মাৎস্যন্যায় রাসপূর্ণিমা ক্রোড়পত্র

আজ রাসপূর্ণিমা ১৪২৭, ৩০শে নভেম্বর ২০২০। এই উপলক্ষে মাৎস্যন্যায় ব্লগজাইনের বিশেষ রাসপূর্ণিমা ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হল।

লেখকসূচী

পার্থ চৌধুরী – নবদ্বীপে শাক্ত রাস উৎসব

রাধাবিনোদ ঠাকুর গোস্বামী – রাসেশ্বরী

রক্তিম মুখার্জি – রাসরহস্য

শুভদীপ সিনহা – রাসোৎসব

সুবীর মুখার্জি – রাসের মেলা

তমাল দাশগুপ্ত – চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গারিডাই সভ্যতার রাসমণ্ডল

*********************††††*********************

নবদ্বীপে শাক্ত রাস উৎসব

পার্থ চৌধুরী

বাংলার এবং বাঙালির শ্রেষ্ঠ উত্সব যেমন দুর্গাপূজা তেমনই নবদ্বীপের শ্রেষ্ঠ উৎসব। শরৎকালে শারদোৎসবের পরেই শুরু হয় উৎসবের প্রস্তুতি; কার্তিকী পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয় নবদ্বীপের শ্ৰেষ্ঠ লৌকিক উৎসব “রাস”। রাস নামটি যেমন বৈষ্ণব সিঞ্চিত তেমনই বৈপরীত্যে নবদ্বীপের রাস শাক্ত রসে আবৃত। এখানকার রাসের প্রধান বিশেষত্ব শাক্তমূর্তির বিশালতা হলেও মূর্তির সুষমা তাক লাগাবেই। তৎকালীন পন্ডিত সমাজের নানা পন্ডিতদের কুলদেবী ছিলেন এইসব শক্তি দেবী। অপরূপ মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মাণ করে নানারূপে শক্তি আরাধনাই নবদ্বীপের রাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি মূর্তিতে বাংলার প্রাচীন শিল্পের খুরধারতা ফুটে ওঠে। কত কারুকার্যময় নির্মাণশৈলী, কত বিচিত্র রূপকল্পনা, কত ব্যাপক ধর্মীয় ব্যঞ্জনা, কত পণ্ডিতের গভীর উপলব্ধির সুস্থিত বহিঃপ্রকাশ, কত শিল্পীর নিখুঁত চিত্রায়ণ— যা সম্মিলিতরূপে অসংখ্য মানুষের মনোরঞ্জনে সহায়তা করে। নবদ্বীপের রাস শুধুমাত্র উৎসব নয়, ধর্মীয় দ্যোতনার এক ব্যঞ্জনাময় অভিব্যক্তি।

কেন নবদ্বীপ রাস আলোচনা

রাস মূলতঃ কৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত ধর্মীয় উৎসব; কিন্তু পূর্বেই উল্লেখ্য নবদ্বীপের রাস প্রধানত শাক্ত রসাশ্রিত। আবহমানকাল থেকে এখানকার নবদ্বীপের ধর্ম–সংস্কৃতিতে তান্ত্রিক বীরাচারের প্রাধান্য পরিলক্ষিতহয়। মদ–মাংস (পঞ্চমকারেরপ্রধানবস্তু) এবং আড়ম্বরের জৌলুস ছাড়া বীরাচারের আরাধনার পূর্ণতা ঘটেনা। আর সেই সবকিছুরই নবদ্বীপের রাসে অনিবার্য ভাবেই ঘটেছে তন্ত্রাচারের পূর্ণ প্রতিফলন। অপরদিকে তথাকথিত বৈষ্ণবীয় রাসের সাত্ত্বিক ধারা যেমন অনেকটাই কোণঠাসা তেমনই এই শাক্ত রাসের তন্ত্রধারা উদ্ভাসিত। বৈষ্ণবীয় মন্দির অভ্যন্তরে রাধাকৃষ্ণের চক্ররাস যে হয়না তা নয়, তবে তা জাঁকজমকপূর্ণ শাক্ত রাসের পাশে অনেকটাই ম্রিয়মান। তবে জনশ্রুতি প্রচলিত আছে যে, চৈতন্যদেব রাধাকৃষ্ণের রাস উৎসবের সূচনা করেছিলেন নবদ্বীপে। তবে সেটি ছিল বৈষ্ণব রাস। একথা যদি সত্যি হয় তাহলে স্বীকার করে নিতে হয় যে, ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভেই রাসের সূচনা হয়েছিল। তবে চৈতন্যদেবের সন্ন্যাস গ্রহণের পর নবদ্বীপের বৈষ্ণব আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। গৌরাঙ্গ–পরিজনেরা বাধ্য হয়ে নবদ্বীপ ত্যাগ করে স্থানান্তরে গমন করেন। ফলে বৈষ্ণবীয় উৎসব অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে নবদ্বীপে যে রাস উৎসবের সূচনা হয় তা অভিনব এবং বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসে তা অদ্বিতীয়।

পট পূর্ণিমা না রাস পূর্নিমা ?

রাস পূর্নিমায় ‘রাস’ নাম নিয়ে শক্তির উপাসনা, এই কথাটা শুরুতেই একটা ধাক্কা দেয়। কারণ স্বাভাবিক ধারণাতেই রাস বলতে উঠে আসে বৈষ্ণবীয়। কিন্তু তাহলে এটি রাস হলো কিভাবে? সেটারই উত্তর খুজতে সদয় হলেন কৃষ্ণনগরের মহারাজ।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে কৃষ্ণনগরের রাজা গিরীশচন্দ্রের পোষকতায় প্রবর্তন হয় রাস উৎসবের। সূচনা পর্বে পুজো হতো পটে, নাম ছিল ‘পট–পূর্ণিমা’। পরবর্তী পর্যায়ে মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মাণ করে পূজো অনুষ্ঠিত হতো। আর সেই সময়ই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও ঈশ্বরচন্দ্রের আমলে প্রবর্তিত কালী মূর্তিগুলির পূজার কাল পরিবর্তিত হয়ে কার্তিকী পূর্ণিমায় হয়েছিল অর্থাৎ দীপান্বিতা কালীপুজোর একপক্ষ কাল পর। অর্থাৎ সময়ের হেরফের করে মা পূজিতা হলেন রাসপূর্নিমাতে। একই সাথে রাস উত্সবেরও প্রাচীনত্ব প্রদান হলো। প্রসঙ্গে উল্লেখ্য এই সকল কালী মূর্তি বা শক্তিদেবীরা ছিলেন কোনো না কোনো সাধকের ইষ্ট দেবী। তাদের পূজা অনেক আগে থেকেই হতো, শুধু পূজার সময় পরিবর্তন করা হয়েছে।

কালীপূজা ও শাক্ত রাসের প্রবর্তন

আগেই উল্লেখ্য, রাস উৎসবের সূচনার আগেই কয়েকটি কালী মূর্তি পূজার প্রচলন ঘটেছিল এখানে। শাক্ত ঐতিহ্য অনুসারে বঙ্গদেশ ছিল তন্ত্র সাধনার ঐতিহাসিক পীঠস্থান। বাংলায় ব্রাহ্মণ্য দাপট থেকে বাঁচতে নিপীড়িত মানুষের সহায় হয়ে উঠেছে তন্ত্র, আর অত্যন্ত নিবিড় ভাবে আঁকড়ে ধরেছে সেই তন্ত্রকে। দ্বাদশ–ত্রয়োদশ শতক থেকেই তান্ত্রিক সাধনার সামগ্রিক বিকাশ ঘটতে থাকে সমগ্র বাংলায়। তবে সে যুগ ছিল সাধনার যুগ, নিষ্ঠা সহকারে নিয়ম–নীতি মেনে দেবীর উপাসনা করতেন সিদ্ধতন্ত্র সাধকেরা। ঐতিহ্য অনুসারে বাংলায় তখনও তেমনভাবে মূর্তি পূজার প্রচলন ঘটেনি। কথিত আছে, নবদ্বীপের বিশিষ্ট তন্ত্র সাধক কৃষ্ণানন্দ আগম বাগীশের (জন্ম ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে) তন্ত্রসার গ্রন্থ রচনার পর কালীপূজার প্রসার ঘটে। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রচিত ‘কালীপর্যাবিধি’ গ্রন্থের সাক্ষ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে তখনও তেমন ভাবে কালীপূজার প্রসার ঘটেনি।কথিত আছে, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রত্যক্ষ পোষকতায় এদেশে ব্যাপক ভাবে কালিপূজার প্রসারণ ঘটে।নবদ্বীপ নগরী যখন ভাঙনে বিপর্যস্ত তখন নবদ্বীপ সংলগ্ন ভাগীরথীর অপর পাড়ে অবস্থিত কুলিয়া পাহাড়পুরে অন্তত তিনটি শক্তি পূজার প্রচলন ঘটেছিল মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পোষকতায়।

