তন্ত্র ইউনিভার্সিটি চাই নইলে বাঙালি মানুষ হবে না – তমাল দাশগুপ্ত

তন্ত্রভূমি বাংলায় তন্ত্রচর্চার কোনও বিশ্ববিদ্যালয় নেই। মাতৃকা উপাসক বাঙালির মাতৃধর্মের দর্শন, তত্ত্ব, ইতিহাস গবেষণার কোনও সারস্বত প্রতিষ্ঠান নেই। তন্ত্র ডিসকোর্স চাই, তন্ত্র ইউনিভার্সিটি চাই, নইলে বাঙালি মানুষ হবে না!

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, সাত জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

ডাকিনী যোগিনী – তমাল দাশগুপ্ত

ডাকিনী যোগিনী।

কালীপুজোয় প্রায়ই দেখি মা কালীর দুই পাশে আছেন ডাকিনী যোগিনী। মা কালীর কোনও ধ্যানমন্ত্রে এঁদের উল্লেখ নেই, তাহলে এঁরা কিভাবে এলেন? আসলে এঁরা বজ্রযোগিনী মণ্ডল থেকে এসেছেন। পালযুগে পূজিত বজ্রযোগিনীর দুইদিকে বজ্রবর্ণনী এবং বজ্রবৈরোচনী, আজকের ছিন্নমস্তার দুইদিকে বর্ণিনী এবং ডাকিনী থাকেন।

কালী মহাসমুদ্রে এসে পৃথিবীর সমস্ত মাতৃধর্মের দর্শন তত্ত্ব ও ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নির্যাস মিশেছে। ডাকিনী যোগিনী মায়ের দুইদিকে থেকে তন্ত্রের এক সুপ্রাচীন ডায়াগ্রাম নির্মিত করেন: ইড়া ও পিঙ্গলার মধ্যবর্তী সুষুম্না।

ডাকিনী অর্থে জ্ঞানী ও বিদুষী নারী। পালযুগে এটি সম্মানের উপাধি ছিল। ডাকিনী সম্পর্কে আগে লিখেছি। যোগিনী অর্থে মায়ের পুজোয় যিনি পৌরোহিত্য করেন, সর্বদা মায়ের সঙ্গে থাকেন (যিনি মায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, মায়ের পুজোর যোগান দেন তিনিই যোগিনী। প্রসঙ্গত যোগী শব্দের অর্থও তাই। যোগ এবং যোগী – এ দুটিই সেই আদিকালের হরপ্পা সভ্যতা থেকে পালযুগের মাতৃকা উপাসক সভ্যতা পর্যন্ত আবহমান তন্ত্রধর্মের কনসেপ্ট)।

সানুচর জগদকারণ জগন্মাতার মণ্ডলে ডাকিনী যোগিনীর জয় হোক।

জয় মা কালী। ডাকিনী যোগিনীর জয় হোক। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, ছয় জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

পেজের পাঠকদের জন্য আজ লেখক পরিচয় – তমাল দাশগুপ্ত

নমস্কার, তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta পেজের সমস্ত পাঠকদের শুভেচ্ছা জানাই। নতুন পাঠকদের জন্য আজ লেখক পরিচয়। আমার নাম তমাল দাশগুপ্ত। আমি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কলেজে অধ্যাপনা করি আজ চোদ্দ বছর হল। আমার শিক্ষাগত পরিচয় হল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ। আমি বাঙালির শেকড়ে থাকা তন্ত্রধর্ম নিয়ে এবং মাতৃকা উপাসনা নিয়ে চর্চা করি।

কেউ জিজ্ঞেস করার আগেই বলে দিই, এই ছবিতে আমার হাতের বইটা হল টিবেটান বুক অভ লিভিং অ্যান্ড ডাইং। জীবন ও মরণের তিব্বতী গ্রন্থ। দিল্লির একটা বইয়ের দোকানে কদিন আগে ছবিটা তুলেছেন আমার স্ত্রী ঋতু।

তন্ত্র চর্চা এবং মাতৃ সাধনা করতে গেলে হিন্দু ও বৌদ্ধে ভেদ করবেন না, শাক্ত বৈষ্ণবের ভেদ করবেন না, বাঙালি অবাঙালি ভেদ করবেন না, ঘটি বাঙাল ভেদ করবেন না, উত্তরবঙ্গ দক্ষিণবঙ্গ ভেদ করবেন না, শহর ও গ্রাম ভেদ করবেন না, পুরুষ নারী ভেদ করবেন না, ব্রাহ্মণ শূদ্র ভেদ করবেন না, ভারতীয় অভারতীয় ভেদ করবেন না। মায়ের ধর্ম তো বিশ্বব্যাপী, কিন্তু তার ভরকেন্দ্র হল এই বাঙালি জাতি। আমাদের এই বাংলা ভূমি হল কালীক্ষেত্র।

মায়ের সন্তান বলে যারাই নিজের পরিচয় দিই, তাদের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই। সবাই সমান। আমাদের মা কে যে সর্বোচ্চ উপাস্য মানে, সেই আপন।

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, ছয় জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

মা কালী কি অনার্য? না, এত সহজ নয় – তমাল দাশগুপ্ত

মা কালী কি অনার্য, অবৈদিক? না, এত সহজ নয়। বেদে পূজিত হন নক্ৎ কৃষ্ণী (অর্থাৎ রাত্রি, কালো মেয়ে), এবং বেদে রাত্রিসূক্ত কালীর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। সৃষ্টির আদিতে কালো রাত, এবং উন্মেষে ঊষা: কালীই আদিমাতা অদিতি (সুকুমার সেনের লেখায় এর সমর্থন আছে), এবং কালরাত্রি থেকে জগৎ উৎপন্ন হওয়ার মেটাফর হিসেবে নিশা থেকে ঊষার উৎপত্তি: কালীই দুর্গা হিসেবে প্রকাশিত হন। প্রসঙ্গত ঊষা দশভুজারূপে বেদে সম্বোধিত। এদিকে কালী বলি গ্রহণ করতেন: মুণ্ডক উপনিষদে যজ্ঞের অগ্নির সপ্ত জিহ্বা সংক্রান্ত শ্লোক অবশ্যই দেবী হিসেবে, মাতৃকা হিসেবে কালীর আবাহন করে।

