মা কালীর সপ্ত আদ্যা রূপ: শাস্ত্রীয় ও পুরাতাত্ত্বিক – তমাল দাশগুপ্ত

মা কালীর সপ্ত আদ্যা রূপ: শাস্ত্রীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক।

★ ঋগ্বেদে কৃষ্ণী। এছাড়া রাত্রি সূক্ত। কালীই আদি দেবী, জগদকারণ, সৃষ্টির উৎস অন্ধকার থেকে, পরে তিনিই ঊষা হয়ে আলো করেন। সুকুমার সেনও এই মত অবলম্বন করেন: সৃষ্টির আদিতে কৃষ্ণী, তিনিই পরে ঊষা।

হরপ্পা সভ্যতায় ভয়াভয় মাতৃকার মূর্তি পাওয়া গেছে। তিনিই জন্ম ও মৃত্যুর অধিষ্ঠাত্রী বলে কিছু গবেষক মনে করেছেন

★ বলাকাকালী। হরপ্পা (৪৫০০ বছর আগে), পাণ্ডু রাজার ঢিবি (৩০০০-৪০০০ বছর) চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গাল সভ্যতা (২০০০ বছর) বলাকা মাতৃকা পূজিত হতেন। ঐতরেয় আরণ্যক-এর বয়াংসি শ্লোক ইঙ্গিত করে বাঙালির পূর্বসূরী বলাকা উপাসক ছিলেন, অতুল সুর বলছেন।

কালীর ষোড়শ নিত্যার মধ্যে একজন বলাকা। বলাকা থেকেই অপভ্রংশ হয়ে মহাবিদ্যা বগলা। কালীকে বলাকিনী বলা হয় কালিদাসের কাব্যে।

★ চামুণ্ডা কালী। ইনি শ্রী শ্রী চণ্ডীতে অসুর বধ করেন
আজও দুর্গাপুজোর কেন্দ্রীয় অংশ সন্ধিপুজোয় বলি গ্রহণ করেন চামুণ্ডা কালী স্বয়ং। পালযুগে চর্চিকা পূজিত হতেন, ইনিও কালীর আরেক রূপ।

★ পার্বতী কালী। গুপ্তযুগে রচিত বেশিরভাগ পুরাণেই বলা হয় আদিদেবী হিমালয়দুহিতা আগে কালী ছিলেন, পরে তিনিই গৌরী। এটি হরপ্পা সভ্যতা এবং ঋগ্বেদে কৃষ্ণীর রূপভেদ হিসেবে ঊষার আগমনীর দ্যোতনা বহন করে, পৌরাণিক যুগ সেই আদ্যা তত্ত্ব নিজের মত পুনর্নির্মাণ করেছিল।

★ কৌশিকী কালী। শিব পুরাণে দেখা যায় দেবী কালীর কৃষ্ণবর্ণ ত্বক থেকে কৌশিকী কালী আসছেন। ইনি অষ্টভুজা এবং সিংহবাহিনী, এবং ইনি শুম্ভ নিশুম্ভ বধ করেন। এই কৌশিকী কালীর প্রভাব সিংহবাহিনী মহাকালী এবং মহিষাসুরমর্দিনী ভদ্রকালীর মধ্যে দেখা যায়। কৌশিকী কালী আদি মাতৃকা, বর্তমানে বিস্মৃত হলেও কৌশিকী অমাবস্যায় এঁরই উপাসনা হত।

★ কাল সংকর্ষণী কালী। ইনি কাশ্মীরি শৈবধর্মে সর্বোচ্চ উপাস্য মাতৃকা। ইনি কালের নিয়ন্ত্রণ করেন। নথিবদ্ধ আকারে দশম শতক থেকে তন্ত্রে মা কালীর সর্বেশ্বরী একেশ্বরী প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। মহাকাল সংহিতা কালীকে সর্বোচ্চ বলে ঘোষণা করে। কালীই চিরকাল জগদকারণ কিন্তু হরপ্পা থেকে পাণ্ডু রাজার ঢিবি থেকে চন্দ্রকেতুগড় অবধি প্রাচীন তন্ত্রভিত্তিক সভ্যতাগুলির পতন ঘটায় সেই সত্য আড়ালে চলে গিয়ে কালী কিছুটা প্রান্তিক হয়ে যান। মুণ্ডক উপনিষদ, মহাভারত বা চণ্ডীতে কালীকে দেখে প্রান্তিক দেবতা মনে হয়। কিন্তু তন্ত্রে চিরকাল কালীই জগদকারণ, শশাঙ্ক থেকে পালযুগে গৌড়ের উত্থানের ফলে গৌড়ে প্রকাশিতা বিদ্যা তন্ত্রশাস্ত্রে সেই অনাদি সত্যের পুনঃপ্রকাশ ঘটে। পালযুগে কালীর বর্তমান মুণ্ডমালিনী শবারূঢ়া রূপের চূড়ান্ত নির্মাণ ঘটতে থাকে।

★ দক্ষিণা কালী। মধ্যযুগের শুরুতেই বৃহদ্ধর্ম পুরাণে মা কালীর মূর্তিরূপ পাই, এখনকার মতোই, মুণ্ডমালিনী, শববাহিনী। বাংলা জুড়ে কালী ভাগবত ধর্মের বিপুল উত্থান ঘটে। বারো ভুঁইয়ার বেশিরভাগ শাক্ত এবং কালীই তাঁদের ইষ্ট। আগমবাগীশ তন্ত্রসারে দক্ষিণা কালীমূর্তির তত্ত্ব প্রকাশ করেন। যাঁর ভয়ে দক্ষিণদিকের অধিপতি যম পালিয়ে যান তিনিই দক্ষিণা কালী।

নদীয়ার কৃষ্ণচন্দ্র কালীভক্ত ছিলেন। এই সময় মায়ের মাতৃরূপ প্রকাশিত হয় শাক্ত ভক্তি আন্দোলনে, নেতৃত্ব দেন রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত। রাণী রাসমণির দক্ষিণেশ্বর মন্দির নির্মাণের ফলে মা দক্ষিণাকালীকে আশ্রয় করে শাক্ত ধর্মের নতুন অভ্যুদয়ের এক বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়। অবশ্যই বামাকালীও এই সময় বাংলা জুড়ে সমান উদ্যোগে ও আগ্রহে পূজিত হয়েছেন।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

তিনি আদিতে ছিলেন, এজন্য আদ্যা। তিনি চিরকাল আছেন এজন্য নিত্যা। তিনি উৎস, এজন্য জগদকারণ। অন্তিমে তিনিই জগদবিলয়। তিনি অব্যক্ত, তাঁকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ধ্যানের সুবিধার জন্য তাঁকে মা কালী বলে ডাকি, এবং তাঁর মুণ্ডমালিনী বলিপ্রিয়া শবারূঢ়া খড়্গিনী এলোকেশী রূপের পুজো করি।

জয় মা কালী। জয় জয় মা।

মায়ের ছবিটি ইন্টারনেট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, বাইশ নভেম্বর দুহাজার বাইশ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s