বাংলায় তন্ত্রসাধনাকে রাজপৃষ্ঠপোষকতায় ভিত্তিপ্রদান

বাংলায় তন্ত্রসহ শক্তি পূজাকে আড়ম্বরের সাথে উদযাপন করাকে উৎসাহিত করেছিলেন কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। নদিয়ারাজ গিরিশচন্দ্র (১৭৪২– ১৮০২) কৃষ্ণচন্দ্রের প্রকৃত উত্তরসূরি। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বাংলার মাটিতে তন্ত্রাচারের যে বীজ বপন করেছিলেন, গিরীশচন্দ্রের উপযুক্ত পরিচর্যা ও জলসিঞ্চনে তা হয়ে উঠেছিল মহীরূহ। গিরীশচন্দ্ৰ ছিলেন নিষ্ঠাবান তন্ত্রসাধক তবে একই সাথে তিনি ছিলেন পরধর্মসহিষ্ণু। বৈষ্ণব–ঐতিহ্য অনুসারে তার আমলেই নবদ্বীপে গড়ে উঠেছিল বৈষ্ণবীয় মন্দির এবং সূচনা হয়েছিল উৎসব, অনুষ্ঠান ও চৈতন্য চর্চার। তাঁর আমলেই প্রচুর অর্থ ব্যয়ে হটহটিকা বাসন্তী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রকাণ্ড মূর্তি নির্মাণ করে। শান্তিপুর সন্নিহিত সূত্রাগড়ে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন তাঁরই কীর্তি। নবদ্বীপের রথযাত্রা ও দোলযাত্রায় তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন।

ইতিহাস ঘেঁটে রাস

নবদ্বীপের রাস বিষয়ে প্রথম আলোকপাত করেছেন গিরিশচন্দ্র বসু। ইনি ১৮৫৩–১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নবদ্বীপ–শান্তিপুর ও কৃষ্ণনগরের দারোগা ছিলেন। তাঁর রচিত “সেকালের দারোগা কাহিনী” (প্রকাশকাল ১৮৮৮ খ্রি.) থেকে তৎকালীন নবদ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান সহ সমাজ–সংস্কৃতিমূলক বিবিধ সংবাদ জানা যায়। নবদ্বীপের রাস সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “রাসপর্বে শান্তিপুরে যেমন রঙ্গ–তামাসা এবং বহুলোকের সমাগম হয় নবদ্বীপেও এই পূর্ণিমায় পটপূজা উপলক্ষে সেইরূপ সমারোহ হইয়া থাকে। নবদ্বীপের পটপূজা অতি প্রসিদ্ধ ব্যাপার। নামে পটপূজা কিন্তু বাস্তবিক ইহা নানাবিধ প্রতিমার পূজা। দশভূজা, বিন্ধ্যবাসিনী, কালী, জগদ্ধাত্রী, অন্নপূর্ণা প্রভৃতি দেব–দেবীর মূর্তি গঠিত হয়। নদীয়া, বুইচপাড়া ও তেঘরির প্রায় প্রত্যেক পল্লীতেই এক এক খানি করিয়া প্রতিমা হয়। প্রতিমাগুলি অত্যন্ত হালকা এমনকি ৫/৬ জন মজুরে তাহা স্কন্ধে করিয়া নাচাইতে পারে।” তিনি আরও লিখেছেন, “পটপূজার বিসর্জনের দিন উপস্থিত হইল। যে সকল স্থানে বহু প্রতিমা হয়, তাহার সর্বত্রই বিসর্জনের দিবস কোনও এক নির্দিষ্ট স্থানে এবং দর্শকদিগের মনোরঞ্জনের নিমিত্ত সমুদয় প্রতিমা আনিয়া একত্রিত করা হয় এবং ইহাকে এই অঞ্চলে প্রতিমার ‘আড়ঙ্গ’ কহে। পটপূজার বেলা দ্বিতীয় প্রহরের সময় আরম্ভ হইয়া সন্ধ্যার অনেক পূৰ্ব্বেই শেষ হইয়া যায়।”

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে নবদ্বীপের রাস উৎসবের একটি স্বচ্ছধারণা পাওয়া গেল গিরিশবাবুর বর্ণনায়। অধুনা লুপ্ত পুরাণগঞ্জে পূজিতা হতেন বিন্ধ্যবাসিনী। এখানে রাধী কালুর ভিটেয় শ্ৰীবাস অঙ্গন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন লছমন দাস, তো তা রামদাস বাবাজির শিষ্য। ১৮৫৩–৬০ খ্রিস্টাব্দে গিরিশ চন্দ্ৰ বসু পুরাণগঞ্জকে দেখেছিলেন নির্দিষ্ট স্থানে। অথচ শ্ৰীবাস অঙ্গন গঙ্গাগর্ভে নিমজ্জিত হওয়ায় পুনরায় বর্তমান স্থানে তা স্থাপন করা হয় ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে। সুতরাং ১৮৬০–৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সংঘটিত প্রবল বন্যা বা ভূমিকম্পে পুরাণগঞ্জ ধ্বংস হয়েছিল। রেকর্ড থেকে জানা যাচ্ছে, ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে প্রবল বন্যা হয়েছিল। এখানে, সম্ভবত এই বন্যাতেই পুরাণগঞ্জ গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এখানকার অধিবাসীরা বর্তমান শ্ৰীবাস অঙ্গনপাড়ায় উঠে আসেন। পুরাণগঞ্জের বিন্ধ্যবাসিনী শ্ৰীবাস অঙ্গনপাড়ায় পূজিতা হতে থাকে। কয়েক বছরের মধ্যে গোষ্ঠীকোন্দলে এটি ভাগ হয়ে যায়। একটি গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করে খড়ের গোলার বিন্ধ্যবাসিনী আর অপরটি গৌরাঙ্গিনী নামে প্রতিষ্ঠিত হয় যোগনাথতলায়। রাজপুরোহিত অসীম কুমার ভট্টাচার্য নথিপত্র ঘেঁটে জানালেন যে, গোলকীনাথ ন্যায়রত্ন এই দেবীর ধ্যানমন্ত্র রচনা করেছিলেন।

‘রাস’ প্রসঙ্গে কান্তিচন্দ্র রাঢ়ি লিখেছেন, “বহুদিন হইতে নবদ্বীপে রাস পূর্ণিমার বারোয়ারি পূজা হইয়া থাকে। ঐ সময়ে আদ্যাশক্তি ভগবতীদেবীর নানামূর্তি পূজিত হইয়া থাকে এবং পূজার পরের দিবস ঐ প্রতিমা সমূহ মহারাজকে দেখাইবার নিমিত্ত পোড়ামাতলায় উৎসাহে আনীত হইত। মহারাজ ঐসব মূর্তির গঠন–নৈপুণ্য, চিত্রের বিচিত্ৰতা, সাজের পরিপাট্য ইত্যাদি পরীক্ষা করিতেন এবং যে শিল্পী যে বিষয়ে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হইতেন, তিনি যথোচিত পারিতোষিক পাইতেন।” এই মহারাজটি যে গিরীশচন্দ্র তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। কারণ কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে বারোয়ারি পূজার প্রচলন ছিলনা। নদিয়ার রাজার শিল্পের কদর বুঝতেন অকুণ্ঠ চিত্তে সম্মান জানাতেন জগৎ স্রষ্টাকে।

