অক্ষয় তৃতীয়া: আজ কি চৈতন্য অবসানের দিন? – তমাল দাশগুপ্ত

আজ অক্ষয় তৃতীয়া। আমরা যারাই চৈতন্য হত্যার অনুসন্ধান করেছি, তেমন বাঙালিরা আজকের এ দিনটিকে মনে রাখি বিশেষ ভাবে। কারণ চৈতন্যদেবের অন্তর্ধান অনুসন্ধানে যে টেক্সটগুলোর গুরুত্ব সবথেকে বেশি, সেই উড়ে ভাষায় লিখিত গ্রন্থগুলোয় প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে এটাই বলা হয়েছেঃ তিনি আজ, অক্ষয় তৃতীয়ার দিন মারা গেছিলেন।

বাঙালিদের লেখা গ্রন্থে ভিন্ন বিবরণ (আষাঢ় মাসে তাঁর নশ্বর লীলার অবসান), কিন্তু অক্ষয় তৃতীয়া বলে দাবি করা উড়ে টেক্সটগুলো সম্ভবত বেশি অথেন্টিক। উপরন্তু তার মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ আছে, কাজেই তা আমাদের সঙ্গত কৌতূহলের উদ্রেক করে।

উড়িয়া গ্রন্থগুলোর এক এক করে আলোচনা করি। ঈশ্বরদাসের চৈতন্যভাগবত বলে, অক্ষয় তৃতীয়ার দিন চৈতন্য বৈকুন্ঠে গমন করেছিলেন। তিনি নগর পরিক্রমা করে তারপর জগন্নাথ মন্দিরে ঢুকে শ্রীবিগ্রহে চন্দনলেপন করেন (প্রসঙ্গত চৈতন্য জগন্নাথ বিগ্রহের নিকটে যেতেন না, দূর থেকেই দর্শন করতেন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে জগন্নাথের স্পর্শে তিনি ভাবপ্লাবিত হতেন। তবে প্রথমবার পুরী গিয়ে তিনি যখন জগন্নাথকে আলিঙ্গন করতে যান, তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল পাণ্ডারা, এবং বাসুদেব সার্বভৌম এসে না বাঁচালে হয়ত সেদিনই চৈতন্যকে পাণ্ডারা মেরে ফেলত, অতএব চৈতন্যের জগন্নাথ সন্নিকটে না যাওয়ার রাজনৈতিক কারণও থাকতে পারে। যাই হোক, সেই চৈতন্য, যিনি দীর্ঘ চব্বিশ বছর নীলাচলবাসের সময় জগন্নাথকে স্পর্শ করলেন না, গর্ভগৃহেই প্রবেশ করলেন না, সেই তিনি যে এতদিন পরে এইভাবে স্বহস্তে জগন্নাথে চন্দনলেপন করতে গেছিলেন, এটি চমকপ্রদ ঘটনা বটে। মনে রাখবেন এর আগে একদিন তিনি যখন স্পর্শ করেছিলেন, সেদিনের মত আজ কোনও বাসুদেব সার্বভৌম ছিলেন না।) এবং জগন্নাথ এই সময় মুখব্যাদান করেন, তার মধ্যে চৈতন্য অন্তর্হিত হন। এই ঘটনার পরে রাজা প্রতাপরুদ্রের ক্রোধ প্রজ্জ্বলিত হলে প্রভু “জগন্নাথ” স্বয়ং ক্রোধ নিবারণ করতে আদেশ দেন, এবং চন্দনযাত্রা/চন্দনবিজয় সম্পূর্ণ করতে আদেশ দেন। এখানে বলা দরকার, অক্ষয়তৃতীয়ার দিন জগন্নাথের চন্দনযাত্রা হয়।

ঈশ্বরদাস জানাচ্ছেন যে চৈতন্যের মৃতদেহ এরপর “জগন্নাথের আদেশেই” প্রাচী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত, চৈতন্য হত্যার কিনারা করতে গিয়ে যিনি খুন হয়েছিলেন পুরীতে, সেই জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের হাতে একটি উড়ে গ্রন্থ এসেছিল, বৈষ্ণবদাস রচিত “চৈতন্য গৌরাঙ্গ চকড়া” নামে এই পুঁথিটি পুরীনিবাসী পদ্মশ্রী সদাশিব রথশর্মা গঞ্জাম জেলায় আবিষ্কার করেন, এবং এই কীটদষ্ট পুঁথির কিয়দংশ তিনি জয়দেববাবুকে দিয়েছিলেন। বলা হয় চৈতন্যের মৃত্যু নিয়ে এই পুঁথিতে কিছু বিস্ফোরক তথ্য ছিল। দুঃখের কথা, জয়দেববাবু খুন হওয়ার পরে সে পুঁথির আর কোনও চিহ্ন পাওয়া যায় নি। জয়দেববাবুর অসমাপ্ত গ্রন্থ কাঁহা গেলে তোমা পাই পড়লে জানা যায়, পুঁথির রচয়িতা বৈষ্ণবদাস নিজের চোখে চৈতন্যের মৃতদেহ দেখেছিলেন, তবে দিন-ক্ষণ মাস-তারিখ কিছু বলা নেই। জগন্নাথের চন্দনবিজয়ের পরে রাত দশটার সময় গরুড় স্তম্ভের পেছনে চৈতন্যের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছিল।