তবে কি কালী বৈদিক? না, এতটাও সহজ নয়। হরপ্পা সভ্যতায় কালী পূজিত ছিলেন, প্রমাণ করা যায়। কালীর মুখ্য স্থান আমাদের অবৈদিক ব্রাত্য তন্ত্রাশ্রয়ী ব্রতধর্ম। বেদ আমাদের জগন্মাতার ধর্মের পরিপূর্ণ প্রকাশ ও স্ফুরণ ধারণ করতে পারেনি।

তবে কালী কে? আর্য না অনার্য? তিনি কার, সেনযুগের হিন্দুর না পালযুগের বৌদ্ধর? আসলে তিনি সকলের। তিনি পূর্বের এবং পশ্চিমের। তিনি নারী ও পুরুষ। তিনি তন্ত্রের কেন্দ্রে, কিন্তু আসলে তাঁর দর্শন নিয়েই বেদ উপনিষদ। তিনি সাংখ্য, তিনি বৌদ্ধ জৈন সহ সমস্ত নাস্তিক অবৈদিক ধর্ম। তিনি অব্যক্ত, আবার তিনিই মুণ্ডমালিনী রূপ ধারণ করেন। তিনি বলাকা, তিনি শিবারূপও ধারণ করেন। তিনি জড়জগৎ, তিনিই জীবজগৎ। তিনি বৈষ্ণবের রটন্তি কৃষ্ণকালী এবং তিনি শাক্তদের পরম আরাধ্যা। কালী ব্রাহ্মণ্য ধর্মেও পূজিত, আবার তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মেও পূজিত।

কালীর নামে পাণ্ডু রাজার ঢিবির সুপ্রাচীন সভ্যতা বাংলার বুকে পাঁচ হাজার বছর আগে উত্থিত হয়েছিল, মা সেখানে বলাকা মাতৃকা রূপে পূজিত হতেন। কালী ছিলেন চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গাল সভ্যতায়, সেখানেও বলাকা রূপে পূজিত হতেন। তিনি পালযুগে চামুণ্ডা চর্চিকা রূপে পূজিত, এবং সেনযুগে বৃহদ্ধর্ম পুরাণে তাঁর বর্তমান মূর্তিরূপ পাই, প্রথম মহাবিদ্যা রূপে কালী সেনযুগে পূজিত। ষোড়শ শতকে বারো ভূঁইয়ার বিদ্রোহ কালীকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল আবার উনিশ শতকের নবজাগরণে এবং বিংশ শতকের অগ্নিযুগে কালী আমাদের কেন্দ্রে ছিলেন।

কালীকুল বর্ণবাদ স্বীকার করে না। মা কালীর ধর্মে লিঙ্গভেদ নেই, পুরুষ প্রাধান্য নেই। কালীর উপাসনা সবার জন্য অবারিত। অনেকে সেজন্য কায়েমী স্বার্থ নিয়ে ভয় দেখায়, যাতে সবাই মায়ের পুজো না করতে পারে। বোধকরি সেও আমাদের মায়ের লীলা। মিথ্যা ভয় জয় করুন, মায়ের দর্শন পাবেন। কিন্তু জ্ঞান তো সামান্য সাঁকো, তা দিয়ে নয়, কারণ এই সমুদ্রের কোনও অন্ত নেই। ভক্তি নৌকো ছাড়া এই কালী সমুদ্র পার হওয়া যায় না।

কালী আসলে আর্য অনার্য, হিন্দু বৌদ্ধ, পুরুষ নারী, এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। কালী হলেন সারা পৃথিবীর মাতৃধর্মের অনেক সহস্র বছরের নির্যাস।

এবং কালী হলেন বাঙালি জাতির সবথেকে বড় গর্ব, সবথেকে বড় আশ্রয়, সবথেকে বড় ব্যাপ্তি। কালী আমাদের জাতির কেন্দ্রে আছেন। আমাদের ভূখণ্ড মা কালীর নামে শাসিত হয় এবং আমাদের জাতি মা কালীর নামে সংজ্ঞায়িত হয়।

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, পাঁচ জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

নতুন বছরের ইংরেজি বাংলা ক্যালেন্ডার – তমাল দাশগুপ্ত

নতুন বছরের ইংরেজি-বাংলা ক্যালেন্ডার। গুগল ড্রাইভ লিংক আছে, ঝকঝকে রেজলিউশনের পিডিএফ ডাউনলোড করে নিতে পারেন।

কালীক্ষেত্র আন্দোলন পেজ থেকে।

ইংরেজি নতুন বছর ২০২৩এর শুভেচ্ছা। এসে গেল নতুন বছরের ইংরেজি বাংলা ক্যালেন্ডার, কালীক্ষেত্র আন্দোলনের সমর্থকদের জন্য। উৎকৃষ্ট রেজলিউশনের জন্য পিডিএফ ডাউনলোড করুন এই লিঙ্কে https://drive.google.com/file/d/1G3WIJS9_QwejDf4mSQewpShFLMRBEe3u/view?usp=drivesdk

মহাকালভৈরব – তমাল দাশগুপ্ত

মহাকালভৈরব।

পালযুগের তন্ত্রাশ্রয়ী সভ্যতায় মহাকাল পূজিত হতেন মহাকালীর পুরুষ রূপ হিসেবে। এজন্যই অনেক পরে শাক্ত কবি গেয়েছেন, কালী কেবল মেয়ে নয়, মেঘের বরণ করিয়ে ধারণ কখনও কখনও পুরুষ হয়।

পূজিত মহাকাল মূর্তির অন্যতম একটি নাম ছিল ধর্মপাল, এবং পালসম্রাট ধর্মপালের দৈহিক আদলে এই মহাকাল মূর্তি নির্মিত হত। মহাকালকে জ্ঞাননাথ বলেও ডাকা হত, পালযুগের বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞাননাথ এবং মা তারা পূজিত হতেন।

আজও বিদেশের অনেক মিউজিয়ামে পালযুগের বাংলায় নির্মিত মহাকাল মূর্তি দেখা যায়। নবম-দশম শতকের মহাকালসংহিতা নামক গ্রন্থে আমরা তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে অবগত হই এবং সেই গ্রন্থে কালী/মহাকালীর সর্বোচ্চ উপাস্য রূপের কথাও বলা হয়েছে।