মৃৎ শিল্প ও নবদ্বীপ রাস

নবদ্বীপের রাস উৎসবের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার অনন্য এক শিল্পধারা, সেটাই হলো বাংলার মাটি বাংলার মৃৎশিল্প।

রাসের সূচনা পর্বে পটপূজা হতো, তখন মৃৎশিল্পীরা নবদ্বীপে ছিলেননা। কথিত আছে, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমন্ত্রণে মৃৎশিল্পীরা নাটোর থেকে নবদ্বীপে এসে বাসা বাঁধেন। কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা ইংরেজ রাজপুরুষদের পোষকতায় বিকাশলাভ করেছিল। পট পূজার কাল অতিক্রমণের পর ক্রমশ মৃন্ময়ী মূর্তি পূজোর প্রচলন হয়, তখন লোকে বলত “রাসকালী” পুজো। “বিশাল বিশাল মূর্তি নির্মাণে নবদ্বীপের শিল্পীদের অসাধারণ দক্ষতা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। মূর্তির বিশালত্ব সত্ত্বেও প্রতিটি অঙ্গের আনুপাতিক মাপ বজায় রাখা, প্রতিটি অংশের সুষমা অক্ষুন্ন রাখা, বিভিন্ন দেবতার শাস্ত্রীয় কল্পনাকে মাটির সাহায্যে বাস্তবে ৰূপায়িত করা বিশ্বের যেকোন দেশের পক্ষে যুগপৎ বিস্ময় ও গৌরবের বস্তু”— বলেছেন কার্টুনিষ্ট চণ্ডী লাহিড়ি।

নবদ্বীপ–কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের নির্মাণ শৈলীর প্রশংসায় দেশ–বিদেশের মানুষেরা মুখরিত। নবদ্বীপের শিল্পীরা বিশালাকার মূর্তি নির্মাণে স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। নবদ্বীপের মৃৎশিল্পীদের সম্পর্কে ড. সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, “অতি বড় মূর্তির অবয়ব গঠনে মৃৎশিল্পীর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। ভারসাম্য ও বিন্যাস একেবারে নিখুঁত জ্যামিতিক। কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা ছোটো পুতুলে দক্ষ কিন্তু এত বড় মূর্তি গড়তে পারবেনা। চন্দননগরের মৃৎশিল্পীরা বিশাল জগদ্ধাত্রী গড়তে পারেন। কিন্তু তার সুষমা কম। সবটাই ঢেকে যায় শোলার সাজের আড়ম্বরে। নবদ্বীপের সবকটি মৃৎ মুর্তি সুসম, সুগঠিত ও লাবণ্যময়। এ গঠনে ধরা আছে বহুদিনের রক্ত গত জাতিবিদ্যার অহংকার”।

ডাকের সাজ ও রাস উৎসব

দেবীমূর্তিতে লাবণ্য আনার জন্য যেমন মৃৎশিল্পীরা এসেছিলেন সুদূর নাটোর থেকে, তেমনই বীরভূম থেকে এসেছিলেন ডাকের সাজের শিল্পীরা। তারাও নবদ্বীপে এসে বেনেপাড়ায় ঘর বাধেন। জলশোলাকে সূক্ষ্মভাবে কেটে তা দিয়ে দেবীর সাজ তৈরী করা হয়। শুভ্রসাজে গগনচুম্বী দেবী মূর্তি হয়ে উঠেছে অনন্যা। অপরূপ সৌন্দর্য উদ্ভাসিত হয়েছে। আজ ডাকের সাজের শিল্পীরা অনেক কমে গেছে। সঙ্গে তুলনায় সস্তা থার্মোকলের সাজ বাজার ধরেছে।

বৈষ্ণব রাসের উদ্ভব এবং শাক্ত রাসের সাথে সংঘাত

ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত মুষ্টিমেয় ভক্তিবাদীদের হাতে যখন বৈষ্ণবীয় ভক্তি আন্দোলন দানা বাঁধে তখন তন্ত্রসাধকদের সঙ্গে এদের শুরু হয় সংঘাত। প্রায় তিনশো বছর এই দুই সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্ব ছিল অব্যাহত। নবদ্বীপের রাসেও পড়েছিল এর অনিবার্য প্রভাব। আজকের বাতাবরণ সম্পূর্ণ আলাদা হলেও পরিষ্কার কোথাও একটা পার্থক্য থেকেই গেছে।

কয়েকটি রাসের প্রতিমার ইতিহাস এবং প্রাচীনত্ব

ব্যাদড়াপাড়ার শবশিবা : পুরুষ প্রকৃততে বীজবপন করে প্রকৃতি তাকে ধারণ করে জগৎ প্রসব করে। এখানে কালী শ্মশানের শবকে তার স্পর্শে শিবে রূপান্তরিত করেন। প্রায় ২২৫ বছর আগে রাজা রাম এই পূজার প্রচলন করেন। মূর্তির অভিনবরূপ কল্পনায় সাংখ্যের ত্ৰিগুণাত্মিক প্রকৃতিতত্ত্ব এবং তন্ত্রের বিপরীত রতাতুরা তত্ত্বের মিশ্রণ ঘটেছে এখানে।

শব শিবা ছাড়াও কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে যেসব রাস প্রতিমা পুজোর সূচনা ঘটেছিল নবদ্বীপে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—নন্দীপাড়ার মহিষাসুরমর্দিনী, পুরাণগঞ্জ ও বুড়োশিবতলার বিন্ধ্যবাসিনী, মহাপ্রভুপাড়ার গোঁসাইগঙ্গা, দণ্ডপাণিতলার মুক্তকেশী, আমপুলিয়াপাড়ার শব শিবা, রামসীতাপাড়ার কৃষ্ণমাতা ইত্যাদি। আমপুলিয়াপাড়ার শব শিবা ছিলেন মহামহোপাধ্যায় শিতিকণ্ঠ বাচস্পতির ইষ্টদেবী। পুরাণগঞ্জ গঙ্গাগর্ভে নিমজ্জিত হওয়ার পর এখানকার বিন্ধ্যবাসিনী উঠে আসে শ্ৰীবাস অঙ্গনে।

এল্যানিয়াকালী : শক্তি উপাসক ভৃগুরামের উত্তরপুরুষদের কাছে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, ঢাকা নিবাসী ভৃগুরাম ১৭২৮খ্রিস্টাব্দে নবদ্বীপে এসে ভাগীরথীর তীরে মহাশ্মশানে পঞ্চমুণ্ডির আসন স্থাপন করে শক্তি আরাধনায় ব্ৰতী হন, এই কালীর নাম এ্যালানেকালী। কথিত আছে, প্রখ্যাত পণ্ডিত শঙ্কর তর্কবাগীশ (জন্ম, আনুমানিক ১৭১৭খ্রি.) যখন রাজসভার সভাপতিত্ব তখন এ্যালানে কালীপূজার প্রবর্তন হয়েছিল।

বড় শ্যামা : মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্ৰ ভৃগুরামকে ১২০০বিঘা জমি দান করেন। ভৃগুরামের তিনপুত্র এখানে বসতি স্থাপন করলে এই অঞ্চলের নাম হয় তেঘরি। ভৃগুরামের জ্যেষ্ঠপুত্র গদাধর তেঘরিপাড়ায় বড়শ্যামামাতার পূজা প্রতিষ্ঠা করেন।

চারিচারাপাড়ায় ভদ্রাকালী : এই সময়ে চারিচারপাড়ায় ভদ্রাকালী পূজার সূচনা হয় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায়। শোনা যায়, সেকালে রাজবাড়ি থেকে পূজা আসত, মহারাজের নামে সংকল্প হতো। উপাখ্যান হিসাবে মহীরাবণ রামলক্ষ্মনকে বলি দিতে উদ্যত হয় এবং পাতালে নিয়ে যায়। হনুমান গিয়ে ছলে মহিরাবনকে হত্যা করে উদ্ধার করেন। রামের আদেশে দেবীকে মর্তে প্রতিষ্ঠা করতে দেবীকে মাথায় এবং রামলক্ষ্মনকে স্কন্ধে নিয়ে আসেন। সেই মূর্তি এখানে অবতারণা করা হয়েছে। কাটোয়ার কাছে ভদ্রকালী পীঠ আছে, কথিত আছে সেখানেই মহীরাবণ ধরে নিয়ে গেছিলেন। দেবী এখানে মহিষাসুরমর্দিনী, যা মার্কেন্দেয় পুরাণসিদ্ধ।

