বঙ্কিম: ফিরে দেখা, এগিয়ে চলা – তমাল দাশগুপ্ত

২০১৩ সালের ছাব্বিশে জুন তারিখে বঙ্কিমের বয়েস হয়েছিল ১৭৫ বছর। সপ্তডিঙা তখনও পরিকল্পনার স্তরে, পত্রিকা প্রকাশিত হবে এবং সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন হবে আরও দুবছর পরে। সেইসময় সেই প্রোটো-সপ্তডিঙার পক্ষ থেকে কলকাতায় অ্যাকাডেমি অভ ফাইন আর্টসের কনফারেন্স হলে একটি সভা আয়োজিত হয়েছিল, বঙ্কিমঃ ফিরে দেখা, এগিয়ে চলা। আমাদের জানামতে বঙ্কিমের ১৭৫ বার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার কাজ হয়নি বাংলায়। কেউ করেনি। বিজেপি তৃণমূল লিটল ম্যাগাজিন রাবীন্দ্রিক আনন্দবাজার গ্রুপ থিয়েটার এন জি ও – কেউ না।

সেই অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে এই বার্তাটি লিখেছিলাম।

বঙ্কিমঃ ফিরে দেখা, এগিয়ে চলা

তমাল দাশগুপ্ত

বঙ্কিমকে নতুন করে না পড়লে বাঙালিরই লোকসান। বাঙালি সত্ত্বার আবাহন করেছিলেন বঙ্কিম, ওঁকে ছাড়া বোধহয় বাঙালি পরিচয়ের সংজ্ঞা খোঁজা যায় না। অগ্নিযুগ নিয়ে আমরা জার্নাল অভ বেঙ্গলি স্টাডিজ এর প্রথম সংখ্যাটা যখন প্রকাশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সেটা ২০১১ সালের শেষের দিক, বাংলার বিপ্লবীদের ওপরে কিছুটা পড়াশোনা করার সুযোগ হয়েছিল, প্রাইমারি ও সেকন্ডারি দু-রকমেরই (অর্থাৎ বিপ্লবীদের নিজেদের লেখা, এবং বিপ্লবীদের সম্পর্কিত অন্যান্য লেখাপত্র), এবং একটা বিষয় বার বার উঠে এসেছিলঃ বঙ্কিম বাংলার বিপ্লববাদের জনক, জাতীয়তাবাদেরও জনক। এবং সেই বিপ্লববাদকে জাতীয়তাবাদ থেকে আলাদা করা যায় না, সেই জাতীয়তাবাদকেও বিপ্লববাদ থেকে আলাদা করা যায় না।
মার্ক্সীয় চিন্তাবিদ টেরি ইগলটন একজন আইরিশ জাতীয়তাবাদী এবং ক্রিশ্চান তাত্ত্বিক। তিনি তাঁর আলোচনায় মার্ক্সবাদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও খ্রীষ্টধর্ম মিলিয়েছেন, এবং সেজন্য ইউরোপীয় মার্ক্সবাদীরা তার মুণ্ডুপাত করেন না। ভারতে কোনও মার্ক্সবাদী অবশ্য বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ (রেভলিউশনারি ন্যাশনালিজম, যার সম্পর্কে ইগলটন বলে থাকেন যে বিংশ শতকে সাড়া পৃথিবী জুড়ে মানবমুক্তি ঘটানোর পেছনে সবথেকে বেশি অবদান এই রাজনৈতিক আন্দোলনেরই) নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখাবেন না। ভারতের কমিউনিস্টরা আসলে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনকে ব্রিটিশ জেলের মধ্যে সাবভার্ট করে, ব্রিটিশের হাত মজবুত করে উঠেছিলেন, তাই সে আন্দোলন নিয়ে ভারতের মার্ক্সবাদীরা উচ্চবাচ্য করবেন না, তাতে আর আশ্চর্য কি। আর বঙ্কিম থেকে তো এরা শতহাত দূরে থাকেন।
বঙ্কিম লিখছেন হিন্দুধর্মের কথা, তিনি বাঙালির ইতিহাস চেয়েছেন, তিনি বাঙালি জাতির রূপরেখা খুঁজেছেন তার জনসংস্কৃতিতে, তার মহাকাব্যে, তার পুরাণে। তিনি বন্দে মাতরম দিয়েছেন, ধর্মতত্ত্ব দিয়েছেন, সাম্য দিয়েছেন। কৃষ্ণচরিত্র লিখেছেন, কমলাকান্তের দপ্তর লিখেছেন, মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত লিখেছেন। বাংলা উপন্যাসের জন্ম দিয়েছেন, এবং আজ পর্যন্ত তিনি ছাড়া বাংলা সাহিত্যে বোধহয় আর কোনও আদর্শ নেই, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় যেমনটা এক সময় বলেছিলেন। এ-হেন যুগনায়কের ১৭৫-তম জন্মবার্ষিকীতে এ দেশে যা হওয়ার কথা ছিল, তার সামান্য ভগ্নাংশও কলকাতায় কি বাংলায় হচ্ছে না। বাঙালিরই ভগ্নদশা, কি আর করা!
সপ্তডিঙা সবে পথ চলতে শুরু করেছে। বঙ্কিমের নাম নিয়ে যাত্রা শুরু হল।

© তমাল দাশগুপ্ত

http://fb.me/tdasgupto থেকে, ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৯

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s