বস্তুত কালীর পুজোর আগে অষ্টভৈরবের পুজো এবং তৎসহ মহাকালভৈরবের পুজোর প্রথা আছে। সম্পূর্ণ পূজাবিধি আছে আগমবাগীশের তন্ত্রসারে যেখানে মহাকালভৈরব সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। ইনি দেবীর দক্ষিণভাগে বিদ্যমান। ইনি ধূম্রবর্ণ। দণ্ড এবং চিতাকাঠ ধারণ করেন। ইনি করালদ্রংষ্টা। কটিদেশে অর্থাৎ কোমরে ব্যাঘ্রচর্ম। এঁর উদর অতি স্থূল। এঁর গায়ে রক্তবস্ত্র। এঁর ত্রিনয়ন। কেশজটা ঊর্ধ্বে এবং চতুর্দিকে বিকীর্ণ। ইনি মুণ্ডমালা ধারণ করেন। কপালে অর্ধচন্দ্র। এঁর উগ্রমূর্তি এবং দেহ অগ্নিভ।

মহাকালং যজেদ্দেব্যা দক্ষিণে ধূম্রবর্ণকং।
বিভ্রতং দণ্ডখট্টাঙ্গৌ দ্রংষ্টাভীমমুখং শিশুং।
ব্যাঘ্রচর্ম্মাবৃতকটিং তুন্দিলং রক্তবাসসং।
ত্রিনেত্রমূর্দ্ধকেশঞ্চ মুণ্ডমালাবিভূষিতং।
জটাভারলসচ্চন্দ্রখণ্ডমুগ্রং জ্বলন্নিভং।

কুমারীকল্পে আমরা মহাকালের এই মন্ত্রটি পাই:

হুঁ ক্ষ্রোঁ যাং লাং বাং ক্রোং মহাকালভৈরব সর্ব্ববিঘ্নান্ নাশয় হ্রীঁ শ্রীঁ ফট্ স্বাহা।

প্রকৃতপক্ষেই মহাকাল ভক্তের সমস্ত বিঘ্ন নাশ করেন। তিনি জগন্মাতার শাক্ত ধর্মের অতন্দ্র ভৈরব-ক্ষেত্রপাল-প্রহরী। তাই আমরা মহাকালের জয়ধ্বনি করি।

জয় মহাকাল। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মহাকালের ছবিটি পিন্টারেস্ট থেকে।

মহাকাল সম্পর্কে আগেও লিখেছি। লিংক কমেন্টে রইল।

সংযোজন

মহাকাল সম্পর্কে আমার লেখালেখির লিঙ্কের সঙ্কলন https://matshonyay.home.blog/2022/07/25/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%97%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B2-%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%B0/

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, চার জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

বামাকালী: ধ্যানমন্ত্র ও মূর্তিরূপ – তমাল দাশগুপ্ত

বামাকালীঃ ধ্যানমন্ত্র ও মূর্তিরূপ।

বামাকালীর উপাসনা আমাদের তন্ত্রধর্মে বেশ জনপ্রিয়। মায়ের এই রূপটি সম্পর্কে সকলের মধ্যে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট জ্ঞানের প্রসার হওয়া দরকার, সেজন্যই এই লেখাটি নির্মাণ করলাম। সাধারণ বাঙালি যেরকম ব্যাপকভাবে দক্ষিণকালিকার স্নেহময়ী মাতৃরূপ উপাসনা করে, বামাকালীকে তুলনায় কম প্রকাশ্যে পূজিত হতে দেখা যায়, যদিও তন্ত্রাচারী শাক্তদের মধ্যে বামাকালীর উপাসনা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কিছু বাৎসরিক সার্বজনীন কালীপুজো, কিছু জনপ্রিয় মন্দির বা পারিবারিক পুজোতেও বামাকালী পূজিত হন, কাজেই তাঁর উপস্থিতি গণধর্মেও সমানভাবে পরিলক্ষিত।

প্রথমেই বলা দরকার, আদিকাল থেকেই তন্ত্রের আদর্শ এক সুষম ভারসাম্য, ইড়া ও পিঙ্গলার মধ্যে সুষুম্না যেমন। তন্ত্রে বামাচার ও দক্ষিণাচার দুটির কোনোটির স্থান একে অপরের থেকে কম বেশি নয়। বামাচারী মতেই সাধারণত বামাকালী পূজিত হন। তাঁর বাম পদ শবের বুকের ওপরে থাকে। মায়ের বাম পদ ভক্তকে সমস্ত বামগতি বা বিধি বাম হওয়া থেকে রক্ষা করে। তন্ত্রসারে বামাকালী ধ্যানমন্ত্র ও মূর্তিরূপ দেওয়া আছে, প্রধান অংশটি উদ্ধৃত করছি।

বিদ্যুৎকান্তিসমানাভ-দন্তপংক্তি বলাকিনীম্।
নমামি ত‍্যং বিশ্বমাতাং কালমেঘসমদ্যুতিম্।
মুণ্ডমালাবলীরম্যাং মুক্তকেশীং দিগম্বরাম্।।
লোলজিহ্বাং ঘোররাবামারক্তলোচনত্রয়াম্।
কোটিকোটিকলানাথ-বিগলম্মুখমণ্ডলাম্।।
অমাকলাসমুল্লাসকিরীটোজ্জ্বলমণ্ডলাম্।
শবদ্বয়কর্ণভূষাং নানামণিবিভূষিতাম্।।
সূর্য্যকান্তেন্দুকান্তৌঘ-প্রোল্লাসকর্ণভূষণাম্।
মৃতহস্তসহস্রৈলস্তু কৃতকাঞ্চীং হসম্মুখীম্।।
সৃক্কদ্বয়গলদ্রক্ত ধারাবিস্ফুরিতাননাম্।
খড়্গমুণ্ডবরাভীতি সংশোভিতচতুর্ভুজাম্।।
দন্তুরাং পরমাং নিত্যাং রক্তমণ্ডিতবিগ্রহাম্।
শিবপ্রেতসমারূঢ়াং মহাকালোপরি স্থিতাম্।।
বামপাদং শবহৃদি দক্ষিণে লোকলাঞ্ছিতম্।
কোটিসূর্য্যপ্রতীকাশং সমস্তভুবনোজ্জ্বলম্।।
বিদ্যুৎপুঞ্জসমানাভোজ্জ্বটবিরাজিতম্।
রজতাদ্রিনিভং দেবং স্ফটিকাচলবিগ্রহম্।।
দিগম্বরং মহাঘোরং চন্দ্রার্কপরিমণ্ডিতম্।
নানালঙ্কারভূষাঢ্যং ভাস্বংস্বর্ণতনূরুহম্।।
যোগনিদ্রাধরং শম্ভুং স্মেরাননসরোরুহম্।
বিপরীতরতাসক্তাং মহাকালেন সন্ততম্।।
অশেষব্রহ্মাণ্ডভাণ্ড প্রকাশিত মহোজ্জ্বলাম্।
শিবাভির্ঘোররাবাভির্ব্বেষ্টিতাং প্রলয়োদিতাম্।।
কোটিকোটিশরচ্চন্দ্রন্যক্কৃতানখমণ্ডলাম্।
সুধাপূর্ণশীর্ষহস্ত যোগিনীভির্ব্বিরাজিতাম্।।
আরক্তমুখমদ্যাভি-স্মর্ত্তাভিরম্বগাং বৈ।
ঘোররূপৈর্ম্মহানাদৈ-শণ্ডতাপৈশ্চ ভৈরবৈঃ।
গৃহীতশবকঙ্কাল জয়শব্দপরায়ণৈঃ।
নৃত্যাদ্ভির্ব্বাদনপরৈ রনিশঞ্চ দিগম্বরৈঃ।
শ্মশানালয়মধ্যস্থাং ব্রহ্মাদ্যুপনিষেবিতাম্।।