রাস যেহুতু বৈষ্ণবদের প্রধান উত্সব কিন্তু নবদ্বীপের শাক্তরাসে যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থান তখন শাক্ত বৈষ্ণব মিলনের অন্যতম মূর্তি এই ভদ্রাকালী।

মহীরাবণবধ : অপর মতে দেবী ভদ্রকালী লেলিহান জিহ্বা নিয়ে কালী রূপে অবতারণা করা হয়। সেই মূর্তিও এখানে পূজিত হয়।

বামাকালী : কালী মূর্তিতে সাধারনত দেবীর ডান পা অগ্রে থাকে, কিন্তু এই মূর্তিতে দেখা যায় দেবীর বাম পা অগ্রে।

দেবী গোষ্ঠমাতা : শাস্ত্রে কৃষ্ণ সহগোপিনিদের আরাধ্য দেবী গোষ্ঠমাতা। কংস যখন মহামায়াকে প্রস্থরে ছুড়ে হত্যা করতে উদ্যত হয় সেই মহামায়াই হাত থেকে ছুটে যায় এবং অভিশাপ দেয়। সেই মহামায়া দেবীই হলেন দেবী গোষ্ঠমাতা।

বিন্ধবাসিনী : আগে উল্লেখ করা মহামায়া কথিত আছে পরে বিন্ধ পর্বতে অবস্থান করেছেন। এটি সেই মূর্তি।

ডুমুরেশ্বরী : ডুমুরগাছ কথায় আছে শ্মশানে থাকে। আর শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন কালী। এর একটি রূপই হলো ডুমুরেশ্বরী।

গৌরাঙ্গিনী : এই মূর্তিতে দেবীর সত্যগুনের প্রতীক। দেবীর অসুর নিধনের রূপ জগতকে অভয় দান করছেন। দুটি সিংহ দেবীর বীরত্বের প্রতীক। এখানে দেবীকে দেবতারাও পূজা করছেন। দেবীকে এখানে জগদ্ধাত্রীর সাথে তুলনা করা যায়।

শোভাযাত্রা এবং ভাসান

পুজোর পর শোভাযাত্রা অনেক হয় কিন্তু এই শোভাযাত্রার মধ্যেও এক অনন্য ধারা বহন করছে নবদ্বীপ রাস। আগে কাঁধে করে এই বিশালাকার প্রতিমা নিয়ে যাবার প্রচলন থাকলেও আজ লোহার বিশেষ গাড়িতে করে এই শোভাযাত্রা হয়। প্রতিমা গাড়িতে করে পুজোর পরের দিন সন্ধ্যায় একটি নির্দিষ্ট পথে শোভাযাত্রায় বের হয়। কথিত আছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রাসে অর্থ সাহায্য করার পর শহরের মধ্যেখানে পারিষদ নিয়ে বসে থাকতেন। তার সামনে দিয়ে সব প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হত, তিনি বিচার করতেন কোন প্রতিমা ভালো হয়েছে। আজ রাজা না থাকলেও সেই ধারা চলে আসছে। আজ গৌরাঙ্গিনী ১০৮ জন বেয়ারার কাঁধে করে শোভাযাত্রায় বের হয়।

পরিশেষ

রাস উৎসবের অনুকরণে পার্শবর্তী অঞ্চলে বিশালাকার মূর্তিপূজার সূচনা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কাটোয়ার কার্তিক লড়াই। দাইহাটের রাস উৎসব। বাংলার শাক্ত ইতিহাসের মল্লরাজারা যেমন অবদান রেখেছেন তেমনই নবদ্বীপের রাস নবদ্বীপে শাক্তধারাকে ধরে রেখেছে। বাইরে নবদ্বীপনামে বৈষ্ণব মিশে থাকলেও অন্তরে প্রবল শাক্তশক্তির আকর নবদ্বীপ। কালের অবক্ষয়ের নিয়মে পতন কিছুটা হলেও এখনও পরাক্রম কমেনি। সেটাইএখনও ভরসা।

পরিশেষে ধন্যবাদ জানাই আমার বড় হয়ে ওঠা নবদ্বীপ শহরকে। এই শহরে না থাকলে রাস নিয়ে ভাবতাম না; জানতাম না শাক্তরাস কি? আর তার সাথে শ্রীমৃত্যুঞ্জয় মন্ডল মহাশয়কে; যার বই আমার লেখাকে প্রভাবিত করেছে এবং তথ্য দিয়েছে।

(সপ্তডিঙা উল্টোরথ সংখ্যা, ১৪২৫ থেকে সপ্তডিঙা সম্পাদকের অনুমতিক্রমে পুনঃপ্রকাশিত)

*******

রাসেশ্বরী

রাধাবিনোদ ঠাকুর গোস্বামী

রাসে রাসেশ্বরী শ্রীরাধা | রাসেশ্বর নাই | রাসমন্ডলের সর্বজনমান্য ঈশ্বর এক , শ্রীরাধা | স্ত্রীলিঙ্গে রাসেশ্বরী | শ্রীকৃষ্ণ সেখানে রাসনায়ক | রাসেশ্বর নন | রাসের মূল আধার শ্রীরাধাই | ‘রা’ধার আধারে বা’স’ , তাই ‘রাস’ |

       পূর্ণশক্তির আধারে , শক্তিমানের আবাস , বিকাশ , বিলাস এবং বিলয় | মহারাস-রস-পরিনতিতে শক্তিমানের শক্তিতে আত্মলুপ্তি , আত্মসুপ্তি , আত্মসংগুপ্তি | মহাভাবে রসরাজের হারিয়ে যাওয়া | 

      আর বঙ্গীয় বা গৌড়ীয়-বৈষ্ণব তো এখানেই তাঁর আরাধ্য পরতত্ত্বসীমাকে খুঁজে পেয়ে প্রণত হয় , "রাধাভাবদ্যুতিসুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্"( শ্রীচৈতন্যের পুরীর গম্ভীরা অর্থাৎ রাজগুরু কাশীমিশ্রালয়ের ছোট্ট ঘরে অবস্থান কালের প্রধান সঙ্গী | বাঙ্গালী | পূর্ব্বাশ্রমের নাম পুরুষোত্তম আচার্য্য | সন্ন্যাসান্তর নাম স্বরূপ দামোদর | তাঁরই লেখা কড়চার এই শ্লোকাংশ | যা কৃষ্ণদাস কবিরাজ 'শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে'র মঙ্গলাচরণ প্রসঙ্গের ৫ নং-এ উদ্ধৃত করেছেন ) | রাধা ভাবাঢ্য সমাচ্ছাদিত কৃষ্ণকে প্রণাম | অর্থাৎ শক্তি সমাহিত শক্তিমানকে প্রণাম | এই হল প্রকৃত চৈতন্য সত্ত্বা | অধ্যাত্ম-তত্ত্ব-সার | ঠাকুর রামকৃষ্ণ এই সত্ত্বারই জাগরণ চাইতেন সর্বজনে , সর্বমনে | তাই আশীর্বাদ করার সময় বলতেন , "চৈতন্য হোক" | আজ রাসরসাবগাহনে সেই চিরদিনের চৈতন্য সত্ত্বাকেই মানসে মনন করি | 

                     

**********

রাসরহস্য

রক্তিম মুখার্জি

রাসরহস্য

রমণীর নৃত্যকে বলে লাস্য। পুরুষের নৃত্যকে বলে তাণ্ডব। পুরুষ ও নারীর মিলিত নৃত্য হল্লীসক নামে পরিচিত। আর সেই হল্লীসক যদি নৃত্যগীত সহযোগে আরো রমণীয় হয়ে ওঠে তখন তাকে রাসনৃত্য অভিধায় অভিহিত করা হয়। শ্রীধরস্বামী রাসের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছেন:
“অন্যন্যব্যতিরক্তহস্তানাং স্ত্রীপুংসাং গায়তাং মণ্ডলীরূপেন ভ্রমতাং নৃত্যবিনোদো রাসো নাম।”
অর্থাত্ স্ত্রীপুরুষগণের পরস্পরের হাত ধরে মণ্ডলরচনা করে নৃত্যগীত সহযোগে ভ্রমণপূর্বক যে নৃত্য; তারই নাম রাস।