উড়িষ্যার পঞ্চসখা সম্প্রদায়ের দিবাকরদাসও লিখে গেছেন, কলিকালে বেঁচে থাকা নিরর্থক বিবেচনায় নিজধামে গমন করবার বাসনা থেকে অক্ষয় তৃতীয়ার দিন চৈতন্য লীন হয়েছিলেন জগন্নাথ অঙ্গে।

পঞ্চসখার আরেকজন অচ্যুতানন্দ, ইনি বলছেন অক্ষয় তৃতীয়ার আগের দিন গভীর রাতে (সম্ভবত অক্ষয় তৃতীয়া তিথি শুরু হয়ে গেছিল) চৈতন্যর মৃত্যুর কথা। স্থান অবশ্য সেই জগন্নাথমন্দির, এবং লীলাবসান ওই শ্রীবিগ্রহে লীন হয়েই।

মাধব পট্টনায়ক চৈতন্য সমসাময়িক এবং তিনি চৈতন্যলীলার প্রত্যক্ষদর্শী (লীলাবসানেরও বটে)। অক্ষয় তৃতীয়ার আগের অমাবস্যায় (রুক্মিণী অমাবস্যা) পথে নামসঙ্কীর্তনে নৃত্যরত চৈতন্যর পায়ে ইঁটের খোঁচা লাগে,এবং ফলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হন। তাঁকে ধরাধরি করে জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং সেখানে তাঁর শুশ্রূষা চলে, যদিও কোনও কবিরাজ-বৈদ্যকে ডাকা হয়নি (গরম জলের সেঁক দেওয়া হয়েছিল মাত্র)। তাঁর শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি ঘটতে থাকে, সারা দেহ ফুলে যায়। লক্ষণীয়, কয়েকদিন ধরে অসুস্থ, অথচ কোনও বৈদ্যকে ডাকা হয়নি। অবশেষে অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ব্রাহ্মক্ষণে (খুব ভোরে) জগন্নাথ মন্দিরেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। চন্দনযাত্রায় যোগ দিতে প্রতাপরুদ্র আসছিলেন, তিনি সোজা মন্দিরে এসে পৌঁছলে চৈতন্যের মৃতদেহের সামনেই আলোচনাসভা বসে। রায় রামানন্দ বলেন, গৌড়ীয়রা নানা কুকথা বলবে, হয়ত গৌড়ের “ম্লেচ্ছ” রাজাকে “খর” ভাষণ করবে (উড়িষ্যা আক্রমণ করতে উৎসাহ দেবে), কাজেই এ শবদেহ বাইরে নিয়ে গিয়ে কাজ নেই। কোইলি বৈকুণ্ঠ (জগন্নাথের দারুমূর্তি যেখানে সমাধিস্থ হয়)-তে চৈতন্যকে সমাধি দেওয়া হোক। প্রতাপরুদ্র সম্মতি জানালে জগন্নাথ মন্দিরের দরজা বন্ধ করে চৈতন্যর নশ্বর দেহটিকে পুঁতে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়। সেই ভীষণ কার্য সমাপনান্তে মন্দিরের দরজা খুলে চন্দনযাত্রায় আগত ভক্তদের বলা হয়, চৈতন্য জগন্নাথদেহে লীন হয়ে গেছেন।

প্রসঙ্গত কোইলি বৈকুণ্ঠে সমাধি দিতে গেলে এরপরে জগন্নাথের দারুমূর্তি সমাহিত করতে গেলে সে দেহাবশেষ বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা, কাজেই এ চত্ত্বরে শেষ পর্যন্ত সমাধি সম্ভবত হয়নি, মন্দিরের অন্যত্র চৈতন্যকে সমাহিত করা হয়েছিল।

মানুষের পক্ষে মূর্তিতে লীন হওয়া সম্ভব নয়, সেযুগেও গল্পটা বিশ্বাস করেনি লোকে। কিন্তু বৈষ্ণব ভক্তদের পাণ্ডাচক্র সম্বন্ধে সন্দেহকে ধামাচাপা দিতে এই জগন্নাথে লীন হওয়ার কাহিনী প্রচারিত হয়।

জগন্নাথে লীন হওয়ার কাহিনী যাঁরা প্রচার করেছিলেন, সেই পঞ্চসখা সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ মাধবের বর্ণনা পড়লেই বোঝা যায় যে তাঁরা নিজেরাও জানতেন, এটি গল্পগাছা, কারণ লীন হওয়ার গল্প প্রচারের পাশাপাশি চৈতন্যর মৃতদেহ নিয়ে কী করা হবে সে নিয়েও বন্দোবস্ত সমান তালে চলছে।

চৈতন্যের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। জগন্নাথমন্দিরে আবিষ্কৃত কঙ্কালদ্বয়ের ফরেনসিক টেস্ট আজও হয়নি, সেটা হলে মৃত্যুর সঠিক কারণ বোঝা যেত।

আজ অক্ষয় তৃয়ীয়ার দিন। আজ চৈতন্যকে স্মরণ করার দিন। চৈতন্য এক সাম্যময় গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে সে আদর্শকে স্তব্ধ করা সম্ভব হয়নি।

আজ, অক্ষয় তৃতীয়ার দিন চৈতন্য আন্দোলনের সেই অসমাপ্ত কাজকে সুসম্পূর্ণ ও সুসম্পন্ন করার প্রতিজ্ঞা করব আমরা।

© তমাল দাশগুপ্ত

http://fb.me/tdasgupto থেকে, ২৬শে এপ্রিল ২০২০

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s