মা কালী কি অনার্য? না, এত সহজ নয় – তমাল দাশগুপ্ত

মা কালী কি অনার্য, অবৈদিক? না, এত সহজ নয়। বেদে পূজিত হন নক্ৎ কৃষ্ণী (অর্থাৎ রাত্রি, কালো মেয়ে), এবং বেদে রাত্রিসূক্ত কালীর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। সৃষ্টির আদিতে কালো রাত, এবং উন্মেষে ঊষা: কালীই আদিমাতা অদিতি (সুকুমার সেনের লেখায় এর সমর্থন আছে), এবং কালরাত্রি থেকে জগৎ উৎপন্ন হওয়ার মেটাফর হিসেবে নিশা থেকে ঊষার উৎপত্তি: কালীই দুর্গা হিসেবে প্রকাশিত হন। প্রসঙ্গত ঊষা দশভুজারূপে বেদে সম্বোধিত। এদিকে কালী বলি গ্রহণ করতেন: মুণ্ডক উপনিষদে যজ্ঞের অগ্নির সপ্ত জিহ্বা সংক্রান্ত শ্লোক অবশ্যই দেবী হিসেবে, মাতৃকা হিসেবে কালীর আবাহন করে।

তবে কি কালী বৈদিক? না, এতটাও সহজ নয়। হরপ্পা সভ্যতায় কালী পূজিত ছিলেন, প্রমাণ করা যায়। কালীর মুখ্য স্থান আমাদের অবৈদিক ব্রাত্য তন্ত্রাশ্রয়ী ব্রতধর্ম। বেদ আমাদের জগন্মাতার ধর্মের পরিপূর্ণ প্রকাশ ও স্ফুরণ ধারণ করতে পারেনি।

তবে কালী কে? আর্য না অনার্য? তিনি কার, সেনযুগের হিন্দুর না পালযুগের বৌদ্ধর? আসলে তিনি সকলের। তিনি পূর্বের এবং পশ্চিমের। তিনি নারী ও পুরুষ। তিনি তন্ত্রের কেন্দ্রে, কিন্তু আসলে তাঁর দর্শন নিয়েই বেদ উপনিষদ। তিনি সাংখ্য, তিনি বৌদ্ধ জৈন সহ সমস্ত নাস্তিক অবৈদিক ধর্ম। তিনি অব্যক্ত, আবার তিনিই মুণ্ডমালিনী রূপ ধারণ করেন। তিনি বলাকা, তিনি শিবারূপও ধারণ করেন। তিনি জড়জগৎ, তিনিই জীবজগৎ। তিনি বৈষ্ণবের রটন্তি কৃষ্ণকালী এবং তিনি শাক্তদের পরম আরাধ্যা। কালী ব্রাহ্মণ্য ধর্মেও পূজিত, আবার তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মেও পূজিত।

কালীর নামে পাণ্ডু রাজার ঢিবির সুপ্রাচীন সভ্যতা বাংলার বুকে পাঁচ হাজার বছর আগে উত্থিত হয়েছিল, মা সেখানে বলাকা মাতৃকা রূপে পূজিত হতেন। কালী ছিলেন চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গাল সভ্যতায়, সেখানেও বলাকা রূপে পূজিত হতেন। তিনি পালযুগে চামুণ্ডা চর্চিকা রূপে পূজিত, এবং সেনযুগে বৃহদ্ধর্ম পুরাণে তাঁর বর্তমান মূর্তিরূপ পাই, প্রথম মহাবিদ্যা রূপে কালী সেনযুগে পূজিত। ষোড়শ শতকে বারো ভূঁইয়ার বিদ্রোহ কালীকে কেন্দ্র করে ঘটেছিল আবার উনিশ শতকের নবজাগরণে এবং বিংশ শতকের অগ্নিযুগে কালী আমাদের কেন্দ্রে ছিলেন।

কালীকুল বর্ণবাদ স্বীকার করে না। মা কালীর ধর্মে লিঙ্গভেদ নেই, পুরুষ প্রাধান্য নেই। কালীর উপাসনা সবার জন্য অবারিত। অনেকে সেজন্য কায়েমী স্বার্থ নিয়ে ভয় দেখায়, যাতে সবাই মায়ের পুজো না করতে পারে। বোধকরি সেও আমাদের মায়ের লীলা। মিথ্যা ভয় জয় করুন, মায়ের দর্শন পাবেন। কিন্তু জ্ঞান তো সামান্য সাঁকো, তা দিয়ে নয়, কারণ এই সমুদ্রের কোনও অন্ত নেই। ভক্তি নৌকো ছাড়া এই কালী সমুদ্র পার হওয়া যায় না।

কালী আসলে আর্য অনার্য, হিন্দু বৌদ্ধ, পুরুষ নারী, এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। কালী হলেন সারা পৃথিবীর মাতৃধর্মের অনেক সহস্র বছরের নির্যাস।

এবং কালী হলেন বাঙালি জাতির সবথেকে বড় গর্ব, সবথেকে বড় আশ্রয়, সবথেকে বড় ব্যাপ্তি। কালী আমাদের জাতির কেন্দ্রে আছেন। আমাদের ভূখণ্ড মা কালীর নামে শাসিত হয় এবং আমাদের জাতি মা কালীর নামে সংজ্ঞায়িত হয়।

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

মায়ের ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, পাঁচ জানুয়ারি দুহাজার তেইশ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s