রাসলীলা বর্তমানে বৈষ্ণবীয় লীলাতত্ত্বের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা। রসতত্ত্বের চরমে রাসের উদ্ভব। হরিবংশ ও বিষ্ণুপুরাণে প্রথম রাসনৃত্যের বিবরণ পাওয়া যায়। কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে গোপীবৃন্দের হল্লীসক নৃত্যই এই দুই পুরাণে উল্লিখিত হয়েছে। সেখানে কৃষ্ণ একাকী নন; বলরামও তাঁর সঙ্গে আছেন। এবং কৃষ্ণ শুধুই বংশীধ্বনি করছেন না। তিনি গোপীগণের মনোহরণের জন্য বিবিধ বাদ্যসহযোগে মধুর গীত পরিবেশন করছেন।

সহ রামেণ মধুরম্ অতীব বনিতাপ্রিয়ম্
জগৌ কলপদম্ শৌরীর্নানাতন্ত্রীকৃতব্রতম্।।

এই জগৌ কলপদম্ পদাংশটিই বৈষ্ণবীয় রসতত্ত্বে তান্ত্রিক তাৎপর্যে উন্নীত হয়েছে একাক্ষরী কামবীজের ব্যাখ্যায়; যখন ভাগবতে উল্লিখিত মুরলীর পঞ্চম তানকে বলা হয়েছে ” জগৌ কলপদম্ বামদৃশাম্ মনোহরম্”

এই দুই পুরাণে রাধার নামোল্লেখ না হলেও রাইকমলিনীর কমলিনীভাবসংযুক্তা জনৈকা গোপীশ্রেষ্ঠার উল্লেখ আমরা পাই; যখন বিষ্ণুপুরাণ রাসমণ্ডল থেকে সহসা অন্তর্হিত কৃষ্ণকে এবং তাঁকে অনুসরণকারিণী সেই গোপিকাকে বর্ণনা করে:
কৃষ্ণম্ শরচ্চন্দ্রমসং কৌমুদীম্ কুমুদাকরম্
জগৌ গোপীজনস্ত্বেকম্ কৃষ্ণনামম্ পুনঃপুনঃ।।
এই শ্লোকটির দ্বারা।
কৃষ্ণরূপ শরৎচন্দ্র যে কুমুদিনীর জন্য কৌমুদীস্বরূপ; তিনিই এই গোপীশ্রেষ্ঠা। তিনিই পরে ভাগবতের রসরাজের পরমাহ্লাদিনী; ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের শ্রীরাধা।
লক্ষণীয় বিষয় হলো এই অপূর্ব বিশেষণটি কিন্তু পরবর্তী বৈষ্ণব সাহিত্যের রসতত্ত্বের সারকথাটিই সংক্ষেপে বলে দিয়েছে। কৃষ্ণরূপ চন্দ্রের সার্থকতা গোপীকুমুদিনীর জন্য কৌমুদী বিতরণে। অর্থাত্ প্রকৃতিশক্তির সংযোগেই ঐ পরম পুরুষের সার্থকতা। অন্যথায় কৃষ্ণচন্দ্রের কৌমুদী অর্থহীন।
এখানেই পরমা প্রকৃতির জয়বার্তা ঘোষিত হয়েছে।

হল্লীসকের প্রাকৃতকাব্যে মধুরতম গীতি হালের গাথাসপ্তশতী। সেখানেও গোপচূড়ামণি গোপীগণপরিবৃত। তবে তারই মধ্যে জনৈকা গোপিনীর প্রতি তাঁর অধিক অনুরাগ। নৃত্যকালে সেই বিশেষ গোপিনীর চোখে ধুলো পড়লে তিনি নিজে তার নেত্রে ফুৎকার দিচ্ছেন। এখানেও পুরুষ প্রকৃতির ভাবে ব্যাকুল; তন্ময়।

এরপর ভাগবতের রাসপঞ্চাধ্যায় ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ রাসের যে মধুরতর বর্ণনা করেছে; তা মাধুর্যের শীর্ষে উপনীত হয়েছে জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যের মধুরকোমলকান্তপদাবলীতে। মূলতঃ রাসকে কেন্দ্র করে নায়ক নায়িকার বিলাসলীলার সমস্ত ভাবরাজিকে তিনি উত্তুঙ্গ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রকৃতির প্রতি পুরুষের পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শনকারী এই কাব্য আরম্ভ হচ্ছে মেঘমেদুর আকাশ এবং বনের তমালবৃক্ষরাজির শ্যামলিমা দর্শনে ভীত কৃষ্ণের রাধার অঙ্কাশ্রয়ী হয়ে নির্ভরতা লাভের বর্ণনায়। রাধার কোলে একান্ত আশ্রিত কৃষ্ণকে দেখে কবি বলেছেন: রাধামাধবোর্জয়ন্তি যমুনাকুলেরহ কেলয়।
এই ভাবই তার পূর্ণরূপ লাভ করেছে যখন রাসমণ্ডলে রাধার মানভঞ্জন করতে কৃষ্ণ বলেছেন: স্মরগরলখণ্ডনম্ মম শিরসিমণ্ডনম্ দেহি পদপল্লবমুদারম্।
আকুল হয়ে কৃপাপ্রার্থীর মতো বলেছেন: ত্বমসি মম জীবনম্ ত্বমসি মম ভূষণম্ ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম্

জয়দেবের সহজপ্রেমের এই ভাবের সাথে হুবহু মিলে যায় ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে কৃষ্ণকর্তৃক রাধার মহিমাবর্ণনা; যেখানে কৃষ্ণ রাধাকে বলেছেন:
ক্ষীরের ধাবল্য,অগ্নির দাহিকাশক্তি,পৃথিবীর গন্ধতত্ত্বের মতো তোমা হতে আমি অভিন্ন। আমি বীজরূপ; তুমি সৃষ্টির আধারভূতা। তুমি ভিন্ন আমি জগতকার্যে একান্ত ভাবেই অক্ষম।

সুতরাং রাসের মূল তত্ত্ব হল নায়িকাবৃন্দকর্তৃক পরিবৃত নায়কের আনন্দনৃত্য; যেখানে নায়িকাশ্রেষ্ঠার প্রতি নায়কের পূর্ণ আনুগত্যই প্রকাশিত। রাসের পুরুষতত্ত্ব কৃষ্ণ প্রকৃতিরূপিণীর বিমূর্ত ভাবকে আত্মস্থ করে প্রকৃতিময়। তাই বলাই যায় কেন্দ্রে পরমাপ্রকৃতি ও তদাশ্রিত পুরুষ এবং পরিধিতে প্রকৃতিশক্তির অংশরূপা সহচরী শক্তিগণ; এটাই রাসমণ্ডলের মূল আকৃতি। আমরা যখন সর্বতোভদ্রমণ্ডলে অষ্টদলকমলের কেন্দ্রে অষ্টচণ্ডিকাগণ পরিবৃতা রুদ্রচণ্ডিকার রণরঙ্গ দর্শন করি; যখন পীঠপূজায় সহস্রদল কমলের কর্ণিকায় অষ্টসখীপরিবৃতা মহাসিংহারূঢ়া দুর্গা বা সদাশিব মহাপ্রেতাসনা কালিকাকে দেখি; তখন রাসেরই এক অন্যতম রূপ দর্শন করি আমরা। এখানে ঐ সিংহ বা সদাশিবই সেই পুরুষ; যে মাধুর্যরসে রাধার চরণকমল ধারণ করে নিজ শিরে। আরো আদিতে এই পুরুষও ছিল না। শুধুই মুখ্য মাতৃকা তাঁর সহচরীগণ পরিবৃত হয়ে নৃত্যরতা; এটাই ছিল সেই রাসমণ্ডলের মূল চিত্র। চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত একটি মৃৎপাত্রে এইরকম একটি মণ্ডল পাওয়া গেছে। দক্ষিণ ভারতীয় কবি রামকৃষ্ণের মহিষাসুরমর্দিনীস্তোত্রে আমরা এই চিত্র পাই। সেখানে দেবীর বংশীধ্বনি সমবেত কোকিলকন্ঠকে লজ্জা দিচ্ছে; তাঁরই অংশভূতা মহাযোগিনীগণের কেন্দ্রে তিনি নৃত্যরতা।
করমুরলীরববিজিতকুজিতলজ্জিতকোকিলমঞ্জুমতে
মিলিতপুলিন্দমনোহরগুঞ্জিতরঞ্জিতশৈলনিকুঞ্জরতে
নিজগুণভূতমহাশবরীগণসদগুণসম্বৃতকেলিরতে
জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দিনী রম্যকপর্দিনী শৈলসুতে।।