★ মা বামাকালীর দন্তপংক্তি বিদ্যুৎকান্তির মত, মা হলেন বলাকিনী। মা কে বিশ্বমাতা সম্বোধনে প্রণাম করা হয়েছে। মায়ের দ্যুতি কালমেঘের মত।

★ মা মুণ্ডমালা ধারণ করেন, মা মুক্তকেশী এবং দিগম্বরী। মা লোলজিহ্বা এবং মায়ের তিনটি নয়ন রক্তবর্ণ।

★ মায়ের মুখমণ্ডল থেকে কোটি কোটি চন্দ্র বিগলিত হচ্ছে। তাঁর শিরোদেশে অতিশয় উল্লাসযুক্ত উজ্জ্বল কিরীট।

★ মায়ের কর্ণদ্বয়ে শবকুণ্ডল শোভা পাচ্ছে। সূর্যকান্ত এবং চন্দ্রকান্ত মণি সহ নানা মণি দ্বারা মায়ের কর্ণভূষণ মণ্ডিত। কটিদেশ অর্থাৎ কোমর পরিবেষ্টিত শবহস্ত নির্মিত কাঞ্চীমালা দ্বারা।

★ মায়ের মুখমণ্ডল হাস্যময়। মুখের দুই কোণে রক্তধারা এবং মায়ের মুখমণ্ডল বিস্ফুরিত। মায়ের চতুর্ভুজ খড়্গ, মুণ্ড, বর এবং অভয় দ্বারা শোভিত।

★ মায়ের দন্তরাজি সু উচ্চ। মায়ের বিগ্রহ রক্তমণ্ডিত। মা শিবপ্রেতারূঢ়া, অর্থাৎ শববাহনা। মা মহাকালের উপরে স্থিতা।

★ মায়ের বাম পা শবের বুকের ওপরে। দক্ষিণ পদ মহাকাল শঙ্করের উপরে।

★ মা বামাকালী ঘোর রব করা শিবাদল দ্বারা পরিবেষ্টিতা। মা প্রলয়কালের মূর্তি ধারণ করেন। তাঁর নখমণ্ডল কোটি কোটি সূর্য চন্দ্র তুচ্ছ করে দিচ্ছে।

★ মায়ের মস্তকমণ্ডল এবং করসমূহ ঘিরে যোগিনীগণ বিরাজ করছেন, যোগিনীগণ সুধাধারিণী এবং আরক্তমুখী। ঘোর মহানাদকারী দিগম্বর নৃত্যবাদ্যরত ভৈরবগণ মা বামাকালীকে চতুর্দিকে পরিবেষ্টন করে মায়ের জয়জয়কার ঘোষণা করছেন।

★ মা শ্মশানবাসিনী। তিনি ব্রহ্মাদি সমস্ত দেবতাগণ দ্বারা পূজিত।

জয় মা বামাকালী। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবি ইন্টারনেট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, তিন জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

২০২৩ সালে কালীভক্তের সাফল্য মন্ত্র: মায়ের সন্তানদের জন্য পাঁচটি সহজ চর্যা – তমাল দাশগুপ্ত

২০২৩ সালে কালীভক্তের সাফল্য মন্ত্র: মায়ের সন্তানদের জন্য পাঁচটি সহজ চর্যা।

নতুন পশ্চিমী বছর ২০২৩ এলো। মায়ের সন্তানরা সবাই মায়ের নাম নিয়ে এই বছরটি শুরু করেছেন নিশ্চয়ই। একজন সাধারণ নগণ্য মাতৃসাধক হিসেবে পাঁচটি জীবনশিক্ষা আমার পাথেয়, আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি নতুন বছরের শুরুতে।

১. কালী চতুর্বর্গময়ী। ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ। এর কোনও একটি বর্গ আলাদা করে নিয়ে খণ্ডজীবন কাটালে মায়ের সন্তানের উপযুক্ত কাজ হয় না।

ধর্ম অর্থ ব্যাপক, শুধু রিলিজিয়ন নয়। আপনি যে চাকরি করেন, কর্তব্য করেন, জ্ঞানার্জন করেন, সব ধর্ম। অর্থ মানেও কেবল পয়সা নয়, সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার আছে, অর্থাৎ আপনার স্মার্টফোনে এই যে আমার লেখাটা পড়ছেন, সেটা অর্থবর্গের কাজ।

কাম অর্থে কেবল যৌনতা নয়। কাম্য বস্তুর অর্জন। ধরুন আপনি নিজের বাড়ি কিনতে চান, টাকা জমাচ্ছেন, সেটা কাম বর্গের অনুশীলন।

মোক্ষ অর্থ সবাই জানেন। কালী কৈবল্যদায়িনী। এই জন্ম মৃত্যুর দুঃখময় জীবন থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার আদর্শ ভারতে প্রাচীন। সাংখ্য বলে উচ্ছিত্তি। বৌদ্ধধর্মে নির্বাণ।

এবার, তন্ত্রধর্মে শাক্তধর্মে কেবল চতুর্থ বর্গের কথা বলা নেই। চতুর্বর্গের কথা বলা আছে। চারটি বর্গই আমাদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। শাক্তধর্ম কেবল পারমার্থিক নয়, তা জাগতিকও বটে। মনে রাখবেন মায়ের সন্তানের জন্য ভুক্তি ও মুক্তি দুয়েরই ব্যবস্থা করে রেখেছেন মা। অতএব জাগতিক কর্তব্যপালন, জাগতিক প্রাপ্তিসুখ, জাগতিক কামনা পূরণ – শাক্ত হিসেবে, মায়ের সন্তান হিসেবে আপনার জীবনের অঙ্গ।

