মা কালী কেন দিগবসনা? – তমাল দাশগুপ্ত

মা কালী কেন দিগবসনা?

★ জগদকারণ জগন্মাতাকে আচ্ছন্ন করতে পারে এমন কোনও পার্থিব বস্ত্র নেই। তিনি সারা বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনি বিশ্বব্যাপী আছেন, তিনি দশদিকে ব্যাপ্ত। এজন্য তিনি দিগবসনা, দিগম্বরী।

★ তিনি জগৎপ্রসবিনী। যেমন বাঙালির স্বস্তিকা চিহ্ন বলে খ্যাত লজ্জাগৌরী মূর্তি প্রসবের ভঙ্গিতে উত্তানপাদ থাকেন এবং তিনিও নগ্নিকা, কারণ তিনি বিশ্বকে প্রসব করছেন। প্রসব করার সময় আচ্ছাদন অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয়।

★ মা কালী কৈবল্যদায়িনী। কার্তিকী দীপান্বিতা অমাবস্যা কৈবল্যের উৎসব, এবং আদ্যা নিত্যা অব্যক্ত জগদকারণ প্রকৃতির মূর্ত প্রকাশ জগন্মাতা মা কালীর নগ্নতা এই কৈবল্যের দ্যোতনা বহন করে। বস্তুত দীপান্বিতা অমাবস্যা মহাবীরের প্রয়াণ তিথি রূপে জৈন ধর্মে উদযাপিত হয়। আসলে অনেক প্রাচীন উৎসব, জৈন ধর্ম পরে আত্মসাৎ করেছে, যেমন রামায়েত বৈষ্ণব ধর্মও পরে চেষ্টা করেছে ( রামের অযোধ্যা ফেরার উৎসবের গল্প)।

আসলে এই দীপান্বিতা উৎসব উপমহাদেশে হরপ্পা সভ্যতার সময় থেকে চলে আসছে। শারদীয়া দুর্গাপুজো এবং কার্তিকী অমাবস্যায় কালীপুজো হরপ্পা সভ্যতায় পূজিত ঊষা ও নিশার উপাসনার স্মৃতিবাহী। নিশা মোক্ষ বা কৈবল্যপ্রদায়িনী, সেখান থেকে পরে বিভিন্ন অবৈদিক ধর্ম যেমন বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম তাদের দর্শন নির্মাণ করেছে। অতএব মা কালী এই কৈবল্য প্রদান করেন বলেও দিগবসনা। কালীপুজো সমস্ত জাগতিক মোহজাল থেকে মুক্ত হওয়ার উৎসবও বটে।

★ কালীপুজোর দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে উপমহাদেশে, হরপ্পা সভ্যতার সময় থেকেই প্ৰচলিত। কিন্তু আগে মূর্তিরূপ ভিন্ন ছিল। বর্তমানকালে মায়ের যে মূর্তিরূপ জনপ্রিয়, তা পালযুগে প্রথম প্ৰচলিত এবং সেনযুগে বৃহদ্ধর্ম পুরাণে প্রথম লিপিবদ্ধ। মধ্যযুগে তা হারিয়ে গেলে পুনরায় ষোড়শ সপ্তদশ শতকে পুনরুদ্ধার করা হয়। জনপ্রিয় এই মূর্তিরূপ বাঙালির শাক্তধর্মের দীর্ঘ দর্শন, তত্ত্ব, ইতিহাস ও আবেগের মহা মন্থনে নির্মিত। মায়ের এই মহারূপটিকে নিছক বস্ত্রে আবৃত করা মূর্খের কাজ। পশ্চিমবঙ্গে শোনা যাচ্ছে আজকাল অবাঙালি উত্তর ভারতীয় প্রভাবে এই মূর্খামি ঘটছে, অনুরূপ বিষয় মোল্লা প্রভাবে বাংলাদেশে ঘটছে কি না জানি না। মায়ের সন্তানদের পক্ষে বিষয়টা লজ্জার। মাকে আবরণ উপহার দিতে চাইলে নরমুণ্ডমালা দিন, তিনি আপনার ঘোমটা আর আঁচল ঢাকা শুচিবাইগ্রস্ত পুরুষতান্ত্রিক বাড়ির বাধ্য বউ নন।

মনে রাখবেন আদ্যা নিত্যা অব্যক্ত জগদকারণ জগন্মাতার পুজো হচ্ছে, এটা রাম শ্যাম যদু মধুর মাসিমা পিসিমা মামিমা জেঠিমা মা ঠাকুমা বৌমার পুজো নয়।

এও মনে রাখবেন, মা কালী সমস্ত লিঙ্গভেদের অতীত। আমরা বোঝার সুবিধার জন্য অব্যক্ত জগদকারণ সর্বকারণকারণম আদ্যা নিত্যা প্রকৃতিকে মাতৃরূপে উপাসনা করি মাত্র। তা নয়ত, শাক্ত কবির ভাষায়, কালী কেবল মেয়ে নয়, কখনও কখনও পুরুষ হয়।

★ মায়ের মূর্তিতে কটিদেশে কর্তিত হস্তের মেখলা থাকে। জবাফুল ও অলঙ্কারের প্রশস্ত আস্তরণ থাকে। মুণ্ডমালা তো থাকেই। কিন্তু নিছক বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদন তন্ত্রবিরোধী, ধর্মবিরোধী, শাস্ত্রবিরোধী, ইতিহাসবিরোধী, বাঙালির শেকড়বিরোধী।

শাক্ত কবি গেয়েছিলেন বটে বসন পরো মা, কিন্তু সেটা সাহিত্যের বিশেষ দ্ব্যর্থবোধক এবং বিপরীতার্থক অলঙ্কার। ইংরেজিতে একে আয়রনি বলে। সাহিত্য বিষম বস্তু, আক্ষরিক ও কেজো অর্থে নিলে বিভ্রাট হয়। মা বসন পরতে পারেন না, কারণ বিশ্বকে আবৃত করতে পারে এমন বসন অসম্ভব, সেটাই শাক্ত কবি বলতে চেয়েছেন।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

জয় জয় মা।

ছবিটি ইন্টারনেট থেকে।

তমাল দাশগুপ্ত ফেসবুক পেজ, চোদ্দ সেপ্টেম্বর দুহাজার বাইশ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s