শিব ও উমার রাসনৃত্যও পুরাণে পাওয়া যায়। সেখানেও একই ভাব প্রকাশিত। তাছাড়া কর্পূরমঞ্জরী নাটকে কবি রাজশেখরের উপাস্যরূপে যখন সেই হরকে দেখি যিনি স্বীয় জটানির্গত গঙ্গাধারা ও ললাটচন্দ্রের জ্যোৎস্নার অর্ঘ্য উমার চরণে নিবেদন করেন; কিম্বা যখন বসুবন্ধুর বাসবদত্তায় কাত্যায়নী দেবীকে “প্রণয়প্রণত-গঙ্গাধর-জটাজুটস্খলিত-জাহ্নবীজলধারা-শ্বেতপাদপদ্মা”রূপে দেখি তখন বুঝতে পারি একদা শৈবধর্মেও এই মধুর ভাব বর্তমান ছিল। সিন্ধু সভ্যতার পশুগণসমাবৃত পশুপতির মাতৃকাবন্দনারত মূর্তিটিও সেই ভাবনাই প্রকাশ করে। যদি পরবর্তী সময়ে শৈবযোগীগণ বিশেষত নাথপন্থীগণ প্রকৃতিবিচ্ছিন্নতার আদর্শে মত্ত না হতেন; তাহলে হয়তো হরগৌরীর যুগলপ্রেমের তত্ত্বও বৈষ্ণব দর্শনের মতো উচ্চতায় আরোহণ করতে পারত।

তাই রাস মূলতঃ প্রকৃতিপরায়ণতার উৎসব। যে পুরুষ প্রকৃতির প্রেমে মত্ত হয়েছেন; তিনিই রাসমণ্ডলে আনন্দনৃত্য করতে পারেন। সাঙ্খ্যের প্রকৃতি তন্ত্রের পথে এই প্রেমসাগরে পরিণত হয়েছেন। তাঁর চতুর্বিংশতি তত্ত্বই অষ্টসখী চৌষট্টি গোপিণীর রূপ লাভ করেছে। পুরুষ সেই রসসিন্ধুতে অবগাহন করে রসরাজ হয়েছেন। গোবিন্দদাসের ভাষায় তাঁদের এই সম্মিলিত রূপ এই প্রকার :
কাঞ্চন মণিগণ জনু নিরমাওল
রমণীমণ্ডল সাজ
মাঝহি মাঝ মহামরকত সম
শ্যাম নটবররাজ…
থির বিজুরি সনে চঞ্চল জলধর
রাস বরিখয়ে অনিবার

*******

রাসোৎসব

শুভদীপ সিনহা

আজ পরম পবিত্র রাসযাত্রার পুণ্যলগ্নে এই লেখাটি দেওয়া হল-

রাস মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত ধর্মীয় উৎসব। ভগবান কৃষ্ণের রসপূর্ণ অর্থাৎ তাত্ত্বিক রসের সমৃদ্ধ কথাবস্তুকে রাসযাত্রার মাধ্যমে জীবাত্মার থেকে পরমাত্মায়, দৈনন্দিন জীবনের সুখানুভূতিকে আধ্যাত্মিকতায় এবং কামপ্রবৃত্তিসমূহকে প্রেমাত্মক প্রকৃতিতে রূপ প্রদান করে অঙ্কন করা হয়েছে।

হর্ষচরিতের টীকাকার শঙ্করের মতে, রাস হলো এক ধরনের বৃত্তাকার নাচ যা আট, ষোলো বা বত্রিশ জনে সম্মিলিতভাবে উপস্থাপনা করা যায়।

পদ্মপুরাণে (৫২/১০৩-১০৫) শারদরাস ও বাসন্তীরাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে (ব্রহ্মখণ্ড, পঞ্চম অধ্যায়) বাসন্তীরাস এবং শ্রীমদ্ভাগবত ও বিষ্ণুপুরাণে (৫/১৩/১৪-৬১) শুধুমাত্র শারদরাসের বর্ণনা আছে। হরিবংশে ও ভাসের বালচরিতে উল্লেখ আছে যে, কৃষ্ণ গোপিনীদের সঙ্গে হল্লীশনৃত্য করেছিলেন। হল্লীশনৃত্য যদি তালযুক্ত ও বিবিধ গতিভেদে বৈচিত্র্যপূর্ণ হয় তবে তাকে “রাস” নামে অভিহিত করা হয়। বিষ্ণুপুরাণের মতে, কৃষ্ণ রাস অনুষ্ঠান করেছিলেন গোপরমণীদের সঙ্গে। শ্রীধর স্বামী বলেছেন, বহু নর্তকীযুক্ত নৃত্য বিশেষের নাম রাস– “রাসো নাম বহু নর্ত্তকীযুক্তে নৃত্যবিশেষঃ।” শ্রীমদ্ভাগবতের অন্যতম টীকাকার বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেছেন, —“নৃত্যগীতচুম্বনালিঙ্গনদীনাং রসানাং সমূহো রাসস্তন্ময়ী যা ক্রীড়া বা রাসক্রীড়া”। শ্রীমদ্ভাগবতের মতে, কৃষ্ণ যোগমায়াকে সমীপে গ্রহণ করেই রাস অনুষ্ঠান করেছিলেন।বস্ত্রহরণের দিন গোপিনীদের কাছে কৃষ্ণ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, পরবর্তী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি রাসলীলা করবেন-

“যখন করেন হরি বস্ত্রহরণ।
গোপীদের কাছে তিনি করিলেন পণ।।
আগামী পূর্ণিমাকালে তাঁহাদের সনে।

করবেন রাসলীলা পুণ্য বৃন্দাবনে।।”
শ্রীকৃষ্ণের সুমধুর বংশীধ্বনিতে মুগ্ধ হয়ে গোপিনীবৃন্দ আপনাপন কর্তব্যকর্ম বিসর্জন দিয়ে সংসারের সকল মোহ পরিত্যাগ করে বৃন্দাবনে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের চরণে নিজেদের সমর্পন করেছিলেন। প্রথমে শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের স্ব-গৃহে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন; বলেন, তাদের সংসার-ধর্ম পালন করা উচিত। কিন্তু গোপিনীরা নিজেদের মতে দৃঢ় ছিলেন। ভগবান ভক্তের অধীন। শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের দৃঢ়ভক্তি দেখে তাদের মনোকামনা পূরণার্থে রাসলীলা আরম্ভ করেন। কিন্তু যখনই শ্রীকৃষ্ণ তাদের অধীন বলে ভেবে গোপিনীদের মন গর্ব-অহংকারে পূর্ণ হল, তখনই শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের মধ্য থেকে অন্তর্ধান হয়ে গেলেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন রাধাকে নিয়ে উধাও হলেন, তখন গোপিনীবৃন্দ নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন। ভগবানকে ‘একমাত্র আমার’ বলে ভেবে অহংকারের ফলে শ্রীকৃষ্ণকে তারা হারিয়ে ফেলেছিলেন। যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ ত্রিজগতের পতি, তাই তাকে কোনো মায়া-বন্ধনে বেঁধে রাখা যায় না। তখন গোপিনীবৃন্দ একাগ্রচিত্তে শ্রীকৃষ্ণের স্তুতি করতে শুরু করেন। ভক্তের ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান গোপিনীদের মানব জীবনের পরমার্থ বুঝিয়ে দিয়ে তাদের অন্তর পরিশুদ্ধ করেন। গোপিনীদের ইচ্ছাকে তিনি সম্মান জানিয়ে ‘যতজন গোপিনী, ততজন কৃষ্ণ’ হয়ে গোপিনীদের মনের অভিলাষ পূর্ণ করেছিলেন আর গোপীবৃন্দও জাগতিক ক্লেশ থেকে মুক্তিলাভ করেছিলেন। এইভাবে জগতে রাসোৎসবের প্রচলন ঘটে।