তাই চোখ বুঁজে কেবল আধ্যাত্মিক ধ্যান করে কাটিয়ে দেবেন না জীবন। মা কালীকে তো আমরা নিজেদের মধ্যেই ধ্যানে উপলব্ধি করি।

কিন্তু জাগতিক ব্যাপ্তি দরকার। মায়ের বিশাল মন্দির তৈরি করুন। বৃহৎ জাগতিক কর্ম করুন। বস্তুনিষ্ঠ থাকুন। আপনার প্রজ্ঞা যেন আপনার জাতির জন্য সুফল বয়ে আনে। বৃহৎ আনন্দের স্বাদ নিন।

অনুশীলন ধর্মের কথা বঙ্কিমের লেখায় পাবেন, অনুশীলনের মাধ্যমে আপনার মানব সম্পদকে আরও তুখোড় করুন। যাবৎ বাঁচি তাবৎ শিখি, মনে রাখবেন। মায়ের সন্তানদের জয় হোক, এই ধ্বনিতে জগৎ মুখরিত করুন। জয় মা কালী বলে জীবন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। জীবন বিমুখ হবেন না। আপনার সঙ্গে মা কালী আছেন, চারপাশের সবাই আপনার বিরুদ্ধে গেলেও আপনার জয় অনিবার্য।

★★★

২. কালী জগদকারণ, কালী জগৎময়। রামকৃষ্ণদেব একটা কথা বলতেন, তিনিই সব হয়েছেন।

কাজেই জগতের সমস্ত কিছুই তাঁর অংশ। পারিপার্শ্বিক থেকে সমস্ত কিছু অবলোকন করুন, বিশ্লেষণ করুন, অনুধাবন করুন, কারণ পুণ্য তাঁরই জগৎ থেকে উৎপন্ন, পাপও তাঁর, সমস্ত কিছুর মধ্যেই তাঁর বার্তা আছে, পাঠ করুন মায়ের সেই সংকেত। যেখানে অনাচার, মায়ের বার্তা পাঠ করে রুখে দাঁড়ান। যেখানে সদাচার, মায়ের নির্দেশে পাশে থাকুন। কোনও রকম অন্যায় বৈষম্য মায়ের অভিপ্রায় নয়, বর্ণবৈষম্য বা লিঙ্গবৈষম্যর কোনও স্থান নেই মায়ের তন্ত্রধর্মে।

কিন্তু জগতে বৈষম্য আছে, তার মানে মা আপনাকেই সঙ্কটকালে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং কর্ম করার দায়িত্ব দিয়েছেন। এ মায়ের পরীক্ষা। প্রকৃতি সর্বদা পরীক্ষা নিয়ে চলেছেন।

অনাচারের অংশ হবেন না, অন্যায়ের পক্ষ সমর্থন করবেন না। কেউ মহৎ উদ্দেশ্যেও জোচ্চুরি জুমলা করতে গেলে বিরোধিতা করুন, কারণ জোচ্চোরের ভরসা কি, তার মহৎ উদ্দেশ্যেও তো জল মেশানো থাকতে পারে। কেউ খারাপ উদ্দেশ্যে আছে, আপনি জানেন সে খারাপ, অথচ দুয়েকটা ভালো কাজের চেষ্টা করছে, সতর্ক থাকুন, সরাসরি বাধা দেওয়ার দরকার নেই, কিন্তু বিপদের আশঙ্কা আছে, মা আপনাকে বলছেন। মায়ের বার্তা যেন সর্বদা আপনার মনের মাঝে পৌঁছে যায়। পশ্চিমের সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বাধুনিক বিজ্ঞানকে অনুসরণ করুন, কারণ তন্ত্র অতীতকাল থেকেই বিজ্ঞানের পরিপূরক। মহামারী এলে আমাদের বৈদ্যরা যে আয়ুর্বিজ্ঞান দিয়ে চিকিৎসা করতেন, তা তন্ত্রাশ্রয়ী। আদি সাংখ্যের সবথেকে নির্ভরযোগ্য নথি আছে একটি আয়ুর্বিজ্ঞান গ্রন্থে: চরক সংহিতা।

একটা রসিকতা আছে। ডুবন্ত এক ভক্ত খ্রিষ্টান মানুষ, মাঝ সাগরের জলে হাবুডুবু খাচ্ছে। একটা জাহাজ দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো, লাইফ বেল্ট দিয়ে বাঁচাতে চাইল। কিন্তু এ এমনই ভক্ত যে বলল, না ভাই, আমাকে গড বাঁচাবেন, ক্রাইস্ট বাঁচাবেন। আরও দুয়েকটা জাহাজও এভাবেই ওকে বাঁচানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে চলে গেল।

তা লোকটা অবশেষে ডুবে মারা গেল। ভক্ত মানুষ, সে মরে স্বর্গে গেছে। গিয়ে অভিমান করে বলছে, একি ভগবান, আমাকে বাঁচালেন না? ভগবান ভয়ানক রেগে গিয়ে বললেন, ওই তিনটে জাহাজ কি তোর বাবা পাঠিয়েছিল?

ভক্তটি বিড়বিড় করে বলল, বাবাই পাঠিয়েছিল তাহলে। আওয়ার ফাদার হু আর্ট ইন হেভেন…

★★★

তাই ডাক্তার ও বৈজ্ঞানিককে অবহেলা করে, বিশেষজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান মানুষকে উপেক্ষা করে কদাপি ভাববেন না আপনি বিশাল মাতৃভক্ত হয়েছেন। তেমন করলে কসমিক একটি থাপ্পড়ে মা আপনাকে বুঝিয়ে দেবেন, মায়ের বার্তা জগৎ মাঝে মায়ের সন্তানদের মাধ্যমেই প্রস্ফুটিত হয়, মায়ের ডাককেই আমরা অবহেলা করি যদি আমরা মায়ের সেই বার্তা না শুনি। কারণ তিনি প্রকৃতি, আর আমরা সবাই প্রকৃতির অংশ।

৩. কালীভক্ত সর্বদা মায়ের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় কারিণী রূপ মাথায় রাখবেন। মা তো, মা কি সন্তানের বলি চাইতে পারে, ইত্যাদি যারা বলে তারা নিজের মা, টুনির মা ইত্যাদির সঙ্গে জগদকারণ জগদবিলয় জগন্মাতাকে গুলিয়ে ফেলছে। যে পৃথিবী জন্ম দেন, সেই পৃথিবীই গ্রাস করেন।

