বাঙালির বনদেবী – তমাল দাশগুপ্ত

বাঙালির বনদেবী।

বনদেবী নামটি আজ আর সুপ্রচলিত নয়, বনবিবি নামেই তাঁকে সবাই চেনে। বনবিবি হলেন দক্ষিণবঙ্গে বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চলে পূজিত অরণ্যচণ্ডী বা বনচণ্ডীর বিবর্তিত রূপ। বনদেবী মুসলিম প্রভাবে বনবিবি হয়েছেন মধ্যযুগে।

সাম্প্রতিক সংবাদে প্রকাশ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বনবিবি মন্দিরে পুজো দিয়েছেন।

ব্যাঘ্রবাহিনী মা বনদেবীর জয় হোক, আজ আমরা মায়ের কথা আলোচনা করব

বনদেবীর বৈশিষ্ট্য।

★ সন্তানসহ চণ্ডীর পূজা হয় আদিকাল থেকেই। সন্তানকোলে মাতৃকামূর্তি প্রাচীন হরপ্পা সভ্যতায় সবথেকে জনপ্রিয় ছিল। বনদেবীও তাঁর সন্তানদের রক্ষা করেন, তাঁর মূর্তিমণ্ডলে তাই প্রায়শই তাঁর দ্বারা রক্ষিত তাঁর সন্তান (দুখে/দুখী) পরিলক্ষিত। এই প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গে এমন মূর্তির কথা জানতে পারছি যেখানে বনদুর্গা লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ সহ পূজিত হন।

★ ব্যাঘ্রকে প্রশমিত করতেন হরপ্পা সভ্যতার সুপ্রাচীন মাতৃকা। পাঁচ হাজার বছর পুরোনো ব্যাঘ্রধারিণী মাতৃকার সিল পাওয়া গেছে, দুই হাতে দুটি বাঘকে চেপে ধরে শমিত করছেন। বনদেবী ব্যাঘ্রবাহিনী, তিনি বাঘের ভয় থেকে রক্ষা করেন, বাঘকে শমিত করেন। যেহেতু এই সুন্দরবন অঞ্চল ব্যাঘ্র অধ্যুষিত, তাই বনদেবীর বাহন বাঘ।

★ এই বনদেবী গঙ্গারিডাই সভ্যতায় পূজিত ছিলেন কি না নিশ্চিত করে বলা যায় না, কারণ সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যোগের অভাব, কিন্তু পালসেনযুগে দক্ষিণবঙ্গের শাসনভুক্তির ব্যাঘ্রতটীমণ্ডল নাম দেখে বোঝা যায়, ব্যাঘ্র অধ্যুষিত এই অঞ্চলে সেই যুগে স্থানেশ্বরী মাতৃকার ব্যাঘ্রবাহিনী রূপ থাকাই স্বাভাবিক।

★ বনদেবীর উপাসনায় নারী পুরুষ, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকার, পুরোহিত প্রায় সর্বত্র অব্রাহ্মণ। বনদেবী তাই সনাতনী বর্ণবাদী বৈদিক পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যধর্মের বাইরে অবস্থান করেন। অরাজক মধ্যযুগে সহজেই স্থানীয় ইসলাম তাঁকে বনবিবিতে রূপান্তরিত করে। তবে তিনি ইসলামেরও বাইরে অবস্থান করেন। ইসলামে আল্লা ছাড়া কারও পুজো স্বীকৃত নয়। মাতৃকা উপাসক বাঙালির মধ্যে টিঁকে থাকতে গিয়ে সমস্ত বহিরাগত ধর্মকেই মাতৃধর্মের সঙ্গে আপোষ করতে হয়েছিল।

★ বনদেবীর উপাসনা বাঙালিকে তার সুপ্রাচীন শেকড়ে ফেরাতে পারে। এই বনদেবী তাঁর অপার স্নেহে দক্ষিণবঙ্গের বাঙালিকে রক্ষা করছেন। তাঁর ধ্যানমন্ত্র পুরাণে নেই কিন্তু পালাগানে আছে। তাঁর উপাসনায় দুরূহ তন্ত্র লেখা হয়নি কিন্তু মানুষের কণ্ঠে তাঁর মিথলজি ছড়িয়ে গেছে। তিনি মূলধারার দুর্গা থেকে আলাদা, কিন্তু সেজন্যই বনদুর্গা হিসেবে তাঁর পৃথক উপাসনা। তিনি সন্তানের চির আশ্রয়, এই বনদেবী জগন্মাতা হয়ে আমাদের বরাভয় দেন। তিনি তন্ত্রের অব্যক্ত জগদকারণ প্রকৃতির প্রাকৃতিক রূপ, তিনি মানুষের সঙ্গে অরণ্যের সহাবস্থান ঘটান, তিনি প্রাকৃতিক ভারসাম্যের মূর্ত প্রতীক।

জয় মা বনদেবী। জয় জয় মা।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

বনবিবি/বনদেবী মায়ের ছবি ইন্টারনেট থেকে।

বনদেবীর বাৎসরিক পুজোর দিন হল পৌষ সংক্রান্তি এবং মাঘের পয়লা। কিন্তু জঙ্গলে প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করতে ঢোকার আগে বছরের যে কোনও সময়েই সুন্দরবনের মানুষ তাঁর বিশেষ পুজো করে থাকেন।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, এক ডিসেম্বর দুহাজার বাইশ