*********

রাসের মেলা

সুবীর মুখার্জি

মধ্যমগ্রাম রাস মেলার স্মৃতি আমার খুব “ছোটোবেলা” থেকে শুরু করে, “বড়বেলা”, এবং বলা যেতে পারে “পোস্ট বড়োবেলা” পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১৬ সালে ভাইজাগ পোস্টিং এর আগে পর্যন্ত প্রতিবছর মেলার দিন গুলোতে দিনে একাধিক বার রাসের মেলাতে ঘুরতে যেতাম। বন্ধুবান্ধব দের সঙ্গেই বেশী। মনে আছে মধ্যমগ্রামের প্রভাষ দার কোচিং এ পড়ার সময় সকালে পড়তে যাওয়া ও আসা, বিকালে আবার মেলায় যাওয়া মিলিয়ে দিনে প্রায় বার তিনেক রাসের মেলাতে ঢু মারতাম। খুব ছোটোবেলায় আমার মা, পিসি আর পিসতুতো দিদি দের সঙ্গে যেতাম রাসমেলা দেখতে। তখন মেলাতে যাবার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটানো, আর জিলিপি খাওয়া। তবে আমার মাতাঠাকুরানির প্রবল শাসন আমাকে ওই বয়সে হাতে বন্দুক তুলে নিতে দেয় নি। আর একটা কারণ অবশ্যি ছিল, তখন বন্দুকের দৈর্ঘ্য ছিল আমার দৈর্ঘ্যের থেকে বেশী। তবে পরবর্তীকালে বেশ বড়বেলা অবধি শুধু বন্দুক দিয়ে “পেরেক” ওড়াতেই রাসের মেলাতে যেতাম। বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে মেলায় গিয়ে সাকসেসফুলি পেরেকে টিপ করতে পারাটা ছিল বেশ একটা কলার উচুঁ করা ব্যাপার। অনেকই পেরেক টিপ করতে গিয়ে বেলুন ফাটিয়ে ফেললে তাকে দারুন অপদস্ত করা (প্যাঁক দেওয়া) হতো। আর সে বেচারা তখন এমন ভাব দেখাত যেনো সে ইচ্ছে করেই বেলুন ফাটিয়েছে। পরবর্তী কালে এই বেলুন ফাটানোতে বেশ একটা রাডিক্যাল চেঞ্জ বা বলা ভালো বিপ্লব আসে। তখন এটার সঙ্গে লটারিকে জুড়ে দেওয়া হয়। মানে যে বেলুন তুমি ফাটাবে তার নিচে সাটা কাগজে যেটা লেখা থাকবে সেই জিনিসটা তুমি পাবে। দোকানে টিভি, সাইকেল, ঘড়ি ইত্যাদি খুড়োর কল সাজিয়ে রাখলেও জলের মগের বেশী কোনো দিন আমার ভাগ্যে জোটে নি। কেনো জানিনা এই লটারি প্রথা চালু হবার পর, বন্দুক দিয়ে টিপ করার আনন্দটা কেমন যেনো চলে গেছিলো।
মধ্যমগ্রামের মেলায় সাইকেল রাখার জায়গা ছিল ব্রীজটা টপকেই বা দিকে। এখনো বোধহয় ওখানেই সাইকেল রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ওখানে সাইকেল রেখে মেলার ভেতরে ঢোকা ছিল একটা বেশ ঝক্কির ব্যাপার। কাতারে কাতারে লোক, প্রচন্ড ভিড়, ঠেলাঠেলি করে ভিতরে ঢুকে একাধিক বার আবিষ্কার করতাম যে আমাদের মধ্যে কারোর না কারো মানি ব্যাগ হাওয়া। পরবর্তীকালে এই ঘটনা থেকে বাঁচতে মেলায় মানিব্যাগ না নিয়ে পকেটে করে টাকা নিয়ে যেতাম। মেলাতে ঢুকে সাধারণত দ্বিতীয় বাম দিকের বাঁকে বেলুন বন্দুকের সরঞ্জাম বসতো। সেখানে গিয়ে মোক্ষ লাভ করার পর, জিলিপী গজা ইত্যাদি খাওয়া, কখনো কখনো নাগরদোলার দিকে যাওয়া ইত্যাদি গৌণ কাজগুলো সারতাম। নাগরদোলায় চড়ার একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। সালটা বোধহয় ৯৭-৯৮ হবে। তখন উঁচু ইলেকট্রিক নাগরদোলায় ওঠা ছিল বেশ একটা কেতার ব্যাপার। তার আগে কাঠের হাতে ঘোরানো নাগরদোলা ই বেশী দেখা যেত। অনেকই এই ইলেকট্রিক নাগরদোলায় উঠতে বেশ ভয় পেতেন। সে বছর সব বন্ধুদের সঙ্গে আমি আর আমার ভাই মেলায় গেছিলাম। সবাই মিলে ঠিক হল নাগরদোলায় ওঠা হবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে উঠলাম নাগরদোলায়। তারপর যখন চলতে আরম্ভ করলো, তখন সে কি সাংঘাতিক ব্যাপার! মনে হচ্ছিল যে কোনো সময় ছিটকে বাইরে চলে যাবো। সব থেকে মারাত্মক হলো নাগরদোলা যখন উপর থেকে নিচের দিকে নামে। মনে হয় যেনো আমি পাতালে প্রবেশ করছি, পেটের মধ্যে কেমন যেন গুর গুর করছিল।মাথাটাও কেমন যেনো ঝিমঝিম ভাব। সে দিন নাগরদোলা থেকে নামার পর আজ পর্যন্ত আর নাগরদোলা তে উঠি নি। সেদিন বাড়িতে এসে খুব শরীর খারাপও হয়েছিল আমাদের দুজনের।
রাসের মেলার একটু ভিতরে ঢুকলে, ঠিক মধ্যমগ্রাম টিকিট কাউন্টারের সামনে থেকে শুরু হতো সারি সারি জিলিপি, গজা,নিমকি আর অমৃতির দোকান। এই দোকান গুলো থেকে জিলিপি ভাজার একটা গন্ধ ভেসে আসে। আমার মনে হয় এই গন্ধটা মধ্যমগ্রাম রাসের মেলার একটা বৈশিষ্ট। এই মেলাটার কথা মনে পড়লেই আমি যেনো ওই চেনা গন্ধটা এখনো পাই। এই দোকান গুলো থেকে দাম দস্তুর করে জিলিপি, গজা খাওয়া ছিল “মেলার মজার” একটা অঙ্গ। মধ্যমগ্রাম স্টেশনের ওভারব্রীজ এর ওপর দাড়ালে তখন পুরো মেলাটা দেখা যেত। বোধহয় এখনো যায়। মাঝে মাঝে বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের জন্য অপেক্ষার মাঝে ওভারব্রিজের ওপর গিয়ে দাড়াতাম। প্রচুর মানুষের ভীড়, অনেক আলো, চেচামেচি, ঝগড়া, জিলিপির গন্ধ, নাগরদোলা সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আবেশ আমাকে ঘিরে ধরত সে সময়।

********

চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গারিডাই সভ্যতার রাসমণ্ডল

তমাল দাশগুপ্ত

চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গারিডাই সভ্যতার রাসমণ্ডল।

রাসযাত্রা একটি সুপ্রাচীন উৎসব। বস্তুত জীবক যেমন অরণ্যে প্রবেশ করে এমন একটিও বৃক্ষ খুঁজে পান নি যা ওষধিগুণসম্পন্ন নয় তেমন আমিও আজ পর্যন্ত বাংলাভাষী হিন্দুর এমন একটিও উৎসব খুঁজে পাইনি যা অত্যন্ত প্রাচীন নয়। এই মহাজাতি এক অক্ষয় বট, এবং আমাদের দেশজ প্রতিটি উৎসবের শেকড় অনাদি ও অনন্ত।