তাই বিপদে আশঙ্কিত হবেন না, মনে রাখবেন, এক আশ্চর্য ভবচক্রের আবর্তন ঘটে চলেছে, এই চক্র মায়েরই প্রতীক, তার আবর্তন বুঝতে গেলে অনুশীলন করতে হবে, অথবা এমন প্রজ্ঞাবান মানুষের দ্বারস্থ হতে হবে যিনি অনুশীলনের মাধ্যমে মায়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বাঙালি যদি বিধ্বস্ত হয়ে থাকে, তার কারণ সে জগন্মাতার ধর্মে তন্নিষ্ঠ থাকে নি।

পড়াশোনা করলে পরীক্ষায় ফেল করবেন না, অন্তত স্বাভাবিক অবস্থায় এমন হবে না।

ফাঁকিবাজি করলে মহৎ কাজ হয় না।

দেবো দুর্বলঘাতক, দেবতারাও দুর্বলের ঘাতক, এই মর্মে সংস্কৃত শ্লোকটি তো আগেও পেজে দিয়েছি। দুর্বলতা পরিহার করুন।

এবং সমস্ত প্রয়াসের পরে, অনুশীলনের পরে এই অহঙ্কার যেন না আসে, যে সর্বজয়ী দিগ্বিজয়ী হয়েই গেছি। এক ইঞ্চি ভূমি জয় করার জন্য দীর্ঘ অনেক দিনের সংগ্রাম করতে হতে পারে, আবার দীর্ঘদিনের জয়ের ফসল এক মুহূর্তের অসতর্কতার ফলে বিনষ্ট হতে পারে।

দুঃখেষু অনুদ্বিগ্নমনা সুখেষু বিগতস্পৃহঃ। সাংখ্যযোগ থেকে পাই। অর্থাৎ, দুঃখে ভেঙে পড়বেন না, সুখে আত্মহারা হবেন না।

৪. কালী হলেন কালের অধিষ্ঠাত্রী। কালস্রোত, কালপ্রবাহ, কালগ্রাসের প্রতি তাই বিনম্র থাকুন। মা চাইলে এই কালের কলন করবেন, মা চাইলে কালস্রোতে ভাসিয়ে দেবেন। মানুষ অমর নয়, কালজয়ী হওয়ার অহঙ্কার মানুষকে মানায় না। জগন্মাতা জন্ম দিয়েছেন, সময় হলে তিনি তাঁর কোলে আবার টেনে নেবেন। জন্ম মৃত্যু কালীভক্তের কাছে পায়ের ভৃত্য, কারণ মা আমাদের শ্মশানবাসিনী। কালীভক্ত অকুতোভয় হবেন, কারণ মায়ের সন্তানের থেকে বড় বীর মানুষ পৃথিবীতে আর হয় না। কালীভক্ত ত্রিকালজ্ঞ হবেন, কারণ অতীতকালকে নিবিড়ভাবে পাঠ করলে ও বর্তমানকে নিষ্ঠাভরে বিশ্লেষণ করলে মায়ের সন্তানদের ভবিষ্যৎ দর্শনের ক্ষমতা জন্মায়।

৫. মা কালীর মূর্তি সন্তানকে সিদ্ধিদান করে, তাই বাড়িতে, এবং সম্ভব হলে নিজের খুব কাছেই সর্বদা মাতৃমূর্তি, মাতৃচিত্র রাখবেন। আমার ফ্ল্যাটে প্রত্যেক ঘরে মায়ের একাধিক ছবি/মূর্তি আছে। বাকি কারও মূর্তি বা ছবি না থাকলেও চলে, কিন্তু মা কে সঙ্গে রাখবেন।

নান্যদেবো কলৌ যুগে, তাই মায়ের পুজো করলে আর অন্য কারও পুজো করতে হয় না, অস্যার্থ: এক এই মায়ের পুজো করলেই বাকি সকলকে পুজোর ফল হয়। আমি বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি ভীষণ অনুরাগী। আমাদের সমকালে নাথযোগী এবং তান্ত্রিক সিদ্ধাচার্য যোগীপাল চৌরঙ্গীর সমাধিস্থল সম্পর্কে আমিই জন সচেতনতা তৈরি করেছি। আমি বৌদ্ধধর্মের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করি। যে বৈদিক ও পৌরাণিক ধর্মের সমালোচনা করি, তাকেও অতি যত্নে পাঠ করি। এমনকি খ্রিষ্ট বা মুসলিম ধর্ম সম্পর্কেও আমি দীর্ঘদিন ছাত্রের অধ্যবসায় নিয়ে পঠন পাঠন করেছি, আমার পিএইচডির বিষয় ছিল আইরিশ জাতীয়তাবাদ ও ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্ম।

আমি মা মনসার প্রচণ্ড ভক্ত, মা মনসাকে আমি কুণ্ডলিনীজ্ঞানে পুজো করি। আমি দুর্গাভক্ত বলা বাহুল্য, সহজ দুর্গাপুজো শুরু করেছি, আমিই এই সমকালে সহজ দুর্গাপুজোর প্রবর্তক। আমি জগন্মাতার সরস্বতী রূপের একনিষ্ঠ উপাসক, কারণ কুলে আমি বৈদ্য, বৈদ্যরা সারস্বত ব্রাহ্মণ। এছাড়া শীলে আমি অধ্যাপক, সেজন্যও সরস্বতী উপাস্য। তন্ত্রধর্মে কুলশীল মান্য হয়, বর্ণবাদ নয়। আমি বজ্রযোগিনী এবং নারোডাকিনীর উপাসনা করি, কারণ নারোপা আমার গুরু। আমি সকলের নাম নিতে পারব না, তবে আধুনিক যুগে বঙ্কিমের মত পথ প্রদর্শক পেয়ে অন্য অনেক শিক্ষিত বাঙালির মত আমিও ধন্য। কিন্তু সবার জয়ধ্বনি করতে গেলে এই এক জীবন যথেষ্ট হবে না।

তাই সর্বদা মনে রাখি, মা কালী তো সর্বময়ী। মা কালীর নাম করলে আর আলাদা করে কারও নাম নিতে হয় না, সমস্ত পাঠ, সমস্ত সাধনার পরে এই প্রতীতি জন্মেছে। পশ্চিমের শ্রেষ্ঠতম দর্শন, পূর্বের শ্রেষ্ঠতম প্রজ্ঞা, সমস্ত দেবতার নির্যাস এবং সমগ্র জীব ও জড় জগতের স্পন্দন এই কালীর মধ্যে এসে কেন্দ্রীভূত। বাঙালি হয়ে জন্ম নিয়ে নিয়ে যে কালীনাম করল না, সে অতি হতভাগা।

কালিকা বঙ্গদেশে চ। মা কালী বঙ্গেশ্বরী।

কলৌ কালী কলৌ কালী। মা কালী কলিযুগেশ্বরী। কলিযুগের একমাত্র গতি কালী।

কালীকে একমাত্র ইষ্ট করুন। জগদকারণ আদ্যা নিত্যা অব্যক্ত প্রকৃতির ধর্মে তন্নিষ্ঠ থাকুন। মায়ের আশীর্বাদে মায়ের সন্তানদের ভালো হবে।

মায়ের ধর্ম সর্বব্যাপী হোক।

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, দুই জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

কালী কে, কালিকে? – তমাল দাশগুপ্ত

কালী কে, কালিকে?