কমেন্ট থ্রেড থেকে

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ লিখেছেন: ত্রিপুরার বড়মুড়া পাহাড়ে বনদেবীর মন্দির আছে। আগরতলা থেকে প্রায় 35কিমি দূরে জাতীয় সড়কের পাশেই অবস্থিত মন্দিরটি। অনেকটা জগদ্ধাত্রী ঠাকুরের মত দেখতে বিগ্রহটি। এছাড়া, আগরতলার যে পাড়ায় আমি থাকি, তার পাশের পাড়ার নামই হল বনকুমারী।

রামকৃষ্ণ বড়াল লিখেছেন:

আমাদের গ্রাম এবং আশপাশের গ্রামেও এই দেবির মূর্তি দেখিনি৷ সল্টলেকের নলবনভেড়িতে সর্বপ্রথম এই লৌকিক দেবীর দর্শন লাভ করি। পরে এই দেবীর ব্যপারে বিস্তারিত জানার জন্য পশ্চিমবঙ্গ দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা সংখ্যায় চোখ বোলায়।

সুন্দর পোস্ট। ধন্যবাদ।।

টুম্পা দাস লিখেছেন: আমার বাড়ির পাশে জঙ্গলে(মৈপিঠ নেগেনাবাদ ,সুন্দরবন)এই দেবীর পুজো হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ মঙ্গলবার।যাঁরা বন থেকে কাঠ,মধু, মাছ ধরে জীবিকা চালান তাঁরাই এই পুজোর আয়োজন করেন। ধর্মের ভেদ থাকে না,যৌথ উদ্যোগে পুজোর আয়োজন হয়।পর্যটকের ভিড় থাকে ভালোই ,পুজোর দিন থেকে মেলা চলাকালীন ১৫দিন যাবত।

রক্তিম মুখার্জি লিখেছেন: গ্রামবাংলায় জনপদের বাইরে বলি সহযোগে শ্যাওড়া জাতীয় কাঁটাগাছে ভীষণা ব্যাঘ্রবাহনা বনদুর্গার পূজা করেন বঙ্গনারীরা। এইরূপে কান্তারদুর্গার উপাসনার কথা সদুক্তিকর্ণামৃতেও আছে। আসকো পারপোলা হরপ্পার কাঁটাগাছের নিচে বাঘের পিঠে বসা মাতৃকার কথা জানাচ্ছেন। তিনিই সম্ভবত কান্তারদুর্গা বা বনদুর্গা বা বনদেবীর আদিরূপ।

ময়ূখ ভৌমিক লিখেছেন: Raktim Mukherjee উত্তরবঙ্গে র সর্বত্র ও পূর্ব বঙ্গের কোথাও কোথাও যে বুড়িমা বা বুড়ি ঠাকুরানী র পূজা হয়, তিনিও বনদুর্গা l আবার ময়মনসিংহ এর কিছু অঞ্চলে সন্তান জন্মের ত্রিশ দিনের মাথায় প্রসুতি শেওড়া গাছের নিচে বন দুর্গা পূজা করেন l এই পূজায় হাঁসের ডিম ও বলি দেওয়া র প্রথা আছে l

Know Bengal লিখেছেন:

রাঢ় বঙ্গের হুগলিতে বনদেবীর ব্রত।

ঋতু পর্ণা লিখেছেন:

এই পুজো অগ্রহায়ণ মাস থেকেই শুরু হয়। আমাদের পাড়াটি আসলে কুমোরপাড়া। অগ্রহায়ণ মাসের যেকোনো একটি শনি বা মঙ্গলবারে তাঁদের করতে দেখছি। সন্ধ্যে হয়ে এলে তুলসীতলায় খেতে বসতাম দই চিঁড়ে, তরকারি আর মুড়ি। গত মঙ্গলবারেই শুনলাম পুজো হয়েছে। এই খাওয়াদাওয়ার আগে সব খাবার বনদেবীকে দেওয়া হয় বড়ো কোনো গাছের গোড়ায়। আর খাওয়া হলে একটা ঘরে ঢুকে ছড়া বলতে হয়। ঘরের বাইরে বাড়ির গিন্নি থাকেন। ভিতরে থাকতাম আমরা। ঘরে মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতাম।
বাইরে থেকে গিন্নি বলেন- “ঘরে কেনো আলো”
তখন ভেতর থেকে বলা হয় “গিন্নি গেছে বনভোজনে সবাই আছে ভালো”
এটা তিনবার বলার পর। দরজায় একটা কুলের কাঁটা রাখা হয়। সেটা দেখে বাইরে যিনি আছেন তিনি বলেন “দোরে কেনো কাঁটা” তা শুনে ভেতর থেকে বলা হয় “ঘরে সোনার ভ্যাঁটা”।

পুরো অনুষ্ঠানটা আমার খুব প্রিয় আর গিন্নির বনভোজনে যাওয়ার ব্যাপরটাও খুব অবাক করার মতো।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s