রাস কথাটা রস থেকে এসেছে বলেই মনে করা হয়। এই রাস পূর্ণিমা শারদ পূর্ণিমা বলেও খ্যাত, এই কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে যে উৎসব ঘটে, তা রাসমণ্ডল গঠনের মাধ্যমে পালিত হত এবং এই রাসমণ্ডলে সর্বোচ্চ মাতৃকা ভগবতীর উপাসনা হত, এখনও হয়। বৈষ্ণব ধর্ম, আমি আগেই বলেছি, বৈদিক আর্যদের ধর্মগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রে তন্ত্রের কাছে এবং প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে (শৈব অনেক পরে)। বিষ্ণুর উত্থানে, বিষ্ণুভাগবত ধর্মের উত্থানে প্রাচীনযুগে আর্যদের একটি ট্রাইব (নাম সম্ভবত নর)নেতা নারায়ণ কর্তৃক প্রচলিত তন্ত্রধর্মীয় পাঞ্চরাত্র উপাসনা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

একজন চূড়ান্ত সর্বোচ্চ সর্বাগ্রগণ্য মাতৃকার উপাসনাই রাসমণ্ডলের আদি বৈশিষ্ট্য (দেবী ভাগবত পুরাণ দ্রষ্টব্য)। এই শক্তিকে কেন্দ্রে স্থাপন করে রাসমণ্ডল নির্মাণ উপমহাদেশে সুপ্রাচীন তান্ত্রিক প্রথা। কাজেই নবদ্বীপের শাক্ত রাস কোনও অর্বাচীন প্রথা নয়, এমন নয় আচমকা কৃষ্ণচন্দ্র বা তাঁর বংশের আবিষ্কার। নবদ্বীপের শাক্ত রাস মহোৎসব হল ইসলামিক মধ্যযুগ অন্তে প্রাচীন দেশজ প্রথার পুনরুদ্ধার মাত্র।

এই মাতৃকা হলেন বিমূর্ত শক্তি, সেই শক্তি যিনি ধারণ করেন, যিনি শক্তিমান, তিনি কৃষ্ণ। এটিই দার্শনিক ব্যাখ্যা তবে প্রাচীন কাল থেকে এই রাসমণ্ডলে দলবদ্ধ নৃত্য গীতের প্রচলন, অতএব রাধা ও কৃষ্ণের লৌকিক প্রেমের গানের কোনও সুপ্রাচীন ভার্শন গাওয়া হত অনেক আগে থেকেই। এই পূর্ণিমা তিথিতে কি পালসম্রাট গোপাল চুন্দার উপাসনা করতেন? কারণ শারদ পূর্ণিমায় তাঁর পুজো হত এরকম একটা ইঙ্গিত পাচ্ছি। অনুরূপভাবে গঙ্গারিডাই সভ্যতায় কোনও রাসমণ্ডল জাতীয় সারিবদ্ধ নাচগান প্রচলিত ছিল সেরকম প্রমাণ দিচ্ছে চন্দ্রকেতুগড় থেকে প্রাপ্ত একাধিক টেরাকোটা ফলক।

মাতৃকা কেন্দ্রে থাকেন, তাঁকে কেন্দ্র করে একটি মণ্ডল রচনা করি আমরা। প্রকৃতিমাতৃকা, আগেই বলেছি, অব্যক্ত। শক্তি বিমূর্ত, এজন্য শক্তিমানের উপাসনা হয়। এজন্যই বলে বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ, তর্কে বহুদূর, কারণ অনাদি অসীম অনন্ত অব্যক্ত শক্তিকে যে ধারণ করা সম্ভব এ বিষয়টা বিশ্বাস না করলে আপনি কৃষ্ণকে পাবেন না। এজন্য গৌড়বঙ্গের বৈষ্ণব, গৌড়ীয় বৈষ্ণব মাত্রেই রাধাকিঙ্কর, শ্রীরাধার ভৃত্য।

আমি একটি রাসের মেলায় বৈষ্ণব হয়েছিলাম, সে কথা এর আগে লিখেছিলাম, পুনরায় লিখব। আমি শ্রীরাধার ঐশ্বর্য, অপার্থিব বিভূতি দেখেছি। রাধারাণীর জয় হোক।

চন্দ্রকেতুগড় থেকে প্রাপ্ত খ্রিষ্টপূর্ব যুগের এই হাতির দাঁতের ফলকটিকে আমি বাঙালির সুপ্রাচীন রাসমণ্ডল বলতে চাই। চিত্রেও দেখবেন কেন্দ্রটি তন্ত্রের প্রতীক, অনেকটা যন্ত্রের মত। রাসমণ্ডলে আট বা তার গুণিতকের সংখ্যায় সারিবদ্ধ থাকেন প্রকৃতিমাতৃকার সহচরী (অষ্ট সখী এই থেকে এসেছে)। এই ফলকে অষ্ট সখীর নিম্নাংশ মৎস্যকন্যা বা মারমেড দের মত, গ্রেকো রোমান জগতের সঙ্গে চন্দ্রকেতুগড় গঙ্গারিডাই সভ্যতার নিয়মিত সংযোগের একটি সাক্ষ্য হতে পারে।

এবং, বলা বাহুল্য, এই সময়ে কৃষ্ণ আসেন নি। এই সময়ে রাধাও নেই। রাধা কৃষ্ণের লৌকিক প্রেমের কাহিনী অবলম্বনে রচিত গান (কৃষ্ণধামালি) পালযুগের শেষের দিকে বাংলায় জনপ্রিয় হয়েছিল, সেনযুগে গীতগোবিন্দ রচিত হয়। কিন্তু রাসযাত্রা আরও প্রাচীন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বিভিন্ন রকম যাত্রা বা সচল অনুষ্ঠানমূলক ধর্মীয় উৎসবের উল্লেখ আছে। ব্রাত্যধর্মীয় (ব্রাত্য আর্য?)দের মধ্যে বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল এরকম যাত্রা। যাত্রা একরকম গীতবাদ্যনৃত্যমূলক পারফরম্যান্সকেন্দ্রিক ধর্মানুষ্ঠান ছিল। ঘট স্থাপন করে স্থাবর উপাসনা নয়, এই উপাসনা সচল। চৈতন্য যে সচল জগন্নাথ ছিলেন সেটা স্রেফ আলঙ্কারিক প্রয়োগ নয়। রাসযাত্রার মত এই সচল ধর্মানুষ্ঠানের সুপ্রাচীন আদর্শ আছে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রকাশ্য রাজপথে নৃত্য করার প্রথার পেছনে।

আমরা বাঙালি মহাজাতি বারবার আমাদের শেকড়কে বাঁচিয়ে তুলেছি। আমরা পুনরুত্থিত হয়েছি,বারবার মাথা তুলেছি।

আবারও মাথা তুলব।

© তমাল দাশগুপ্ত Tamal Dasgupta

চন্দ্রকেতুগড়, খ্রিষ্টপূর্ব যুগ। হাতির দাঁতের বৃত্তাকার ফলক, একটি বিপুলাকৃতি কর্ণকুণ্ডল হিসেবে ব্যবহৃত হত বলে অনুমান। বর্তমান অবস্থান অজানা।

একে বাঙালির সুপ্রাচীন রাসমণ্ডল বলে অভিহিত করলাম।

বন্ধুজন রাসযাত্রার শুভেচ্ছা নিন আর শত্রুদের কারও সাধ্য থাকলে আমাকে খণ্ডন করুন।

**********

© মাৎস্যন্যায় ব্লগজাইন

রাসপূর্ণিমা ১৪২৭

বিশেষ মাৎস্যন্যায় ক্রোড়পত্র

সম্পাদক তমাল দাশগুপ্ত

প্রকাশক ঋতুপর্ণা কোলে

††††††††††

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s