★ কালী হলেন জগদকারণ প্রকৃতি। সাংখ্য ও তন্ত্র দর্শনের কেন্দ্রে আছেন প্রকৃতি: অব্যক্ত, আদ্যা, নিত্যা, অদ্বয়। সমস্ত লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে তিনি, আমাদের ধ্যানের সুবিধার জন্য মা বলে ডাকি। বহু আগে সাধক কবি কমলাকান্ত লিখেছিলেন, কালী কেবল মেয়ে নয়, মেঘের বরণ করিয়ে ধারণ কখনও কখনও পুরুষ হয়। বর্তমানকালে জনপ্রিয় একটি শাক্তগানে বলা হয়েছে, তুমি পুরুষ কি নারী, বুঝিতে নারি, স্বয়ং না বোঝালে তা কি বুঝিতে পারি।

তাই কালী কে, সে কথা আমরা বরং মা কালীকেই জিজ্ঞেস করি। কারণ তিনি অব্যক্ত , বাক্য ও মনের অগোচর, অজ্ঞেয়। রামপ্রসাদ বলেছিলেন, কে জানে কালী কেমন, ষড় দর্শনে পায় না দর্শন।

কালী কে, কালিকে!

★★★

একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা, শ্রী শ্রী চণ্ডীতে দেবী স্বয়ং বলেন: “এই জগতে একমাত্র আমি ছাড়া আর দ্বিতীয় কে আছে!”

তিনি সর্বকারণকারণম্‌, দেবীভাগবত অনুযায়ী। তিনি অনাদি ও অদ্বয়। দেবী ভাগবত বর্ণনা করছে যখন সৃষ্টির আদিতে বেদ ছিল না, বিষ্ণু বা বাসব ছিলেন না, জল, বায়ু, অম্বর ছিল না, মন ছিল না, বুদ্ধি ছিল না, তখন শুধু দেবী ছিলেন। এই রূপটি বাঙালির প্রকৃতিমাতৃকার রূপ। কালীকুলে এই অদ্বয়বাদ আছে। তিনি উৎস, তিনি সমাপ্তি, তিনি ছাড়া আর কিছু নেই।

কালিকা বঙ্গদেশে চ। কালী হলেন বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী।

কলৌ কালী কলৌ কালী নান্যদেবো কলৌযুগে। মা কালী কলিযুগেশ্বরী, কলিযুগে কালী একমাত্র ফলপ্রদা। কলিযুগের একমাত্র গতি কালী, এবং কলিযুগে অপর কোনও দেবতা পূজা পাওয়ার অধিকারী নন।
এবং এই কালী কেবল শাক্তদের নন, তিনি জগজ্জননী। তিনি বৈষ্ণবের কৃষ্ণ। হ্যাঁ, কালী ও কৃষ্ণ অভেদ। নিতাইচাঁদ মা ত্রিপুরাসুন্দরীর উপাসনা করতেন। খড়দহে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপুজো আজও হয়। বাংলার বৈষ্ণবও শাক্ত। এবং কালীই শৈবদের পরম উপাস্য, কারণ মহাকাল ও মহাকালী অভিন্ন।

★★★

কালী হরপ্পা সভ্যতা থেকেই পূজিত, যদিও আগে তিনি যন্ত্রে পূজিত হতেন, এছাড়া ভিন্ন ভিন্ন মূর্তিরূপ ছিল। হরপ্পা থেকেই সুভীষণ মাতৃমূর্তির উপস্থিতি দেখা যায় (অর্থাৎ ভয়াভয় মূর্তি দেখা যায়: মায়ের সন্তানদের শত্রুদের মনে ভয় উদ্রেক ও মায়ের সন্তানদের অভয় প্রদান করেন কালী, কেননা তিনি জগদকারণ ও জগদবিলয়। তিনি সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়)। মায়ের বর্তমান মূর্তিরূপ পালযুগের অবদান, এবং সেনযুগে তা চূড়ান্ত রূপ পায়, সেনযুগের বৃহদ্ধর্ম পুরাণে আমরা কালীর বর্তমান মূর্তিরূপ পাই। এর তিন চারশো বছর পরে অন্ধকার মধ্যযুগে আগমবাগীশ মা কালীর সেই রূপ পুনরুদ্ধার করেন।

★★★

কালী ও দুর্গা অভিন্ন। দুর্গোৎসব আসলে ভদ্রকালীর পুজো। দুর্গাপূজার কেন্দ্রে আছে সন্ধিপুজো, এবং সেই সন্ধিপুজোর বলি গ্রহণ করেন স্বয়ং চামুণ্ডা কালী।

বাংলার প্রাচীনতম সভ্যতাকেন্দ্র পাণ্ডু রাজার ঢিবি অন্তিম হরপ্পা সভ্যতার সমসাময়িক। সেই প্রত্নক্ষেত্রে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছিল যে সেখানে বলাকা মাতৃকা পূজিত হতেন। আমরা জানি প্রাচীন বাঙালি জাতি বলাকা মাতৃকার উপাসক ছিলেন: বেদের বয়াংসি শ্লোক দ্রষ্টব্য।

এই বলাকা মাতৃকা হলেন কালীর আদি রূপ। দশমহাবিদ্যার অন্যতম মা বগলামুখী আসলে আদিতে বলাকামুখী। এছাড়া মা কালীর নিত্যা (আবরণ দেবতা) -দের মধ্যে একজন হলেন বলাকা। এই বিষয়ে তমাল দাশগুপ্তের প্ৰবন্ধ মা কালীর উত্থান এবং মা কালীর উৎসরণ দ্রষ্টব্য, যা সপ্তডিঙা পত্রিকার ওয়েবসাইটে বিনামূল্যে পড়া যায়।

