার প্রকাশ দেখতে পাই আমরা।

আজ অরণ্যষষ্ঠীর উপাসনার তিথি। বিশ্ব পরিবেশ দিবসও বটে। যাঁরা তাম্রাশ্মযুগ ও লৌহযুগের সূচনাকালে প্রকৃতির মধ্যে নিহিত মাতৃকার বিশাল রূপকে স্নেহময়ী ষষ্ঠী দেবীর রূপ দান করেছিলেন; তাঁর উপাসনায় ঘরের আদরের সন্তান থেকে পোষা বিড়াল পর্যন্ত সবার মঙ্গলকামনার মহতী ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন; তাঁদের সেই প্রাচীন অথচ আধুনিকতম মননের জন্য কোনো শ্রদ্ধাই যথেষ্ট নয়। বাঙালির ব্রতকর্মের সব দেবীই করুণার মূর্ত বিগ্রহ। তাঁরা অন্ধকে চক্ষু দেন; নিরন্নকে অন্ন দেন; সন্তানহীনকে সন্তান দেন; পথহারাকে পথ দেন। অবলোকিতেশ্বরের জগতের দুঃখ দেখে নির্বাণসুখ পরিত্যাগ; মহাযানের মহাকরুণা; বজ্রযানের আর্যতারার করুণাময়ী রূপ; সবই উৎসারিত হয়েছে বাঙালির সমাজভাবনায় নিহিত এই আর্ততারণের মধুর ভাবনা থেকেই। চিরন্তন স্নেহের প্রতিমূর্তি হয়ে শিশুসন্তান পরিবৃতা মা ষষ্ঠীও বারো মাসে তেরোবার আমাদের মাতৃভূমিতে নিজের সেই মধুরতম রূপেই চিরকাল অবতীর্ণ হন।

রক্তিম মুখার্জ্জী

ছবি ও তথ্য কৃতজ্ঞতা তমাল দাশগুপ্ত মহাশয় ও ময়ূখ ভৌমিক মহাশয়