★★★

ধর্ম, যা ধারণ করে। ধর্ম কেবল রিলিজিয়ন নয়। বাঙালিত্বের সংজ্ঞা সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়, স্রেফ ভাষাগত নয়। তাহলে ইংরেজিতে কথা বলেই সবাই ইংরেজ হত। সমকালের বিখ্যাত তাত্ত্বিক ইউভাল নোয়া হারারি বলেছেন ধর্মের মাধ্যমেই মানুষ বৃহৎ সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করেছে, অন্যান্য প্রাইমেটদের মত ক্ষুদ্র ইমিডিয়েট গোষ্ঠী থেকে বৃহত্তর সভ্যতায় উত্তীর্ণ হয়েছে।

তন্ত্রধর্ম এবং মাতৃধর্ম পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম। সাংখ্য ও তন্ত্রের প্রকৃতি কিন্তু কোনও আল্লা ঈশ্বর গড়ের মত মানবকল্পনা নন। ভারতের অতি প্রাচীন তত্ত্ব হল সাংখ্য যা নিরীশ্বর দর্শন হিসেবে প্রসিদ্ধ। সাংখ্য দর্শনের বিখ্যাত উক্তি, ঈশ্বরাসিদ্ধে। কাজেই প্রকৃতি কোনও তথাকথিত ঈশ্বর নন। জগতের উৎসরূপে তাঁকে বিগ ব্যাং ভাবতে পারেন, এবং তিনি বিশ্বচরাচর জুড়ে ব্যাপ্ত, জীব জড় নির্বিশেষে সমস্ত তাঁর উপাদান, তাঁর অংশ। প্রকৃতি হলেন বৃহৎ ইউনিভার্স এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম। এবং এই ধর্ম জগৎকে অস্বীকার করতে শেখায় না, এই ধর্ম বস্তুনিষ্ঠ। এই ধর্ম নরদেহকে অস্বীকার করতেও শেখায় না, কোনও দেহাতীত পরম সত্য নয়, দেহভাণ্ডর মধ্যেই ব্রহ্মাণ্ডকে অনুভব করা এই ধর্মের বৈশিষ্ট্য। আদি তন্ত্র থেকেই যোগ এসেছে আমরা জানি, তন্ত্রাশ্রয়ী হরপ্পা সভ্যতায় যোগাসন প্ৰচলিত ছিল।

মানব সম্পদের সর্বোচ্চ অনুশীলন হল আমাদের জগন্মাতার ধর্মের শিক্ষা। জয় মা কালী ধ্বনি আমাদের উৎসাহ দেয়, জাগতিক সত্যে সম্পৃক্ত করে।

এছাড়া তন্ত্রে লিঙ্গবৈষম্য নেই, পুরুষতন্ত্র নেই, নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য এই ধর্ম শেখায় না। তন্ত্রে বর্ণভেদ-বর্ণবাদ নেই, এই ধর্মে ব্রাহ্মণ শূদ্রের ভেদাভেদ করতে শেখায় না। মা কালীর তন্ত্র কেবল আবহমান নয়, তা একুশ শতকে এবং ভবিষ্যতেও মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তির পথ, ধ্যান ও আনন্দের পথ, সেজন্যই পশ্চিমের দেশগুলিতে তন্ত্র এবং মাতৃকা উপাসনা সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ছে, অনবরত গবেষণা হচ্ছে। বাঙালি অভাগা, বাংলা ভূমি দালাল অধ্যুষিত, তাই সে নিজের শেকড়ের কথা নিজেই জানতে পারছে না। শিক্ষিত ভদ্রলোক বাঙালি আত্মবিস্মৃতির অন্ধকারে নিমজ্জিত।

★★★

কিন্তু সমস্ত অধঃপতন সত্ত্বেও বাঙালি হল আধুনিক পৃথিবীর একমাত্র মাতৃকা উপাসক মহাজাতি। মাতৃধর্ম পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম, প্রাচীন প্রস্তর যুগ থেকেই মাতৃকা উপাসনা প্ৰচলিত, তার পাথুরে প্রমাণ আছে, কিন্তু বাকি সর্বত্র তা প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর একমাত্র জীবন্ত মাতৃধর্মের বিপুল জনপ্রিয়তা এই বাঙালির মধ্যেই দেখা যায়। বাঙালির সংজ্ঞায়ন হয় মাতৃধর্মে, মা কালী আমাদের জাতির পরিচয়। এবং কালী হলেন অব্যক্ত জগদকারণ প্রকৃতির ব্যক্ত ধ্যানমূর্তি।

কালীর দর্শন ও তত্ত্ব তো অসীম। তবে সবার ওপরে, সবার আগে তিনি আমাদের মা। তিনিই জন্ম দেন, তিনি চতুর্বর্গ দান করেন, জীবনের শেষে তিনিই অন্তিম আশ্রয় দেন।

বাঙালির অস্তিত্ব মা কালীর সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাঙালির নবজাগরণ একমাত্র তন্ত্রধর্মী শেকড়ের পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমেই সম্ভব। তাই কালীতত্ত্ব মহাসমুদ্র থেকে এই এক আঁজলা জল নিয়ে আমরা আমাদের মায়ের নামে জয়ধ্বনি করলাম। জয় মা কালী!

জয় জয় জয় মা কালী!
জয় মা কালী, জয় বাঙালি।

© কালীক্ষেত্র আন্দোলন
মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

আজ পনেরোই পৌষ ১৪২৯ শনিবার মধ্যরাতে মা কালীর নাম নিয়ে নতুন ইংরেজি বছর ২০২৩-এর আরম্ভ মুহূর্তে আমাদের পথ চলা শুরু হল। আমাদের পেজটি লাইক করুন, পেজের নাম কালীক্ষেত্র আন্দোলন। পেজের লিংক: https://www.facebook.com/profile.php?id=100088854411804&mibextid=ZbWKwL
নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের গ্রূপে সংযুক্ত হন, গ্রূপের নাম জয় মা কালী আন্দোলন- কালীক্ষেত্র চিরন্তন। গ্রূপের লিংক: https://www.facebook.com/groups/1208680915856872/?ref=share&mibextid=NSMWBT
আমাদের ওয়েবসাইট হল রিক্লেম কালীক্ষেত্র, ওয়েবসাইট লিংক https://reclaimkalikhetro.data.blog/

কালীক্ষেত্র আন্দোলন পেজ একত্রিশ ডিসেম্বর দুহাজার বাইশ।